মুসলিম সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে বাঙালির বাঙলা (শেষ পর্ব) | ফয়জুল্লাহ মনির

বিশ শতকের আলো : উচ্ছল উন্মেষ
বিশ শতকের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। অনেক কিছুই এখনও আমাদের চোখের সামনে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়। বাংলার সীমানা অনেকটা খাটো হয়ে আসে। অনেক বাঙালি লেখক বাইরেই থেকে যান। এরপর আসে ১৯৫২ সাল। বাংলার ভাষা আন্দোলন। রফিকউদ্দিন, আবদুস সালাম, আবুল বরকত, আব্দুল জব্বার, শফিউর রহমান শফিক ও আউয়াল সহ বহু মুসলিম বীর সন্তানের শাহাদাতের বিনিময়ে বাংলা ভাষা লাভ করে তার সম্পূর্ণ অধিকার। আপন রূপে আবির্ভূত হয়। নতুন চেতনায় বাংলা সাহিত্য পুনরুজ্জীবিত হয়। বাংলা সাহিত্যে ভাষা আন্দোলনের প্রভাব অনেক গভীর। হৃদয়ের তলদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। অতঃপর ১৯৭১ সালে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে বাংলা একান্তই বাঙালির সম্পদে পরিণত হয়। বাঙালিরা লাভ করে তাদের নিজস্ব স্বাধীন মাতৃভূমি। বিশ্বের মানচিত্রে ভেসে ওঠে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা প্রিয় বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। ঊনিশ শতকের অনেক বাংলা সাহিত্যিকই বিশ শতকের প্রথমটা জুড়ে ছিলেন। দুই তিন দশক পর্যন্ত। এরপর শুরু হয়েছে বিশ শতকের মূল আধুনিকতা।
বিশ শতকের প্রথমেই আলোচনা করব বাংলার এক স্বরণীয় ব্যাক্তিত্ব, বহু ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫—১৯৬৯) কে নিয়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরেই দেশের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে যে কজন ব্যাক্তি জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন, তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তার এই ভূমিকার কারণেই পরবর্তীতে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ অনেকখানি সুগম হয়েছিল। তিনি সব সময়ই সাহিত্য কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন। তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ভাষা ও সাহিত্য, বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, দীওয়ানে হাফিজ, রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম, নবী করিম মুহাম্মাদ, ব্যাকরণ পরিচয়, বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান ও টেইল ফ্রম দি কুরআন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৮—১৯৪০)। ইনিও রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষাবলম্বন করেন। বাংলা গদ্যের একজন শক্তিশালী শিল্পী ছিলেন। ইসলামী দর্শন ও সংস্কৃতি তার লেখার মূল উপজীব্য। বক্তব্যের বলিষ্ঠতা, ভাষার মাধুর্য ও ভাবের গাম্ভীর্যে তার রচনা অনন্যতার দাবিদার। হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির পক্ষে কাজ করেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪টি। ধর্মের কাহিনী (১৯১৪), নূরনবী (১৯১৮), শান্তিধারা (১৯১৯) ও মানব মুকুট (১৯২২)।
উপমহাদেশের আরেকজন মুসলিম শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ছিলেন টাঙ্গাইলের অধ্যাপক ইবরাহীম খাঁ (১৮৯৪—১৯৭৮)। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি একাধারে স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, জীবনচরিত, শিশুসাহিত্য, পাঠ্যপুস্তক ও অনুবাদ সহ প্রায় শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে কামাল পাশা, ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র, আমাদের মহানবী, বৌ বেগম, ইসলাম সোপান ও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অন্যতম।
তারুণ্যের কল্লোল : কবি কাজী নজরুল
‘দুখু মিয়া’ নামে পরিচিত কবি কাজী নজরুল ইসলামের পুরো জীবনটাই একটা বিস্ময়। বহু চড়াই উৎরাই আর বৈচিত্র্যের আখ্যান। বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে এমন প্রতিভা একমাত্র একটিই জন্মেছিল। মাত্র বিশ বছরে বাংলা সাহিত্যের পুরো কাঠামোটাই যেন পাল্টে দিয়েছেন। এত আধুনিকতা, এত ঐশ্বর্য, এত অল্প সময়ে বাংলা সাহিত্যের আর কোন কবি দিয়েছেন বলে জানা যায় না। হ্যা, রবীন্দ্রনাথকে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয় ঠিক। তবে তিনি সময় পেয়েছিলেন ষাট সত্তর বছর। সেই তুলনায় নজরুল সাহিত্য চর্চার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র বিশ বাইশ বছর। এর মাঝেও কত বাঁধা, কত আপদ।
যাই হোক, বিংশ শতাব্দীর মূল আধুনিকতা যে নজরুলকে দিয়েই সূচনা হয়েছে, তা অস্বীকার করবার জো নেই। তখনকার সময়ে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে একটা বলয় তৈরি হয়েছিল। অনেকেই বের হতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। পুরোপুরি সফল হতে পারেন নি। নজরুলই প্রথম সার্থক কবি, যিনি রবীন্দ্রধারা থেকে বেরিয়ে নতুন এক ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। “অগ্নিবীণা” দিয়ে ১৯২২ সালে তিনি বাংলা সাহিত্যে আগমণ করেন। এটি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ হলেও কোন অংশেই এতে কোন ধরনের ত্রুটি ছিল না। বরং এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থের একটি বলা যায়। এতে প্রলয়োল্লাস, বিদ্রোহী, কামাল পাশা, শাত–ইল–আরব, ধূমকেতু সহ বারোটি কবিতা স্থান পেয়েছে। এরপর তিনি একে একে লিখেছেন সঞ্চিতা (১৯২৫), সাম্যবাদী (১৯২৫), ফনী-মনসা (১৯২৭), চক্রবাক (১৯২৯), সাতভাই চম্পা (১৯৩৩), নির্ঝর (১৯৩৯), নতুন চাঁদ (১৯৩৯) ও মরুভাস্কর (১৯৫১)।
“মরুভাস্কর” নজরুলের এক অমর কীর্তি। এতে চার ভাগে রাসূলের জন্ম থেকে নিয়ে মক্কী জীবন চিত্রিত হয়েছে। অবতারণা করেছেন এভাবে—
“জেগে ওঠ্ তুই রে ভোরের পাখি,
নিশি–প্রভাতের কবি!
লোহিত সাগরে সিনান করিয়া
উদিল আরব–রবি।”
নজরুলের সাহিত্যকর্ম কতটি? বিশ বছরে যতগুলো কল্পনা করা যায় না, ঠিক ততটি। কবিতার পাশাপাশি তিনি লিখেছেন ছোট গল্প ব্যথার দান (১৯২২), রিক্তের বেদন (১৯২৫) ও শিউলি মালা (১৯৩১)। লিখেছেন উপন্যাস বাঁধন হারা (১৯২৭), মৃত্যুক্ষুধা (১৯৩০) ও কুহেলিকা (১৯৩১)। আরও লিখেছেন ঝিলিমিলি (১৯৩০), আলেয়া (১৯৩১) ও পুতুলের বিয়ে (১৯৩৩) নাট্যগ্রন্থ। সাহিত্যের মোটামুটি সব শাখায় তাঁর পদচারণা ছিল। এছাড়াও আরও বহু প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কবিতা ও গ্রন্থ রচনা করেছেন। অনুবাদ করেছেন রুবাইয়াৎ–ই–ওমর খৈয়াম, দিওয়ানে হাফিজ ও কাব্যে আমপারা। তাঁর সমস্ত গ্রন্থের বর্ণণা এই ছোট্ট পরিসরে দেওয়া সত্যিই সম্ভব নয়।
‘নজরুল সঙ্গীত’ তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিকর্ম। তাঁর সীমিত কর্মজীবনে তিনি ৪০০০ এরও অধিক গান রচনা করেছেন। পৃথিবীর কোনো ভাষায় একক হাতে এত বেশি সংখ্যক গান রচনার উদাহরণ নেই। এ সকল গানের বড় একটি অংশ তারই সুরারোপিত। তার রচিত “চল্‌ চল্‌ চল্‌, ঊর্ধ্বগগণে বাজে মাদল” বাংলাদেশের রণসংগীত। “বিষের বাঁশি” তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এছাড়াও “গজল” তাঁর অনন্য সৃষ্টিশীলতার পরিচয় বহন করে।
কবি নজরুল কি শুধুই কবি ছিলেন? না, তাঁর আরও অনেক পরিচয় আছে। তিনি ছিলেন গভীরভাবে দেশপ্রেমী। পরাধীনতার শৃঙ্খল তাঁর একেবারেই সইতো না। তাঁর বিদ্রোহী কবিতাগুলোর মাঝে আমরা বিধ্বংসী ক্ষোভ ও হতাশার কালো ছায়া প্রোজ্জ্বলভাবে দেখতে পাই। সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন তিনি কুমিল্লায় ছিলেন। সেখান থেকেই তিনি যুবসমাজকে নিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। লিখে চলেন দেশাত্মবোধক ও চরম উদ্দীপনাময় কিছু গান। “মরণ–বরণ” কাব্যে তিনি আত্মত্যাগের উদ্দাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন—
“এসাে এসাে এসাে ওগাে মরণ!
এই মরণ–ভীতু মানুষ–মেষের ভয় করাে তাে হরণ৷৷
না বেরিয়েই পথে যারা পথের ভয়ে ঘরে
বন্ধ–করা অন্ধকারে মরার আগেই মরে,
তাতা থইথই তাতা থইথই তাদের বুকের পরে
ভীম রুদ্রতালে নাচুক তোমার ভাঙন–ভরা চরণ।।”
রাজনৈতিক কারণেই কবি নজরুল সাংবাদিকতাকে বেছে নিয়েছিলেন। পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর নিকট অকপটে একের পর এক স্বাধীনতার আবেদন করে গেছেন। উচ্চারণ করেছেন আন্দোলনের স্পষ্ট অনলবর্ষী ভাষা। ফলশ্রুতিতে তাঁকে কারাগারে যেতে হয়েছে। বরণ করতে হয়েছে বন্দীত্বের দীর্ঘ যাতনা। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকাগুলোর মধ্যে পাক্ষিক “ধূমকেতু” অন্যতম। এর প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয় নজরুলের আরেক বিদ্রোহী কবিতা ‘ধূমকেতু’। কবিগুরু এই পাক্ষিককে আশীর্বাদ করে লিখেছিলেন—
“আয় চলে আয় রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।”
আরেকটি মাসিক পত্রিকার নাম ছিল “কল্লোল”। তরুণদের উদ্দীপ্ত চেতনার কল্লোল। এটি গতানুগতিক কোন সাময়িকীর মত নয়। এখানকার লেখকেরা কোন দূর্নামের তোয়াক্কা করে না। ধার ধারে না কোন অশুভ শক্তির। যৌবনের আবেগে উদ্বেলিত হয়ে সে সময়টায় যেই তরুণরা এতে লিখে চলেছিলেন, তারাই পরবর্তীতে বিবেচিত হন বিংশ শতাব্দীর আধুনিকতার পথিকৃৎ হিসেবে।
নজরুলকে নিয়ে অনেক কিছুই লেখার আছে। আছে অনেক গবেষণার। বাংলা সাহিত্যে যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি গ্রন্থ রচিত হয়েছে তিনি কবি নজরুল। তারপরও তাঁর ঋণ শোধ হয় নি। তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন হয় নি। তাঁর অবস্থান অনুসারে সঠিক মর্যাদা দেয়া হয় নি।
নজরুলের সমসাময়িক মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত আরেক বিখ্যাত কবি ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭—১৯৬৪)। স্কুল জীবনেই তার কাব্যপ্রতিভার প্রকাশ ঘটে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “রক্ত রাগ” প্রকাশিত হলে কবিগুরু তাকে সম্ভাষণ করে বলেন—
“তব নব প্রভাতের রক্তরাগখানি মধ্যাহ্নে জাগায় যেন জ্যোতির্ময়ী বাণী।”
তার পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের মধ্যে হাসনাহেনা, খোশরোজ, সাহারা, বুলবুলিস্তান এবং উপন্যাসের মধ্যে রূপের নেশা, ভাঙ্গাবুক ও এক মন এক প্রাণ পাঠক সমাজে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। অনুবাদেও তার বিশেষ কৃতিত্ব ছিল।  ‘ইখওয়ানুস সাফা’, ‘মুসাদ্দাস-ই-হালী’, ‘কালাম-ই-ইকবাল’, ‘শিকওয়া’ ও ‘আল-কুরআন’ তার ভাষান্তরিত গ্রন্থগুলির অন্যতম। এছাড়া ইসলাম ও কমিউনিজম, ইসলামে জিহাদ তার গভীর চিন্তাধারার ফসল।
কবি গোলাম মোস্তফার “বিশ্বনবী” এক আশ্চর্য সৃষ্টি। এটি গদ্যে রচিত হলেও ভাষাগত দিক থেকে এটি ছন্দময় এবং মধুর। বাংলা ভাষায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি সার্থক জীবনীগ্রন্থ। এতে হৃদয়ের যেই আবেগ এবং আন্তরিক অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে তার উদাহরণ দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া বিরল। কুরআনিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে রচিত “বনি আদম” মহাকাব্য তার আরেক অমর ও অক্ষয় কীর্তি। সঙ্গীতেও তার উল্লেখযোগ্য প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়।
সমসাময়িক কবিদের মাঝে আরেকজন ছিলেন কবি জসীম উদদীন (১৯০৩—১৯৭৬)। ‘পল্লী কবি’ উপাধিতে ভূষিত এই কবির শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ নকশী কাঁথার মাঠ। এটি বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন বাংলা পাঠ্যবইয়ে তার “কবর” কবিতাটি স্থান পায়। এছাড়াও কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রাখালী (১৯২৭), বালুচর (১৯৩০), ধানখেত (১৯৩৩), সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৪), হাসু (১৯৩৮), রুপবতি (১৯৪৬), মাটির কান্না (১৯৫১) ও এক পয়সার বাঁশী (১৯৫৬) এবং ‘বেদের মেয়ে’ (১৯৫১) নাটক, ‘যাদের দেখেছি’ (১৯৫১) আত্মকথা, ‘চলে মুসাফির’ (১৯৫২) ভ্রমণ কাহিনী, ‘রঙিলা নায়ের মাঝি’ (১৯৩৫) সঙ্গীত ও ‘বোবা কাহিনী’ (১৯৬৪) উপন্যাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এবং ছিলেন কবি বন্দে আলী মিয়া (১৯০৭—১৯৭৮)। তিনি রচনা করেছেন আমাদের ছোটবেলার সেই কালজয়ী কবিতা—
“আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর,
থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর৷”
আরও ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল (১৯১১—১৯৯৯)। তার রচিত ‘তুলি দুই হাত, করি মোনাজাত’ “প্রার্থনা” কবিতা আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
এবার বলব ইসলামি রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ (১৯১৮—১৯৭৪) এর কথা। কবিতার মাধ্যমেও যে অনেক কিছু পাল্টে দেয়া যায়, ফররুখ তা বিশ্বাস করতেন। এজন্য তিনি আজীবন নিজ আদর্শকে আঁকড়ে ধরে কবিতার চর্চা করে গেছেন। তার কবিতায় মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অনুপ্রেরণা প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়াও প্রকরণকৌশল, শব্দচয়ন ও বাকপ্রতিমায় তাঁর কবিতা অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জল। আধুনিকতার সকল লক্ষণ তাঁর কবিতায় পরিস্ফুট। “সাত সাগরের মাঝি” তাঁর এক অমর সৃষ্টি। এতে যেই কাব্যভাষা স্থান পেয়েছে তা সম্পূর্ণই স্বতন্ত্র।
পাশাপাশি তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে সিরাজাম মুনীরা (১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১), হাতেম তায়ী (১৯৬৬), কাফেলা (১৯৮০), সিন্দাবাদ (১৯৮৩) ও দিলরুবা (১৯৯৪) এবং শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্যে পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৭০) ও চাঁদের আসর (১৯৭০) অন্যতম। কবি মন দিয়ে সমাজকে উপলব্ধি করতেন। সমাজের দুরাচার, মিথ্যাচার ও ভদ্র মুখোশের আড়ালে নিত্য প্রতারণা তাঁকে ব্যথিত করে তুলত। তিনি আক্ষেপ ভরে লিখেছেন—
“এ কোন সভ্যতা আজ মানুষের চরম সত্তাকে করে পরিহাস?
কোন ইবলিস আজ মানুষেরে ফেলি মৃত্যুপাকে করে পরিহাস?”
কবির আর সহ্য হয় না। মানবতার এই অধঃপতনে কবির ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। বিদ্রোহী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে মুসলিম সমাজকে জেগে ওঠার আহ্বানে কবি চিৎকার করে বলেন—
“ছিঁড়ে ফেলো আজ আয়েশী রাতের মখমল-অবসাদ,
নতুন পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দাবাদ!”
উপরোক্ত বিখ্যাত কবিরা মোটামুটি সবাই ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের আধুনিকতার রূপকার। দ্বিতীয় ভাগে বাংলা সাহিত্য খোলস পাল্টেছে আরও অনেক রূপে। বেড়েছে নতুন নতুন বহু ঐশ্বর্য। সৃষ্টি হয়েছে আধুনিকতার নবতর ধারা। কবিতা এখন আর ছন্দের বাঁধনে আটকে থাকে না। শব্দের দেউড়ি পেরিয়ে বর্তমানে কবিতার ভাবটাই প্রধান। গদ্যের জন্যও এখন আর কঠিন শব্দ খুঁজতে হয় না। বড় বড় বাক্যও তৈরি করতে হয় না। বরং বক্তব্যকে যত সাবলীলভাবে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা যায়, ততই আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত হয়।
এই সময়টায় কাব্য জগতের প্রায় পুরোটা জুড়ে আছেন দুই বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ (১৯৩৬—২০১৯)। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। কবিতাকে যেমন নতুন আঙ্গিক, চেতনা ও বাকভঙ্গিতে সমৃদ্ধ করে গেছেন, ঠিক তেমনি গদ্যেও বিষয়বস্তু, বর্ণণাভঙ্গি ও উপস্থাপনায় তার অনন্যতা সহজেই চোখে পড়ে। তিনি কেন নাস্তিকতার পাশ ঘেঁষেও নিজের ঐতিহ্যকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন, তার জন্য আজও একটা সমাজ নাক ছিটকায়, প্রশ্ন তোলে। তিনি নিজেই এর উত্তর বলে গেছেন, “আমি যে পরিবারে জন্মেছি তারা সবাই ছিল খুবই ধর্মপ্রবণ লোক। কীভাবে যেন তাদের মধ্যেই যে রয়েছে সত্যিকারের পথের ঠিকানা, এটা আমাকে দূর থেকে ইশারায় ডাকতো”।
তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য বলেছেন—
“হে মোহান্ত, তেমন কোনো শব্দ জানো কি
যার উচ্চারণকে মন্ত্র বলা যায়?
হে মোয়াজ্জিন, তোমার আহ্বানকে
কী করে আজান বলো, যা এতো নির্দিষ্ট।
আর হে নাস্তিক!
তোমর উচ্চকণ্ঠ উল্লাসকে কোন শর্তে আনন্দ বলো
যা এত দ্বিধান্বিত,
তাই আমি নাস্তিক নই।”
খাঁটি ঈমানের বর্ণণায় তার ভাষ্যে ফুটে ওঠে—
“নগরে প্রচার করে পরিপূর্ণ পল্লবের ভয়।
অথচ ঘুমের মধ্যে কারা যেন, মানুষ না জিন
আমার কবিতা পড়ে বলে ওঠে, আমিন, আমিন।”
(সবুজ ঈমান, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো)
‘আমাদের মিছিল’ কবিতাটি নিজ ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর অগাধ ভক্তির পরিচয় তুলে ধরে—
“আমাদের এ মিছিল নিকট অতীত থেকে অনন্ত কালের দিকে
আমরা বদর থেকে ওহুদ হয়ে এখানে,
শত সংঘাতের মধ্যে এ কাফেলায় এসে দাঁড়িয়েছি।
কে জিজ্ঞেস করে আমরা কোথায় যাবো?
আমরা তো বলেছি আমাদের যাত্রা অনন্ত কালের।
উদয় ও অস্তের ক্লান্তি আমাদের কোনদিনই বিহ্বল করতে পারেনি।”
৫০-এর দশকে যে কয়েকজন লেখক ভাষা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদ, রাজনীতি, অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবং পশ্চিম পাকিস্তানি সরকার বিরোধী আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন তাদের মধ্যে আল মাহমুদ অন্যতম একজন। লোক লোকান্তর (১৯৬৩), কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৭৩), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এছাড়াও গল্প, উপন্যাস ও তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থগুলোর সত্যিই তুলনা হয় না।
এক বিংশ শতাব্দীঃ কওমীয়ানদের পদচারণা
মুসলিম নামধারী লেখকরা যখন শঙ্কর প্রজাতির সংস্পর্শে নিজেদের সংস্কৃতি খুঁইয়ে বসেছে, তখনই এই ধারাটির সৃষ্টি হওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে এই ধারার উর্ধতন পুরুষরা বিংশ শতাব্দী থেকেই সক্রীয় ছিলেন। এক্ষেত্রে প্রথমেই আমি স্মরণ করব ‘মুজাহিদে আযম’ নামে খ্যাত আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. (১৮৯৬—১৯৬৯) কে। হাদীস পাঠদানের পাশাপাশি তিনি সমাজ সংস্কারের কথা ভাবতেন। সাধারণ জনতার দীন শিক্ষার পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করতেন। তাঁর রচিত স্বতন্ত্র গ্রন্থগুলোর মাঝে রয়েছে- ১. বাইয়াতনামা. ২. তাওবানামা. ৩. ইলমের ফজিলত. ৪. নামাজের ফজিলত. ৫. জিকিরের ফজিলত. ৬. নামাজের অর্থ. ৭. রোজার ফজিলত. ৮. তেজারতের ফজিলত ইত্যাদি। অনুবাদও করেছেন বেশ অনেকগুলো গ্রন্থ। এসবের মধ্যে ১. বেহেশতী জেওর (১১ খণ্ড) ২. তাবলীগে দীন. ৩. ফুরুউল ঈমান. ৪. হায়াতুল মুসলিমীন. ৫. কাসদুস সাবীল. ৬. মোনাজাতে মাকবুল. ৭. তালীমুদ্দীন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সব মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা একশ ছাড়িয়েছে।
তাঁরই যোগ্য সাগরিদ ছিলেন শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. (১৯১৯—২০১২)। তাঁর হাত ধরেই হাদীসের সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ বুখারী শরীফের প্রথম বাংলা অনুবাদ হয়। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে আছে—
১. মুসলিম শরীফ ও অন্যান্য হাদীসের ছয় কিতাব।
২. মসনবি-এর বঙ্গানুবাদ।
৩. পুঁজিবাদ, সমাজবাদ ও ইসলাম।
৪. কাদিয়ানি মতবাদের খণ্ডন।
৫. মুনাজাতে মাকবূল।
৬. সত্যের পথে সংগ্রাম।
আরেকজন ব্যাক্তিত্বের কথা বলব। ড. কাজী দীন মুহম্মদ (১৯২৭—২০০১)। তিনিই সর্বপ্রথম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের লিঙ্গুইজটিকস এন্ড ফনিটিকস বিভাগে আধুনিক বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বে বাংলা ভাষার ক্রিয়ারূপ নিয়ে গবেষণা করে উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করেন। আলেম পরিবারে জন্ম নেয়া এই মনিষী নিজে কওমীতে পড়েন নি। তারপরও আদর্শ ও মননে তিনি কওমীয়ানদের তুলনায় কোন অংশে কম ছিলেন না। তাঁর রচনাগুলোই এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ বহন করে। মানবমর্যাদা (১৯৬০), সুফীবাদ ও আমাদের সমাজ (১৯৬৯), জীবনসৌন্দর্য (১৯৮১), সূফীবাদের গোড়ার কথা (১৯৮০), মানবজীবন (১৯৮০), নাস্তিকতা ও আস্তিকতা (১৯৯৩), আমি তো দিয়েছি তোমাকে কাউসার (১৯৯৩) ও ছোটদের হযরত মুহাম্মদ সা. (১৯৯৯) ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাবলী। এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সম্পাদনা বোর্ডেও কাজ করেছেন অনেক দিন।
তাঁরই সমসাময়িক আরও দুইজনের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। একজন হচ্ছেন ভাষাসৈনিক অধ্যাপক শাহেদ আলী (১৯২৫ – ২০০১)। তাঁর তরুণ মুসলিমের ভূমিকা (১৯৪৬), একমাত্র পথ (১৯৪৬), ফিলিস্তিনে রুশ ভূমিকা (১৯৪৮) ও বুদ্ধির ফসল আত্মার আশিস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি অনুবাদ করেছেন মক্কার পথ, ইসলামে রাষ্ট্র ও সরকার এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও আধুনিক মানুষ।
অপরজন হচ্ছেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ (১৯০৬—১৯৯৯)। ইনিও ভাষা আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। তাঁর তমদ্দুনের বিকাশ, সত্যের সৈনিক আবুজর, ইতিহাসের ধারা, ব্যাকগ্রাউন্ড অব দি কালচার অব বেঙ্গল ও জীবন সমস্যার সমাধানে ইসলাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত সব মিলিয়ে তার গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় একশ ছুঁইছুঁই।
কওমীয়ানদের মাঝে সাহিত্য চর্চা ও ভাষাপ্রেম ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই যাঁর নাম উঠে আসে তিনি আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ. (১৯৩৩—২০১৩)। দেশ স্বাধীনের পর কওমী অঙ্গনে তাঁর খেদমত ছিল সুদূরপ্রসারী। তাঁর রচনায় খুঁজে পাওয়া যায় বলিষ্ঠ ভাষা ও ঐতিহ্যের রসবোধের সিক্ততা। নজরুল–রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতা ছিল তাঁর ঠোঁটস্থ। তিনি বিভিন্ন আয়াতের তরজমা করতেন কবিতা দিয়ে। সূরা আলে ইমরানের ১৬৯ নং আয়াতের তরজমায় তিনি বলতেন—
“উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,
ভয় নাই ওরে ভয় নাই।
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।”
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
নজরুলের কবিতা তাঁকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। তিনি প্রায়ই আবৃত্তি করতেন—
“উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ
আমরা বলিব সাম্য, শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।
উহারা চাহুক দাসের জীবন, আমরা শহীদী দর্জা চাই
নিত্য মৃত্যুতে ভীত ওরা, মােরা মৃত্যু কোথায় খুঁজে বেড়াই।”
তাঁর স্বতন্ত্র গ্রন্থের সংখ্যা খুব বেশি না। তবে যা আছে, তাই তার পাণ্ডিত্য ও গভীর প্রতিভার পরিচয় বহন করার জন্য যথেষ্ট। তাছাড়া তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে সম্পাদনার যেই বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, তা সত্যিই বিরল। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলির মাঝে রয়েছে ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ, বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সুর (দুই খণ্ড), হাদীসের আলোকে ইসলামী আদর্শবাদ ও জমিয়ত পরিচিতি। অনুবাদ করেছেন তানভিরুল মিশকাত, হেদায়ার কিতাবুল ওসায়া, কিতাবুল আদাব ও মসজিদের মর্মবাণী প্রভৃতি।
কওমী অঙ্গনের আরেক দিকপাল ছিলেন মাসিক মদীনার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. (১৯৩৫—২০১৬)। বাংলা ভাষায় ইসলামের প্রচারই ছিল তাঁর কলম ধারণের মূল লক্ষ্য। সীরাত গবেষণা ছিল তাঁর একমাত্র প্রিয় বিষয়। বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চার ক্ষেত্রে তাঁকে পথিকৃৎ গণ্য করা হয়। সীরাত চর্চায় উৎসাহ প্রদানের জন্য তিনি ‘সীরাত স্বর্ণ পদক’ এর প্রবর্তন করেন। ‘রাবেতায়ে আলম আল ইসলামি’র তিনিই প্রথম বাংলাদেশি সদস্য। মাসিক মদীনা তাঁর একটি স্বপ্ন। একে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে তাঁর সকল রচনা। প্রতিষ্ঠা করেছেন মদীনা পাবলিকেশন্স। তাঁর মৌলিক রচনাবলীর মধ্যে ইমাম যয়নুল আবেদীন, দরবারে আওলিয়া, বিপ্লবী সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী রা. ও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবনের খেলাঘরে’ অন্যতম রচনা। তাঁর অনুবাদ গ্রন্থের তালিকা অনেক দীর্ঘ। যখনই যেটার প্রয়োজন অনুভব করেছেন, বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য তা ভাষান্তর করে দিয়েছেন। ভাষার সাবলীলতায়, বর্ণণার সৌন্দর্যে সেগুলো স্থান করে নিয়েছে স্বতন্ত্র গ্রন্থের ভূমিকায়। এগুলোর মধ্যে তফসীরে মা’আরেফুল কুরআন, ওসওয়ায়ে রাসূলে আকরাম সা., হৃদয়তীর্থ মদীনার পথে, সীরাতুন্নবী সা., খাসায়েসুল কুবরা, সীরাতে রাসূলে আকরাম সা., আল মুরশিদুল আমীন, চেরাগে মুহাম্মদ সা., মারেফাত জ্ঞানের রত্নভাণ্ডার, ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, মাকতুবাত ও জীবন সায়াহ্নে মানবতার রূপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি যতটা না সাহিত্য চর্চা করতেন, তার চেয়ে বেশি উৎসাহিত করতেন। ফলে তাঁর ছত্রছায়ায় জন্ম নিয়েছে বিংশ শতাব্দীর বহু কলমসৈনিক। এক বিংশ শতাব্দীতে আমরা তাদের বিপ্লবের অপেক্ষায় রইলাম।
স্বতন্ত্রতাই যাঁর ছন্দ, সৃজনশীলতাই যাঁর ভূষণ, কওমী অঙ্গনের এমন একজন মনীষী ছিলেন আল্লামা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া (১৯৫৪—২০১৭)। ছাত্র জমানাতেই এক উস্তাদের কাছ ‘আবুল ফাতাহ’ নামটি লাভ করেছিলেন। পারিপার্শ্বিকতা তাকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করত। তিনি সমসাময়িক বিষয় নিয়ে প্রচুর ভাবতেন। যার দরুন তাঁর কলমে ওঠে আসে চমৎকার কিছু গবেষণাধর্মী মৌলিক রচনা। কওমী ধারার ইতিহাস নিয়ে লেখেন ‘দেওবন্দ আন্দোলন; ইতিহাস ঐতিহ্য অবদান’। সুদী অর্থনীতির বেড়াজাল থেকে বাঁচতে লেখেন ‘ইসলামী অর্থনীতির আধুনিক রূপায়ন’। ইসলামী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ দেখাতে রচনা করেন ‘আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইসলাম’। ইসলামী আইন বিষয়ে রচনা করেন ‘ইসলামী আইন ও বিচারব্যবস্থা’। উসূলে হাদীস সম্পর্কে রচিত হয় ‘হাদীস অধ্যায়নের মূলনীতি’।
নাস্তিকতার সয়লাব ঠেকাতে রচিত হয় ‘স্রষ্টা ও তাঁর স্বরূপ সন্ধানে’। জীবনের আরেকটি অলঙ্ঘনীয় অনুষঙ্গ যৌন চাহিদা নিয়ে তিনি লিখেছেন চমৎকার একটি গ্রন্থ ‘ইসলাম ও যৌনবিধান’। এছাড়াও আরও লিখেছেন ইসলাম ও সমাজবিজ্ঞান, আল্লাহর পথে সংগ্রাম, জেগে উঠো হে ঘুমন্ত শতাব্দী, তালিবে ইলমের জীবন গড়ার কর্মসূচি, রচনাসম্ভার ও ইসলামের দৃষ্টিতে পীর মুরিদী। ‘জেগে ওঠো হে ঘুমন্ত শতাব্দী’ একটি কাব্যগ্রন্থ। এতে তাঁর অসাধারণ কবিপ্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর ভিতরের ধিকি ধিকি জ্বলা, উদ্দীপ্ত, স্বপ্নদ্রষ্টা এক চেতনার। তিনি দূর্বার সাহসে ভর করে পুনর্জাগরণের উদ্দাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলে ওঠেন—
“জেগে ওঠো হে ঘুমন্ত শতাব্দী!
জেগে ওঠো আরেকবার;
আতঙ্কে ঘেরা ভয়াল রজনীর শামিয়ানা ফেঁড়ে,
দিয়ে হায়দারী হুঙ্কার,
মুছে নিদ্রালো চোখ তব,
জেগে ওঠো না আরেকবার!”
ভালোবাসায় টইটম্বুর কওমী অঙ্গনের আরেক কারিগরকে আমরা চিনি ‘আদীব হুজুর’ নামে। আবু তাহের মিসবাহ দা. বা.। “পুষ্প” এর মাধ্যমে তিনি সৃষ্টি করেছেন বাংলা সাহিত্যের নতুন এক ধারা। এছাড়াও লিখেছেন বায়তুল্লাহর ছায়ায়, বায়তুল্লাহর মুসাফির, দরদী মালির কথা শোনো। শিশুদের জন্য লিখেছেন আকীদা সিরিজ ও সীরাত সিরিজ।
আমাদের অঙ্গনের উর্ধতনদের মধ্যে আরও আছেন ইতিহাস লেখক, বহু কলামিস্ট মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী। আছেন নিভৃতচারী এক শিশুসাহিত্যিক মাওলানা নাসিম আরাফাত। লিখে চলেছেন সভ্য পৃথিবীর অহঙ্কার মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন। লিখে চলেছেন সীরাত পাঠক মাওলানা ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী। লিখে চলেছেন কুরআনপ্রেমী মাওলানা মুহাম্মদ আতীক উল্লাহ। আরও আছেন সাহসী কলমসৈনিক, বিশিষ্ট সাংবাদিক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ। এছাড়াও বিশিষ্ট আরও অনেকেই আছেন। এরা সবাই ইন্তেকাল অবধি লিখে যাবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এবং এঁদের আঁচল ধরেই গড়ে উঠবে কওমীয়ানদের এক বিংশ শতাব্দীর বিস্ময়কর ইতিহাসের নতুন পাতা।
পরিশিষ্ট :
এখানে আমি সকল মুসলিম সাহিত্যিকদের নাম জমায়েত করতে পারি নি। যাদের নাম উল্লেখ করেছি, তাদের সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য দেয়া সম্ভব হয় নি। তেমন কোন চেষ্টাও অবশ্য ছিল না। আমি কেবল যুগ যুগ ধরে অবহেলিত ইতিহাসের এই পৃষ্ঠাটির প্রতি আবার নতুন করে সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে চেয়েছি। এখানে যতটুকু বর্ণিত হয়েছে, তার চেয়েও বাকি রয়ে গেছে দ্বিগুণ। বাকি রয়ে গেছে ইতিহাসের আরও অনেক জানালা। এসব খুলে খুলে আমাদেরকেই একদিন মলাটবদ্ধ করতে হবে। নাহয় হুমায়ূন আজাদের মত শঙ্কর প্রজাতির সুসাহিত্যিকরা ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ বইয়ে নির্লজ্জের মত বলে বসবে, “এখানে হিন্দু কবিদের কথা বলব”।
সূত্র :
১/ বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস (১ম খণ্ড) ~ ডক্টর এম. এ. রহিম।
২/ বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস (২য় খণ্ড) ~ ডক্টর এম. এ. রহিম।
৩/ দেওবন্দ আন্দোলন, ইতিহাস ঐতিহ্য অবদান ~ আল্লামা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ.।
৪/ লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী ~ হুমায়ূন আজাদ।
৫/ কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী ~ হুমায়ূন আজাদ।
৬/ নজরুল ইসলাম, কিশোর জীবনী ~ হায়াৎ মামুদ।
৭/ মরু–ভাস্কর ~ কাজী নজরুল ইসলাম।
৮/ ফররুখ আহমদ, ব্যাক্তি ও কবি ~ শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত।
৯/ স্মারক গ্রন্থ, আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ.।
১০/ স্মারক গ্রন্থ, আল্লামা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ.।

Facebook Comments