সংকলন
ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি
জীবনী

মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধির কথামালা-১ | মওলবি আশরাফ

কোরআন সর্বকালীন সর্বজনীন

পবিত্র কোরআন একটি বৈপ্লবিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাওয়াত দেয়। এই বৈপ্লবিক ব্যবস্থায় সারা দুনিয়ার ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ শামিল। কেয়ামতের আগ মুহূর্তেও মুসলমানদের কোনো দল যদি সেই ব্যবস্থা কায়েম করে, তখনও তারা মুসলমানদের প্রথম প্রজন্মের মতো সফলতার মুখ দেখবে। এটা কোরআনের প্রভাব, কোরআনের মোজেজা, এই প্রভাব কোনো ব্যক্তিবর্গ ও নির্দিষ্ট যুগের জন্য নয়, বরং কেয়ামত অবধি প্রত্যেক যুগের জন্য সমান কার্যকর।

খ্রিষ্টীয় দুনিয়া কোরআনের এই প্রভাবকে সাদামাটাভাবে দেখার জন্য এবং বিপথগামী করার জন্য সদা তৎপর। প্রসিদ্ধ খ্রিষ্টান ঐতিহাসিক ও গবেষক জরজি জায়দান তো একদম পরিষ্কারভাবে লিখেছেন— ‘হজরত আবু বকর ও হজরত ওমরের (রা) খেলাফত তো ঘটনাক্রমে কিসমতে লেগে গেছিল।’ মানে তিনি বলতে চান, মুসলমানদের প্রথম প্রজন্মের বিশ্বব্যাপী জয়জয়কার কোরআনি শিক্ষার প্রভাবে নয়, বরং এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যার ফলে এই ঘটনা ঘটেছিল, দ্বিতীয়বার আর এমন ঘটার সম্ভাবনা নাই। এসব কথা ছাড়াও কোরআনের প্রভাবকে ছোট করে দেখানোর জন্য তারা নানা কিসিমের তত্ত্ব-অস্ত্র ব্যবহার করে।

 

মুসলমানদের অনেক গবেষক ও তাত্ত্বিকও একই সুরে কথা বলে। তারা বোঝে বলুক কিংবা না বোঝে, খ্রিষ্টীয় প্রোপাগান্ডা ঠিকই মুসলমানদের মস্তিষ্কে এই ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছে যে, কোরআন অনুযায়ী বৈপ্লবিক ব্যবস্থা কেবল আল্লাহর রসুল এবং কেবলই আল্লাহর রসুলের মতো ব্যক্তিত্বের পক্ষেই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। যদি ভবিষ্যতে কখনো এমন ব্যক্তিত্ব জন্ম নেন, তখনই কেবল সম্ভব হবে বিপ্লব করা। আর একারণেই মুসলমানদের একটি বড় দল ইমাম মাহদির অপেক্ষায় হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে।

কোরআন পড়তে হবে বোঝেসমঝে

সাহাবায়ে কেরাম একদিকে কোরআন পড়তেন, আরেকদিকে কার্যত বাস্তবায়ন করতেন। প্রথমে দশ আয়াত পড়তেন, এবং তা কার্যত বাস্তবায়ন করতেন, তারপর আবার দশ আয়াত পড়তেন, আবার তা কার্যত বাস্তবায়নে লেগে যেতেন, এভাবেই ধারাবাহিক কার্যক্রম বজায় রাখতেন। স্রেফ পড়া আর বোঝাই উদ্দেশ্য বানাননি। ইবন কাসির যেমন তার কিতাবে উল্লেখ করেন, ‘ইবন মাসউদ বর্ণনা করেন, আমাদের মধ্যে কেউ দশ আয়াতের বেশি পড়তেন না, যদ্দিন না ওই আয়াতের অর্থোদ্ধার করতেন এবং তা কার্যত বাস্তবায়নে আনতেন।’

কোরআন সবার বোধগম্য করেই নাজিল করা হয়েছে

বড়ই দুঃখজনক কথা, আমরা মনে করি কোরআন বুঝব না। কোরআনের কত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আছে, বিভিন্ন তফসিরের কিতাবে কত জটিল জটিল বিষয় লেখা আছে, মুফাসসিরদের গবেষণা ও মতামত পড়লেই কেবল কোরআন বুঝব। কিন্তু এই ‘মনে করা’ বাস্তবিক নয়। এইসব তফসিরগুলো যদি নিখাদ ও কোরআনের হক আদায় করে লেখা হতো তাহলে এই ‘মনে করা’ মেনে নিতে আপত্তি থাকত না। কিন্তু গজব কাণ্ড হলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট ও মতবাদের প্রভাবে কোরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে পরিবর্তন করা হয়েছে, এমনকি এমন অনেক কিছুই যুক্ত করা হয়েছে যেসবের সাথে আল্লাহর বাণীর বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নাই। সাধারণ মানুষ ওই সবকেই কোরআন মনে করে। কোরআনের প্রকৃত শিক্ষার সাথে ওই সব ব্যক্তিগত মতের কোনোপ্রকার লেনাদেনা নাই। আল্লাহ হেফাজত করুন।

কোরআন কামেল আখলাকের কারিগর

কোরআনি শিক্ষা এমন— কেবলমাত্র কোরআনের প্রভাবে আরবের মূর্তিপূজক জাহিল মরুবাসীরা অল্পকয়েক বছরে সারা দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহওয়ালা, সবচেয়ে বেশি সভ্য, সবচেয়ে বেশি সংস্কৃতিবান ও সবচেয়ে শক্তিশালী জাতিতে রূপ নেন। এই কোরআনি শিক্ষা এতদ্রুত তাদের মধ্যে ‘কামেল’ আখলাক তৈরি করে যে, একদিকে তারা যেমন দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিধর সাম্রাজ্যগুলোকে তাদের সামনে মাথানত করতে বাধ্য করে, অন্যদিকে তারা আল্লাহ ইবাদত-বন্দেগিতে সর্বোচ্চ মর্যাদা হাসিল করেন। পারস্য সাম্রাজ্যের সাথে কাদেসিয়ার ময়দানে যুদ্ধকালে এক পারসিক জেনারেল বলেছিলেন, ‘আমরা এমন লোকদের সাথে মোকাবেলায় পারব না, যারা রাতে ফেরেশতা থাকেন আর দিনে হয়ে যান বাঘ’।

আমরা কেন পরাজিত

আমাদের ধর্মগ্রন্থ তো এমন যে, বিধর্মীরাও পড়ে এখান থেকে ফায়দা নিতে পারে। যে-কেউ এই কোরআনের প্রভাব গ্রহণ করবে সে হবে পৃথিবীর সবচেয়ে সংস্কৃতিবান, সবচেয়ে সভ্য-ভব্য, সবচেয়ে সফল ও সবচেয়ে শক্তিশালী। খোদ আল্লাহও কোরআনে তা-ই বলেছেন। এমনকি এই সত্য প্রমাণিত হতেও আমরা দেখেছি। সেই একই কোরআনই তো এখনও আমরা পড়ি, তাহলে কেন আমরা অসুস্থ, কেন আমরা পিছিয়ে পড়া, কেন আমরা এত কমজোর?

মূল কোরআন থেকে দূরে সরে যাওয়াই অধঃপতনের কারণ

এই বিষয়টি স্পষ্ট যে কোরআনের ওপর চিন্তাভাবনা এক জিনিস আর তফসির-কেন্দ্রিক ভাবনাচিন্তা আরেক জিনিস। কোরআনের মূলানুগ পাঠ ছেড়ে দেওয়ায় অথবা সঠিক পদ্ধতিতে না পড়ার ফলে আমরা কোরআনের মোজেজা উপলব্ধি করা থেকে যে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছি, আশা করি তা দেখতেই পাচ্ছেন। কোরআনে স্বয়ং আল্লাহ পাক যেভাবে কোরআন পড়ার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তা এড়িয়ে গিয়ে ভুল পদ্ধতি অনুসরণ করলে কীভাবে প্রকৃত ফলাফল পাব? যতদিন আমরা মূল কোরআন থেকে দূরে থাকব, ততদিন আমরা কেবল অধঃপতিত হতেই থাকব। অন্যান্য জাতির যেই পরিণতি, আমাদেরও ঠিক তা-ই হবে। আমাদের স্বভাব-চরিত্রেও বিজাতীয় ছাপ স্পষ্ট। আমরা তো অন্তরে অন্তরে মুর্দা। যদি কোনো জাতি জিন্দা হয়, তাহলে তাদের প্রত্যেক সদস্য বীরত্ব, সাহসিকতা, দৃঢ়তা, প্রগতিশীলতার গুণ ধারণ করে আত্মোৎসর্গের মতো মহান কাজে পিছ-পা হয় না। আর যদি জাতি মুর্দা হয়, তাহলে তাদের লোকজন কাপুরুষ, হিম্মতহারা, সস্তা মানসিকতার আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার মতো স্বভাবচরিত্রের হয়। জাতির অধঃপতন লোকজনের মাঝে এমনভাবে প্রভাব ফেলে যে, মহামূল্য অর্থে ব্যবহৃত শব্দও বিকৃত হয়ে সস্তা অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

