সমকালীন জনজীবনে সালাফদের প্রভাব: পর্ব -৩ | ইমরান রাইহান

salaf

আলেমদের প্রতি শাসকদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রমাণ মেলে আলেমদের সাথে তাদের আলাপচারিতা থেকে। শাসকরা যখন আলেমদের সাথে কথা বলতেন, তখন তাদের পরিবারের খোঁজখবরও নিতেন। আমর বিন উবাইদ যখনই আবু জাফর মানসুরের দরবারে প্রবেশ করতেন, আবু জাফর মানসুর তার পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিতেন এবং নাম ধরে ধরে কে কেমন আছে তা জিজ্ঞেস করতেন। (১)

উমাইয়া শাসকদের মধ্যে উমর বিন আবদুল আযিয ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি নিজে যেমন নেককার ছিলেন, তেমনি নেককারদের সম্মানও করতেন। প্রায়ই তিনি আলেমদের উপহার পাঠাতেন। একবার তিনি মুহাম্মদ ইবনু সিরিন ও হাসান বসরির কাছে উপহার পাঠান। অবশ্য মুহাম্মদ ইবনু সিরিন উপহার গ্রহণ করলেও হাসান বসরি ফিরিয়ে দেন। (২)

ইবরাহিম নাখয়ি একবার হুলওয়ান শহরের আমিরের সাথে দেখা করলে আমির রাজকীয় বাহনে চড়ান এবং ফেরার সময় এক হাজার দিরহাম উপহার দেন। (৩)

আলেমদের কেউ কেউ নিজেদের সমস্যার কথা শাসকদের সামনে তুলে ধরতেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শাসকরা এই সমস্যা সমাধান করে দিতেন। হিশাম বিন উরওয়া ইবনুয যুবাইর একবার আবদুল মালেক ইবনু মারওয়ানের কাছে নিজের কিছু ঋনের কথা জানান। ঋনের পরিমান ছিল ১০ হাজার দিরহাম। আবদুল মালেক ইবনু মারওয়ান এই ঋন পরিশোধ করে দেন। (৪)

ইবনে জুরাইজ একবার আমির মাআন বিন যায়েদাহর সাথে সাক্ষাত করে নিজের কিছু ঋনের কথা বলেন। আমির তার ঋন পরিশোধ করে দেন। ইবনে জুরাইজ আমিরের মেহমানদারিতে তার গৃহে কয়েকদিন অবস্থান করেন। এরপর তিনি ইচ্ছা করেন হজ্বে যাবেন। বিদায়কালে আমির তাকে ১৫০০ দিরহাম উপহার দেন। (৫)

উমর বিন আবদুল আযিয বিভিন্ন সময়ে আলেমদের অনেক ঋন পরিশোধ করেছেন। (৬)

শুধু আলেমরাই শাসকদের কাছে যেতেন, ব্যাপারটি এমন নয়। বরং শাসকরাও প্রায়ই আলেমদের কাছে আসতেন। কখনো তাদের গৃহে এসে সাক্ষাত করতেন, কখনো তাদের দরসে কিংবা ওয়াজের মজলিসে এসে বসতেন। আতা ইবনু আবি রবাহ দরস দিতেন মসজিদুল হারামে। একদিন তার দরসে আসেন উমাইয়া খলিফা সুলাইমান বিন আবদুল মালিক। সামনের দিকে জায়গা না পেয়ে তিনি আতা ইবনু আবি রবাহর পেছনে বসে পড়েন। দরসের এক পর্যায়ে তিনি আতা ইবনু আবি রবাহকে হজ্বের বিভিন্ন মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে থাকেন। আতা ইবনু আবি রবাহ বসেছিলেন তার দিকে পিঠ দিয়ে। তিনি সে অবস্থাতেই সব প্রশ্নের জবাব দেন। সুলাইমান বিন আবদুল মালিকের দিকে ফিরেও তাকাননি তিনি। (৭)

তবে শাসকদের আগমনে আলেমরা ব্যতিব্যস্ত হতেন না। তারা তাদের স্বাভাবিক দরস চালিয়ে যেতেন। শাসকদের আগমন তাদের কাছে ছিল একজন ছাত্রের আগমনের মতই। মাকহুল শামির ঘটনা থেকে এর প্রমাণ মেলে। একবার তার দরসে উপস্থিত হন ইয়াযিদ বিন আবদুল মালেক। খলিফাকে দেখে ছাত্ররা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা নড়াচড়া করা খলিফাকে সামনের দিকে জায়গা করে দিতে চায়। মাকহুল এ দৃশ্য দেখে বলেন, ব্যস্ত হয়ো না। তার যেখানে সুবিধা বসুক। সে বিনয় শিখুক। (৮)

আলেমদের অনেকেই শাসকদের কাছে আসা যাওয়া অপছন্দ করতেন। তারা বলতেন কোনো প্রয়োজন হলো শাসকরা নিজেরাই আসুক আমাদের কাছে। হাম্মাদ ইবনু সালামাহর মনোভাবও ছিল এমন। একবার বসরার আমির মুহাম্মদ বিন সুলাইমান কোনো কারনে তাকে ডেকে পাঠান। তিনি জবাব দেন, আমরা এমন আলেমদের পেয়েছি যারা কারো কাছে যেতেন না। যদি আপনার কোনো দরকার থাকে তাহলে আপনি আমার কাছে আসুন। যা বলার বলুন, যা জিজ্ঞেস করার করুন। শর্ত হলো আপনি একা আসবেন। আপনার লোকজন সাথে আনতে পারবেন না।

মুহাম্মদ বিন সুলাইমান পত্র পেয়ে নিজেই রওনা হলেন তার সাথে দেখা করতে। হাম্মাদ বিন সালামাহর ঘরের সামনে পৌছলে তিনি চাকরকে বললেন, আমিরকে বলবে একা প্রবেশ করতে। আমির একাই ঘরের ভেতর প্রবেশ করেন। দুজন প্রাথমিক কুশল বিনিময়ের পর কথা শুরু করেন। দীর্ঘ সময় অবস্থান শেষে আমির বিদায় নেন। বিদায়ের আগে তিনি হাম্মাদ ইবনু সালামাহকে চার হাজার দিরহাম উপহার দিয়েছিলেন, কিন্তু হাম্মাদ তা ফিরিয়ে দেন। (৯)

যদিও আলেমদেরকে শাসকরা অনেক সম্মান করতেন তবুও আলেমরা শাসকের কাছ থেকে পার্থিব কোনো সুবিধা নিতে অনাগ্রহী ছিলেন। শাসকের সাথে অতিরিক্ত মেলামেশাকে তারা নেতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখতেন। নিজেদের সকল বিষয়ে তারা একমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা করতেন।

একবারের ঘটনা। উমাইয়া খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালেক প্রবেশ করেন কাবার চত্বরে। সেখানে তার সাথে দেখা হয় সালেম বিন আবদুল্লাহ বিন উমরের সাথে। সালেমকে তিনি বলেন, আপনার কোনো প্রয়োজন থাকলে বলুন। সালেম বলেন, আমি আল্লাহর ঘরে বসে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে কিছু চাইতে লজ্জা করি। হিশাম চুপ হয়ে যান। কিছুক্ষন পর সালেম মসজিদে হারাম থেকে বের হলে তিনিও বের হন। তিনি সালেমকে বলেন, এখন তো আমরা বাইরে এসেছি এবার বলুন। সালেম বললেন, কী বলবো? দুনিয়ার কোনো প্রয়োজন নাকি আখিরাতের প্রয়োজন? হিশাম বললেন, দুনিয়ার প্রয়োজন। সালেম বললেন, যিনি দুনিয়ার মালিক তার কাছেই তো আমি কখনো দুনিয়া চাইনি, তাহলে যে এর মালিক নয়, তার কাছে কী করে চাইবো? (১০)

এ ধরনের নির্লিপ্ততা ছিল সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের মধ্যেও। একবার তিনি মসজিদে নববীতে নিজের দরসে বসা ছিলেন। এ সময় মসজিদে প্রবেশ করেন ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক। তিনি সাঈদের কাছে এসে থামেন। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, শায়খ আপনি কেমন আছেন? সাঈদ সালামের জবাব দিয়ে বলেন, আমিরুল মুমিনিন কেমন আছেন? খলিফা বলেন, আলহামদুলিল্লাহ। সাঈদ আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মুগ্ধতা নিয়ে ফিরে আসেন ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক। (১১)

শাসকদের সাথে দেখা হলেও সত্য উচ্চারণ করতে সাধারণত তারা ভয় করতেন না। একবার ইবনু আবি জিব, আবু জাফর মানসুরের সাথে দেখা করে মক্কার গভর্নরের সমালোচনা করেন। গভর্নর সে সময় পাশেই উপস্থিত ছিলেন। নিজেকে বাঁচাতে তিনি বলেন, খলিফা আপনি তাকে নিজের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। আবু জাফর মানসুর বললেন, আমার সম্পর্কে আপনার মত কী? ইবনু আবি জিব বললেন, এটা বলতে চাই না। আমাকে রেহাই দেন। খলিফা বললেন, বলুন। ইবনু আবি জিব বলেন, আপনি আপনাকে একজন জালিম ও দাম্ভিক হিসেবেই জানি।

এই কথা শুনে খলিফার প্রহরী রবি দৌড়ে এসে ইবনু আবি জিবকে ধরে ফেলে। কিন্তু খলিফা ধমক দিয়ে বলেন তাকে ছেড়ে দাও। এরপর তিনি ইবনু আবি জিবকে ৩০০ দিনার উপহার দেন। (১২)

আলেমদের সাথে শাসকদের সম্পর্কের আরেকটি ধরণ ছিল পত্র যোগাযোগ। প্রায়ই তারা একে অপরকে পত্র পাঠাতেন। আলেমদের লিখিত পত্রে থাকতো নানা বিষয়ে নসিহত ও পরামর্শ। অপরদিকে শাসকরা তাদের পত্রে বিভিন্ন বিষয়ে সমাধান জানতে চাইতেন আলেমদের কাছে।

ইমাম আউযায়ি বসবাস করতেন সিরিয়ায়। সেখান থেকে তিনি বাগদাদে একাধিক পত্র পাঠান, খলিফা আবু জাফর মানসুরের কাছে। এসব পত্রে তিনি বিভিন্ন সময়ে বন্দিদের মুক্তির সুপারিশ করেন। আবু জাফর মানসুর তার এসব পত্র গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন এবং নানা বিষয়ে তার পরামর্শ চান। (১৩)

লাইস ইবনু সাদ একাধিক পত্র পাঠান আবু জাফর মানসুরের কাছে যাতে তিনি মিসরের প্রশাসনিক কাঠামোর সমালোচনা করেন। (১৪)

টীকা

১। আল মুন্তাজাম, ৮/৬০।

২। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৪/৬১৫।

৩। প্রাগুক্ত, ৪/৫২৩।

৪। আল মুন্তাজাম, ৮/১০১।

৫। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৬/৩৩৫।

৬। আল মুন্তাজাম, ৭/৫২। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/২০৩।

৭। আল মুন্তাজাম, ৭/১৬৬।

৮। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/১৬২।

৯। আল মুন্তাজাম, ৮/২৯৫।

১০। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৪/৪৬৬। আল মুন্তাজাম, ৭/১১৪।

১১। আল মুন্তাজাম, ৬/৩০০।

১২। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৭/১৪৪।

১৩। হিলয়াতুল আউলিয়া, ৬/১৩৫। আল জারহু ওয়াত তাদিল, ১/১৮৭।

১৪। ওফায়াতুল আইয়ান, ৪/১৩১।

Facebook Comments