সংকলন
আব্দুল্লাহ বিন বশির

তীব্র এই গরম হোক জাহান্নাম থেকে মুক্তির সহজ উপায় | আব্দুল্লাহ বিন বশির

-‘ভাই! এত গরম, মরে যাওয়ার দশা৷ বাসার ছেলে-মেয়ারাও অনেকেই গরমে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। গরমে ছোট মেয়েটার গায়ে ফোঁসা পড়ে গেছে।কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা। ফ্যান ছেড়ে রাখলেও ঘামাতে থাকি।’
ইবরাহিম চাচার দোকানে এসে ঠান্ডা মাম পানি ঘট-ঘট করে গলায় ঢালতে বললো জাবের।

ছবির মত সুন্দর না হলেও লাইলনপাড়া গ্রামটি যে কাউকে খুব সহজেই মুগ্ধ করবে। দুদিকে দুটো বড় দিঘি। মাঝে এঁকেবেকে যাওয়া মেঠো রাস্তা। রাস্তার শেষ মাথায় বড় একটি কড়ই গাছ। সেখানে চার পায়া বাঁশের উপর বাঁধা ইবরাহিম চাচার চায়ের দোকান। কারেন্ট এখানে না থাকলেও ফমের একটি বাক্সে বরফ দিয়ে ঠান্ডা পানি রাখেন তিনি। কারণ কোনো কারণে মেইনরোড থেকে সিএনজি বা রিক্সা না পাওয়া গেলে দুপুরে দিঘির পার দিয়ে হেঁটে আসলে গরমে সিদ্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয়।

ইবরাহিম চাচা নামাজি মানুষ। টাকা পয়সা না থাকলেও গ্রামের মানুষের মনের একমাত্র রাজা তিনি। গ্রামের যেকোনো সমস্যার সমাধান ছোট এই চায়ের দোকান থেকেই হয়। গ্রামের জোয়ান-বুড়া থেকে শিশুকিশোর সকলেই চাচার দোকানে এসে চা-বিস্কুট খায়। আড্ডার আসর প্রায় সারদিনই থাকে চাচার দোকানে।

জাবেরের কথা শুনে মৃদু হাসলো ইবরাহিম চাচা। হাতের চা বানাতে বানাতে বললেন,
-‘আসতে সিএনজি মনে হয় পাওনি। একটু অপেক্ষা করে আসলেই পেতে।’
-‘না চাচা, সিএনজি না। আসলেই প্রচন্ড গরম। পাশের বাড়ির মোতালেব চাচা গতকাল সহ্য না করতে পেরে এসি লাগিয়ে ফেললো। আমরা গরিব মানুষ…

কথা শেষ করতে পারলোনা জাবের। আগে থেকে দোকানে বসে থাকা জাফর মিয়া বললো,
-এসি দিয়ে কী আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচা যাবে? যা অন্যায় আমরা করছি, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব ছাড়া আর কিছুই না। যদি বাঁচতেই হয় পুরো দেশ মিলে এখন আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে।’

-‘কথাটা তুমি খারাপ বলো নাই জাফর মিয়া। গত কয়েকদিন যেভাবে আলেম ওলামাদের হেনস্তা করা হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে একদম শেষ করে দিচ্ছেনা এটাও বা কম কিসে।’
কাঁচা পান আর সুপারি মুখে চিবুতে চিবুতে জাফর মিয়ার কথার সমর্থনে বললেন গ্রামের প্রবিন আব্দুল আজিজ চাচা।

-‘আচ্ছা ইবরাহিম চাচা! আপনি তো বুজুর্গ মানুষ। এই গরম থেকে বাঁচার কোনো দোয়া বা আমল নাই। যেটা করলে মুক্তি পাওয়া যাবে।’
ঠান্ডা পানি খেয়ে কিছুটা শান্ত হয়ে বললো জাবের।
মুখের উপর এভাবে প্রশংসায় সবসময় লজ্জা পান ইবরাহিম চাচা। গ্রামের মানুষ বুঝে,কিন্তু ইবরাহিম চাচাকে সকলে এত মহব্বত করে প্রশংসা না করে কেউ পারেনা৷ জাবেরের কথা শুনে মৃদু হেঁসে জাফর মিয়ার দুধ বেশি দেওয়া চা এগিয়ে দিলেন।

-নেন জাফর ভাই, চা নেন। আর জাবের, তুমি একটু আমার ব্যাপারে একটু বেশিই ভাবো। আমি অশিক্ষিত মানুষ, নামাজ শুদ্ধ হয় এতটুকু দোয়া-দরুদ পারি। আমি কিরে মাহবুব তুই কিছু জানিসরে?

