আব্দুল্লাহ বিন বশির

দরসে তাফসিরুল কুরআন-১ | মাওলানা মানজুর মেঙ্গল দা.বা.

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

হুরুফে মুকাত্তায়া :

الم، ’الر‘ …
কুরআনে এই জাতীয় শব্দ কয়েক জায়গায় এসেছে। এগুলোকে বলা হয় ‘হুরুফে মুকাত্তায়া’। অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন শব্দ। বা কেঁটে দেওয়া শব্দ।

এখন খেয়াল করেন মাওলানা।

এই শব্দগুলোকে কেন ‘হুরুফে মুকাত্তায়া’ বলে? এবং এই শব্দগুলোর দ্বারা উদ্দেশ্য কী?

মুফাসসিরে কেরাম এর কয়েকটি উদ্দেশ্য বলেছেন।

١- قطع الله علمه عمن سواه،
১- এই শব্দগুলোর ইলম তথা জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া সকলের থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এগুলোর হাকিকত ও বাস্তবতা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আর কেউ নয়।

٢- استأثر الله ورسوله علمها،
২- এই শব্দগুলোর জ্ঞান শুধুমাত্র আল্লাহব্ব তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানে। আর কেউ এর অর্থ জানে না।

এটা মুফাসসিরে কেরামের দ্বিতীয় রায়। সুফি মুফাসসিরদের রায় এটা। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন। কিন্তু উম্মতকে জানাননি।

প্রত্যেক বিষয় উম্মাহকে জানানো জরুরি না। দরসে আপনারা অনেকেই বসে আছেন। দুইজন চুক্তি করলো, ক্লান্তি আসলে আমি চা খাওয়ার জন্যে বাহিরে যাবো। সকলের সামনে তো তোকে ডাকা যাবেনা।অনেকেই মন খারাপ করবে। আমি তোকে ইশারা করবো৷ ইশারা করলে তুই এসে পড়বি।

এখানে দুই বন্ধু পরস্পরের মাঝে কোর্ড ব্যবহার করেছেন।যাতে অন্যরা কষ্ট না পায়৷ বা অন্যরা এর হাকিকত ও বাস্তবতা জানতে না পারে৷

এটার একটি দলিল কুরআন থেকে নিন।

يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ(من أوصاف محمد صلى الله عليه وسلم) وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ ۚ (يترك محمد صلى الله عليه وسلم من أوصافه كثير)
অর্থাৎ হে আহলে কিতাব! তোমরা আমার নবির অনেক গুণাবলি গোপন করো যা তোমাদের কিতাবে রয়েছে। তা আমার নবি স্পষ্ট করে বলে দেন৷ আর অনেকগুলো এমন আছ, যা আমার নবি বলেন না। গোপন রাখেন৷

এ-ই গোপন কেন রাখেন? উম্মাহের কল্যাণের জন্যে। যদি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব বলে দিতেন আর কোনো আহলে কিতাব তারপরও ইমান না আনতো, তাহলে তাদেরকে সেখানেই ধসিয়ে দেওয়া হতো৷ তদ্রুপ সব জ্ঞান যদি আমাদেরকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দিতেন, তাহলে তা আমাদের জন্যে অনেক কষ্টের কারণ হতো৷

٣- قطع عمن قبله وبعضه،
৩- এই শব্দগুলো তার আগের ও পরের আয়াত থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে৷ তথা আলাদা।

٤- قطع عن كلمات،
৪- অনেকগুলো শব্দ থেকে কেঁটে একটি সংক্ষিপ্ত রূপ দেওয়া হয়েছে। যেমন :
আলিফ দ্বারা আল্লাহ। ‘লাম’ দ্বারা ‘লাতিফ’। ‘মিম’ দিয়ে ‘মাজিদ’। আল্লাহর তিনটি নামের সংক্ষিপ্ত রূপ হলো ‘الم’।
আরবিতে এটাকে বলা হয় ‘نحط’।

এইنحط‘ বড় মজার জিনিস। খুব ভালো করে ইয়াদ করে নেন। ইলমি ময়দানে অনেক কাজে দিবে।
‘নাহত’ বলা হয়,
’تركيب كلمة أو لفظ كلمتين أو أكثر‘
অর্থাৎ দুই বা ততধিক বাক্য বা শব্দ থেকে একটি বাক্য শব্দ গঠন করা৷ যা বলার দ্বারা সবগুলো একসাথে বুঝে যাবে। যেমন ‘بسمل زبد’ যায়দ بسم الله الرحمن الرحيم বলেছে। ‘استرجع زيد’ যায়েদ إنا لله و إنا إليه راجعون বলেছে।

অথবা এখানে ‘আলিফ’ দ্বারা ‘আল্লাহ’। ‘লাম’ দ্বারা ‘জিবরীল’। আর ‘মিম’ দ্বারা ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ উদ্দ্যেশ। আর এর হেকমত হলো, এই কথা বুঝানো,
نزل القرآن من الله بواسطة جبريل إلى محمد صلى الله عليه وسلم،
কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরিল আ.-র মাধ্যমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অবতীর্ণ হয়েছে৷

যেমন আপনাদের কাছে আমার আওয়াজ পৌঁছে দেয় এই সাউন্ড বক্স৷ সাউণ্ড বক্স আপনাদের উস্তাদ নয়। উস্তাদ তো আমি। এইজন্যেই আমাদের আকিদা হলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উস্তাদ জিবরিল আ. নয়। স্বয়ং আল্লাহ।

এইতো হলো আলিফ-লাম-মিম হলে। যখন সাথে অন্য শব্দ বৃদ্ধি পাবে যেমন ‘ص’। অর্থাৎ المص। সেখানে আল্লাহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাকে সামনের আয়াতে যা বুঝাতে চাচ্ছেন সেটার একটি সংক্ষিপ্ত রূপ।
যেমন ‘المص’ এখানে ‘সোয়াদ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হবে ‘صدر’ তথা বুক,সিনা। কারন আয়াতে সামনে বলা হচ্ছে,
كِتَٰبٌ أُنزِلَ إِلَيْكَ فَلَا يَكُن فِى صَدْرِكَ حَرَجٌ مِّنْهُ
হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার উপর এমন কুরআন অবতীর্ণ করা হচ্ছে যার কারনে আপনার অন্তরে কোনো রকম পেরাশানি যেন না থাকে।

পাল্লায় কিছু পড়েছে? নাকি ‘শাম্বু’ বার ওজনে ‘বাম্বু’।

যাইহোক। যে অর্থেই আপনি নেন তা আয়াতে মুতাশাব্বিহাতের অন্তর্ভুক্ত। যার অর্থ একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।

(এখানে একটি কথা মনে রাখা জরুরি, মুফাসসিরে কেরাম এই আয়াতগুলোর শুধু অতটুকু ব্যাখ্যাই করেন, যতটুকু আরবী ভাষা জ্ঞানের বিভিন্ন ব্যাখ্যা থেকে বুঝা যায়৷ কিন্তু কেউ সে সমস্ত ব্যাখ্যাগুলো অকাট্য অর্থ নেননা। বা এই কারণে এই আয়াতের ব্যাখ্যা করেন না যে, এই শব্দগুলোর হাকিকত খুঁজে বের করবে।
এই জন্যে প্রথম দুটো ব্যাখাই অধিকাংশ মুফাসসিগণ করেছেন। অন্য ব্যাখ্যার দিকে যাননি। কারণ এই শব্দগুলোর ব্যাখা জানা যদি জরুরিয়্যাতে দ্বীনের অংশ হতো, যা না জানলে ইমান থাকবে না, তাহলে আল্লাহ এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অবশ্যই জানিয়ে যেতেন৷ আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুক। আমীন। মুরাততিব)।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: