মাওলানা রাশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ. : ‌কিছুগুণ, কিছু বৈ‌শিষ্ট্য | ইফতেখার জামিল

songkolon
আজ রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির একশো ষোলতম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন, উপমহাদেশে হাদিস-আকিদা-ফিকাহ-তাসাউফে তাঁর গুরুত্ব অপরিসীম। এই লেখায় তাঁর কিছু অবস্থান-অভিজ্ঞতা তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
ক) ধার্মিকতা ও বিনয়
রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি দেওবন্দে অবস্থানকালে বাইশ বছরে শুধু একবার তাকবিরে ওলা ছুটে যায়। তাতে তিনি দীর্ঘক্ষণ মনখারাপ করে মসজিদে বসে থাকেন। গাঙ্গুহি সাধারণ জনতার কাছে নিজের জন্য দোয়া চাইতেন। চিঠির সাথে লেখতেন, আমি কে, আমি কত নাদান। লোকজনকে বলতেন, আমি বিশেষ কেউ না। তোমরা আমার সম্পর্কে সুধারণা পোষণ করো, আল্লাহ তোমাদের সুধারণায় আমাকে বিবেচনা করবেন বলে আশা রাখি।
হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মাক্কি তাঁকে খেলাফত প্রদান করতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, হজরত আমি এর উপযুক্ত নই। আমার কাছে কে আসবে? হাজি সাহেব ধমক দেন, ‘আমি যা বলছি তা করো, আমার কথা শুনো, তোমার কাছে মুরিদ আসলে ফিরিয়ে দিয়ো না।’
খ) ইলমের গুরুত্ব
আশরাফ আলী থানবি ছাত্রজীবনে রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির কাছে তাসাউফের বাইয়াত হতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। গাঙ্গুহি আবেদনের উত্তরে বলেন, যতদিন ছাত্রজীবনে আছো, ততদিন পর্যন্ত বাইয়াতের ইচ্ছা শয়তানের ওয়াসওসা।
থানবি বলেন, আমি তখন গাঙ্গুহির এমন অবস্থানের মর্ম বুঝিনি। এখন ধরতে পারি, শয়তান মানুষকে কখনো খারাপ পথে পথভ্রষ্ট করে, কখনো আপেক্ষাকৃত গুরুত্বহীন কাজে মনোযোগী করে তৃপ্তি লাভ করে। ছাত্রজীবনে বাইয়াতের চেয়ে ইলম চর্চায় নিমগ্ন থাকাই বেশী গুরুত্বপূর্ণ।
গ) হকের অনুসরণ
রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি একটা ফতোয়া প্রদান করেন। পরবর্তীতে আশরাফ আলী থানবি তাঁর সাথে দ্বিমত করে বিপরীত ফতোয়া দেন, দলীলও পেশ করেন। গাঙ্গুহির কাছে দ্বিমতের কথা পৌঁছে। তিনি থানবির মতকেই সঠিক বলে আখ্যা দেন, প্রদত্ত ফতোয়া থেকে রুজু’ করেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয়, শিক্ষক সমতুল্য হওয়া সত্ত্বেও থানবি গাঙ্গুহির ফতোয়ায় দ্বিমত করতে দ্বিধা করেননি। পাশাপাশি গাঙ্গুহিও দলিল ও যুক্তি দেখে আগের মত থেকে সরে আসেন। এর থেকে বুঝা যায়, আকাবিররা মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতেন, একে বিচ্ছিন্নতা-বাড়াবাড়ি হিসেবে দেখতেন না। হকের অনুসরণে কোন দ্বিধা রাখতেন না।
ঘ) তাসাউফের সংস্কার
তাসাউফের ভক্ত লোকেরা আল্লাহ প্রেমে দেওয়ানা হয়ে অনেকে নির্জনবাসে চলে যান, লোকালয় ছেড়ে দেন। কিছু লোক রশিদ গাঙ্গুহির কাছে বনে চলে যাবার অনুমতি চাইতে আসলেন। গাঙ্গুহি বললেন, আমাদের বুজুর্গরা বনে যাবার অনুমতি দেননি। থানবি এই অবস্থানের ব্যাখ্যায় বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নির্জনবাসের ক্ষতিটাই হয় বেশী। মানুষ নির্জনবাসের মাধ্যমে প্রসিদ্ধি কামনা করে, আত্মপ্রেমে ভুগে, সাধারণ জনতাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। এসবের প্রেক্ষিতে গাঙ্গুহি নির্জনবাসের অনুমতি দেননি। জনতার মধ্যে থেকে ধর্ম পালন ও প্রচারে গুরুত্ব আরোপ করেন।
ঙ) বিদআতের সংজ্ঞা ও প্রয়োগ
তাসাউফের প্রচুর বিষয়ে একসময় বিদআত ঢুকে যায়। যেসব বিষয় প্রশিক্ষণের অনুষঙ্গ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, মানুষ সেসবকেই একসময় উদ্দেশ্য মনে করতে থাকে। আগের দৃষ্টান্তে স্পষ্ট, গাঙ্গুহি নির্জনবাসে নিষেধ করেছেন। অথচ ঐতিহাসিকভাবে আমরা জানি, নির্জনবাসে মানুষের আত্মশুদ্ধি হতে পারে। বুজুর্গরা জনকোলাহল পছন্দ করতেন না। তবে কালক্রমে নির্জনবাস পরিণত হতে পারে ক্ষতিকর প্রক্রিয়ায়, তাই গাঙ্গুহি নির্জনবাসে নিষেধ করেন।
মিলাদ মাহফিলে স্মরণ করা হয় নবীজিকে, এটি কোনভাবেই দোষনীয় নয়। তবে কালক্রমে এতে প্রযুক্ত হয় অনেক অপসংস্কৃতি, মানুষ একে মনে করতে থাকে ধর্মীয় বিধিনির্দেশ, তাই আলেমরা মিলাদ মাহফিল থেকে বিরত থাকতে বলেন। যদিও এটি প্রচলিত হয়েছিল উপকারী প্রক্রিয়া হিসেবে, কালক্রমে ক্ষতিকর অনুষ্ঠানে রুপান্তরিত হওয়ায় আলেমরা একে বিদআত বলতে থাকেন। থানবি বলেন, আমার মনে প্রশ্ন ছিল। যেসব প্রক্রিয়া জনসাধারণের জন্য ক্ষতিকর, সেগুলোতে আলেমরা অংশগ্রহণ করলে অসুবিধা কোথায়, তারা তো ভালোটাই করবেন, ক্ষতিকর উপাদান থেকে বেঁচে থাকবেন?
রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি থানবিকে ব্যাখ্যা করেন, আলেমরা মিলাদ মাহফিলে ক্ষতিকর বিশ্বাস-কাজে জড়াবেন না। তবে তাদের কাজে জনতা বিদআতে উৎসাহিত হবে। মোটাদাগে এটি দেওবন্দ ও বেরলবি ধারার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য। প্রথমোক্তরা তাসাউফের কোন প্রক্রিয়া ক্ষতিকর উপাদানে পরিণত হলে বাদ দিতে বলেন, শেষোক্তরা বলেন জনসচেতনতার কথা। অন্যদিকে আহলে হাদিস সম্প্রদায় নবীজির যুগে চর্চিত হয়নি, এমন সমস্ত প্রক্রিয়া-সংস্কার-তৎপরতাকেই বিদআত বলে আখ্যা দেন।
চ) বিরোধীদের বিষয়ে
বেরলবি ও দেওবন্দিদের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। মৌলবি আহমদ রেজা খান রশিদ গাঙ্গুহিসহ অনেককে কাফের ফতোয়া দিয়ে বসে। অনেকে রশিদ গাঙ্গুহিকে উত্তর দেবার জন্য জোর করতে থাকেন। তিনি বলেন, উত্তরে কোনকিছু হবে না। তিনি মনে করতেন, এভাবে তিক্ততা-বিরোধ আরও বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলতেন, মানুষ যতটা বাদ-বিবাদে লেগে থাকে, ততটা যদি আল্লাহ আল্লাহ করতো, তবে কত উপকার হত।
থানবি লেখেন, কখনো রশিদ গাঙ্গুহি আহমদ রেজা খানকে শত্রু আখ্যা দেননি, শত্রুতামূলক কোন কথা বলেননি। শেষদিকে আহমদ রেজা খান কঠিন রোগে আক্রান্ত হন, গাঙ্গুহির কোন কোন মুরিদ আনন্দ প্রকাশ করতে থাকেন। গাঙ্গুহি তাদেরকে ধমক দিয়ে বলেন, কারো বিপদে আনন্দ করতে হয় না, তোমার নিজের তকদিরে কী লেখা আছে, তুমি নিজে জানো?
দেওবন্দিদের সাথে আহলে হাদিসদের বিরোধও চরম আকার ধারণ করে। তিনি তাদের প্রতিও কঠোরতা দেখাননি। লোকজন তাঁর কাছে সালাফি নেতা মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব ও নাজির হুসাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তিনি কখনো উত্তর দেন, আমি তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। একবার উত্তর দেন, মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত। তাদের অনেকের মধ্যে প্রান্তিকতা আছে। তবে মোটাদাগে আমাদের ও তাদের আকিদা একই। কিছু পার্থক্য আছে, সেগুলো প্রায়োগিক; বিশ্বাসগত নয়।
ছ) ফিকাহ-হাদিস
কাসেম নানুতুবি নয়, হাদিস ও ফিকাহের ক্ষেত্রে রশিদ আহমদ গাঙ্গুহিই দেওবন্দি ধারার প্রধান ব্যক্তিত্ব। প্রথমোক্তজন মুনাজারা-বিতর্কে দক্ষ ছিলেন বেশী, নিজেকে সেখানেই নিয়োজিত করেছিলেন। নানুতুবি দারুল উলুম দেওবন্দের নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষক ছিলেন না। রশিদ গাঙ্গুহি কর্মজীবনের শুরু থেকেই সিহাহ সিত্তাহ পাঠদানে নিয়োজিত হন। দেওবন্দের শুরুর দিকে যদিও তিনি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেননি, তবে দেওবন্দের ছাত্ররা তাঁর কাছে গিয়ে হাদিসের তালীম লাভ করতো। কাসেম নানুতুবির মৃত্যুর পরে তিনি একাধারে হাদিস, ফিকাহ ও মাদরাসা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেওবন্দি ধারার লাখ লাখ ছাত্রের প্রায় সবার হাদিসের সনদ তাঁর মাধ্যমে দেহলবি পরিবারের সাথে যুক্ত হয়।
ভারতে মুসলিম শাসনের পতনের প্রেক্ষিতে আলেমদের ওপর বিশেষ দায়িত্ব অর্পিত হয়। তারা ফতোয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করেন। দেওবন্দে রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ফতোয়ার চর্চা শুরু হয়। কাসেম নানুতুবি গাঙ্গুহিকে বলতেন যুগের আবু হানিফা, থানবিও এমন বিশ্বাস পোষণ করতেন। আনোয়ার শাহ কাশ্মীরির দৃষ্টিতে গাঙ্গুহি ছিলেন ফকিহুন নাফস, যিনি রুচিগতভাবে ধর্মীয় ব্যাখ্যা বুঝতে সক্ষম। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, গাঙ্গুহির ফতোয়া সংকলন করা হয়নি। মৃত্যুর আগে তাঁর দৃষ্টিশক্তি কমে যায়, পরবর্তীতে সংকলিত ফতোয়া নিরীক্ষণের সুযোগ পাননি। শেষদিকের ফতোয়াগুলো নিজে লিপিবদ্ধ করেননি। তবে এসব জটিলতা সত্ত্বেও বলা যায়, দেওবন্দি ফতোয়া-ধারার তিনি প্রধান পুরুষ।
রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি একইসাথে দুটি লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। ফিকহি মাজহাব গ্রহণে বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি করতে নিষেধ করেন। মাজহাবের তাকলিদকে আহলে হাদিসদের একাংশ শিরিকি বলে আখ্যা দিত, তিনি এর খণ্ডন করেন, ‘আল্লাহ বলেছেন, জ্ঞানীদের অনুসরণ করো।’ এই অনুসরণই হল প্রচলিত তাকলিদ। অনেক আহলে হাদিস বলত, মাজহাবের অনুসরণ অপ্রয়োজনীয়। তিনি এর খণ্ডন করে বলেন, জনসাধারণের জন্য নির্দিষ্ট মাজহাবের অনুসরণ করাই বিশেষ উপযোগী, নয়ত তারা জটিলতায় পড়বে, পাশাপাশি অনির্দিষ্ট তাকলিদকেও হারাম মনে করতেন না। গাঙ্গুহি মাজহাব অনুসরণে বাড়াবাড়ি করতেও নিষেধ করতেন। অতিপ্রয়োজনে অন্য মাজহাব গ্রহণের অনুমতি দিতেন, হাদিসের বাহ্যিক অর্থে মাজহাবের মত ছেড়ে দেওয়াকে প্রয়োজনীয়/দোষনীয় মনে করতেন না। পাশাপাশি আহলে হাদিসদের প্রতি বিরক্ত হলেও তাদেরকে নিন্দামন্দ করার বিরোধী ছিলেন।

Facebook Comments