গেরিলা মহাযোদ্ধা | আহমাদ উসমান

গেরিলা-মহাযোদ্ধা

জুলাই, ১৯২১ সাল।

জেনারেল ফারনান্দেজ সিলভেস্টের নেতৃত্বে প্রায় পঁচিশ হাজার স্প্যানিশ সৈন্য মার্চ করছে মাগরিবের রিফ অঞ্চলের দিকে। লক্ষ্য মুসলিম ভূমিতে দখলদারিত্বের বিরোধী জিহাদ পরিচালনাকারী রিফের ইসলামী ইমারাতের আমীর ও গেরিলা মুজাহিদীন বাহিনীকে চিরতরে দুনিয়ার বুক থেকে মিটিয়ে দেয়া। তাদের সাথে তৎকালীন সময়ের সর্বাধুনিক রাইফেল, ভারী আর্টিলারি গান সেই সাথে রয়েছে কয়েকটা যুদ্ধবিমান।

রিফের আমীর সিদ্ধান্ত নিলেন শত্রু বাহিনী রিফে মাগরিবে (অর্থাৎ মরক্কোর গ্রাম্য দিক) ঢুকে মুসলিমদের উপর গণহত্যা চালানোর আগেই তাদের দূরে থামাতে হবে। কিন্তু তার সৈন্যসংখ্যা মাত্র কয়েক হাজার। অস্ত্র বলতে মান্ধাতা আমলের কিছু বন্দুক, তাও আবার সবাইকে অস্ত্রে সজ্জিত করার মত নয়। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আল্লাহর উপর ভরসা করে যাই আছে তা নিয়েই নেমে পড়তে হবে। বিজয় এবং পরাজয় উভয়টি আল্লাহর পক্ষ হতে। ঠিক হলো ‘আনুয়াল’ শহরের নিকট স্প্যানিশ বাহিনীকে অ্যামবুশ করা হবে। নিজেদের এলাকা, তাই তাঁর সৈন্যরা সে জায়গাকে খুব ভালো ভাবেই চেনে।

রিফের এই দুঃসাহসী আমীরের পুরো নাম মুহাম্মাদ ইবনে আব্দিল কারিম আল-খাত্তাবি। যাকে আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের জনক বলা হয়ে থাকে। রক্কোর উত্তরে ‘রিফ’ অঞ্চলে আজদি শহরে ঐতিহ্যবাহী আমাজিঘ আদিবাসীর বসবাস। এখানেরই এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে ১৮৮২ সালে আল খাত্তাবি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আবদুল কারিম ছিলেন রিফ অঞ্চলের প্রভাবশালী সম্মানিত কাজী। প্রাথমিক পড়াশোনা মাদ্রাসায় করেন। কোরআন-হাদিস ও আরবি ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন মাদ্রাসা থেকেই। পরে তিনি ও তার ভাই একটি স্প্যানিশ স্কুলে কয়েক বছর পড়শোনা করেন। সেখান থেকে আল খাত্তাাবি ফেজের বিখ্যাত কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামি আইন শাস্ত্রে অধ্যয়ন সম্পন্ন করেন।

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে আল খাত্তাবি উসমানীয়দের পক্ষে নিজের অবস্থান ঘোষণা করেন। মরক্কোয় সাম্রাজ্যশক্তি স্প্যানিশ শাসনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেন। বিদেশি আধিপত্যের দুর্যোগ সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করতে শুরু করেন। এই কারণে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তাকে আটক করা হয়। দীর্ঘ ১১ মাস তাকে কারাবন্দির পর মুক্ত করা হয়। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি নিজ শহর রিফে চলে আসেন। ১৯২০ সালে খাত্তাবির বাবা মারা গেলে আজদির নেতা হিসেবে তিনিই আবির্ভূত হন।

আগে থেকে রিফ অঞ্চলের স্থানীয় সমাজে তাদের পরিবারের বিশাল প্রভাব ছিল। ঐতিহ্যবাহী পরিবার হওয়ায় সবাই তাদের সমীহ করে চলত। এর মাঝে খাত্তাবির তীক্ষ্ণ মেধা, নেতৃত্বের সুনিপুুুণ যোগ্যতা, উচ্চ মনোবল আর অসাধারণ রণকৌশলী হওয়ার কারণে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তার সুনাম-সুখ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর স্প্যানিয়ার্ডদের দখলদারিত্ব দিনে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তারা সাধারণ মানুষের উপর হামলা করে তাদের জমিজমা দখল করে নিচ্ছিল। আল-খাত্তাবী আর বসে থাকলেন না। তিনি এবার লুটেরা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেন। স্প্যানিশ সাম্রাজ্য বিস্তার রোধে স্থানীয় গোত্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে গেরিলা হামলার ছক কষতে থাকেন। রিফ অঞ্চলে তিনি হয়ে উঠলেন অবিসংবাদিত নেতা। মরক্কোর অন্য গোত্রগুলোও তার সঙ্গে সংঘবদ্ধ হলে তিনি শক্তিশালী স্প্যানিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের জন্য সুদক্ষ এক বাহিনী প্রস্তুত করেন।

১৯২১ সালের জুন মাস। সাম্রাজ্যবাদী স্প্যানিশ বাহিনী রিফে হামলা করার জন্য অগ্রসর হতে থাকে। আল খাত্তাবি স্প্যানিশ বাহিনীর প্রধান জেনারেল ম্যানুয়েল ফার্নান্দেজকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি তোমরা রিফ নদী পার হওয়ার চেষ্টা করো তাহলে তোমাদের নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হবে। বিশাল বাহিনি ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত স্প্যানিশ সেনাপ্রধান ম্যানুয়েল ফার্নান্দেজ খাত্তাবির হুঙ্কার থোড়াই কেয়ার করলেন। উল্টো উপহাসের সুরে বললেন, আগামীকাল আমি খাত্তাবির গেরিলা বাহিনিকে পুরো ধ্বংস করে তার ঘরে সবাইকে নিয়ে চা পান করব।

যুদ্ধের প্রথম দিনই আল খাত্তাবির সুদক্ষ গেরিলাদের আক্রমণে স্প্যানিশদের ১৭৯ সৈনিক নিহত হয়। এভাবে কয়েক সপ্তাহ দফায় দফায় স্প্যানিশ বাহিনির সঙ্গে সংঘর্ষ চলতে থাকে। কিন্তু প্রতিবারই খাত্তাবির গেরিলাদের কাছে পর্যদুস্ত হয়ে ফিরে আসতে হয়। চারদিন যুদ্ধের পর স্পেনীয় সেনাপতি সিলভেস্টে পিছু হটলেন। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল স্পেনীয় সৈন্যদের মাঝে। শেষবার স্প্যানিশ প্রধান ম্যানুয়েল ফার্নান্দেজ ৬০ হাজার সৈন্য একত্রিত করে খাত্তাবির গেরিলাদের ওপর চূড়ান্ত হামলার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন খাত্তাবির গেরিলাসংখ্যা ছিল মাত্র ৩ হাজার।

১৯২১ সালের ২২ জুলাই। রিফ অঞ্চলে এক দুর্ধর্ষ যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা ইতিহাসের পাতায় ব্যাটেল অফ অ্যানুয়াল নামে পরিচিত। টানা পাঁচ দিন বিচ্ছিন্ন লড়াই চলার পর এক রাতে খাত্তাবি স্প্যানিশ বাহিনির ওপর ভয়ংকর হামলার পরিকল্পনা করেন । মাত্র তিন হাজার গেরিলা নিয়ে রাতের আঁধারে বিশাল স্প্যানিশ বাহিনির শিবিরে হামলা করেন। এ এক রাতেই পুরো স্প্যানিশ বাহিনিকে নাকাল করে ছাড়েন। স্প্যানিশ লাশে সাম্রাজ্যবাদীর শক্তি তছনছ হয়ে যায়। প্রায় ২২ হাজার স্প্যানিশ সৈন্য মারা যায়। ফেলে যায় অন্তত ১৫ শত কামান, ৪ হাজার মেশিনগান। ২৫ হাজার রাইফেল। ২ হাজার ঘোড়া ও প্রায় হাজারখানেক বন্দি। বলা হয় বন্দীদের মধ্যে একশজন ছিল জেনারেল। বিপরীতে খাত্তাবির ৮০০ গেরিলা যোদ্ধা শাহাদতবরণ করেন।

১৯২৪ সালে তেতুয়ান নদীর অববাহিকায় জাবলাহ গোত্র খাত্তাবির সৈন্য বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিল। অবরোধ করলো তেতুয়ান শহর। বিচ্ছিন্ন করে দিল তেতুয়ান এবং তানজিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে স্পেনীয়দের অবস্থা হলো সংগীন। অ্যানুয়াল যুদ্ধ ছিল স্প্যানিশদের জন্য বিশাল এক পরাজয়। এরপর সংগঠিত হওয়া কোন যুদ্ধেই তারা খাত্তাবির বিরুদ্ধে বিজয়ের মুখ দেখেনি। প্রতিবারই খাত্তাবির গেরিলা বাহিনী দখলদার সৈন্যদের পর্যদুস্ত করতে লাগল। নিজেদের পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলার জন্য এবার তারা আরো বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিল। সাথে জোটবদ্ধ হলো ফরাসি বাহিনী। মরক্কোতে নামতে লাগলো নতুন নতুন স্পেনীয় সৈন্যদের।

প্রথমে শান্তি স্থাপনের জন্য দু’পক্ষ আলাপ-আলোচনার বৈঠকে বসলো। স্পেনীয়রা যে এলাকা হারিয়েছে তারা তা আবদুল করিমকে দিতে চাইলো। আল-খাত্তাবি বেঁকে বসলেন। তিনি বললেন, যেসব শহর আমি অস্ত্রের মাধ্যমে অধিকার করেছি সেগুলো কারো দেয়ার অধিকার নেই। তিনি দাবি করলেন, মরক্কোর অন্যান্য অংশ থেকেও স্পেনীয় বাহিনীকে প্রত্যাহার করতে হবে। স্পেনীশরা এটা মানলো না। সুতরাং ভেস্তে গেল শান্তি আলোচনা। এবার সম্মিলিত শত্রু বাহিনী একজোট হয়ে রিফ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলো।

শেষ পর্যন্ত ১৯২৬ সালে প্রায় আড়াই লাখ সৈন্যের ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে পরাজিয় বরণ করে নিতে বাধ্য হন খাত্তাবি। তাকে বন্দী করে নির্বাসিত করা হয় সূদুর ভারত মহাসাগরের রিইউনিয়ন দ্বীপে। সেখানে নির্বাসনে কেটে যায় বিশটি বছর। দেখেছেন ভারত মহাসাগরের উত্তাল তরঙ্গমালায় বিদেশীদের পদানত স্বদেশ। বিশ বছর পর ফরাসী সরকার তাকে ফ্রান্সে নির্বাসনের আদেশ দিল। এক নির্বাসন থেকে আরেক নির্বাসন। ফ্রান্সে যাওয়ার পথে যখন জাহাজটি অপরিসর সুয়েজখাল অতিক্রম করছিল তখন তিনি জাহাজ থেকে ঝাঁপ দিলেন সুয়েজ খালের পানিতে। আশ্রয় চাইলেন মিশর সরকারের কাছে। তিনি আর নিজ দেশে ফিরে যাননি। মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় আন্দোলন ও জাগরণের অন্যতম কেন্দ্র কায়রোতে ১৯৬৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি হয়তো সাময়িকভাবে পরাজিত হয়েছিলেন সম্মিলিত উপনিবেশ শক্তির কাছে। কিন্তু তাঁর প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সৃষ্টি হয়েছিল দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ নতুন প্রজন্মের হাজার হাজার মুজাহিদ। তারাই মুসলিম ভূমিকে মুক্ত করেছিল উপনিবেশ শক্তির সামরিক আধিপত্য থেকে। আরব জাহান, মুসলিম বিশ্ব তথা সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে ইতিহাসে তিনি থাকবেন চিরভাস্কর হয়ে.

Facebook Comments