আকীদার প্রাথমিক পাঠ : কিছু সরল সমীকরণ । হোযাইফা আওয়াদ

আকীদার-প্রাথমিক-পাঠ

আল্লাহ তা’য়ালার সিফাত এবং ‘সিফাতে খবারিয়্যা’র আলোচনা প্রথম শতকে জটিলতর প্রশ্নের ব্যাপার ছিলো না।তাই সাহাবা,তাবেয়িন এই মাসালাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখেন নি, কিংবা ঐতিহাসিক ভাবে খামবদ্ধও করে যান নি।ফলে তাদের থেকে আমাদের পর্যন্ত এমন বিশাল কিছু পৌছে নি,যার উপর ভিত্তি করে আমরা অথেনটিক্যালি ‘মাযহাবুস সালাফ’ আখ্যা দিতে পারি।

তাদের থেকে যেটা পাই,সেটা কেবল মাত্র নির্দিষ্ট কিছু ‘সিফাতী টেক্সে’র অল্পস্বল্প ব্যাখ্যা মাত্র,যা বিষয়ের ক্লিয়ার ও পরিমিত এপ্রোচ হিশেবে যথেষ্ট নয়।মোটকথা প্রথম শতকের প্রভাবশালী চরিত্রটাই হচ্ছে ‘সুকুত’ তথা নীরবতা।

এবং বহু প্রমাণের মাধ্যমে বলা যায় যে,এই সুকুত তথা নীরবতা ইচ্ছাকৃত কিংবা এমন কোন বাধ্যতামূলক অবস্থান ছিলো না,যার উপর সালাফ একমত হয়ে গেছেন,বরং দাওয়াত ও জিহাদের ময়দানে তাদের স্বাভাবিক জীবনচক্র ও দার্শনিক নানাবিধ বিতর্ক থেকে দূরে থাকার ফলেই এমনটি হয়েছে।

একটা পর্যায়ে আকীদা ও ইলমে কালামের অন্যান্য মাসায়েলের সাথে ‘সিফাতে খবারিয়্যার’ জটিল তর্ক শুরু হয়।সিফাতের নুসুসগুলো বিস্তৃত অধ্যয়ন ও গবেষণা’র ফলে আহলুস সুন্নার তিনটি মত সামনে আসে।

1-তাফউদ,(আল্লার সমীপে পূর্ণ অর্পণ)
2-তা’বীল(ক্ষেত্র বিশেষ ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ)
3-ইছবাত( সিতাফ সাব্যস্ত করতঃ
প্রকৃত ইলমের ব্যাপার আল্লার কাছে অর্পন)

এই তিনটি মাযহাবই নিজ বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র।উসুল,মানহাজ ও যাওয়াবেতের ক্ষেত্রেও প্রত্যেকের বিশেষত্ব আছে।প্রত্যেকেরই লক্ষ লক্ষ রিজাল ও দায়ী আছে।

এই তিনটি মাযহাবের কোনটিই ইসলামের গণ্ডির বাইরের কোনো কিছুর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত নয়,বরং প্রত্যেকে ভাষাগত,শরীয়াহর কানুন ভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিশালী সব প্রমাণ সাথে নিয়ে ‘সত্য’ অনুসন্ধানে কসরতে করে-ই গত হয়েছেন। তাদের মধ্যে যা হয়েছে,ইজতিহাদের নীতিমালা সাপেক্ষে ইসলাম সেগুলোকে ন্যাচারাল ডিসএগ্রিমেন্ট হিশেবে বৈধতা দিয়েছে।এর ন্যায্যতা ও দাওয়াফে’ খোদ ইসলামের বিস্তৃত ইলমি অধ্যায়ে মজুদ আছে।এসব মাযাহিব এবং ফিকহী মাযাবিহের মাঝে অনেকাংশেই বৈপরীত্য অনুপস্থিত।

বহুযুগ থেকে এসকল মাযাহেবকে আমলে নিয়ে আইম্মাগণ নুসুসে ইসলামীর বৃত্তে থেকে ইজতিহাদ করে গেছেন,এবং এখনো দু চার জন করে যাচ্ছেন।অতএব, একাট্টা কাউকে পূর্ণ রূপে সঠিক কিংবা একেবারেই ভুল বলার অবকাশ থাকছে না।বরং শরীয়ার নীতিমালা হলো,মুজতাহাদ ফিহি বিষয়ে প্রত্যেকেই ক্ষেত্র বিশেষ ‘সঠিক ও ভুলের’ সম্ভবনা বাকি রেখেই সামনে অগ্রসর হবেন।এজন্য শরীয়ার বোদ্ধা পাঠককে সতন্ত্র ও চৌকশ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এগুতে হয়,ফলে সে সঠিক ব্যাখ্যাদাতাকে সঠিক,ও ভুল ব্যাখ্যাদাতাকে মা’যুর ঠাওরাতে পারে।
খাত্তাবী,বায়হাকী,নববী, ইবনে হাজার সহ বহু আইম্মাদের এ বিষয়ে লিখিত গ্রন্থ আমাদের জন্য সঠিক মানহাজ বুঝার ক্ষেত্রে বড় সহায়ক।কারণ ফিকহী মাযাহেবের ক্ষেত্রে তাদের কেউ কারো অসম্ভব রকমের মুকাল্লিদ হওয়া সত্ত্বেও এসব মাসালায় এসে ‘সত্য’ অনুসন্ধানে নিজের অবস্থানও পরিবর্তন করেছেন কখনো সখনো।

এই কথাগুলো সামনে রেখে কয়েকটি কথা:-

**
সালাফের সকল নুসুস সামনে রাখলে একটা ব্যাপার অত্যন্ত স্পষ্ট হয়,তা হলো- সিফাতের ক্ষেত্রে এ সকল টেক্সট দ্বীনের কোনো মৌলিক নীতি কিংবা রোকন বুঝার ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করে না।কিংবা আমলের এমন কোন ক্ষেত্রও এর মাঝে পড়ে না,যার মাঝে ইসলাম ও মুসলিম উম্মার বড় ধরনের কোনো ফায়েদা নিহিত।উপরন্তু সিফাতের জটিল নুসুস গুলো সম্পর্কে সম্যক জানাশোনা না থাকা,কিংবা গত হয়ে যাওয়া ইখতিলাফের মারপ্যাঁচ না বোঝা ঝুঁকিপূর্ণ কোনো বিষয় নয়।কারণ,সাহাবা কেরাম এর প্রতি বিশেষ নজর দেন নি,এসবের দিকে কাউকে দাওয়াতও দেন নি,মানুষকে শেখান নি,কিংবা এগুলো দিয়ে কারো ঈমানের পরিক্ষাও নেন নি।তাদের অনুকরণই মূল কথা।

দেখুন,সূরা কলামের ৪২ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
يوم يكشف عن ساق ويدعون إلى السجود فلا يستطيعون ‏‏
[سورة القلم : الآية 42]
এখানে ‘সাক’- এর ব্যাখ্যা নিয়ে সাহাবাদের মাঝে মতভেদ আছে।হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযীব এর মতে এর অর্থ -‘যেদিন প্রচণ্ড ভয়াল ও বিপর্যয়কর অবস্থা হবে’
কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযীঃ বলছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা,তার মতে এখানে উদ্দেশ্য হলো-‘যেদিন আল্লাহ তায়ালা তার সাক মুবারক তথা পায়ের একাংশ উন্মোচিত করবেন,বান্দারা সেজদায় লুটিয়ে পড়বে’
খোদ সহীহ বুখারিতে হুজুর সাঃ থেকে সরাসরি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ এর অনুরূপ ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে।
এ সত্ত্বেও কিন্তু সাহাবিরা একে অপরকে দোষারোপ করেন নি,গালি দেন নাই,বেদাতী বানান নাই।তাকফীর তো
অনেক দূরের ব্যাপার।

ব্যাপারটা এমনও নয় যে,এসকল নুসুসের ক্ষেত্রে সর্ব অবস্থায় আমরা একই প্রক্রিয়া অবলম্বন করবো,কিংবা পরস্পর-সদৃশ ব্যাখ্যা হাজির করবো,কারণ- এসব ক্ষেত্রে কোনো কোনো নস কতয়ী দলীল তথা অকাট্য ভাবে এসেছে,আবার কোনটা এসেছে যন্নী তথা প্রবল কিংবা সাধারণ ধারণাকে ভিত্তিমূল করে।কিছু নসের আবার কনটেক্সের বিচারে অর্থ ভিন্ন করতে হয়,কোনটার তাবিলের ক্ষেত্রে সালাফের ঐক্যমত্য, আবার কোনটার ক্ষেত্রে মতভিন্নতা পাওয়া যায়।সর্বপোরি সিফাতে বারীর সকল নসকে এক কাতারে নিয়ে এসে একাট্টা তাবীল,বা তাফয়ীযের আশ্রয় নিয়ে ব্যাপারটাকে অতি সরলিকরণেরও কোন সুযোগ নাই।

