সংকলন
kiliz arsalan
ইতিহাস ইমরান রাইহান

কিলিজ আরসালানঃ এক ব্যর্থ বীরের উপাখ্যান । ইমরান রাইহান

৫ মে ১০৯৭ খ্রিস্টাব্দ। নিকিয়া।

দিনের শুরুতে প্রখর রোদ ছুঁয়ে গেল জলপাই বাগান, ফসলের মাঠ, স্বচ্ছ পানির নহর ও প্রাচীন রোমান স্থাপনার ছাদ। শহরে বাইরে পাইন বনে ঘেরা উপত্যকায় একত্র হলো ক্রুসেডাররা। সেনাপতি রেমন্ড তাকালেন নিকিয়ার দিকে, শহরের হলুদ প্রাচীর গাম্ভীর্যপূর্ন নিরবতা নিয়ে অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। নিজের শিবিরের লক্ষ্য করলেন দাসদের কর্মব্যস্ততা, ভারবাহী পশুগুলোকে খাবার দিচ্ছে তারা। শিশু ও নারিদের চিৎকারে বিরক্ত হলেন রেমন্ড, তবে আশু যুদ্ধের উত্তেজনায় ঝেড়ে ফেললেন বিরক্তি, মনে মনে আঁটছেন যুদ্ধের পরিকল্পনা।

রাজকীয় তাবুতে শুয়ে বোলনের গডফ্রে চিন্তা করছিলেন জীবনের নাটকিয়তা নিয়ে। গত বছরের সেপ্টেম্বরের কথা মনে পড়ছে তার। সেলকুজদের সাথে সেবারই প্রথম মুখোমুখি হয় ক্রুসেডাররা। গডফ্রে নিজেও ছিলেন ক্রুসেডারদের সেই বাহিনীতে। ‘সেলজুকদের সম্পর্কে তখনো আমাদের কোনো ধারনাই ছিল না’ আপনমনে ভাবলেন গডফ্রে। সে যুদ্ধের কথা স্মরণ করে শিউরে উঠেন গডফ্রে। কোনো রকম পূর্ব প্রস্তুতি ও জানাশোনা ছাড়াই তারা ঢুকে পড়েছিলেন সুলতান কিলিজ আরসালানের সীমান্তে। ভেবেছিলেন ক্রুসেডারদের প্রতিরোধ করার কেউ নেই। যদিও বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম এলেক্সিয়াস কমনিনোস বারবার বলেছিলেন ক্রুসেডারদের মূল বাহিনী আসার পূর্বে সেলজুকদের সীমান্তে প্রবেশ করা ঠিক হবে না, কিন্তু কেউ অপেক্ষা করতে চাচ্ছিল না ততদিন। সেনাদের সংখ্যাধিক্য দেখে সবার মধ্যেই কাজ করছিল অহমিকা।

‘অথচ ওদের বেশিরভাগই ছিল সাধারণ কৃষক ও শ্রমিক, প্রশিক্ষিত যোদ্ধা নয়’ মনে মনে বললেন গডফ্রে। ক্রুসেডারদের জানাও ছিল না তাদের গতিপথের উপর বুনো ঈগলের মত সতর্ক দৃষ্টি রাখছিলেন কিলিজ আরসালান। ক্রুসেডার বাহিনী রোমান সেলজুকদের সীমান্ত অতিক্রম করতেই প্রশিক্ষিত সেলজুক সেনাদের পাঠানো হলো তাদের রুখতে। পাইন ও বার্চের বনে বয়ে যাওয়া হিমেল বাতাসের মাঝে এগিয়ে যাচ্ছিল ক্রুসেডাররা। তাদের ধারণাও ছিল না সামনে কী বিপদ অপেক্ষা করছে।

পিটার দ্য হারমিট অবস্থান করছিলেন কনস্টান্টিনোপলে, তার অবর্তমানে বাহিনীর নেতৃত্ব ছিল ওয়ালটারের হাতে। দুভাগে ভাগ হয়ে হিংস্র শ্বাপদের মত সামনের দিকে এগুচ্ছিল তারা। রেনল্ডের নেতৃত্বে সেলজুকদের এলাকায় প্রবেশ করে বেশ কিছু গ্রাম দখল করে নেয় ক্রুসেডাররা। লুণ্ঠন করা সম্পদ নিয়ে সামনের দিকে এগোয় তারা, পেছনে ফেলে আসে লাশের সারি। ক্রুসেডাররা এসময় সুলতানের রাজধানী নিকিয়া থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থান করছিল, যদিও সুলতানের উপস্থিতি সম্পর্কে খুব একটা সচেতন ছিল না তারা। সাধারণ যোদ্ধাদের চোখগুলো ছিল লোভাতুর, পাদ্রিদের দেখানো স্বর্গের লোভ খেলা করছিল সেখানে। এশিয়া মাইনরের নির্মল প্রকৃতি ওদের লোভ বাড়িয়ে তোলে, নির্দিষ্ট গন্তব্যের বদলে ওরা লুণ্ঠন ও দখল শুরু করে। সুলতান কিলিজ আরসালান নিয়ন্ত্রিত একটি কেল্লার দখল নেয় ক্রুসেডাররা। বিরক্ত সুলতান সেনাপতি ইলখানুসকে পাঠালেন ক্রুসেডারদের শায়েস্তা করতে। ইলখানুস তার সেনাবাহিনী নিয়ে অবরোধ করে দূর্গ। বন্ধ করে দেয় পানির সরবরাহ। কয়েকদিনেই অস্থির হয়ে উঠে ক্রুসেডাররা, শেষ হয়ে আসে পানি ও রসদ।

শত্রুদের দূর্বলতা বুঝতে পেরে ইলখানুস দেন সদয় প্রস্তাব। আত্মসমর্পন করো, ইসলাম গ্রহন করলে জানে বাঁচবে, অন্যথায় প্রান হারাবে। পিপাসাকাতর ক্রুসেডাররা মেনে নিল প্রস্তাব, দূর্গের ফটক খুলে বাইরে এলো তারা। উন্মুক্ত তরবারি হাতে দাঁড়ানো সেলজুক সেনারা বিরক্তি নিয়ে তাকালো ওদের দিকে, বেশি সময় না নিয়ে বন্দি করা হলো সবাইকে। বন্দি ক্রুসেডারদের যারা ইসলাম গ্রহন করেছিল তাদেরকে পাঠানো হলো এন্টিয়ক, আলেপ্পো ও খোরাসানে। বাকিদের হত্যা করে উপত্যকায় পুঁতে ফেলা হলো লাশ।

এদিকে পেছনের ক্রুসেডার সেনারা পরিস্থিতি বুঝে উঠার আগেই কিলিজ আরসালানের নিযুক্ত দুজন গ্রীক গুপ্তচর তাদের সাথে দেখা করে জানায়, অগ্রবর্তী ক্রুসেডার সেনারা নিকিয়া দখল করে ফেলেছে। ভুল সংবাদ পেয়ে রেমন্ড ও গডফ্রে দ্রুত সামনে এগুতে আগ্রহী হন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণমতে সেনারা জয়ের উল্লাসে রীতিমত কাঁপছিল। তবে শীঘ্রই মূল বিষয়টি জেনে ফেলে তারা, রেমন্ডের সামনে স্পষ্ট হয় কিলিজ আরসালান ধোঁকা দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে টেনে আনতে চাচ্ছেন ক্রুসেডারদের। সতর্ক রেমন্ড চাচ্ছিলেন অপেক্ষা করতে, পিটার দ্য হারমিটের অনুপস্থিতিতে যাত্রা অব্যাহত রাখার সাহস হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু গডফ্রে ছিলেন যুদ্ধে আগ্রহী, সাধারণ সেনারাও তার সাথে সুর মিলিয়েছিল। নিকিয়ে জয়ের সংবাদ ভুল প্রমাণিত হওয়ায় এখন তাদের উদ্দেশ্য নিহতদের রক্তের বদলা নেয়া। জনপ্রিয় মতামতকে উপেক্ষা করতে পারলেন না রেমন্ড, সিদ্ধান্ত হলো সামনে এগিয়ে হামলা করা হবে নিকিয়ায়।

‘ভুল পরামর্শটা আমিই দিয়েছিলাম’ তাঁবুর পর্দা সরিয়ে বাইরে সেনাদের কর্মব্যস্ততা দেখার ফাঁকে ভাবলেন গডফ্রে।

১০৯৬ সালের ২১ অক্টোবর রেমন্ড ও গডফ্রের নেতৃত্বে ২০ হাজার ক্রুসেডার যাত্রা শুরু করে, তাদের লক্ষ্য নিকিয়া জয়। সে রাতটি কিলিজ আরসালান কাটিয়েছিলেন সিভিটোটের পাহাড়ে, ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রা সম্পর্কে তিনি ছিলেন সচেতন। পাহাড়ি এলাকায় শীত একটু আগেই চলে আসে, অক্টোবরের শীত রীতিমত শরিরে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিল। সারারাত সুলতানের তাঁবুর বাইরে আগুন জ্বেলে রেখেছিল প্রহরীরা, আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে লাকড়ি দিচ্ছিল তারা।

ভোরবেলা উঁচু টিলায় অবস্থানরত সুলতান দেখলেন ধুলি উড়িয়ে এগিয়ে আছে ক্রুশের ধ্বজাধারীরা। সূর্যের প্রথম কিরণ প্রতিফলিত হলো ক্রুসেডারদের বর্মে, চোখ ধাধিয়ে গেল সুলতানের। সুলতান যুদ্ধের পরিকল্পনা আগেই সাজিয়ে রেখেছিলেন, ড্রাকন গ্রামের কাছাকাছি হলেই হামলা চালানো হবে তাদের উপর। ছোট একটি পাহাড়ি নদী পার হয় ক্রুসেডাররা। স্বচ্ছ পানির নিচে নুড়ি পাথর ও রঙ্গিন মাছ দেখা যাচ্ছিল। সুলতান অপেক্ষা করছিলেন মোক্ষম সময়ের। ক্রুসেডাররা ড্রাকন গ্রামের নিকটবর্তী হতেই সেলজুক সেনাদের নিক্ষিপ্ত তির ছুটে যায় তাদের দিকে।

আচমকা আক্রমনে ক্রুসেডারদের সেনাবিন্যস এলোমেলো হয়ে যায়, দিশেহারা হয়ে তারা পালটা হামলা করে, কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছিল ততই ক্রুসেডার শিবিরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান বাড়ছিল। সেলজুক সেনারা অপেক্ষা করছিল বনের ভেতর, অপরদিকে ক্রুসেডাররা ছিল খোলা মাঠে, ফলে শত্রুপক্ষের তীরের সহজ নিশানায় পরিনত হল তারা। বেশিরভাগের তেমন কোনো সামরিক প্রশিক্ষন ছিল না, তারা কিছু বুঝে উঠার আগেই প্রান হারালো। পরিস্থিতির নাটকিয়তায় চমকে গেলেন রেমন্ড ও গডফ্রেও, হিমেল বাতাসেও ঘামছিলেন তারা। ক্রুসেডারদের অন্যতম প্রধান সেনাপতি ওয়াল্টার নিহত হলেন নির্মমভাবে। পাইন বনের ভেতর থেকে ক্রমেই এগিয়ে আসছিল সেলজুকরা, তাদের হাতে দামেস্কের ইস্পাত নির্মিত তরবারি, সূর্যের আলোতে ঝিলমিল করছিল তরবারির ফলা।

অক্টোবরের কুয়াশামাখা সন্ধ্যা নেমে আসার আগেই পরাজিত হলো ক্রুসেডাররা। বিশ হাজার সেনার মধ্যে মাত্র ৩ হাজার বেঁচে ছিল, রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেল তারা। মাঠে পড়ে রইলো ক্রুসেডারদের লাশ, ওরা এসেছিল ইউরোপের নানা প্রান্ত থেকে, ওদের গন্তব্য ছিল জেরুসালেম, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছার অনেক আগেই সমাপ্ত হয়েছে ওদের যাত্রা।

পালিয়ে যাওয়া সেনাদের মধ্যে ছিলেন গডফ্রেও। মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন এক পরিত্যক্ত বসতিতে। রাতের বেলা কুয়াশা নেমে এসেছিল বার্চের বনে, সেলজুকরা তাই ধাওয়া করেনি। কিলিজ আরসালান বুঝতে পেরেছিলেন আপাতত আর নিকিয়ার দিকে এগুনোর সাহস নেই ক্রুসেডারদের, তাই সেনাদের ফিরে আসার নির্দেশ দিলেন তিনি। এদিক সেদিক লুকিয়ে থাকা থাকা ক্রুসেডারদের ছেড়ে দেয়া হলো ভাগ্যের হাতে।

‘আমাদের ভাগ্য ভালো ছিল, কারন পরদিনই বাইজান্টাইন সম্রাট জেনে যান আমাদের পরাজয়ের সংবাদ। তখনই আমাদের উদ্ধার করতে বেশ কিছু সেনা পাঠান তিনি। যদি বাইজান্টাইন সম্রাট আমাদের উদ্ধারে সেনা না পাঠাতেন, তাহলে আর জীবিত ফিরতে হত না’ ভাবতে ভাবতে তাঁবু থেকে বের হলেন গডফ্রে। সূর্যের তেজ কমে এসেছে। সেনাদের কোলাহলও থেমে গেছে, সম্ভবত বিশ্রাম নিচ্ছে তারা।

তাবুর পাশেই গডফ্রের ঘোড়া রাখা। ঘোড়ার কাঁধে হাত বুলাতে বুলাতে ভাবলেন গডফ্রে, এ সবই ৬ মাস আগের স্মৃতি। পরিস্থিতি এখন অনেক বদলে গেছে। আমরা এখন আগের চেয়ে সুসজ্জিত ও প্রশিক্ষিত। আমরা এসে উপস্থিত হয়েছে নিকিয়া শহরের অতি নিকটে, ওদিকে কিলিজ আরসালান অবস্থান করছেন নয়শো কিলোমিটার দূরে। এবারের যুদ্ধে জয় আমাদের সুনিশ্চিত।

Facebook Comments

Related posts

সূফীদের সংগ্রামী জীবন (পর্ব-৩) | ইজহারুল ইসলাম

সংকলন টিম

খাইরুদ্দিন বারবারোসা | ইমরান রাইহান

সংকলন টিম

ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর দরবারবিমুখতা | মাহমুদ সিদ্দিকী

সংকলন টিম

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: