সংকলন
ramadan
আব্দুল্লাহ বিন বশির

ফাজায়েলে রমাজান | একটি হাদিস ও তাহকিক

ফাজায়েলে রমাজান বিষয়ে একটি প্রসিদ্ধ হাদিস যা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আলেমের মুখে শুনেছি, এবং বাংলাদেশের অনেক মাদরাসা-মসজিদের রমাজানের সুচিতে সে হাদিস অনুযায়ী ‘রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের’ দশদিন ভাগ করে লেখা হয়। ২০১৯ তখন সারা দেশে লকডাউন। রমাজান মাস চলছিলো। অনলাইনে দুটো লেখা দৃষ্টিগোচর হয়।
সেগুলোর একটিতে প্রসিদ্ধ এই হাদিসকে যায়ীফ জিদ্দান আর অন্যটিতে মুনকার প্রমাণ করা হয়। প্রথমে একটু খারাপ লাগলো, হাদিসটি কত মানুষের মুখেই না শুনেছি। অথচ হাদিসটি বর্ণনার অযোগ্য। পরে এটা ভেবে ভালো লাগলো যে, তাহকিক সমৃদ্ধ সঠিক কথাগুলো উম্মাহের সামনে আসছে। উভয় লেখাতেই হাদিসটির একটি বড় দোষ হিসেবে উল্লেখ করা হয় হাদিসের রাবী ‘আলি ইবনে যায়েদ’কে। হাতের কাছে ইমাম যাহাবীর ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’ কিতাবটি ছিলো। কেনো জানিনা, আলি ইবনে যায়েদের তরজমা খুললাম। আমি একদম অবাক হয়ে গেলাম, যে রাবীকে সামনে রেখে প্রসিদ্ধ এই হাদিসকে যয়ীফ জিদ্দান আর মুনকার বলা হচ্ছে, ইমাম যাহাবী রহ. সে রাবীর তরজমা শুরু করেছেন ‘ইমাম’ শব্দ দিয়ে! একধরনের খটকা তৈরি হলো তাহকিক দুটোর প্রতি। হাদিসটির পুরো বিষয় নিজে তাহকিক করার ইচ্ছে ভিতরে অনুভব করলাম। কিন্তু বাসায় এই বিষয়ে পর্যাপ্ত উপকরণ নেই। বাহিরে তখন কঠোর লকডাউন, কি করবো ভাবতে লাগলাম। দ্রুত সিন্ধান্ত নিয়ে নিলাম, লকডাউন যত কঠোরই হোক, মাদরাসায় গিয়ে হাদিসটির পূর্ণ তাহকিক করবো। আল্লাহর উপর ভরসা করে সকালে শনির আখড়া থেকে রওনা হলাম মুহাম্মদপুর জামিআ রাহমানিয়া (আলী এন্ড নূর) মাদরাসার উদ্দেশ্যে। দেরদিন সময়ে হাদিসটির তাহকিক করলাম আমার সাধ্যে যতটুকু ছিলো। অতঃপর শায়খ আব্দুল্লাহ আল মামুন হাফিজাহুল্লাহের নিকট আমার লেখাটি পেশ করি। উনি তাহকিকটি দেখে বেশ খুশি হন, এবং কিছু সংযোজন করে দেন। যাইহোক, লেখাটিতে যা পেশ করা হয়েছে তা আমার নিকট দলিলের আলোকে যতটুকু স্পষ্ট হয়েছে ততটুকু, চূড়ান্ত কোনো সিন্ধান্ত নয়। যদি কারো কোনো ভুল দৃষ্টিগোচর হয় তাহলে অবশ্যই অবগত করবেন ইনশাআল্লাহ কৃতজ্ঞ থাকবো এবং দলিলের আলোকে বিবেচনা করবো। আল্লাহ আমাদের সকলকে কবুল করে নিক। আমীন।
হাদিসটি কী?
হযরত সালমান ফারসী রা. বলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘হে লোকসকল! তোমাদের মাঝে এমন একটি মাস আসছে …….। অনেক দীর্ঘ একটি হাদিস। তবে তারমাঝে প্রসিদ্ধ হলো দুটি অংশ। এক. যে ব্যক্তি তাতে একটি নেক আমল করবে আল্লাহ্‌ তাকে অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করার ছাওয়াব দিবেন। আর যে একটি ফরজ আদায় করবো তা অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ আদায়ের সমতুল্য। ……দুই. এটা এমন এক মাস যার শুরুভাগ রহমত মাঝের অংশে মাগফিরাত ও শেষের অংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তি। ….
হাদিসটি কোথায় আছে?
১. ইবনে খুজাইমা রহ. তার সহিহ হাদিসের উপর লিখিত কিতাবে (সহিহ ইবনে খুযাইমা ২/৯১০, শায়খ মুস্তফা আ’জমী তাহকিককৃত নুসখা) হাদিসটি উল্লেখ করেন।
২. ইমাম বাইহাকি রহ. (মৃত্যু ৪৫৮ হি.) তার ‘আল জামে লি শুয়াবিল ইমান’ কিতাবে (৫/২২৩) বর্ণনা করেছেন।
৩. ইমাম বাইহাকি রহ.(মৃত্যু ৪৫৮ হি.) বিভিন্ন সময়ের ফলিজত নিয়ে লিখিত কিতাব ‘ফাজায়েলুল আওকাত’-এ (হাদিস নং ৩৭, পৃষ্ঠা ১৪৬) উল্লেখ করেছেন।
৪. ইবনে শাহিন রহ. (মৃত্যু ৩৮৫ হি.) রমজানের ফজিলত নিয়ে লিখিত কিতাব ‘ফাজায়েলে রমজান’-এ (হাদিস নং ১৫,১৬) দুই জায়গায় হাদিসটি বর্ণনা করেন।
৫. ইবনে আবিদ দুনিয়া রহ. (মৃত্যু ২৮১ হি.) রমজানের ফজিলত নিয়ে লিখিত কিতাব ‘ফাজায়েলে রমজান’ (হাদিস নং ৪১)-এ বর্ণনা করেন।
৬. মাহামিলি রহ. (মৃত্য ৩৩০ হি.) ‘আমালী’ কিতাবে (হাদিস নং ২৯৩) বর্ণনা করেন।
৭. শাজারী রহ. (মৃত্যু ৪৯৯ হি.)তার ‘আমালিয়াহ’৩/৩১১ তে বর্ণনাকরেন।
৮. ইবনু হাজার আসক্বালানী রহ. (মৃত্যু ৮৫২ হি.) ‘তালখীসুল হাবীর’ ৩/১১২১ এ উল্লেখ করেছেন।
এছাড়াও আরো কিছু কিতাবে হাদিসটি কয়েকটি সূত্রে পাওয়া যায়।
হাদিসটিতে সমস্যা কী?
হাদিসটি মুলত দুইজন সাহাবী থেকে বর্ণিত। ১. হযরত সালমান ফারসী রা.। এবং এটিই বেশি প্রসিদ্ধ। ২. হযরত আবু হুরাইরাহ রা.।
উপরে হযরত সালমান ফারসী রা.–র হাদিসের তাখরিজ উপরে দেওয়া হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরাহ রা. থেকে বর্ণিত হাদিসের তাখরিজ অন্যকোনো প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে।
হযরত সালমান ফারসী রা.-র হাদিসের মাদারে সনদ হলো, ১. আলি ইবনে যায়েদ ২. সাইদ ইবনে মুসাইয়াব থেকে, ৩. তিনি হযরত সালমান ফারসী থেকে।
এই হাদিসের সনদ নিয়ে মৌলিকভাবে দুটি ইল্লত বা সমস্যার কথা বলা হয়।
১. হযরত সালমান ফারসী রা. থেকে সাইদ ইবনে মুসাইয়্যাব রহ.-র ইরসাল।
২. ‘আলি ইবনে যায়দ’ রাবীর যু’ফ।
প্রথম ইল্লত :
সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব রহ.-র মুনকাতি রেওয়ায়েতের ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের রায়। ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. বলেন, ‘যাদের ব্যাপারে জানা যাবে তারা শুধু ‘ছিকাহ’ রাবী থেকেই হাদিস গ্রহণ করেন তাদের মুরসাল ও তাদলিস উভয়টিই গ্রহণযোগ্য। যেমন সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যাব ও ইবরাহিম নাখয়ী। মুহাদ্দিসদের নিকট তাদের হাদিস সহিহ।-আত তামহীদ ১/৩০
.
সকল মুহাদ্দিসগন আ’মভাবে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাবের মারাসীল কে কবুল করে নিয়েছেন। তাদের মাঝে অন্যতম হচ্ছেন, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমাদ, ইমাম ইবনু মাঈন, ইমাম খতীবে বাগদাদী, ইমাম যাহাবীসহ প্রমুখ।(১)
দ্বিতীয় ইল্লত :
আলি ইবনে যায়েদ একজন ‘মুখতালাফ ফিহ’ রাবী। সর্বসম্মতিক্রমে দুর্বল নন। আয়িম্মায়ে জারহু ওয়াত তাদিলের থেকে তার ব্যাপারে দুই ধরনের মন্তব্যই পাওয়া যায়। আমি আলি ইবনে যায়েদ নিয়ে দুইভাবে আলোচনা করবো।
(ক) উনার সম্পর্কে আয়িম্মায়ে কেরামের বক্তব্য।
(খ) আয়িম্মায়ে হাদিস তার হাদিস উল্লেখ করার পর কি অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
(ক) আলি ইবনে যায়েদের ব্যাপারে আয়িম্মাদের বক্তব্য।
১. ইমাম ইজলি (মৃত্যু ২৬১হি.)
ইমাম ইজলি রহ. ছিকা রাবীদের নিয়ে লেখিত কিতাবে আলি ইবনে যায়েদকে উল্লেখ করে লেখেন,
علي بن زيد بن جدعان بصري ، يكتب حديثه وليس بالقوي، وكان يتشيع وقال مرة لا بأس به
‘তার হাদিস লেখা যাবে। তবে সে অতটা মজবুত নয়।… অন্যস্থানে বলেন, ‘লা বা’সা বিহি’ অর্থাৎ তিনি তেমনকোনো সমস্যার রাবী নন।-আসসিকাত লিল ইজলি পৃ. ৩৪৬ (তরজমা নং ১১৮৬)।
২. ইমাম তিরমীযী রহ. (মৃত্যু ২৭৯ হি.)
ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, ‘আলি ইবনে যায়েদ ‘সাদুক’। তবে তিনি মাঝে মাঝে ‘মাওকুফ’ রেওয়ায়েতকে ‘মারফু’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইমাম তিরমিযীর এই মন্তব্য উল্লেখ করে শায়খ আওয়ামা দা.বা. বলেন, ‘যবতের দুর্বলতার কারনে এই জরাহ করা হয়েছে। এই জন্যেই অনেক ইমাম তার হাদিসকে হাসান পর্যায়ের বলেছেন। যেমন, ইমাম বাজ্জার, ইমাম হাইছামি। ………
ইমাম তিরমিজি রহ. নিজেই কয়েক স্থানে আলি ইবনে যায়েদের হাদিসকে ‘হাসানুন সাহিহুন’ বলেছেন। কিছু উদাহরণ, (১০৯), (৫৪০)। দেখুন আল- আল-কাশেফের টিকা ৩/৪৪৫।
৩. ইমামুল জারহি ওয়াত তা’দিল ইবনে আদি রহ. (মৃত্যু ৩৬৫ হি.)
আলি ইবনে যায়েদ থেকে অনেক নির্ভরযোগ্য হাদিস আছে। আমি বসরা ও অন্যান্য শহরের এমন কোনো আলেম দেখিনি যারা তারা থেকে হাদিস নেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। …. তার মাঝে দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও তার হাদিস লেখা যাবে।-আল-কামিল ২/২৬৪, তাহযীবুল কামাল, মিযযী ২০/৪৩৯
৪. ইমাম যাহাবী রহ.(মৃত্যু ৬৪৮ হি.)
(ক) ইমাম যাহাবী রহ. হাফিজুল হাদিসদের নিয়ে একটি বিশেষ কিতাব লেখেছেন ‘তাজকিরাতুল হুফফাজ’। উক্ত কিতাবে আলি ইবনে যায়েদের জীবনীও এনেছেন। এবং তাকে ‘ইমাম’ খেতাব দিয়েছেন। দেখুন, তাজকিরাতুল হুফফাজ ১/১০৬। দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ প্রকাশ ১৪১৯ হি.।
(খ) ইমাম যাহাবী রহ. তার কালজয়ীগ্রন্থ ‘সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৫/২০৬ তে আলি ইবনে যায়েদের জীবনী এই শব্দগুলো দিয়ে শুরু করেন,
‌الإمام، ‌العالم ‌الكبير، ‌أبو ‌الحسن ‌القرشي، التيمي، البصري، الأعمى
“আল ইমাম, আল-আলিমুল কাবির”।
(গ) আলি ইবনে যায়েদ একজন হাফেজুল হাদিস। কিন্তু অতটা মজবুত নন।-আল-কাশেফ ৩/৪৪৫, শায়খ আওয়ামা তাহকিককৃত নুসখা।
(ঘ) আলি ইবনে যায়েদ ‘ছালিহুল হাদিস’।-মুস্তাদরাকে হাকেমের তালখিস ৮/৩০৪৩
৫. ইমাম হাইছামী রহ. (মৃত্যু ৮০৭ হি.)
ইমাম হাইছামী রহ. তার ‘মাজমাউয যাওয়ায়েদ’ নামক কিতাবে আলি ইবনে যায়েদের হাদিস উল্লেখ করত; কয়েক ধরনের মন্তব্য করেছেন। আমি এখানে তার কয়েকটি উল্লেখ করবো।
(ক) আলি ইবনে যায়েদ ‘লাইয়িনুন’। আজলি রহ. সহ অনেকেই তাকে ছিকাহ বলেছেন। ও এক জামাত মুহাদ্দিস তাকে যায়ীফ বলেছেন। (৪/১৮৮)
(খ) আলি ইবনে যায়েদ তার মাঝে দুর্বলতা রয়েছে। তবে কেউ কেউ তাকে ছিকাহ বলেছেন। (৪/১৫২)
(গ) আলি ইবনে যায়েদ ছিকাহ। তবে তার স্বরণশক্তি খারাপ ছিলো। (৭/৩৬)
৬. হাবিবুর রহমান আ’জমী রহ. (মৃত্যু ১৪১২ হি.)
হাবিবুর রহমান আজমী রহ. বলেন, ‘হাফেজ ইবনে হাজার রহ. যদি তাকে যায়ীফ বলেছেন, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। বহু ইমাম ‘আলি ইবনে যায়েদ’-র হাদিসকে হাসান বলেছেন। যেমন ইমাম বাজ্জার, ইমাম হাইছামি রহ.। ইমাম হাইছামী রহ. স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আলি ইবনে যায়েদ হাসানুল হাদিস ছিলেন।-মুসনাদে উমর ইবনে আব্দুল আজিজ-র টিকা ২০৮ পৃ. শায়খ মুহাম্মদ আওয়ামা তাহকিককৃত, দারুল ইউসর, চতুর্থ প্রকাশ ২০০৯
৭. আহমদ শাকের রহ. (মৃত্যু ১৩৭৭ হি.)
আরবের বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আহমদ শাকের রহ. বলেন, ‘আলি ইবনে যায়েদ ছিকাহ রাবী।-আহমদ শাকের রহ. তাহকিককৃত মুসনাদে আহমেদের হাশিয়া ১/১৭৯, দারুল হাদিস।
৮. আলবানী রহ. (মৃত্যু ১৪২০ হি.)
মরহুম আলবানী সাহেব বিভিন্ন জায়গায় এক তরফা আলি ইবনে যায়েদকে দুর্বল বললেও এক জায়গায় এসে স্বীকার করেই নিয়েছেন, ‘আলি ইবনে যায়েদ যায়ীফ তার স্বরণশক্তির কারনে। তবে অনেক মুহাদ্দিস তার হাদিসকে হাসান বলেছেন।-সিলসিলাতুস সাহিহা ১/৫৮৭
আলি ইবনে যায়েদের সম্পর্কে উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, হাদিস শাস্ত্রে উনার একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থান ছিলো। তবে তিনি শুধুই মুহাদ্দিস ছিলেননা বরং একজন ফকিহও ছিলেন। হাম্মাদ বিন যায়দ বলেন, আমি সাঈদ আল-জারিরীকে বলতে শুনেছি,
قال الجريري: ‌أصبح ‌فقهاء ‌البصرة ‌عميانا: قتادة، وابن جدعان، وأشعث الحدان.
বসরার ‘ফকিহ’রা অন্ধই রয়ে গেলো। কাতাদাহ, আলি ইবনে ইবনে যায়েদ, আসয়াছ আল হাদ্দানী। -সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৫/২০৮; তাহযীবুত তাহযীব ৭/৩২৪
অর্থাৎ, আলি ইবনে যায়েদ একজন প্রসিদ্ধ ফকিহ ছিলেন।
এছাড়া নিজ যামানার আলেমদের নিকট ও জনসাধরণের নিকট উনার গ্রহণযোগ্যতা এত বেশি ছিলো যে, হাসান বসরি রা.-র মৃত্যুর পর লোকেরা উনাকে হাসান বসরির স্থলাভিষিক্ত করেন। মানসুর ইবনে জাযান রহ বলেন,
لما مات الحسن ، قلنا لعلي بن زيد : اجلس مكانه
‘হাসান বসরি রহ. যখন মারা যান, আমি আলি ইবনে যায়েদকে বললাম তার স্থানে বসার জন্য।-সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৫/১০৭, মুয়াসসাসাতুর রিসালা
এইতো গেলো আলি ইবনে যায়েদের ব্যাপারে ইমামদের কিছু ভালো মন্তব্য। এছাড়াও উনার ব্যাপারে ইমামদের অনেক জরাহও পাওয়া যায়। এখানে আমি তা উল্লেখ করে মাকালা দীর্ঘ করবোনা। বাকি উনার ব্যাপারে ইমামদের যত জরাহ আছে তার সবগুলোর মূল কারণ হলো ‘সুয়ে হিফজ’ বা ‘স্বরণশক্তি’-র সমস্যা। ইমাম যাহাবী রহ. বলেন,
وكان من أوعية العلم، على تشيع قليل فيه، وسوء حفظ يغضه من درجة الإتقان
তিনি ইলমের অধিকারী ছিলেন। শিয়িয়্যাতের কিছু প্রভাব তার মাঝে ছিলো। তার মেধা শক্তির দুর্বলতার কারণে তিনি ইতকানের পর্যায় থেকে নীচে নেমে আসবেন।-সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৫/২০৭, মুয়াসসাসাতুর রিসালা
অর্থাৎ, আলি ইবনে যায়েদের স্বরণশক্তির দূর্বলতার কারণে তিনি ছিকাহ হবেননা। বরং তার থেকে একটু নিচের স্থরে হবেন।
প্রশ্ন হলো, সমালোচিত রাবীর ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসে কেরামের অবস্থান কী ?
হাফেজ ইবনে হাজার রহ. ‘তাহযীবুত তাহযীব’ (৫/২৬০)-এ আব্দুল্লাহ ইবনে সালেহ-র তরজমাতে উল্লেখ করেন, ‘ইবনে কাত্তান রহ. বলেন, আব্দুল্লাহ বিন সালেহ সাদুক রাবী। তার ব্যাপারে এমন কিছু প্রমানিত নয় যা তার হাদিসসমুহ বাতিল করে দিবে। তবে সে সমালোচিত রাবী। এবং তার হাদিসের মান হবে হাসান।
যফর আহমদ উছমানী রহ. এই নস উল্লেখ করে বলেন, ‘যদি কোনো রাবী সমালোচিত তথা তার সম্পর্কে ইমামদের ভালো মন্দ উভয় ধরনের বক্তব্য আছে তাহলে সে রাবী হাসান পর্যায়ের। এবং তার হাদিসের মান হবে হাসান।….. যে ব্যক্তি রিজাল ও ইলালের কিতাবসমুহ মুতালায়া করেছে, তার নিকট এই উসূল নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।-ক্বাওয়ায়েদ ফি উলুমিল হাদিস পৃ.৭৭, শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ তাহকিককৃত(২)
(খ) আয়িম্মায়ে হাদিস তার হাদিস উল্লেখ করার পর কি অবস্থান গ্রহণ করেছেন
উলুমুল হাদিস শাস্ত্রে কোনো রাবী ছিকাহ ও যায়ীফ হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, আমলে ময়দানে মুহাদ্দিসে কেরাম কোনো রাবীর সাথে কি রকম আচরণ করেছেন। কোনো একজন রাবীর ব্যাপারে যতই কালাম থাকুক যদি মুহাদ্দিসে কেরাম তার থেকে হাদিস গ্রহণ করে থাকেন এবং ঐ হাদিসের হুকুমে সহিহ বা হাসান বলে থেকেন তাহলে বুঝতে হবে ঐ রাবীর ব্যাপারে জরাহগুলো বাস্তবিক কোনো ভিত্তি নেই বা জরাহগুলো তার ছিকাহ বা হাসান হওয়ার জন্যে বাঁধা হবেনা।
তাই আমরা আলি ইববে যায়েদের ব্যাপারে মুহাদ্দিসে কেরামের আমলি কিছু অবস্থান উল্লেখ করবো।
১. ইমাম বুখারী রহ. তার ‘তার আদাবুল মুফরাদ’ কিতাবে আলি ইবনে যায়েদ থেকে হাদিস উল্লেখ করেছেন। ( হাদিস নং ১৬১)
২. ইমাম মুসলিম রহ. ‘সহিহ মুসলিম’-এ অন্য একটি হাদিসের সমর্থনে আলি ইবনে যায়েদের রেওয়ায়েত এনেছেন। (হাদিস নং ১৭১৮)
৩. এ ছাড়া প্রসিদ্ধ চারটি সুনানের কিতাবে আলি ইবনে যায়েদ থেকে ইমামগণ হাদিস রেওয়ায়েত করেছেন।
(ক) ইমাম তিরমিযী রহ. একাধিক স্থানে আলি ইবনে যায়েদের হাদিসকে ‘হাসানুন সাহিহুন’ বলেছেন। দেখুন ১০৯, ৫৪৫, ২৩৩০, ৩৯০২।
অন্য স্থানে (হাদিস নং ১১৪৬) সাইদ ইবনে মুসাইয়্যাব থেকে আলি ইবনে যায়েদে হাদিস উল্লেখ করে বলেন, আলির সনদে হাদিসটি সহিহ।
৪. ইমাম হাকেম রহ. তার লেখিত মুস্তাদরকে হাকেম নামক কিতাবে আলি ইবনে যায়েদ থেকে হাদিস উল্লেখ করেছেন।
আলি ইবনে যায়েদ থেকে একক সনদে হাদিস উল্লেখ করে বলেছেন, হাদিসটি সহিহ। লোকেরা আলি ইবনে যায়েদ থেকে এই হাদিস রেওয়ায়েত করেন। আর তিনি এই হাদিসে মুনফারিদ। (হাদিস নং ৪০৪১)। যাহাবী রহ. এই কথার উপর কোনো আপত্তি করেননি।
৫. মুসনাদে আহমদে আলি ইবনে যায়েদ থেকে অসংখ্য রেওয়ায়েত আছে। নমুনা দেখুন, ২৩,২৬, ১৫৬। শেষের দুইটি হাদিসের সম্পর্কে মুহাদ্দিস আহমদ শাকের মন্তব্য করেছেন, ‘সনদটি সহিহ’।
৬. এছাড়াও হাদিসের নির্ভরযোগ্য প্রায় সব কিতাবেই আলি ইবনে যায়েদ থেকে রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে।
সুতরাং বুঝা গেলো এই সনদের ব্যাপারে যে দুটি আপত্তি করা হয়, শাস্ত্রীয় বিচারে তার কোনোটিই সহিহ নয়। আল্লাহু আ’লাম। আর পরিশেষে বলা যায় এই সনদকে একেবারে মুনকার ও যঈফুন জিদ্দান পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া মোটেও ইনসাফ নয়। অথচ কেউ তো আগে বেড়ে এর মতন কেও মুনকার বলছেন!!
ইবনে খুজাইমার সনদের উপর আরেকটি আপত্তি
সাধারণত মুহাদ্দিসে কেরাম এই আপত্তিটি এড়িয়ে গেছেন। আমার কাছে তার একটিই কারণ মনে হচ্ছে, তা হলো, হয়তো এই আপত্তিটি গ্রহণযোগ্য নয়। তারপরও কেউ হয়তো এই আপত্তিটি করতে পারে তাই আমি তা উল্লেখ করছি।
উক্ত সনদে ইউসুফ ইবনে যিয়াদ নামক রাবী রয়েছে। সে হাদিস রেওয়ায়েতে মাজহুল। এবং ইমাম বুখারী ও আবু হাতেম রাজি তাকে মুনকার বলেছেন।
ইমাম বুখারীর মুনকার বলার কারন ইবনে আদি রহ. বলেছেন,
ويوسف هذا ليس بالمعروف ولعله لم يرو عنِ ابْن أبي خَالِد إلا الحديث الَّذِي أشار البُخارِيّ إليه
ইউসুফ ইবনে যিয়াদ মা’রুফ বা পরিচিত নন। সম্ভবত সে ইবনে আবি খালেদ থেকে একটি রেওয়ায়েতই করেছেন যেদিকে ইমাম বুখারী ইঙ্গিত করেছেন।-আল কামেল ইবনে আদি ৮/৫১০
অর্থাৎ ইউসুফ ইবনে যিয়াদের একটি রেওয়ায়েতই ইমাম বুখারীর নিকট পৌঁছেছে যে সনদটি ছিলো ত্রুটিযুক্ত। ইমাম বুখারী রহ. সে হাদিসকে সামনে রেখে রাবীর ব্যাপারে হুকুম লাগিয়েছেন। আল্লাহু আলাম।
২. উকাইলি রহ. তার ব্যাপারে বলছেন,
يوسف بن زياد أبو عبد الله كان يحفظ ولايتابع على حديثه، ولايعرف إلا به،
উকাইলি রহ. বলেন, ইউসুফ ইবনে যিয়াদ আবু আব্দুল্লাহ তিনি হাদিস মুখস্ত বর্ণনা করতেন। কিন্তু তার হাদিসের মুতাবায়াত পাওয়া যায়না। এবং তার সূত্র ছাড়া এই হাদিসটি আর জানা যায়না।-আয যুয়াফাউল কাবির লিল উকাইলি ৪/৪৫৩।
উকাইলি রহ. ইউসুফের মুতাবায়াত পাওয়া যায়না বলে ইউসুফের একটি হাদিস উল্লেখ করেন,
حدثنا محمد بن جعفر بن محمد بن أعين، حدثنا عباد بن موسى الحنبلي، حدثنا يوسف بن زياد، حدثنا عبد الرحمن بن زياد بن أنعم،، قاضي إفريقية، عن الأوزاعي، عن ابن مسلم يكنى أبا مسلم , عن أبي هريرة قال: دخلت بالسوق مع رسول الله صلى الله عليه وسلم , فجلس إلى البزازين , فاشترى سراويل بأربعة دراهم , وكان لأهل السوق وزان يزن , فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: “زن وارجح” (الضعفاء الكبير للعقيلي4/ 453)
কিন্তু উকাইলি রহ.-র এই বক্তব্যটি ঠিক নয়। কারণ উকাইলি রহ.-র নিজের বর্ণিত এই হাদিসটিরই মুতাবায়াত পাওয়া যায়। ইমাম বাইহাকী রহ. তার “শুয়াবুল ইমান” নামক কিতাবে (৮/২৮৩) এই হাদিসের একটি সনদ উল্লেখ করেন। যেখানে হাফস ইবনে আব্দুর রহমান ইউসুফ ইবনে যিয়াদের মুতাবায়াত করছেন।
অর্থাৎ বুঝা গেলো ইউসুফ ইবনে যিয়াদের হাদিসের মুতাবায়াত পাওয়া যায়না, এমন কথা আমভাবে বলা সঠিক নয়। আল্লাহু আলাম।
ইউসুফ বিন যিয়াদের থেকে ফাজায়েলে রমাজানের হাদিসটি আলি ইবনে হুজর রেওয়ায়েত করেন। ইবনে হাজার রহ. বলেন, আলি ইবনে হুজর ‘সিকাতুন হাফিজুন’ (তাকরিব ,জীবনী নং ৪৭০০)। এবং এই সিকাতুন সাবতুন পর্যায়ের রাবী ইউসুফ থেকে ‘হাদ্দাসানা’ শব্দে বর্ণনা করেন।
আলি ইবনে যায়েদ থেকে একাধিক সনদ :
ইউসুফ ইবনে যায়েদের সনদসহ এই হাদিসটি আলি ইবনে যায়েদের থেকে মোট চারজন রেওয়ায়েত করেন।
১. হাম্মাম বিন ইয়াহয়া। এটা ইউসুফ বিন যায়েদের সনদ।
হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন, হাম্মাম সিকাহ। তবে তার থেকে কখনো কখনো ওহাম হয়।
শুয়াইব আল আরনাউত রহ. ইবনে হাজারের এই মন্তব্যের ব্যাপারে বলেন, ‘কখনো কখনো ওয়াম হয়’ হাফেজ ইবনে হাজার যদি এই কথাটি না বলতেন তাহলেই ভালো হতো। কোনো ছিকা রাবীই ওহাম থেকে মুক্ত নন।-তাকরিব পৃ. ৮১৭, শায়খ শুয়াইব আল আরনাউত তাহকীককৃত
২. সাইদ বিন আবি আরুবাহ। (‘আমালি’ মাহামিলি রহ. ২৯৩ নং হাদিস)
হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, সাইদ বিন আবি আরুবা ‘সিকাতুন ছাবতুন’।-তাকরিবুত তাহজিব ২৮৫, শায়খ শুয়াইব আল আরনাউত তাহকীককৃত
৩. ইয়াস বিন আব্দুল গাফফার (শুয়াবুল ইমান ৫/২২৩)
ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন,
وأما ‌إياس ‌بن ‌عبد ‌الغفار فما عرفته
ইয়াস ইবনে আব্দুল গাফফার তাকে আমি চিনিনা।-ইতহাফুল মাহারাহ ৫/৫৬০
৪. সাল্লাম ইবনে সালম। (ফাজায়েলে রমজান লি ইবনে শাহিন, ১৪৪ পৃ.।)
ইবনে আদি রহ. বলেন,
“ولسلام أحاديث صالحة غير ما ذكرته وعامة ما يرويه عَمَّن يرويه عن الضعفاء والثقات لا يتابعه أحد عليه”
আমি এখানে যে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করেছি তা ছাড়াও তার বর্ণিত ভালো হাদিস আছে। তার অধিকাংশ হাদিস যা সিকা ও দূর্বল রাবী থেকে তিনি বর্ণনা করেন সেগুলোর মুতাবায়াত পাওয়া যায়না।-আল-কামেল ফি যুয়াফায়ির রিজাল ৪/৩১২
অর্থাৎ যদি সাল্লামের হাদিসের মুতাবায়াত পাওয়া যায় তাহলে তা গ্রহনীয় হবে।
এই হাদিসের উপর ইমামদের জরাহ :
১. এই হাদিসের উপর যতজন ইমাম শক্ত কালাম করেছেন তা এই সনদের উপর নয়। তা হলো মুসনাদে হারেসীতে এই হাদিসের আরেকটি সনদ আছে, তা হলো,
حدثنا عبدالله بن بكر،حدثني بعض،أصحابنا رجل يقال له إياس،رفع الحديث إلى سعيد بن المسيب،عن سلمان الفارسي….
এই সনদের উপর বদরুদ্দিন আইনী রহ. কালাম করেছেন,
وَلَا يَصح إِسْنَاده، وَفِي سَنَده إِيَاس. قَالَ شَيخنَا: الظَّاهِر أَنه ابْن أبي إِيَاس، قَالَ صَاحب (الْمِيزَان) إِيَاس بن أبي إِيَاس عَن سعيد بن الْمسيب لَا يعرف، وَالْخَبَر مُنكر
‘সনদটি সহিহ নয়। এই সনদে ইয়াস ইবনে আবি ইয়াস আছে।যাহাবী রহ. বলেন, সায়িদ ইবনে মুসাইয়্যাব থেকে তার বর্ণনা মা’রূফ নয়। খবরটি মুনকার।-উমদাতুল কারী ১০/২৬৯
আইনি রহ. যাহাবী রহ. কথাকে যেভাবে নকল করেছেন, তাতে স্বাভাবিকভাবে মনে হয়, যাহাবী রহ. এই হাদিসের মতনকে মুনকার বলেছে। কিন্তু মিজানুল ই’তেদাল সরাসরি মুরাজায়াত করে নিলে এই সংশয় থাকার কোনো সুযোগ নেই। যাহাবী রহ. ইবারত লক্ষ্য করুন,
إياس بن أبي إياس.عن سعيد بن المسيب.لا يعرف أيضا، وخبره منكر
ইয়াস বিন আবী ইয়াস। সে সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যাব থেকে রেওয়ায়েত করে। সেও অপরিচিত রাবী। তার হাদিস মুনকার।-মিজানুল ই’তেদাল ১/২৮২)
হাদিসটি মুনকার। আর তার বর্ণিত হাদিস মুনকার। আশা করি এই পার্থক্যটুকু বুঝতে পাঠকের অসুবিধে হয়নি।
লক্ষ্য করে দেখুন, আইনী রহ. এখানে ইয়াসের হাদিসের ব্যাপারে যাহাবীর হুকুম নকল করছেন যে তার খবর মুনকার। আলি ইবনে যায়েদের হাদিসের উপরে নয়।
২. ইবনে আবি হাতেম রহ. আরেকটি সনদ বর্ণনা করেন,
حدَّثناه الحَسَنُ بْنُ عَرَفَة عَنْ عبد الله بْنِ بَكْرٍ السَّهْمي؛ قَالَ: حدَّثني إِيَاسٌ ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ زَيْدِ بْنِ جُدْعان، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ؛ أنَّ سَلْمان الفارسيَّ قَالَ: خَطَبَنا رسولُ الله صلى الله عليه وسلم آخِرَ يَوْمٍ مِنْ شَعْبان، فَقَالَ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّهُ قَدْ أَظَلَّكُمْ شَهْرٌ عَظِيمٌ، شَهْرٌ مُبَارَكٌ، فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، فَرَضَ اللهُ صِيَامَهُ، وَجَعَلَ قِيَامَهُ تَطَوُّعًا……
এরপর তিনি মন্তব্য করেন,
فقال: هذا حديث منكر؛ غلط فيه عبد الله ابن بكر ؛ إنما هو: أبان بن أبي عياش، فجعل عبدالله بن بكر “بان”: “إياس”
এই হাদিসটি মুনকার। আব্দুল্লাহ বিন বকর এখানে ভুলে আবান বিন আয়্যাশের স্থানে আবান ইবনে আবী ইয়াস উল্লেখ করেছেন।-ইলালে ইবনে আবি হাতেম ৩/ ১১০
এখানেও লক্ষ্য করুন, আবু হাতেম রহ. হাদিসকে মুনকার বলছেন সনদে আবান ইবনে আয়্যাশ থাকার কারনে। আলি ইবনে যায়েদ থাকার কারণ বা অন্যকোনো কারণ উল্লেখ করেননি।
এখন ইমাম যাহাবী ও বদরুদ্দিন আইনী রহ.-র কথানুযায়ী আবান ইবনে আয়াস হোক বা ইমাম আবু হাতেম রহ.-র বক্তব্যনুযায়ি আবান ইবনে আয়্যাশ হোক, তাতে এই হাদিসে কোনো সমস্যা হবেনা। কারণ আলি ইবনে যায়েদ থেকে তার একাধিক ছাত্র এই হাদিসটি রেওয়ায়েত করেন। যাদের মধ্যে সাঈদ ইবনে আবি আরুবাহ (মাহামিলি রহ. ‘আমালি’ ২৯৩ নং হাদিস দ্রষ্টব্য) ও হাম্মাম বিন ইয়াহয়ার (সহিহ ইবনে খুজাইমা ও বাইহাকি রহ.-র শুয়াবুল ইমান দ্রষ্টব্য) মত বিখ্যাত মুহাদ্দিস রয়েছে।
৩. ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন,
رواه البيهقي في (الشعب) من طرق: عن علي بن حجر , بهذا الإسناد. ومن طريق أخرى: عن عبد الله بن بكر السهمي، عن ‌إياس ‌بن ‌عبد ‌الغفار، عن علي بن زيد. والأول أتم ومداره على علي بن زيد، وهو ضعيف، وأما يوسف بن زياد فضعيف جدا، وأما ‌إياس ‌بن ‌عبد ‌الغفار فما عرفته
বাইহাকী রহ. এই হাদিসটি কয়েক সনদে রেওয়ায়েত করেন। একটি হলো আলি ইবনে হুজর থেকে। অপরটি হলো আব্দুল্লাহ ইবনে বকর তিনি ইয়াস ইবনে আব্দিল গাফফার থেকে। হাদিসটির মাদারে সনদ হলো আলি ইবনে যায়েদ, সে দূর্বল। আর ইউসুফ ইবনে যিয়াদ সে যায়ীফ জিদ্দান। আর অপর সনদের ইয়াস, সে কে আমি জানিনা।-ইতহাফুল মাহারাহ ৫/৫৬০
ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এখানে কয়েকটি আপত্তি করেছেন।
ক) আলি ইবনে যায়েদ দূর্বল।
আমরা পিছনে বিস্তারিত আলোচনা করেছি আলি ইবনে যায়েদ হাসান পর্যায়ের রাবী।
খ) ইউসুফ ইবনে যিয়াদ যায়ীফ জিদ্দান।
ইউসুফ ইবনে যিয়াদ অনেক বেশি পর্যায়ের দূর্বল হলেও এই হাদিসটি আলি ইবনে যায়েদ থেকেই একাধিক সনদ পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে এই ইল্লত তেমন শক্তিশালী নয়।
গ) ইয়াস ইবনে আব্দুল গাফফার মাজহুল
ইয়াস মাজহুল হলেও এই হাদিসে মৌলিক কোনো সমস্যা হবেনা। কারণ ইয়াসের তিনজন মুতাবায়াত পাওয়া যায়।
৪. এছাড়া যত মুহাদ্দিস এই হাদিসের উপর কালাম করেছেন তারা সকলেই আলি ইবনে যায়েদ রাবীর কারনে করেছেন। আর উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে আলী ইবনে যায়েদ দুর্বল রাবী নন। হাসান পর্যায়ের রাবী।
এই হাদিসের উপর ইমামদের ইতিবাচক বক্তব্য :
১. ইবনে খুজাইমা রহ. এই হাদিসকে সহিহ বলেছেন । দেখুন, সহিহ ইবনে খুজাইমা ।
শায়খ হাবিবুর রহমান আজমী রহ. ইবনে খুজাইমা রহ.-এর এই তাসহিহকে সমর্থন করেছেন।(৩)
তবে শাস্ত্রীয় বিচারে হাদিসটিকে পারিভাষিক ‘সহিহ’ এই অবস্থান তেমন শক্তিশালী মনে হয় না। আল্লাহু আলাম।
২. হাফেজ মুনজিরি রহ. এই হাদিসকে (عن) শব্দ দিয়ে তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন। (দেখুন, ২/২৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা।)
আত তারগিব ওয়াত তারহিব নামক কিতাবে হাফেজ মুনজিরির কর্মপন্থা হলো, যে হাদিসকে উনি (عن) শব্দ দিয়ে উল্লেখ করবেন তা তার তার নিকট সহিহ অথবা হাসান, বা এর কাছাকাছি।(৪)
মোটকথা হাফেজ মুনজিরির কর্মপন্থানুযায়ী এই হাদিসকে হাসানও বলা যায়। (সকল সনদের সমষ্টির বিচারে এই মতটি দূর্বল নয় তেমন)
৩. আর যদি আমরা হাদিসটিকে যায়ীফও ধরে নেই তাহলে এই হাদিস বর্ণনা করার ক্ষেত্রে কোনো রকম সমস্যা হবেনা ইনশাআল্লাহ। কারন ফাজায়েলে আমলের ক্ষেত্রে এমন দূর্বল হাদিস বর্ণনা করা মুহাদ্দিসেনে কেরামের কাছে কোনো দোষনীয় বিষয় নয়।(৫)
এখানে ইবনে হাজার আসলাকানী রহ.-র একটি বক্তব্য উল্লেখ করা মুনাসিব মনে করছি। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এই হাদিসের উপর আপত্তি করে পরবর্তীতে ইমাম নববীর হাওয়ালায় লেখেন,
قال النووي واستأنسوا فيه بحديث انتهى والحديث المذكور ذكره الإمام في نهايته وهو حديث سلمان مرفوعا في شهر رمضان من تقرب فيه بخصلة من خصال الخير كان كمن أدى فريضة فيما سواه ومن أدى فريضة فيه كان كمن أدى سبعين فريضة في غيره، انتهى
ثم قال ابن حجر : وهو حديث ضعيف أخرجه ابن خزيمة وعلق القول بصحته واعترض على استدلال الإمام به والظاهر أن ذلك من خصائص رمضان ولهذا قال النووي استأنسوا والله أعلم
“একটি নফল আমল একটি ফরজ আমলের সমতূল্য…” ফাজায়েলে রমাজান সম্পর্কে এই প্রসিদ্ধ হাদিসটি যয়ীফ। ইমাম ইবনে খুজাইমা রহ. যদিও হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন কিন্তু ইমামের এই হুকুমের উপর আপত্তি আছে। তবে এই বিশাল ফাজায়েলটি রমাজানের বৈশিষ্টসমূহের একটি। এই জন্য ইমাম নববী রহ. বলেছেন, এই হাদিসটি দলিলের বিচারে শক্তিশালী না হলেও তোমরা তা গ্রহণ করতে পারো। (অর্থাৎ, পরিত্যাজ্য পর্যায়ের নয় এই হাদিস)।-আত-তালখিসুল হাবীর ৩/২৫৭
মোটকথা, ফাজায়েলে রমাজান সম্পৃক্ত প্রসিদ্ধ এই হাদিসটি সনদের বিচারে যয়ীফ। তবে তার মাঝে দুর্নলতা নিতান্ত কম, যা ফাজেয়েলের ক্ষেত্রে বর্ণনাযোগ্য। এবং তা রেওয়ায়েত করতে বা এই হাদিস উল্লেখ করে রমাজানের বিশেষত্ব বলা ও মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে কোনো সমস্যা নেই, যেমনটি ইমাম নববি ও ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেছেন। আল্লাহু আলাম।
.
টিকা :
১] আল-মাতালিবুল আলিয়া’-এর টিকায় শায়খ হাবিবুর রহমান আজমি রহ.-এর এই বক্তব্য নকল করেছেন শায়খ সুলাইমান আল-গাওয়াজি রহ.। দেখুন ‘আল কাফি ফিল ফিকহিল হানাফি’ ২/৫৫২
২] আত তারগিব ওয়াত তারহিব, হাফেজ মুনজিরির ভুমিকা দ্রষ্টব্য
৩] সামনের অন্যকোনো স্বতন্ত্র প্রবন্ধে ‘যায়ীফ হাদিস; জমহুর ওলামায়ে কেরামের অবস্থান’ বিষয় নিয়ে ইনশাআল্লাহ্‌ আমরা আলোচনা করবো।

Facebook Comments

Related posts

তীব্র এই গরম হোক জাহান্নাম থেকে মুক্তির সহজ উপায় | আব্দুল্লাহ বিন বশির

সংকলন টিম

ইসলামের ইতিহাসে সিরাত চর্চার সূচনা এবং মৌলিক সিরাত পরিচিতি | আব্দুল্লাহ বিন বশির

সংকলন টিম

সুন্নাত ও বিদআত-৩ | আল্লামা ইউসুফ লুধিয়ানভী রহ.

সংকলন টিম

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!