যেমনি ভাবে চোখ বন্ধ করে শুধু মাত্র যুক্তি কাজে লাগানোও শুদ্ধ না,কারণ যুক্তি যদিও উপলব্ধির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ, তবে সব ক্ষেত্রেই যে তা বিশুদ্ধ ফলাফলে পৌছবে এমন তো নয়।ঠিক তদ্রুপ যৌক্তিক জরুরতের ভিত্তিতে ক্ষেত্র বিশেষ কোরান সুন্নার বাহ্যিক নুসুসের ব্যাখ্যার ব্যাপারটাও সবার কাছেই স্বীকৃত। তবে এখতেলাফটা হলো এই জরুরত নির্ণয় ও এর পরিমাণ নিয়ে।এ কারণে দেখা যাচ্ছে-

‘فإذا سويته ونفخت فيه من روحي’
(যখন আমি তাকে সুষমরূপে তৈরী করেছি,(আমার) রহু তার মাঝে ফুঁকে দিয়েছি)

এ আয়াতের ক্ষেত্রে সালাফের সবাই এক বাক্যে তাবিল তথা ব্যাখ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন।ইমাম কুরতুবী থেকে শুরু করে ইবনে তাইমিয়া -ইবনুল কায়্যিম পর্যন্ত সকলেই আয়াতের ‘রুহে’র ব্যাখ্যা করছেন সামাঞ্জস্য বিধান করতে।

এবার ইসবাত নিয়ে কিছু কথা-

ইবনে তাইমিয়া রহঃ যে তাফউদের ব্যাখ্যা ‘ইসবাত’ দিয়ে করেছেন,সেটা প্রকৃত পক্ষে জটিলতার-ই জন্ম দেয়।খোলাসা হলো,সর্বাংশে ‘তাফউইদ’ তথা আল্লার কাছে পুরো আয়াতের ইলমকেই সপে দেওয়া ক্রমবর্ধমান চিন্তাগত বিকাশের সাথে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে অক্ষমতা কিংবা অসহায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ। এর একাধিক বিপদজনক লক্ষণের একটি হলো,অতিরিক্ত ‘তাফউইদের'(পূর্ণ সমর্পণ) দ্বারা কখনো কারো কাছে কোরানকে ধাধা ও মন্ত্রপূত কবচ মনে হতে পারে।পথনির্দেশক ও আলোর কিতাব নয়!
(ইবনে তাইমিয়া এ ব্যাক্ষা-ই দিয়েছেন)

কিন্তু সর্বাংশে ‘তাবিল’ তথা ব্যাখ্যার পক্ষেও ইবনে তাইমিয়া নন।কারণ তার মতে- এতে নুসুসের প্রকৃত গতি ব্যাহত হয়,অর্থ গত সামঞ্জস্য বিধানে ঝামেলা সৃষ্টি হয়।

বরং ইবনে তাইমিয়া রহঃ তো খুব চিৎকার করে একথা বলেছেন যে-

إن القرآن كله ظاهر وواضح، وكذالك السنة المطهرة، وأنه لا يجوز صرف هذه النصوص عن ظاهرها،

‘কোরানের পুরোটাই স্পষ্ট,এমনিভাবে সুন্নাতে মুতাহহারও,এসকল নুসুস বাহ্যিক অর্থের বিপরীতে প্রবাহিত করা ঠিক নয়’

ইবনে তাইমিয়া রহঃ-কে কেউ যেন চেপে না ধরতে পারেন,সে জন্যও তিনি স্পষ্ট বলে গেছেন-

‘أنا نؤمن بهذه النصوص بلا كيف وبلا تشبيه’

‘আমি এসকল নুসুসের উপর ঈমান রাখি,কোনো প্রকার অবস্থা কিংবা সৃষ্টি-সদৃশতা’র আকীদা থেকে মুক্ত হয়ে’।

স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখলে তো মনে হয় ইবনে তাইমিয়ার ব্যাখ্যা ঠিক আছে,কিন্তু মজার ব্যাপার হলো-ইবনে তাইমিয়া ‘তাফউইদ'(পূর্ণ অর্পণ) থেকে যে কারণে বাচতে চেয়েছেন,ঘুরে ফিরে ঠিক সেখানেই এসে দাড়িয়েছে তার ফলাফল!তিনি ইসবাতের নামে এমন কিছু বলেছেন মাঝে মাঝে,যা তার কথিত পুথি কিংবা মন্ত্রমূত কবচের মতই মনে হবে।😆

– আল্লাহ আরশে আছেন।”
– তিনি নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন।”
-মুত্তাকী বান্দাদের নিকটবর্তী হন।”

এগুলো সব ইবনে তাইমিয়া রহ এর ভাষ্য মতে হাকীকি অর্থে।এ সত্ত্বেও নাকি আরশ আল্লাহর সত্ত্বা থেকে খালী হয় না,কারণ আল্লার উর্ধাগমণ, অবতরণ ও নিকটবর্তী হওয়া বান্দার মত নয়,বরং বৈসদৃশ!
এজাতীয় দ্বিমুখী তথ্য ও ব্যাখ্যা ইবনে তাইমিয়ার কিতাবে প্রচুর,শুধু মাত্রা ‘আল আকিদাতুল ওয়াসেতিয়্যা’ ও ‘আল আকিদাতুত তাদমুরিয়্যা’ পড়লেই হবে না।এসব নিয়ে তার সকল ফতোয়া দেখলে বুঝা যাবে যে,তিনি ভালো কিছুর উদ্দেশ্যে উসুল বানিয়েছেন,কিন্তু হিতে কেমন বিপরীত হয়েছে।তবে আমরা একথা বলতে পারি যে,ইবনে তাইমিয়ার ব্যাখ্যা সোজাসাপ্টা ও অনেকটা সরল ছিলো,কিন্তু ফলাফল অত্যন্ত বৈপরীত্যপূর্ণ হয়েছে।

মোট কথা-
এই জটিলতার সমাধান হলো,প্রত্যেক নসের মাকসাদ নির্ণয়ের চেষ্টা করা,এর বাইরের অতিরিক্ত ঝামেলায় না জড়ানো।কোরান সুন্নাহর প্রত্যেক নস’ কোনো না কোনো হিকমাহকে মাকসাদ বানিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে,অতএব এই মাকসাদ পর্যন্ত পোছার জন্য চিন্তার ব্যাবহার একটা সীমা পর্যন্ত শুধু বৈধ নয়,জরুরীও বটে।বেশীরভাগ সময়েই এই মাকসাদ থাকে একেবারে স্পষ্ট। সাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন কোনো মুসলিমকে যদি আমরা জিজ্ঞেস করি,(সে গ্রাম্য বেদুইন-ই হোক না কেন)- যে,

-فإنك بأعيننا
(তুমি আমারর চোখের’ সামনে)
-كل شيء هالك إلا وجهه
(তার চেহারা(সত্ত্বা) ব্যাতিত সব কিছুই ধ্বংস হবে)
-بل يداه مبسوطتان، ينفق كيف يشاء
(তার হাত প্রশস্ত, যেভাবে তার মর্জি,সেভাবেই তিনি
খরচ করেন।)

এসকল আয়াতের অর্থ কী!খুব গভীর চিন্তা না করেও সে উত্তর দিতে পারবে।কারণ এখানে মাকসাদ খুবই স্পষ্ট।অতএব, মাকসাদ স্পষ্ট হওয়ার পরে আমার অতিরিক্ত এইসব বিতর্কে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন থাকছে না যে,
আল্লার কি ‘আ’উন’ আছে?থাকলে সেটা কি হাকিকী অর্থে বহু বচনের জন্য ব্যাবহার হয়েছে,নাকি বহুবচন দিয়ে দ্বিবচন উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে-ইত্যাদি!

এসব আলোচনা সামনে রেখে আমরা বলতে পারি,ইবনে তাইমিয়া রহঃ সহ এই ঘরানার লোকেরা ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করাকে যেমন মারাত্মক ভয়াবহ মনে করেছেন,ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়।ঠিক তদ্রুপ মুতাকাল্লিমিনদের মধ্যে কারো কারো যে তাবিলের তাক্ললুফি অধিক কসরত করতে দেখা গেছে,সেটাও অনুচিত। ঠিক এ জায়গায় এসেই উলামায়ে দেওবন্দের গুরুত্ব স্পষ্ট হয় যে,তারা একাট্টা আশায়ারী কিংবা মাতুরিদুও নয়,আবার তাদের কোনো নির্দিষ্ট টেক্সটকে তাফউইদ করার কারণে আসারি কিংবা সালাফী বলারও অবকাশ নেই।এই ব্যাপারটা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহঃ স্পষ্ট করে ফয়যুল বারীতে বলে গেছেন।মুফতি শফী ছাহেব ও তাকী ছাহেবও জোর দিয়ে বলেছেন।এজন্য ‘আল কাওলুত তামাম’ কিতাবটির মুকাদ্দিমা দেখা যেতে পারে।

১০

আমরা এ কথা মোটেও অস্বিকার করি না যে, সালাফের কারো কারো ক্ষেত্রে এসব মাসালার ইখতিলাফে বড় ধরনের না ইনসাফী দেখা গেছে।কিংবা একাট্টা নিজের মতকে চাপিয়ে দিতে যেয়ে অপজিট জামাতকে তাবদী’ কিংবা তাকফীরও করে ফেলেছেন।না-ইনসাফি সব সময়-ই পরিত্যাগ যোগ্য।চাই সেটা আল্লামা ফখরুদ্দিন রাযীর প্রতি ইবনে শাইখুল ইসলাম তাইমিয়ার হামলা হোক,হাফেয যাহাবির প্রতি ইমাম তাজুদ্দিন সুবকীর হামলা হোক,কিংবা শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার উপর শায়খ যাহেদ কাওসারীর হামলা হোক।কোনো অবস্থাতেই সালাফের কোনো অসম্পূর্ণ কথা,কিংবা অশোভন আচরণ,আমাদের জন্য আদর্শ হতে পারে না।আমরা জানি,মানি,এবং দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি যে,তারা এসব ‘হামিয়্যাতে দ্বীনি’ কিংবা দ্বীনি মূল্যবোধের খাতিরেই করেছিলেন।তবে তাদের কারো কোনো কথার দোহাই দিয়ে যেন,আমরা সিফাতের মাসালায় আহলুস সুন্নার কাউকে তাকফীর না করে বসি।

তবে হ্যা,একথা তো অবশ্যই সত্য যে,ইবনে তাইমিয়া রহঃ-র কিছু অবস্থান আসলেও আপত্তিজনক, তবে সে ক্ষেত্রে রদের ভাষা যেন হয় ইনসাফ পূর্ণ।দারুল উলুম দেওবন্দে আমাদের এক উস্তাদের মুখে শুনেছি-‘ইবনে তাইমিয়া অষ্টম শতকের মানুষ হলেও,তার ইলম তাকে তৃতীয়-চতুর্থ শতকের দস্তুর মুজতাহিদে ইমামের শান দিয়েছে’।

১১

আরেকটা দুঃখজন ব্যাপার হলো,আমাদের দেশের সালাফিদের এপ্রোচটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।তাদের দায়িত্বশীলদের কারো কারো কথা শুনে মনে হয় যে,আকীদার ক্ষেত্রে সত্যের মাপকাঠি কেবল মাত্র ইবনে তাইমিয়া কিংবা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব ও তাদের অনুসারীরাই।আর বাকি সবাইক কোনো মতে তাদের কৃপায় ‘মুসলিম’ নাম নিয়ে বেচে আছেন।দ্বিতীয়ত তাদের পক্ষ থেকে আক্রমণ শুরু না হলে আমাদের ভাইয়েরা অবশ্যই এসব বিষয় নিয়ে এখন লিখতেন না।যেখানে এর চেয়ে শতগুন বেশী গুরুত্ব রাখে,এমন বিষয় গুলো মজলুম।

আল্লাহ আমাদের সকলকে মৃত্যু পর্যন্ত হকের উপর অবিচল রাখুন।

——————
গ্রন্থপঞ্জী –
১- আস সিফাতুল খবারিয়্যা-মুহাম্মাদ আয়্যাশ আল কুবাইসি।
২-আল কাওলুত তামাম,বি ইসবাতি আন্নাত তাফয়ীদ মাযহাবান লিস সালাফিল কিরাম-সাঈফ আলী আসরী।
৩-তাফসীরে কুরতুবী
৪কিতাবুস সুন্নাহ -আবু আব্দিল্লাহ ইবনে মানদাহ
৫-কিতাবুত তাওহীদ-ইবনে খুযাইমাহ
৬-আল আকিদাতুত তাদমুরিয়্যা-ইবনে তাইমিয়া
৭-মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া
৮-তারিখুন মুযাজুন লিল ফিকরিল আরবী-ড. হুসাইন মু’নাস
৯-দারুল উলুম দেওবন্দ-মাদরাসাতুন,ফিকরিয়্যাতুন,তাওজীহিয়্যাতুন
উবাইদুল্লাহ আসআদী

Facebook Comments