ইবরাহিম চাচার বড় ছেলের নাম মাহবুব। হাফেজে কুরআন। এই বছর ঢাকার নামকরা মাদরাসা মাদানীনগরে দাওরা জামাতে ভর্তি হয়েছে। পড়ালেখার ফাঁকে ছুটিতে যখন গ্রামে আসে সেসময়টা চায়ের দোকানে বাবাকে এসে সাহায্য করে। ইবরাহিম চাচার চার ছেলে একমেয়ে। বড় দুই ছেলে হাফেজ। তৃতীয়জনের ১৫ পারা মুখস্থ হয়ে গেছে। আর ছোটজন গ্রামের রহিম মাওলানার কাছে মক্তবে পড়ে৷

কাপ দুচ্ছিলো মাহবুব। বাবার কথায় কিছুক্ষণভেবে বললো,

-‘দোয়া একটা পড়েছিলাম। তবে সেটা পড়লে গরম কমবে কিনা জানিনা কিন্তু অনেক বড় একটি সুসংবাদের কথা হাদিসে এসেছে।’

দোকানের সকলের মুখ খুঁশিতে ভরে উঠলো।
-‘বেশি বড় দোয়ারে মাহবুব? বুড়ো হয়ে যাচ্ছি এখন আর বড় কিছু মনে রাখতে পারিনা।’
আব্দুল আজিজ মিয়া দোয়া না শুনেই আগেই আত্মপক্ষ সমর্থনে বললেন।
-না দাদু। একদম সোজা আর সহজ। একটু চেষ্টা করলেই পারবেন।
-আগে লাভটা বল, লাভ বড় হলে দোয়া শিখতে আগ্রহ পাবো। লাভ ছাড়া তো আমাদের এখন আর কোনো কাজই করতে মনে চায়না।’
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন জাফর মিয়া।

-ঠিকই কইছেন চাচা। আল্লাহও জানে মানুষ লাভ খুঁজে তাই দুনিয়ায় আল্লাহ মানুষকে পাঠিয়ে শুধু তার ইবাদত করারই আদেশ করে নাই। প্রতিটি ইবাদতের পুরস্কারও ঘোষণা করেছেন। যাতে মানুষ পুরস্কারের কথা স্মরণ করে করে আল্লাহর ইবাদত আরো বেশি বেশি করতে পারে।’
মাহবুব সুযোগ পেয়ে দাওয়াহ শুরু করলো। এমনই করে ও প্রায়। গ্রামে যখন থাকে সুযোগ পেলেই যুবক-বুড়া সকলকে দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে কথা বলে।

জাবের আর চুপ থাকতে পারলোনা।
-চাচা চুপ করো তো তোমরা। আর মাহবুব তুই সুযোগ পাইলেই শুধু বয়ান শুরু করোস। এখন আগে দ্রুত দোয়াটা বল আর লাভটাও বল।’

-আচ্ছা আগে লাভ শোনেন। হাদিস শরিফে এভাবে আছে,যে ব্যক্তি গরমের দিনে ঐ দোয়াটা পড়বে আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি দিবেন। এবং জাহান্নামকে সাক্ষি রেখে বলবে, শুনে রাখ জাহান্নাম আমি তোর গরম থেকে এই দোয়া পড়া ব্যক্তিকে অবশ্যই মুক্তি দিবো।’

দোকানের সকলে উচ্ছাসের সাথে তাকিয়ে আছে মাহবুবের দিকে। মাহবুব মশকের মত করে সকলকে মুখস্ত করাচ্ছেন দোয়াটি। কিন্তু আব্দুল আজিজ মিয়া ভারাক্রান্ত মনে ইবরাহিম চাচার দিকে থাকিয়ে ভাবছেন, ‘মিয়া ইবরাহিম কত বড় এক কামাই তুমি করছো ছেলেগুলোকে আলেম বানাইতেছো। পাঁচটা ছেলে আর এতগুলো নাতি অথচ এই দুনিয়ায় আখেরাতের জন্যে কিছুই কামাই করতে পারলামনা।’

.

গত কয়েকদিনের তীব্র গরমে সাধারণ জনজীবনও অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটু বৃষ্টি আর ঠান্ডা বাতাসের জন্যে মানুষের হাহাকারের কোনো শেষ নেই। বাহিরে কর্মময় জীবন থেকে ঘরে ফিরা বাবা-ভাইদের চেহারার দিকে তাকানো যায়না। রান্নাঘরের মা-বোন আর স্ত্রীর আচল দিয়ে মুখ মুছার দৃশ্য আর চেহারায় কষ্টের ছাপ ঘরের বুঝবান মানুষই শুধু নয় বাচ্চারা পর্যন্ত অনুভব করছে। কবে শেষ হবে কষ্টের এইদিনগুলো সঠিকভাবে বলতে পারছেনা কেউই।

তবে কষ্টের এই সময়টাতেও ছোট্ট একটি দোয়ার মাধ্যমে অর্জন করে নিতে পারি আরো বড় ও স্থায়ী একটি কষ্ট থেকে। দরকার শুধু একটু সদিচ্ছা আর হিম্মতের। গরমের এই কষ্ট থেকে বাঁচার জন্যে আমাদের হাতে তো কিছুই নেই। কিন্তু কষ্টের এই মুহুর্তগুলোতে দোয়াটা বারবার পড়তে থাকি,এই তীব্র গরমও হতে পারে আমাদের জন্যে জাহান্নাম থেকে বাঁচার অনেকবড় মুক্তির একটি মাধ্যম। এটাই মুমিনের জীবনের সৌন্দর্য। সে কষ্টের মাঝেও অর্জন করে নিতে পারে অনেক বিশাল প্রতিদান।

.
হযরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—গরমের দিন যে ব্যক্তি এই দোয়া পড়বে।
”لا إلَهَ إلّا اللَّهُ، ما أشَدَّ حَرَّ هَذا اليَوْمِ، اللَّهُمَّ أجِرْنِي مِن حَرِّ جَهَنَّمَ“
(অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আজ কতইনা তীব্র গরম পড়েছে। হে আল্লাহ আপনি আমায় জাহান্নামের গরম থেকে হেফাজত করুন।)
তখন আল্লাহ জাহান্নামকে উদ্দেশ্য করে বলবে, আমার এক বান্দা আমার কাছে তোর গরমের তীব্রতা থেকে মুক্তি চাচ্ছে৷ তুই সাক্ষি থাক, আমি তাকে তা থেকে মুক্তি দিয়ে দিলাম’।[১]

সুবহানাল্লাহ! কত বড় এক সফলতা এই তীব্র গরমের মধ্যে আমাদের জন্য হাতছানি দিচ্ছে।
দোয়াটিতে যদিও দুনিয়াতে গরম কমবে কিনা এমন কথা নেই, তবে ভালো করলে খেয়াল করলে দেখবেন দোয়াটা মুলত একটা ইসফেগফার। যদি উপলব্ধির সাথে দোয়াটি পড়ি আর আল্লাহর কাছে কাকুতি মিনতি করতে থাকি, আশা করা যায় হাদিসে বর্ণিত সে মহান সুসংবাদটি দান করবেন সাথে দুনিয়ার এই তীব্র গরমের কষ্ট থেকে আমাদের বাঁচাবেন। আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুক। আমীন।

টিকা:
[১] আমালুল য়াওমি ওয়াল লাইলাতি, ইবনুস সুন্নি, বর্ণনা নং ৩০৬।

Facebook Comments

Related posts

কেমন ছিল সালাফদের কুরআন তিলাওয়াতের ইশক|| আব্দুল্লাহ বিন বশির

সংকলন টিম

সুন্নাত ও বিদআতের পরিচয় : কিছু মৌলিক কথা-১ | আল্লামা ইউসুফ লুধিয়ানভী রহ.

সংকলন টিম

শাতিমে রাসুল এবং ফিকহে হানাফি | আব্দুল্লাহ বিন বশির

সংকলন টিম

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: