শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. | আব্দুল্লাহ বিন বশির

ibn taimiya
ভুমিকা :
ইসলামের সৌন্দর্যটা কী জানেন?
ইবনে তাইমিয়া রহ. বিভিন্ন বাতিল ফিরকার খণ্ডন করতে গিয়ে কখনো আহলুস সুন্নাহের স্বীকৃত মাজহাবকেও খুব শক্ত ভাষায় খণ্ডন করে ফেলেন। এবং বেশ শক্ত ভাষায় করেছেন, যার জের ধরে ইবনে তাইমিয়ার নাম করে একদল হামলে পড়ে আকিদার মাসআলায় ‘আশয়ারী ও মাতুরিদি’ আলেমদের উপর। বাস, বিপরীত পক্ষের মূর্খরাও চুপ থাকবে কেন, তারাও শুরু করে দেয়। একদিকে ইবনে তাইমিয়াকে শাইখুল ইসলাম আর অপরদিকে ইবনে তাইমিয়াকে যিন্দিক ঘোষণা৷ চলতে থাকে সমানে। উত্তপ্ত পরিবেশ কে কার কথা শুনে!
ইবনে তাইমিয়া রহ.-র কিছু বিচ্ছিন্ন বক্তব্য দিয়ে যারা ইবনে তাইমিয়াকে শাইখুল ইসলাম মনে করেন তাদেরকেই গোমরাহ, বেদায়াতি ক্ষেত্র বিশেষ কাফের পর্যন্ত বলা হচ্ছিলো! আর এটার সবচেয়ে বেশি স্বীকার হয়েছেন, আশয়ারী আলেমগণ। বিরক্ত হয়েছিলেন অনেকে ইবনে তাইমিয়ার উপর। বাধ্য হয়ে ইলমী খণ্ডন করেছেন ইবনে তাইমিয়ার নাম নিয়েই কেউ, কেউবা শুধু মতানৈক্যর জায়গাটুকু স্পষ্ট করেছেন।
একেরপর এক যখন ইবনে তাইমিয়ার খণ্ডন আসা শুরু হলো, একদল স্বার্থবাজ আর ভণ্ডসুফী যাদেরকে তুলোধোনা করে উম্মাহকে সবচেয়ে বেশি সতর্ক করেছেন ইবনে তাইমিয়া রহ. তারা মাঠ গরম করতে লাগলো ফতোয়া দিতে থাকলো ইবনে তাইমিয়ার বিরুদ্ধে,যে ইবনে তাইমিয়াকে ‘শাইখুল ইসলাম’ বলবে সে কাফের, তার পিছনে নামাজ হবেনা।
এহেন মুহূর্তে এই মুর্খ আর দলান্ধদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম কলম ধরেছেন কারা জানেন? ঐসব আশয়ারী আলেমগণ যাদেরকে ইবনে তাইমিয়ার হাওয়ালায় গোমরাহ থেকে নিয়ে কাফের ফতোয়া দেওয়া হচ্ছিলো।
ইবনে নাসিরুদ্দিন দিমাশকী একজন শাফেয়ী আলেম এবং আশয়ারী আকিদার লোক। ইবনে তাইমিয়াকে নিয়ে এরকম জঘন্য আচরণ সহ্য করতে না পেরে একটি বই রচনা করেন,
الرد الوافر على من زعم بأن سمى ابن تيمية شيخ الإسلام الكافر
অর্থাৎ, ইবনে তাইমিয়াকে শাইখুল ইসলাম বললে যারা কাফের ফতোয়া দেয় তাদের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ।
আর এই বইটিকে দুনিয়া ব্যাপি প্রসিদ্ধ করেদেন আরেক আশয়ারী আলেম ইবনে হাজার আসকালী রহ. শুরুতে একটি ‘তাকরিজ’ বা প্রশংসাবানী লিখে দিয়ে। সাথে ইমাম বুলকিনীসহ সে সময়কার অন্যান্য আশয়ারী আলেমগণ!
এটাই আহলুস সুন্নাহ, এটাই ইলমী ইখতেলাফ এবং এটাই ইনসাফ।
এই ধারা ইবনে তাইমিয়া রহ.-র সাথেই প্রথম এমন নয়, যখন আহলুস সুন্নাহের কাউকে নিয়ে কোনো সুবিধাবাদী মহল অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে তখনই আলেমগণ শত ইখতেলাফ ভুলে সুবিধাবাদীদের মুখ বন্ধ করছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ.ও ছিলেন তাদের একজন। ‘মুরজিয়া’ আর ‘আহলুর রায়’ বলে যখন এই মহান ইমামের ইজ্জতের উপর একদল আক্রমণ করছিলো, হাদিস জানেনা বলে হেয় করছিলো তখন মালেকী ও শাফেয়ী মাজহাবের ইমামগণ আবু হানিফার মানাকিব নিয়ে কিতাব লেখা শুরু করলেন যে, এই মহান ইমাম শুধু ফকিহ নন একজন বিদগ্ধ মুহাদ্দিস ও নিজ জামানার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের একজন। ইবনে আব্দুল বার, ইমামা যাহাবী থেকে ইবনে হাজার হাইতামী ও সুয়ূতী রহ.গণ লেখে গেছেন এই মহান ইমামের শানে সঠিক ও সত্য কথাগুলো।
.
(১)
ইবনে নাসিরুদ্দিন দিমাশকী রহ. ৭৭৭ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। অর্থাৎ ইবিনে তাইমিয়ার মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পর। তখন জামানাটা এমন ছিলো যে, ইবনে তাইমিয়া রহ.কে নিয়ে একদল যেমন করছিলো বাড়াবাড়ি তেমনি আরেকদল এমন পরিবেশ তৈরি করছিলো যে, যারা ইবনে তাইমিয়া রহ.কে ‘শাইখুল ইসলাম’ বলেছেন তারা তাকফিরের স্বীকার হচ্ছিলো কিছু মূর্খ, বেদয়াতী থেকে। আর কিছু ঝোকের তালে পড়া অবুঝ আলেমদের থেকে। ইবনে নাসির আদ-দিমাশকী রহ. বড় আফসোস করে বলেন,
ولا فكرة لَهُ فِيما تطرق بِهِ إلى تَكْفِير خلق من الاعلام بِأن قالَ من سمى ابْن تَيْمِية شيخ الاسلام كانَ كافِرًا لا تصح الصَّلاة وراءه
একদল বিজ্ঞ আলেমদের তাকফির পর্যন্ত করা হচ্ছিলো ইবনে তাইমিয়া রহ.কে ‘শাইখুল ইসলাম’ বলার অপরাধে। এবং ফতোয়া দেওয়া হচ্ছিলো, যারা ইবনে তাইমিয়াকে শাইখুল ইসলাম বলে তাদের পিছনে নামাজ হবেনা৷আর-রদ্দুল ওয়াফির পৃ.২১
.
ইবনে নাসিরুদ্দিন দিমাশকী রহ. বইটিতে ইবনে তাইমিয়া ও তার পরবর্তী জামানার শ্রেষ্ঠ আলেম আর ফকিহদের উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন,যারা ইবনে তাইমিয়ার শুধু প্রশংসাই করেনি, তাকে শাইখুল ইসলাম উপাধি দিয়েছন বা উচ্চ প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন।
.
(২)
নীচে উল্লেখিত ইমামদের বক্তব্য বুঝার জন্য ‘শাইখুল ইসলাম’ এই উপাধীর ভার কত বেশি তা বুঝে নেওয়াটা জরুরি। এবং এউ উপাধি দ্বারা কী উদ্দেশ্য এবং এই উপাধি কাদের শানে ব্যবহার হতো তা সংক্ষিপ্তভাবে জেনে নেওয়া যাক।
শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ. বলেন,
وأطلقه العلماء السابقون على كل من حاز درجة كبيرة عالية في العلم بالكتاب والسنة ، وفي الفضل والصلاح والقدوة ، وكان مرجع المسلمين في العلم وشؤون الدين . وهو بهذا المعنى وارد في كتب المحدثين والمؤرخين والرجال والتراجم ، فاعرفه
পূর্ববর্তী ওলামায়ে কেরাম ‘শাইখুল ইসলাম’ উপাধিকে শুধু এমন কোনো মহান ব্যক্তির জন্যই ব্যবহার করতেন যারা কুরআন-সুন্নাহের জ্ঞানে ও ন্যায়নিষ্ঠা ও অনুসরণীয়তায় অনেক উঁচু স্থরে পৌঁছে যেতেন। সাথে সাথে তারা হতেন নিজ সময়ের আলেমদের দ্বীনি ও ইলমি বিষয়ের সমাধানের কেন্দ্র। মুহাদ্দিসিন, ইতিহাসবিদ ও রিজালের কিতাবসমূহে এই শব্দ যেখানে ব্যবহার হয়েছে এই অর্থেই হয়েছে ।আল-ওলামাউল উজ্জাবের টিকা পৃ.৩০
ইবনে নাসির আদ-দিমাশকী রহ. বিস্তারিতভাবে ‘শাইখুল ইসলাম’ এই শব্দের পরিচয় দিয়েছেন৷ তিনি লেখেন,
شيخ الاسلام أن مَعْناهُ المَعْرُوف عِنْد الجهابذة النقاد المَعْلُوم عِنْد أئِمَّة الاسناد أن مَشايِخ الاسلام والأئِمَّة الاعلام هم المتبعون لكتاب الله ﷿ المقتفون لسنة النَّبِي ﷺ الَّذين تقدمُوا بِمَعْرِفَة أحْكام القُرْآن ووجوه قراآته وأسْباب نُزُوله وناسخه ومنسوخه والأخْذ بِالآياتِ المحكمات والايمان بالمتشابهات قد أحكموا من لُغَة العَرَب ما أعانهم على علم ما تقدم وعَلمُوا السّنة نقلا وإسنادا وعَملا بِما يجب العَمَل بِهِ اعْتِمادًا وإيمانا بِما يلْزم من ذَلِك اعتقادا واستنباطا لِلْأُصُولِ والفُرُوع من الكتاب والسّنة قائِمين بِما فرض الله عَلَيْهِم مُتَمَسِّكِينَ بِما ساقه الله من ذَلِك إلَيْهِم متواضعين لله العَظِيم الشان خائِفين من عَثْرَة اللِّسان لا يدعونَ العِصْمَة ولا يفرحون بالتبجيل
عالمين أن الَّذِي أُوتُوا من العلم قَلِيل فَمن كانَ بِهَذِهِ المنزلَة حكم بِأنَّهُ إمام واسْتحق أن يُقال لَهُ شيخ الاسلام
আর-রদ্দুল ওয়াফির পৃ.২২
.
(৩)
ইবনে তাইমিয়া রহ. সম্পর্কে ঐ জামানার প্রসিদ্ধ কয়েকজন আলেমের বক্তব্য।
১. কাজিউল কুজাত ইমাম বাহাউদ্দিন আস-সুবকী রহ.
ইমাম বাহাউদ্দিন আস-সুবকী আশ-শাফেয়ী রহ.-র সামনে কেউ কেউ ইবনে তাইমিয়া রহ.সম্পর্কে আজে-বাজে কথা বললে, তিনি গোস্বা হয়ে বললেন,
ولَقَد صدق العَلامَة الامام قاضِي قُضاة الاسلام بهاء الدّين أبو البَقاء مُحَمَّد بن عبد البر بن يحيى السُّبْكِيّ الشّافِعِي ﵀ حَيْثُ يَقُول لبَعض من ذكر لَهُ الكَلام فِي ابْن تَيْمِية فَقالَ والله يا فلان ما يبغض ابْن تَيْمِية إلّا جاهِل أو صاحب هوى فالجاهل لا يدْرِي ما يَقُول وصاحب الهوى يصده هَواهُ عَن الحق بعد مَعْرفَته بِهِ انْتهى
ঐ বেটা! আল্লাহর কসম, ইবনে তাইমিয়া রহ.কে যারা ঘৃণা করে তারা হয়তো মুর্খ-জাহেল নাহলে সে প্রবৃত্তির অনুসারী। মুর্খের মুখ দিয়ে কী বের হয় সে জানেনা আর প্রবৃত্তি তার অনুসারীকে হক জানার পরেও তা গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখে।-আর-রদ্দুল ওয়াফির পৃ.২৪
২. ইবনে দাকিকিলুল ইদ রহ.
উনাকে বলা হয় ফিকহে শাফেয়ী ও মালেকি উভয় মাজহাবের ইমাম। উনি উভয় মাজহাবে এত বেশি পান্ডিত্য অর্জন করেছেন যে, উভয় মাজহাবের মানুষ তার কাছে নিজ নিজ মাজহাবের সমাধানের জন্য আসতেন।
তাতারিদের ফিতনার মোকাবেলায় ইবনে তাইমিয়া রহ.-র সুদৃঢ় মনোবল আর সাহসী বক্তব্য শুনে ইবনে দাকিকুল ইদ রহ. বলেছিলেন, আমার জানা ছিলো না আল্লাহর দুনিয়ায় এত সাহসী কোনো মানুষ এখনো আছে। অথচ তখনো ইবনে তাইমিয়াকে খুব ভালো করে চিনতেন না তিনি। পরবর্তীতে যখন উভয়ের সাক্ষাত হয়, ইবনে দাকিকুল ইদ রহ. বলেছিলেন,
لما اجْتمعت بِابْن تَيْمِية رَأيْت رجلا العُلُوم كلها بَين عَيْنَيْهِ يَأْخُذ مِنها ما يُرِيد ويدع ما يُرِيد
যখনই আমি ইবনে তাইমিয়ার সাথে মিলিত হই তখন এমন একজন মানুষকে দেখতে পাই, যার চোখের সামনে পুরো কুরআন আর হাদিস রয়েছে। সেখান থেকে যা প্রয়োজন তিনি নেন আর যা প্রয়োজন নেই তা রেখে দেন।-আর-রদ্দুল ওয়াফির পৃ.৫৯
৩. ইবনুল হারীরী আল হানাফী রহ.
তাতারীদের ফিতনার সয়লাবে যে কটি মুসলিম ভূখণ্ড নিরাপদে ছিলো এবং তাতারীদের মহাপ্রলয়কে রুখে দিতে কিছুটা হলেও সচেষ্ট ছিলো তার মধ্যে সুবিশেষ উল্লেখ্য হলো মিশর ও শাম। সেখানের কাজিউল কুজাত (প্রধান বিচারপতি ইবনুল হারীরী আল-হানাফী রহ. বলতেন,
الإمام قاضِي قُضاة مصر والشّام أبُو عبد الله مُحَمَّد ابْن الصفي عُثْمان ابْن الحريري الانصاري الحَنَفِيّ كانَ يَقُول إن لم يكن ابْن تَيْمِية شيخ الاسلام فَمن
যদি ইবনে তাইমিয়া শাইখুল ইসলাম না হয় তাহলে এই যোগ্যতার অধিকারী আর কে আছে?। আর-রদ্দুল ওয়াফির পৃ. ২৫
৪. ইমাম মিজ্জি রহ.
ইমাম মিজ্জি রহ.-র পরিচয় কোনো আহলে ইলমকে দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা। প্রসিদ্ধ হাদিসের ছয় কিতাব যাকে কুতুবে সিত্তাহ বলা হয়,তা পড়তে হলে এই মহান মানুষটির সাহায্য ছাড়া প্রায় অসম্ভব আমাদের জন্য। যিনি হাফেজ যাহাবী ও ইবনে কাসির রহ.-র উস্তাদ ও ইবনে তাইমিয়া রহ.-র সমসাময়িক। নিজ সমসাময়িক একজন মানুষের ব্যাপারে মিজ্জি রহ. বলেন,
ما رَأيْت مثله ولا رأى هُوَ مثل
نَفسه وما رَأيْت أحدا أعلم بِكِتاب الله وسنة رَسُول الله ﷺ ولا أتبع لَهما مِنهُ
আমি ইবনে তাইমিয়ার মত কোনো ব্যক্তি আর দেখিনি, এবং আমার বিশ্বাস সেও তার নিজের মত আর কাউকে দেখেনি। বর্তমানে তার থেকেও বড় কুরআন সুন্নাহের আলেম আছে বলে আমার জানা নেই।-আর-রদ্দুল ওয়াফির পৃ. ১২৮
৫. ইমাম জাহাবী রহ.
ইমাম যাহাবী রহ. ছিলেন ইবনে তাইমিয়া রহ.-র শাগরেদ। নিজ উস্তাদকে কাছ থেকে দেখেছেন। এবং অনেক বেশি ইস্তিফাদা করেছেন। ইমাম যাহাবীকে চিনেন তারা জানেন, ব্যক্তি সম্পর্কে উনার মূল্যায়ন কতটা নির্মহ হয়। তিনি নিজ উস্তাদের কাছে ‘রফউল মালাম’ কিতাবটি পড়া শেষ করে লেখেন,
فَقالَ سمع هَذا الكتاب على مُؤَلفه شَيخنا الامام العالم العَلامَة الأوحد شيخ الاسلام مفتي الفرق قدوة الأمة أعجوبة الزَّمان بَحر العُلُوم حبر القُرْآن تَقِيّ الدّين سيد العباد أبي العَبّاس أحْمد بن عبد الحَلِيم بن عبد السَّلام ابْن تَيْمِية الحَرّانِي رَضِي الله
এই কিতাবটি আমি তার লেখক আমাদের উস্তাদ আল্লামা শাইখুল ইসলাম বাহরুল উলুম ইবনে তাইমিয়া থেকে সরাসরি পাঠ গ্রহণ করেছি।-আর-রদ্দুল ওয়াফির পৃ. ৩২
৬. হাফেজ ইরাকী রহ.
হাফেজ ইরাকী রহ. ছিলেন উলুমুল হাদিসের মহান সমুদ্র ইবনে হাজার আর হাইসামী রহ.-র মহান মানুষরা যার সামনে হাটু গেড়ে বসতে পারাকে নিজের জীবনের সৌভাগ্য মনে করতেন। তিনি আশুরা সংক্রান্ত একটি হাদিসের পর্যালোচনা কালে ইবনে তাইমিয়া রহ.র বক্তব্য দিয়ে দলিল পেশ করেছেম, যেখানে ইবনে তাইমিয়া রহ.-র উপাধী ব্যবহার করেছেন ‘ইমাম’। -আর-রদ্দুল ওয়াফির পৃ.১০৮
৭. ইবনে হাজার আসকালী রহ.
فكيف لا ينكر على من أطلق : أنه كافر؟ بل من أطلق على من سماه شيخ الإسلام : الكفر ، وليس في تسميته بذلك ما يقتضي ذلك ، فإنه شيخ في الإسلام بلا ريب ، والمسائل التي أنكرت عليه ما كان يقولها بالتشهي ، ولا يصر على القول بها بعد قيام الدليل عليه عنادا ، وهذه تصانيفه طافحة بالرد على من يقول بالتجسيم والتبري منه، ومع ذلك فهو بشر يخطئ ويصيب ، فالذي أصاب فيه ، ومع الأكثر يستفاد منه ويترحم عليه بسببه ، والذي أخطأ فيه لا يقلد فيه ، بل هو معذور ، لأن أئمة عصره شهدوا له بأن أدوات الاجتهاد اجتمعت فيه
যাকে শাইখুল ইসলাম উপাধী দেওয়া হয় তাকে আবার কাফের কিভাবে বলা হয়? এ’দুটো তো পরস্পর বিরোধী দুটো উপাধী! আর নিসন্দেহে ইবনে তাইমিয়া ছিলেন নিজ জামানার ‘শাইখুল ইসলাম’। আর যে মাসআলাগুলোতে তিনি একক মত গ্রহণ করেছেন তা প্রবৃত্তির তাড়না থেকে নয় বরং কোনো না কোনো দলিল উনার কাছে শক্তিশালী মনে হয়েছে বলেই তা গ্রহণ করেছেন। যারা তাকে এই কারণে মুজাসসিমা বা গোমরাহ বলে তাদের মুখে চপটাঘাত দেওয়ার জন্য ইবনে তাইমিয়ার লিখিত বইগুলোই যথেষ্ট।
এতদা সত্ত্বেও এটাও মনে রাখতে হবে যে, তিনি মানুষ ছিলেন, আর মানুষের থেকে ভুল-সঠিক উভয় হতে পারে। তবে ইবনে তাইমিয়ার ভুল থেকে তার সঠিকটাই বেশি ছিলো। আর যেখানে উনার ভুল হয়েছে আমরা তাকে মাজুর মনে করি। কারণ তিনি ছিলেন তার জামানার একজন ইমাম এবং তার সমকালীন অনেক ওলামায়ে কেরাম এই সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, ইবনে তাইমিয়া রহ.-র ভিতর ইজতেহাদের যোগ্যতা ছিলো।- আর-রদ্দুল ওয়াফেরের শুরুতে ইবনে হাজার রহ.-র ইবনে তাইমিয়া রহ. সম্পর্কে প্রশংসাবানী ২৪৭ পৃ.
হাফেজ মিজ্জি, যাহাবী, ইরাকী ও ইবনে হাজার রহ. সে চারজন, যাদের ব্যাপারে সুয়ুতি রহ. বলেছেন,
إن المحدثين عيال الآن في الرجال وغيرها من فنون الحديث على أربعة: المزي والذهبي والعراقي وابن حجر،
বর্তমান জামানার মুহাদ্দিসরা উলুমুল হাদিসের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় চারজন মানুষের মুখাপেক্ষী। ইমাম মিজ্জি, যাহাবী, ইরাকী ও ইবনে হাজার।-জাইলু তাবকাতিল হুফফাজ ২৩৫ পৃ.
‘মুহাক্কিক’ শব্দটির সঠিক ব্যবহার যদি কারো ক্ষেত্রে হয় তাহলে তাদের মাঝে অন্যতম হলেন এই চারজন।জিকরুল্লাহ খাঁন সাহেব হুজুর যাদের বলেন, ‘উলুমুল হাদিসের গেট’। উনাদের সম্পর্কে যাদের নূন্যতম ধারণা আছে তাদেরকে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা। এই চারজন মহান ব্যক্তিদের বক্তব্যসহ অন্যান্য আয়িম্মাদের বক্তব্য সামনে রেখে আমরা ইবনে তাইমিয়া রহ.কে শাইখুল ইসলাম বলতে পেরে নিজেকেই সম্মানিত বোধ করি। আর মাসলাকবাজি আর মূর্খতাই যাদের স্বভাব তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখি।
(৪)
ইবনে তাইমিয়া রহ.কে নিয়ে ‘মুসনাদুল হিন্দ’ খ্যাত উপমহাদেশের গর্ব শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ.-র মন্তব্য উল্লেখ করা সমীচীন মনে করছি, যিনি ইবনে তাইমিয়া রহ.কে পর্যাপ্ত পড়ে ইবনে তাইমিয়া রহ.-র ব্যাপারে নিজের মন্তব্য এক শাগরেদের চিঠির জবাবে বলেছেন,
وعلى هذا الاصل اعتقدنا في شيخ الاسلام ابن تيمية (رح) فانا قد تحققنا من حاله انه عالم بكتاب الله ومعانيه اللغوية والشرعية وحافظ لسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم وآثار السلف عارف لمذهب لمعانيهما اللغوية والشرعية، استاذ في النحو و اللغة محرر لمذهب الحنابلة فروعه واصوله، فائق في الذكاء ذو لسان وبلاغة في الذب عن عقيدة أهل السنة، لم يؤثر عنه فسق ولا بدعة، اللهم الا هذه الأمور التي ضيق عليه لاجلها وليس شيء منها الا ومعه دليله الأمور التي ضيق عليه لاجلها وليس شيء منها الا من الكتاب والسنة وأثار السلف، فمثل هذا الشيخ عزيز الوجود في العلم ومن يطيق ان يلحق شاؤه في تحريره و تقريره، والذين ضيقوا عليه ما بلغوا معشار ما اتاه الله تعالى وان كان تضييقه ذالك ماهي الا كمشاجرة الصحابة رضي الله تعالى عنهم فيما بينهم والواجب في ذالك كشف اللسان الا بخير،
এরই ভিত্তিতে আমরা শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রহ.-এর উপর আকিদা রাখি। তার অবস্থাদি দ্বারা আমাদের নিকট প্রমাণিত হয়ে গেছে, তিনি আল্লাহর কিতাব কুরআনুল কারিমের একজন আলিম, এর আভিধানিক ও শরয়ী অর্থ সম্পর্কে খুবই ওয়াকিফহাল, আরবিব্যাকরণ ও অভিধানশাস্ত্র সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ, হাম্বলী মাযহাবের খুঁটিনাটি বিষয় ও উসুলের পরিষ্কার ও বিবাদ মীমাংসাকারী ও বিন্যস্ত কারী, একক মেধার অধিকারী, ভাষার উপর অপূর্ব দখল এবং আহলে সুন্নত ওয়ালজামাতের আকিদার সমর্থন ও প্রতিরক্ষায় অত্যন্ত বাগ্মী ও স্পষ্টভাষী। তার দ্বারা কোনো অন্যায় কিংবা বিদআত প্রমাণিত হয়নি। ব্যস, এই কয়েকটিমাত্র মাসআলার ক্ষেত্রে তার সঙ্গে কঠোরতা করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যেও এমন কোনো মাসআলা নেই, যে মাসআলা সম্পর্কে তার নিকট সুন্নাহ ও পূর্ববর্তী বুযুর্গদের অনুসৃত আদর্শের ভেতর কোনো দলিল ছিল না। জ্ঞানের জগতে এমন মনীষীর তুলনা মেলা ভার। কি লেখনী, কি বক্তৃতায় তার পর্যায়ে উপনীত হন এমন সাধ্য কার? আর যে সমস্ত লোক তার সঙ্গে কঠোরতা ও রূঢ় আচরণ করেছে। তার (ইবনে তায়মিয়া রহ.-এর) কামালিয়াত ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই ছিল না, যদিও এই কঠোরতা একটি ইজতেহাদী বিষয় ছিল। এতৎসম্পর্কে আলিমগণের ইখতিলাফ বা মতভেদ সাহাবীগণের পারস্পরিক মতবিরোধেরই অনুরূপ। অতএব এক্ষেত্রে সংযতবাক হওয়াই আমাদের পক্ষে সমীচীন এবং ভালো খারাপ কোনো কিছু আমাদের মুখ থেকে যেন বের না হয়। (১)
আবুল হাসান আলী নদবি রহ. শাহ সাহেবের এই মন্তব্য উল্লেখ করে বলেন,
শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ.-এর সাফাই ও সাক্ষ্য এবং উল্লিখিত প্রশংসাসূচক মন্তব্যের পর কোনো আলিম কিংবা লেখকের আক্রমণাত্মক সমালোচনা—ইবনে তায়মিয়া রহ.-এর জ্ঞান ও চিন্তামার্গের কাছেধারে পৌছুবার যোগ্যতাও যাদের নেই–আদৌ কোনো জ্ঞানগত গুরুত্ব বহন করেন না। হাকিমুল ইসলাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ.-কে আল্লাহ তায়ালা গভীর পাণ্ডিত্য, বিচিত্র কামালিয়াত, মুজতাহিদী চিন্তা ও দৃষ্টি, মতভেদের ক্ষেত্রে ভারসাম্যের পথ ও উলামায়ে ইসলামের কার কী মর্যাদা সে সম্পর্কে পরিমাপ করার এক আশ্চর্য ক্ষমতা দিয়েছিলেন। তাই এ ব্যাপারে তার মতই চূড়ান্ত হিসাবে বিবেচনার দাবি রাখে।- সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস ২/১৮৮
.
ইবনে তাইমিয়া রহ.কে নিয়ে শেষ কথা ও সবচেয়ে ইনসাফপূর্ণ কথা আমার কাছে সেটাই মনে হয়েছে যা ইবনে হাজার রহ. বলেছেন, এতদা সত্ত্বেও এটাও মনে রাখতে হবে যে, তিনি মানুষ ছিলেন, আর মানুষের থেকে ভুল-সঠিক উভয় হতে পারে। তবে ইবনে তাইমিয়ার ভুল থেকে তার সঠিকটাই বেশি ছিলো। আর যেখানে উনার ভুল হয়েছে আমরা তাকে মাজুর মনে করি।
আল্লাহ আমাদেরকে কিছুটা হলেও সালাফদের হক আদায় করার তাওফিক দান করুক। কোনো অবস্থাতেই যেনো আমরা ইনসাফবীহিন না হয়ে যায়, সে দোয়া আল্লাহর কাছে সর্বদা করার তাওফিক চাই।
=======
টিকা:
১] উদ্ধৃত অংশটি শাহ সাহেব রহ. লিখিত একটি আরবি চিঠির অংশ। চিঠিটি তিনি তারই সমসাময়িক মনীষী মখদুম মুঈনুদ্দীন ঠাঠোবী (সিন্ধু প্রদেশের অন্তর্গত ঠাঠের অধিবাসী) -কে তার একটি পাত্রের জবাবে লিখেছিলেন। উক্ত পত্রে তিনি শাহ সাহেব রহ.-কে ইমাম ইবনে তায়মিয়া রহ.-এর কোনো কোনো একক সিদ্ধান্ত ও তার বিরোধীদের মতভেদের উদ্ধৃতি প্রদান করে তার সম্পর্কে শাহ সাহেব রহ.-এর মতামত জানতে চেয়েছিলেন। এই পত্রসংকলনটি শাহ সাহেব সাহেব রহ.-এর প্রখ্যাত ছাত্র খাজা মুহাম্মদ আমিন কাশ্মিরী কর্তৃক সংকলিত। সংকলনটি مناقب أبي عبد الله محمد اسمعيل البهاري و فضيلة ابن تيمية নামে মাতবায়ে আহমদী থেকে মুদ্রিত। جلاء العينين গ্রন্থেও এটি অবিকল উদ্ধৃত হয়েছে।-সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস ২/১৮৮

Facebook Comments