শায়খ নাজমুদ্দিন কুবরা | ইমরান রাইহান

শায়খ নাজমুদ্দিন কুবরা

৬১৮ হিজরী।

সমরকন্দ থেকে ধেয়ে আসছে চেঙ্গিজ খানের বাহিনী। উদ্দেশ্য খাওয়ারেজম সাম্রাজ্যের রাজধানী (বর্তমান উজবেকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত আরজেঞ্চ শহর) আক্রমন করা। সুলতান জালালুদ্দিন খাওয়ারেজম শাহ জিহাদের ডাক দেন। অল্পদিনেই একটি বাহিনী গঠিত হয়ে যায়।

যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল, এই সময়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠে। কুতলুগ খান নামে একজন আমির সুলতানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকে। সে সুলতানের ভাই কুতবুদ্দিনকে প্ররোচনা দিয়ে বলে, আপনিই এই সাম্রাজ্যের প্রকৃত উত্তরাধিকারী। জালালুদ্দিন অন্যায়ভাবে আপনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছে। আপনি নিজের সম্মান বুঝে নিন। পুরো শহরে এই প্রচারনা চলে। এভাবে কুতলুগ খান নিজের পক্ষে একটি দল বানিয়ে ফেলে। এই দলটি সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

এই সংবাদ সুলতানের কানেও আসে। এখন তার সামনে দুটি পথ খোলা। হয় তিনি নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন অথবা কোন সমাধান বের করে তাতারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এগিয়ে যাবেন। চাইলে সুলতান প্রথম পথ অবলম্বন করে বিদ্রোহ দমন করতে পারতেন, তখন তার সেই সামর্থ্য ছিল। কিন্তু সুলতান নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে চাইছিলেন না।

আবার একইসাথে রাজধানীর প্রতিরক্ষাও ছিল গুরুত্বপূর্ন। সবদিক বিবেচনায় তিনি এক বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত নিলেন, ইতিহাসে যার নজির বিরল। তিনি ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে রাতের আধারে মাত্র তিনশো সৈন্য নিয়ে গোপনে শহর ছেড়ে পূর্বদিকে নাসা শহরের পথ ধরলেন। তার বাহিনী পড়ে রইলো রাজধানীতেই , তাতারীদের প্রতিরোধ করার জন্য। একইসাথে তিনি নিজের ভাইয়ের সাথে লড়াই করা থেকে বিরত রইলেন, আবার একইসাথে রাজধানীর প্রতিরক্ষার জন্য নিজের বাহিনীও দিয়ে আসলেন। পথে পদে পদে বিপদের আশংকা ছিল, কারন তাতারীদের ছোট ছোট দল তখন বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এসব দলের মুখোমুখি হলে সুলতানের এই ছোট দলটি টিকতেই পারবে না, কিন্তু তিনি এসবের পরোয়া করলেন না।

সুলতান শহর ছেড়ে দিলেন। শহরে রইলেন তার ভাই কুতবুদ্দিন। এদিকে এগিয়ে আসছে তাতারী বাহিনী। কুতুবুদ্দিনের ব্যক্তিত্ব সুলতান জালালুদ্দিনের ধারেকাছেও ছিল না। সমরবিদ্যায়ও তিনি ছিলেন অপটু। তাতারী বাহিনী যতই কাছে আসছিল তিনি ততই আতংকিত হচ্ছিলেন। শেষমেশ তিনি পরিবার ও গয়নাগাটি নিয়ে শহর ছেড়ে নাসার পথ ধরলেন। কুতবুদ্দিন শহর ত্যাগের তিনদিন পর তাতারী বাহিনী শহর অবরোধ করে। শহরে তখন সুলতান আলাউদ্দিনের দুই পুত্রের কেউই নেই। আছেন কয়েক হাজার জানবাজ মুজাহিদ। যাদের ভেতরে সুলতান জালালুদ্দিন জিহাদের স্পৃহা জাগ্রত করে দিয়েছেন। এই মুজাহিদরা তাতারীদের বিরুদ্ধে লড়তে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল। তারা তাতারীদের বিরুদ্ধে লড়তে থাকে। প্রায় পাঁচ মাস পর্যন্ত তাতারীরা এই শহরে প্রবেশ করতেই পারেনি।

আরজেন্স শহরে তখন বসবাস করতেন শায়খ নাজমুদ্দিন কুবরা রহিমাহুল্লাহ। বিখ্যাত সুফী বুজুর্গ। তাতারী হামলা শুরুর কিছুদিন আগে তিনি তার মুরিদদেরকে বলেছিলেন, পুর্ব দিক থেকে আগুন আসছে। মুসলিম উম্মাহর উপর এর চেয়ে বড় বিপর্যয় আর আসেনি।

চেঙ্গিজ খানের কানে শায়খের সুনাম সুখ্যাতি পৌছেছিল। সে শায়খকে একটি আশ্চর্য পত্র লিখে। সে শায়খকে বলে, আমি আপনার কথা অনেক শুনেছি। আমি আপনাকে সম্মান করি। আপনি আপনার দশজন মুরিদ নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যেতে পারেন। আমি আপনাকে নিরাপত্তা দিলাম। জবাবে শায়খ বলেন, এখানে আমার মুরিদরা থাকে। তাদের ছেড়ে গেলে আমি আল্লাহর কাছে কী বিচার দিব? এরপর চেঙ্গিজ খান এক হাজার লোকের নিরাপত্তা দিতে চায়। শায়খ এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, আমি এখানেই থাকছি। আমি তোমাদের সাথে লড়বো।

চেঙ্গিজ খানের অবরোধ পাঁচ মাস দীর্ঘ হয়েছিল। এরপর তাতারীরা শহরে প্রবেশ করতে থাকে। শায়খ নাজমুদ্দিন কুবরা তার মুরিদদের ডেকে বলেন, সবাই চলো। তাতারীদের বিরুদ্ধে জিহাদে ঝাপিয়ে পড়ো। শায়খ তার কক্ষে যান। তার পীরের দেয়া খিরকাহ পরে নেন। এক হাতে নেন পাথরভর্তি থলে। অন্য হাতে তীর। শায়খ বাইরে এসে তাতারীদের বিরুদ্ধে তীর ছুড়তে থাকেন। আবার কখনো তিনি পাথর নিক্ষেপ করছিলেন। তার তীরের আঘাতে কয়েকজন তাতারী সেনা নিহত হয়। হঠাত একটি তীর এসে শায়খের বুকে লাগে। শায়খ মাটিতে পড়ে যান। তিনি আকাশের দিকে মুখ তুলে বলেন, আল্লাহ আমি আপনার উপর সন্তুষ্ট।

তাতারীদের পতাকাবাহী এক সেনা শায়খের দিকে এগিয়ে আসে। শায়খ আচমকা উঠে তার উপর হামলা পড়েন। তার পতাকা টেনে নেন। তাতারী অনেক চেষ্টা করেও পতাকা ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়নি। এ অবস্থায় শায়খ ইন্তেকাল করেন। শায়খের ইন্তেকালের পরেও তার হাত থেকে পতাকা টেনে নেয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে তাতারীরা পতাকাটি কেটে ফেলে। শায়খকে রিবাতাহ এলাকায় দাফন করা হয়।[1]

মৃত্যুকালে শায়খের বয়স ছিল ৭৮ বছর। তিনি ৫৪০ হিজরীতে জন্মগ্রহন করেন। তার সম্পর্কে ইমাম যাহাবী লিখেছেন, তিনি ইস্কান্দারিয়া, নিশাপুর ও হামাদান সফর করে হাদিসের জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি ছিলেন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সত্য প্রকাশে আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পেতেন না। তিনি শাফেয়ী ফিকহের অনুসারী ছিলেন। বারো খন্ডে কুরআনুল কারিমের তাফসির করেছেন।[2]

[1]শাজারাতুজ জাহাব ফি আখবারি মান জাহাব, ৭ম খন্ড, ১৪২ পৃষ্ঠা– ইবনুল ইমাদ।

[2]তারিখুল ইসলাম ওয়া ওফায়াতুল মাশাহিরি ওয়াল আলাম, ৪৪ খন্ড, ৩৯৩ পৃষ্ঠা– হাফেজ শামসুদ্দিন যাহাবী।

Facebook Comments