কাজী শুরাইহ বিন হারিস (রহ.) | ইমরান রাইহান

কাজি শুরাইহ বিন হারিস রহিমাহুল্লাহ।

হজরত উমর (রা) তাকে নিযুক্ত করেছিলেন কুফার বিচারকের পদে, আর এই পদেই তিনি কাটিয়ে দেন ৬০ বছর। মাঝের সময়টায় ক্ষমতার নানা উত্থান-পতন হয়েছে কিন্তু তার দক্ষতার উপর আস্থা ছিল সবারই।

বিচার পরিচালনায় তার দক্ষতা দেখে আলী (রা) বলেছিলেন, তুমি আরবের শ্রেষ্ঠ বিচারক।

একবারের ঘটনা।

হজরত আলী (রা) তখন খলিফাতুল মুসলিমিন। কুফায় বসে শাসন করছেন মুসলিম বিশ্ব। একবার তিনি তার বর্ম হারিয়ে ফেলেন। কয়েকদিন খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান পেলেন না বর্মটির। কদিন পর দেখলেন এক ইহুদি সেই বর্ম গায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। দ্রুত তিনি মামলা নিয়ে আসলেন কাজি শুরাইহর আদালতে।

‘এই বর্মটি আমার। হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন এই লোক এটি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে’ বললেন তিনি।

কাজি শুরাইহ ঠান্ডা মাথায় শুনলেন অভিযোগ। ইহুদিকে জিজ্ঞেস করলেন, এই বর্ম কার?

‘আমার’ ইহুদির এক কথায় জবাব দিলো।

কাজি শুরাইহ ইহুদির কাছে প্রমাণ চাইলেন। ইহুদি বললো, এটি আমার কাছে , এটাই প্রমাণ করে এটির মালিকানা আমার।
কাজি শুরাইহ এবার হজরত আলী (রা) জিজ্ঞেস করলেন, এটি যে আপনার তার প্রমাণ কী?

হজরত আলী (রা) বললেন, আমার ছেলে হাসান ও আমার চাকর আমার পক্ষে সাক্ষী আছে।

কাজি শুরাইহ বললেন, ছেলের পক্ষ থেকে পিতার মালিকানার জন্য সাক্ষী আমি গ্রহনযোগ্য মনে করি না। তবে চাকরের সাক্ষী ধর্তব্য। কিন্তু আপনি যেহেতু দুজন সাক্ষী আনতে পারেননি, তাই ইহুদির পক্ষেই ফয়সালা করা হলো।

কাজি শুরাইহর ফায়সালা শুনে ইহুদি নিজেই অবাক হয়ে গেল। এ কেমন ইনসাফ? খলিফার বিরুদ্ধে ফয়সালা করছেন একজন কাজি। ইহুদি বলে উঠলো,

‘আসলে এটির মালিকানা হজরত আলী (রা) এরই। আমি এটি পথে পেয়েছিলাম। তবে এই ফয়সালা আমার চোখ খুলে দিয়েছে। যে ধর্মে বিচারক তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে ফয়সালা করার অধিকার রাখে সেই ধর্মই সত্য ধর্ম। আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম’

এই বলে ইহুদি ইসলাম গ্রহণ করে এবং বর্ম ফিরিয়ে দেয়। হজরত আলী (রা) খুশি হয়ে বর্মটি এই নওমুসলিমকেই হাদিয়া দেন।

এমনই ছিল কাজি শুরাইহর দৃঢ়তা। ইনসাফের প্রশ্নে তিনি কারো সাথে আপোষ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। কঠিন থেকে কঠিন সমস্যার ক্ষেত্রেও তিনি বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সহজ সমাধান বের করে ফেলতেন।

একবার দুই মহিলা এলো বিচার নিয়ে। বিচারের বিষয় ছোট একটি বিড়ালছানার মালিকানা। দুজন মহিলাই দাবি করছে এটি তার বিড়ালের বাচ্চা। কাজি শুরাইহ তাদের অভিযোগ শুনে একজনকে বললেন, তোমার বিড়ালটি নিয়ে এসে এই ছানাটির সামনে রাখো। যদি বিড়াল তাকে আদর করে কিংবা দুধ খাওয়ায় তাহলে এটি তোমার বিড়ালের বাচ্চা। আর যদি বিড়াল উত্তেজিত হয়, তার পশম দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে এটি তোমার বিড়ালের বাচ্চা নয়। তোমার দাবী মিথ্যা।

এভাবে কাজি সাহেব কঠিন একটি সমস্যার খুব সহজ সমাধান বের করে ফেললেন।

একবার ইরাকে মহামারি দেখা দিল। জনশূন্য হয়ে গেল শহরের পর শহর। এ সময় কাজি শুরাইহও শহর ছেড়ে একটি নির্জন এলাকায় চলে যান। বেশির ভাগ সময় নফল ইবাদাতে কাটাতে থাকেন। সেই এলাকায় একটি শিয়াল ছিল। কাজি শুরাইহ যখনই নফল সালাতে দাঁড়াতেন, এই শেয়াল সামনে এসে লাফালাফি করতো, বিরক্ত করতো।

শেষে একদিন তিনি জায়নামাজের উপর একটি কাঠ দাঁড় করালেন, তারপর কাঠের গায়ে নিজের পোশাক পরিয়ে দিলেন। নিজে লুকিয়ে রইলেন আড়ালে। একটু পর শিয়ালটি আড়াল থেকে বের হয়ে এল। বরাবরের মত জায়নামাজের সামনে নাচানাচি শুরু করলো। এদিকে সন্তর্পনে তার পেছনে উপস্থিত হলেন কাজি শুরাইহ এবং লাকড়ির এক আঘাতে শিয়ালটিকে কুপোকাত করে দেন তিনি।

এই ঘটনার পর থেকে লোকে বলতে থাকে কাজি শুরাইহ শিয়ালের চেয়েও বুদ্ধিমান।

কাজি শুরাইহর জন্ম ইয়ামানে, নবিজির যুগে। নবিজির যুগে জন্ম হলেও তিনি সাহাবি নন, কারণ তিনি মদীনায় এসেছিলেন নবিজির ইন্তেকালের পর, হজরত আবু বকর (রা) এর যুগে। এখানে এসে তিনি সাহাবিদের মজলিস থেকে প্রচুর ইলম অর্জন করেন। বিশেষ করে হজরত উমর, হজরত আলী, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও হজরত যায়েদ বিন সাবিত (রা) এর ইলম থেকে তিনি বিশেষভাবে উপকৃত হন।

এই দীর্ঘ সান্নিধ্য তাকে পরিণত করে তাবেঈদের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে। ফলে তার কাছে ইলমের জন্য ছুটে আসেন মুহাম্মদ ইবনু সিরিন, ইমাম শাবী ও ইবরাহিম নাখয়ির মত বরেণ্য আলেমরা।
হাদিসশাস্ত্রে তার গভীর জ্ঞান থাকলেও ভালোবাসাটা বেশি ছিল ফিকহের প্রতি। ফলে এই শাস্ত্রেই মাথা খাটাতেন তিনি। হজরত উমর (রা) তার আগ্রহ ও দক্ষতার কথা জেনে তাকে কুফার কাজি নিয়োগ দেন। ষাট বছর ধরে কাজি শুরাইহ, হজরত উমরের (রা) সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণ করে যান।

কাজি শুরাইহ ছিলেন খুবই ধৈর্যশীল একজন ব্যক্তি। যখনই কোনো পার্থিব বিপদ-আপদের মুখোমুখি হতেন, তখন একবার ইন্নালিল্লাহ বলতেন এবং চারবার আলহামদুলিল্লাহ বলতেন।

তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এমনটা করার হেতু কী?

তিনি জবাব দিলেন, প্রথমবার আলহামদুলিল্লাহ পড়ি কারণ, আল্লাহ আমাকে বড় কোনো বিপদ না দিয়ে ছোট বিপদ দিয়েছেন। দ্বিতীয়বার পড়ি কারণ, ধৈর্য্য ধরার তাওফিক হয়েছে। তৃতীয়বার পড়ি কারণ, ইন্নালিল্লাহ পড়ার সুযোগ হয়েছে। চতুর্থবার পড়ি এই ভেবে, বিপদটা আমার দুনিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, আখিরাতকে নয়।

সুবহানাল্লাহ, এভাবেও ভাবা যায়!
সালাফদের সাথে এখানেই আমাদের তফাত। চিন্তার জগতে তাদের সাথে আমাদের এখানেই দূরত্ব।

কাজি শুরাইহ একজন ভালো কবিও ছিলেন। তার লিখিত অনেক পংক্তি আখবারুল কুজাত গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

বৈবাহিক জীবনে কাজি শুরাইহ ছিলেন অত্যন্ত সুখী একজন মানুষ। তিনি বিয়ে করেছিলেন বনু তামিমের মেয়ে যায়নাবকে। নিজের দাম্পত্যজীবন সম্পর্কে শুরাইহ নিজেই বলেছিলেন, যায়নাবের সাথে সংসার করে প্রতিদিন আমি আগের দিনের চেয়ে বেশি সুখী ছিলাম। বিশ বছরে কখনো আমি তার উপর রাগ করিনি। একদিন করেছিলাম, তাও সেটি তার ভুলের কারণে নয়। আমার ভুলের কারণে।

শুরাইহ তার স্ত্রীকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন, যার অর্থ –
আমি দেখি লোকেরা তাদের স্ত্রীকে প্রহার করে। আমি যদি যায়নাবের গায়ে হাত তুলি তাহলে আমার দুহাত অবশ হয়ে যাক।

কাজি শুরাইহর আদালতের আরেকটি ঘটনা শুনিয়ে আজকের আলোচনা শেষ করা যাক।

একদিন কাজি শুরাইহর সাথে দেখা করতে এলেন তার বন্ধু আশআস ইবনু কাইস।
‘মারহাবা হে শায়খ, আসুন আসুন’ বলে এগিয়ে গেলেন শুরাইহ। বন্ধুকে এনে নিজের পাশে বসালেন। শুরু করলেন খোশগল্প। এ সময় আদালতে প্রবেশ করলো এক ব্যক্তি।
‘কী জন্যে এসেছ হে আল্লাহর বান্দা’ কাজি শুরাইহ জিজ্ঞেস করলেন।
‘আমি এসেছি আশআস ইবনু কাইসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে’ লোকটি বললো।

‘উঠুন। অভিযোগকারির পাশে গিয়ে দাঁড়ান’ কাজি শুরাইহ বন্ধুকে বললেন।
‘আমি এখানে থাকলে কী সমস্যা? তার অভিযোগ সে বলুক না’ আশআস আপত্তি করলেন।
‘আপনাকে এখান থেকে জোর করে উঠানোর আগে দয়া করে উঠে যান’ শুরাইহ শক্ত কন্ঠে বললেন।

আশআস ইবনু কাইস উপায় না পেয়ে উঠে অভিযোগকারীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।

কাজি শুরাইহ বেশ দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন। ১১০ বছর বয়সে ৮০ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। দামেশকের মসনদে তখন আবদুল মালেক ইবনু মারওয়ান।

(সিয়ারু আলামিন নুবালা ও আখবারুল কুজাত থেকে সংক্ষেপিত)

#সালাফ_পরিচিতি

Facebook Comments