মরহুম নওয়াব মুহসিনুল মালিক একবার বলেছিলেন, যখন মুসলমানদের অন্তর জিন্দা ছিল, তো তখন ওয়াদা বা কথা দেওয়ার একটাই অর্থ ছিল যে সেটা পূর্ণ করা হবে। যখন তাদের অন্তর মরে গেল, তখন ওয়াদার হরেক রকমের অর্থ হয়ে গেল। আগে বলা হতো— ‘মুসলমানের এক কথা এক জবান, তার জানজীবনের চেয়েও মহান’। তারপর বলা হতো — ‘ওয়াদা করার চেয়ে ওয়াদা রক্ষা করা কঠিন’! আর এখন বলা হয়— ‘ওয়াদা করার কী প্রয়োজন, আমাকে বিশ্বাস করেন না ভাই’!

কোরআনের শাসন ইনসাফের শাসন

যেই সমাজে কোরআনের ভিত্তিতে শাসন কায়েম হবে, সেখানে একজন ব্যক্তিও ক্ষুধার্ত থাকবে না। কেউ ভাত-কাপড় আর আবাসের অভাবে থাকবে না। আর না কেউ অশিক্ষিত বা বেকার থাকবে।

কোরআনই মানবতার প্রকৃত রক্ষক

‘আমাদের ওপর জান-জীবন দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত জাতির সামনে একথা প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক যে, মানবতা রক্ষায় কোরআনের চেয়ে সঠিক ও যথাযথ কোনো পরিকল্পনা মানুষের হাতে নাই। তারপর আমাদের ওপর আবশ্যক যে, যে-লোক কোরআনের ওপর ইমান এনেছে তার দলকে সংগঠিত করা, সে কোন জাতি বা পরিবারের সাথে সম্পর্ক রাখে সেটা দেখার বিষয় নয়। আমরা তার অন্য কোনো আমলদারি কিংবা আকিদাবিশ্বাস দেখব না, স্রেফ কোরআনের ওপর বিশ্বাসটাই দেখব। এমন দলই বিরুদ্ধবাদীর ওপর বিজয়ী হবে, কিন্তু তাদের বিজয় প্রতিশোধস্পৃহা থেকে বা হিংসাত্মক হবে না, বরং হবে হেদায়েত ও মঙ্গল কামনা থেকে, ঠিক যেভাবে পিতা পুত্রকে শাসন করে। এরপর যে-কেউ এই নিয়মের বিরুদ্ধে খাড়া হবে, গোটা মুসলমানি ঐক্যতা ধ্বংস করে দেওয়া তার পক্ষেই কেবল সম্ভব।’

কোরআন দুনিয়া আখিরাত উভয়ের কথা বলে

জীবন সম্পর্কে বস্তুবাদী ধারণা একপেশে ধারণা, একটি দিকের কথাই বলে কেবল, কিন্তু যথাযথ ও পরিপূর্ণ ধারণা আল্লাহর এই কালামে প্রকাশ পায়— রব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওফিল আ-খিরাতি হাসানা’— হে আল্লাহ, আমাকে দুনিয়াতে কল্যাণ দাও, আখেরাতেও কল্যাণ দাও।(সুরা বাকারা : ২০১) এই ধারণা বস্তুর প্রতিভাস ও প্রকৃতরূপ দুটোকেই শামিল করে, জীবনের জন্য দুটোর প্রয়োজনই সমান প্রমাণ করে।

কোরআন আমাদেরকে একটি ইনকিলাবি কর্মপন্থা দেয়

আমি যদি ঠিকঠাক বোঝে থাকি, আমার সমঝ বলে— কোরআন আমাদেরকে একটি ইনকিলাবি কর্মপন্থা দেয়। তাহলে এই নতিজায় পৌঁছানো কঠিন কিছু নয় যে মুসলমানরা কোনো কালেই ইনকিলাব থেকে গাফেল হতে পারে না। এবং কোরআনের ইনকিলাবি ধারণা যেই লোক এড়িয়ে চলে সে প্রকৃত ইসলামকে ধারণ করে বলা যায় না, বরং সে তো ইহুদি-খ্রিষ্টানদের মতোই কেবল কিতাবধারী। তবে কোরআনে নির্দেশিত ইনকিলাব তারাই কেবল সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে যারা কোরআন বোঝে এবং ইনকিলাবের এরাদা রাখে।

শাহ সাহেবের রুহানি ফয়েজ

ভারত থেকে যখন আমি আফগানিস্তানে যাই, আমার সামনে অনেক নতুন নতুন পরিস্থিতি হাজির হয়। তারপর যখন রাশিয়া যাই, দেখি এ সম্পূর্ণ আলাদা এক পৃথিবী। যেই সমস্ত ধ্যানধারণার ওপর সারাটা জীবন পার করেছি, চোখের সামনে সব ভেঙে পড়তে দেখেছি, দেখেছি তারচেয়ে জোরালো ও সপ্রাণ ধ্যানধারণা এই অঞ্চলের মানুষ ধারণ করে। তুর্কিতেও এমন কমবেশি হয়েছে। এই পুরোটা সময়ে একবারের জন্যও ধর্মের মৌলিক বিশ্বাস থেকে আমার মন বিন্দুমাত্র নড়েনি, এবং আমার ধর্মীয় বিশ্বাস রাশিয়ানদের ধর্মহীনতার যৌক্তিকতার উপরে জয়ী ছিল। আর এই সবই শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবির রুহানি ফয়েজ ছিল, শুধুমাত্র আধ্যাত্মিকতার কারণে যার ইনকিলাবি চিন্তা-ফিকির ওইসব দর্শনের চেয়ে প্রমাণিত শক্তিশালী।

শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি বলেন

শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি দুনিয়া ও আখেরাতে সাফল্য লাভের জন্য চারটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য অর্জনের শর্ত দিয়েছেন :
(১) তহারাত বা পবিত্রতা।
(২) ইখবাত বা পরমসত্তার সাথে মিলনের নিবিষ্টতা।
(৩) সামাহাত বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত রাখবার শক্তিমত্তা।
(৪) আদালাত বা ইনসাফ কায়েম করা।

এই চার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য বা কেন্দ্র হলো ‘ইনসাফ কায়েম করা।’ আর কোনো সমাজে ততক্ষণ পর্যন্ত ইনসাফ কায়েম করা সম্ভব নয় যতক্ষণ না শ্রমিকের ওপর শ্রমমূল্যের চেয়ে বেশি শ্রম চাপিয়ে দেওয়ার নিয়ম ভেঙে চুরমার করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া না হয়। একারণেই কোরআনের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য ছিল রোমসম্রাট ও পারস্যরাজের তখত মিসমার করে কোরআনি ব্যবস্থা কায়েম করা, যাতে সারাবিশ্বের সব জাতি এই অসাম্যের মুসিবত থেকে মুক্তি পায়।

দর্শন হতে হবে জীবন ঘনিষ্ঠ

যেই মতবাদ অথবা দর্শন অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান দেয় না, তা না পরিপূর্ণ দর্শন, না সঠিক মতবাদ।

আগে ইনসাফ কায়েম প্রয়োজন

যদি মানুষের জীবনকে পেট ও পিঠের প্রয়োজন থেকে শুরু করে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ পর্যন্ত একই ধারা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে যেই দর্শন তৈরি হবে তাকে পরিপূর্ণ বলা সম্ভব। এইজন্য মানুষের জন্য সামগ্রিকভাবে এমন এক অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করা জরুরি, যা তার সামগ্রিক প্রয়োজনীয়তা পূরণ নিশ্চিত করবে। সুতরাং যখন মানুষ জৈবিক চাহিদা থেকে নিশ্চিন্ত হবে, তার কাছে ভাত-কাপড়ের ফিকির করার বাইরেও সময় থাকবে, তখনই গিয়ে উচ্চস্তরের মাস্তিষ্কিক কাজে মনোনিবেশ করার ফুরসত পাবে। যেই চিন্তাদর্শন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারসাম্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাকে একটি পরিপূর্ণ জীবনদর্শন বলা ভুল হবে না।

হুকুমত অর্থ
হুকুমত অর্থ হুকুম করা নয়, বরং ইনসাফ ও সাম্যতা কায়েমের সুযোগ পাওয়া। মুসলমানদের ধ্বংসের কারণ হলো নিজেদের শাসনপদ্ধতি অমুসলিমদের পদ্ধতির দিকে টেনে নেওয়া।

চাই সংঘবদ্ধ কাজ

ছোট থেকে ছোট পাঁচজন কী তিনজন করে দল তৈরি করতে হবে। যদি এতে সম্ভব না হয় এরচেয়ে কম সংখ্যা নিয়ে হলেও কাজে নামতে হবে। মানে শয়তানের দল যেভাবে কাজ করছে, তার মোকাবিলায় অবশ্যই সংঘবদ্ধ হয়ে আল্লাহর দলের কাজ করে যেতে হবে।

জোশের সাথে হুঁশ লাগবে

শুধুমাত্র জোশ দিয়ে কামিয়াবি হাসিল করা যায় না। কেবল জযবা মনজিলে মাকসুদে পৌঁছাবার গ্যারান্টি দিতে পারে না। বরং এরসাথে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা ও ফিকির করারও প্রয়োজন আছে।

সুদ ধ্বংসের মূল

মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি কোরআন থেকে এই আয়াত পাঠ করেন—

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَاْکُلُوا الرِّبٰۤوا اَضْعَافًا مُّضٰعَفَۃً ۪ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ لَعَلَّکُمْ تُفْلِحُوْنَ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ খেয়ো না, এবং আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩০) তারপর বলেন, মুসলমানদের রাজত্ব এইজন্য ধ্বংস হয়েছে যে তারা সুদের ওপর সুদে ঋণ নিয়েছিল, এর ফলে ভিনদেশিদের ব্যবসার ছলে মুসলমানদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, এবং রাজত্ব দখল করে শাসনব্যবস্থা ধ্বংসের মওকা মিলেছিল।

আধ্যাত্মিকতার সংজ্ঞা

মুসলমানদের প্রথম প্রজন্মে আধ্যাত্মিকতা সর্বমানবের মুক্তির জন্যে চর্চিত হতো। এরপর মুসলমানরা যখন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ল, তখন আধ্যাত্মিকতার চর্চা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যায়। শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি সুফিবাদের যেই সংজ্ঞা দিয়েছেন, অর্থাৎ আধ্যাত্মিকতা মানে আমিত্বকে জাগিয়ে তোলা, আর যখন মানুষের আমিত্ব জেগে ওঠে তখন সে কোনো রকমের ভয়ডর ছাড়া তার ওপর আপতিত সব অনাচার-অবিচার বীরবিক্রমে রুখে দেয়, তারপর নীতিহীন আদর্শ আর অন্যায় আইনের ভিত তীব্র আক্রমণে ভেঙেচুরে তছনছ করে ফেলে, অবশেষে গড়ে তোলে জীবনের নতুন বুনিয়াদ— এটাই প্রকৃত সংজ্ঞা। যদি এই কিসিমের আধ্যাত্মিকতাকে জনজীবনে প্রয়োগ ঘটাতে পারি তাহলে উপমহাদেশের ইতিহাস আবার গৌরবময় হয়ে উঠবে।

কোরআনি নীতি ছাড়া গতি নাই

যে জাতি কোরআনের নীতির ওপর থাকবে না তারা কখনো কামিয়াব হবে না। আল্লাহর রসুলের সঙ্গী-সাথীরা বিশ্বব্যাপী কোরআন অনুযায়ী নীতিনৈতিকতা প্রচারের পরিকল্পনা করেন, এবং পঞ্চাশ বছরে মানে মাত্র অর্ধশতকে তারা কামিয়াবি হাসিল করেন। এখনো যদি কোনো মুসলমান নীতিনৈতিকতার প্রচারে নামে, তাহলে সে কখনোই কামিয়াব হবে না যদি কোরআন অনুযায়ী সে পরিকল্পনা না হয়।

Facebook Comments

Related posts

মাওলানা রাশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ. : ‌কিছুগুণ, কিছু বৈ‌শিষ্ট্য | ইফতেখার জামিল

সংকলন টিম

ওয়াররাকদের বিচিত্র জীবন | ইমরান রাইহান

সংকলন টিম

এক নজরে পালনপুরী রহ. | শারাফাত শরীফ

সংকলন টিম

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: