আদাবুল ইলম (ইলমের আদাব) পর্ব-১ | আব্দুল্লাহ আল মামুন

ilm
সাধারণত সব কিছুরই ধণাত্মক ও ঋণাত্মক প্রভাব থাকে, থাকে অনেক সুবিধা ও আফাত (আপদ)। ইলমের ক্ষেত্রেও তাই। আজকাল আমাদের অনেকের মাঝেই যেই ব্যধি পরিলক্ষিত হচ্ছে, যেখানে সেখানে ইলমী আলোচনা করা আর যাকে তাকে ইলম বন্টন করা, যার তার সাথে ইলমী বাহাস ও মুনাজারা করা। এই রোগ থেকে আমি অধমও একদম মুক্ত নই। তাই নিজের ইসলাহের (সংশোধনের) জন্য এই কথাগুলো বলা। এতে যদি আমি সহ অন্যেরও ফায়দা হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা!
ইমাম খত্বীব আল বাগদাদী রহ. তাঁর কিতাব ‘আল জামে লি আখলাকির রাউই ওয়া আদাবিস সামি’-তে একটি অধ্যায় কায়েম করেছেন যার নাম –
‘كراهة التحديثِ لمن لا يَبتغيهِ، وأنَّ من ضَيَاعهِ بذلُه لغيرِ أهليهِ’
অর্থাৎ, যারা (ইলমের গভীরতা অর্জনে) আগ্রহী নয় তাদের সাথে (ইলমী) আলোচনা করা অপছন্দনীয় এবং অযোগ্যকে ইলম প্রদান করা তা ধ্বংস করার অন্তর্ভুক্ত!
সুতরাং ইলমী আলোচনার স্থান, যাদের নিকট আলোচনা করা হচ্ছে তারা কতটুকু যোগ্য ও আগ্রহী এই বিষয়টি যেসকল উলামাগন লক্ষ্য করেন তারাই প্রকৃত আহলে ইলম।
ইচ্ছে ছিল কুরআন ও হাদীস থেকে প্রথমে এ বিষয়ে লিখব। কিন্তু কিছু কারণে ভাবলাম তা পরবর্তীতে বিল ইস্তিয়াব আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। এ পর্বে আমরা ৪ ইমাম সহ অন্যান্য সালাফ ও খালাফদের মাঝে অনুসৃত আলেমদের থেকে কিছু বর্ণনা নিয়ে আসব।
১. ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. কে লক্ষ্য করে ইমাম আবূ হানীফা রহ. উপদেশ প্রদান করেন যে,
‘যে কোন সাধারণ ব্যক্তি কিংবা বাজারে (বক্তা) পর্যায়ের লোক তোমার সাথে ইলমী মুনাকাশা (আলোচনা) করতে আসবে তার সাথে আলোচনা করবেনা। কেননা সে তার (অজ্ঞতা ও দুনিয়াদারিতার) দিকে তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে (অর্থাৎ আকৃষ্ট ও প্রভাবিত করবে) ।’
” وَمَنْ نَاقَشَك مِنْ الْعَامَّةِ وَالسُّوقَةِ فَلَا تُنَاقِشُهُ، فَإِنَّهُ يُذْهِبُ مَاءَ وَجْهِك “.
[আল আশবাহ ওয়ান নাযায়ির আলা মাযাহিবি আবী হানীফাতান নুমান ৪/৩১৪-৩১৫; মানাক্বিবু আবী হানীফা ২/১১৬; ত্ববাকাতুস সানিয়াহ ফী তারাজিমিল হানাফিয়া, তাক্বীউদ্দীন আল গাযযী পৃ.৫২]
২. ইমাম মালেক রহ. বলেন,
‘নিশ্চয়ই (ইলমের ক্ষেত্রে অযোগ্য এমন) প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে ইলমের গভীরতা নিয়ে আলোচনা করা এবং যে যা ইচ্ছা জিজ্ঞেস করলে তাদের প্রত্যেকের জবাব দেওয়া ইলমকে অপমান করার অন্তর্ভুক্ত।’
” إنّ من إذالة العالم أن يجيب كلّ من كلَّمه، أو يجيبَ كلّ من سأله”.
[আল ফক্বীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ,খত্বীব বাগদাদী ২/৪১৮]
৩. খত্বীব বাগদাদী নিজ সূত্রে আরও একটি বর্ণনা ইমাম মালেক থেকে উল্লেখ করেন আর তা হচ্ছে,
‘যার তার প্রশ্নের উত্তরে তার সাথে (ইলমী) আলোচনা করা ইলমকে অবজ্ঞা করার অন্তর্ভুক্ত।’
مِنْ إِهَانَةِ الْعِلْمِ أَنْ تُحَدِّثَ كُلَّ مَنْ سَأَلَكَ
[আল জামে লি আখলাকির রাউই ওয়া আদাবিস সামি’, খত্বীব বাগদাদী ১/২০৫ ক্রমিক নংঃ ৩৬৯]
৪. ইমাম ইবনু ওয়াহহাব রহ. বলেন, আমি ইমাম মালেক থেকে একথা বলতে শুনেছি যে,
‘অজ্ঞদের সাথে ইলমী আলোচনা করা ইলমের জন্য অপমান ও লাঞ্চনার স্বরুপ হয়ে থাকে (কেননা তারা তার যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেনা)।’
” ذلٌّ وإهانةٌ للعلم ، إذا تكلّم الرّجل بالعلم عند من لا يُطيعه “.
[আল ফক্বীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ,খত্বীব বাগদাদী ২/৫৩]
৫.ইমাম মালেক রহ. আরও বর্ণিত রয়েছে যে,
‘ইলমকে অপমান ও লাঞ্চনা করার স্বরুপ হচ্ছে, ইলম ধ্বংসকারীর (অবমূল্যায়নকারীর) সামনে তা আলোচনা করা।’
ذُلٌّ وإهانة للعلم أن تتكلَّم به عند من يُضَيِّعُه.
[গিযাউল আলবাব ফী শারহি মানজূমাতিল আদাব,সাফফারীনী আল হাম্বলী ১/৫৭]
৬. ইমাম শাফেঈ রহ. থেকে বর্ণিত যে,তিনি রহ. বলেন-
‘যার তার সাথে (অর্থাৎ জাহেল ও দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞের সাথে হুটহাট) মুনাজারা করতে আসলেই মুনাজারা (তথা ইলমী বিতর্ক) করা এবং যার তার সাথে (ইলমী) আলোচনা করতে আসলেই (ইলম ও আহলে ইলমের যথাযথ মর্যাদা দিতে পারবেনা জানা সত্ত্বেও) আলোচনা করা ইলমকে অপমান করার নামান্তর।’
“من إذلال العلم أن تناظر كل من ناظرك، وتقاول كل من قاولك” .
[মানাক্বিবুশ শাফেঈ, বাইহাক্বী২/১৫১]
৭. ইমাম শাফেঈ এ ব্যাপারে পদ্যাকারে বলেন,
مَنَحَ الجُهّالَ عِلماً أَضاعَهُ *** وَمَن مَنَعَ المُستَوجِبينَ فَقَد ظَلَم.
মূর্খদের ইলম প্রদান করলে সে ইলমকে ধ্বংস করে *** আর যোগ্যকে ইলম প্রদানে বিরত থাকলে সে জুলুম করে।
[হিলইয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াঈম ৯/১৫৩; মানাক্বিবুশ শাফেঈ ২/৭২; সিয়ারু আলামিন নুবালা ১০/৭১; ত্ববাকাতুশ শাফেঈয়াহ,সুবকী ১/২৯৪; মানাক্বিবুশ শাফেঈ, রাযী পৃ:১১১; গিযাউল আলবাব ফী শারহি মানজূমাতিল আদাব,সাফফারীনী আল হাম্বলী ১/৫৭; মু’জামুল উদাবা, ইয়াকূত আল হামাবী ১৭/৩০৭]
৮. ইমাম শুবা ইবনুল হাজ্জাজ রহ. বলেন,
”একদিন আমি একদল মানুষদের সামনে হাদিস বর্ণনা করছিলাম, আ’মাশ রহ. দেখে আমাকে বললেন, ধিক তোমার উপর হে শুবা! শুকরের গলায় মুক্তোর মালা ঝুলাচ্ছ!?? (অন্য বর্ণনায় শুকরের গলায় মুক্তোর মালা ঝুলিও দিও না)।”
وَقَالَ شُعْبَةُ : أَتَانِي الْأَعْمَشُ وَأَنَا أُحَدِّثُ قَوْمًا فَقَالَ : وَيْحَك تُعَلِّقُ اللُّؤْلُؤَ فِي أَعْنَاقِ الْخَنَازِيرِ ،
و في رواية ابن الجعد، قال شعبة: رآني الأعمش يوما وأنا أحدث، قال: ويحك – أو ويلك – يا شعبة، لا تعلق الدر في أعناق الخنازير
وفي رواية الخطيب – أنا مُحَمَّدُ بْنُ أَحْمَدَ بْنِ رِزْقٍ، أنا عُثْمَانُ بْنُ أَحْمَدَ، نا حَنْبَلُ بْنُ إِسْحَاقَ، ح وأنا أَبُو نُعَيْمٍ الْحَافِظُ، نا مُحَمَّدُ بْنُ أَحْمَدَ بْنِ الْحَسَنِ، نا مُحَمَّدُ بْنُ عُثْمَانَ بْنِ أَبِي شَيْبَةَ، قَالَا: نا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ الْمَدِينِيُّ، نا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، نا شُعْبَةُ، قَالَ رَآنِي الْأَعْمَشُ وَأَنَا أُحَدِّثُ قَوْمًا، فَقَالَ: «وَيْحَكَ، أَوْ وَيْلَكَ يَا شُعْبَةُ، تُعَلِّقُ اللُّؤْلُؤَ فِي أَعْنَاقِ الْخَنَازِيرِ»
[আদাবুশ শরঈয়াহ, ইবনু মুফলিহ ২/১০৮ ; মুসনাদে ইবনুল জা’দ ১/৪৬২ ক্রমিকঃ ৮৩৬ . (মাকতাবুল ফালাহ), সনদ সহীহ ; আল জামে লি আখলাকির রাউই ওয়া আদাবিস সামি’, খত্বীব বাগদাদী ১/২০৫ ক্রমিক নংঃ ৩৬৮; জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদ্বলিহি,ইবনু আব্দিল বার ১/১০৮]
৯. ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রহ. কে মুহান্না জিজ্ঞেস করলেন যে, ইমাম শুবা ইবনুল হাজ্জাজ রহ. কে লক্ষ্য করে ইমাম আ’মাশ রহ.-এর এই বক্তব্যটির অর্থ কি?
‘তুমি শুকরের গলায় মুক্তোর মালা ঝুলিয়ে দিওনা। ‘
উত্তরে তিনি রহ. বললেন-
‘এর অর্থ হচ্ছে, অযোগ্যের (তথা মূর্খের) সামনে হাদীস বর্ণনা করা (আহলে ইলমদের জন্য) উচিৎ নয় (কেননা তারা হাদীসগুলো বুঝবে ও গ্রহণ করবে নিজেদের বুঝ ও প্রবৃত্তি মুতাবেক। এবং এখানে হাদীস বর্ণনা না করার দ্বারা অনেকেই ইলমী আলোচনা না করার অর্থ নিয়েছেন)।’
وَقَالَ مُهَنَّا لأحمد بن حنبل رحمه الله : ما معنى قول الأعمش لشعبة لا تُعَلِّقُ اللُّؤْلُؤَ فِي أَعْنَاقِ الْخَنَازِيرِ؟ فَقَالَ: معنى قوله : لا ينبغي أن يُحَدَّثَ مَنْ لَا يَسْتَأْهِلُ .
[আদাবুশ শরঈয়াহ, ইবনু মুফলিহ ২/১০৮; গিযাউল আলবাব ফী শারহি মানজূমাতিল আদাব,সাফফারীনী আল হাম্বলী ১/৫৭ ]
১০. প্রখ্যাত তাবেঈ ইকরিমা রহ. বলেন,
‘এই হাদীসের একটি বিশেষ মূল্য ও মর্যাদা রয়েছে। তার ছাত্ররা বললেন, হাদীসের মূল্য বা মর্যাদা কি? তিনি বললেন- এই হাদীসলে যারা সুন্দর ভাবে সংরক্ষণ করতে পারবে তাদের কাছে এর আমানত রাখা এবং একে অযোগ্যদের কাছে বন্টন করে ইলমকে অবমূল্যায়ন ও নষ্ট করবেনা।’
إن لهذا الحديث ثَمَناً، قالوا: وما ثمنُه؟ قال: أن يُوضعَ عند من يُحسن حفظه، ولا يُضيِّعه
[আল জামে লি আখলাকির রাউই ওয়া আদাবিস সামি’, খত্বীব বাগদাদী ১/৩২৮; জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদ্বলিহি,ইব্বু আব্দিল বার পৃঃ ১৭৬; আল মুহাদ্দিসুল ফাসিল, রামাহুরমুযী পৃঃ৫৭৫]
১১. আব্দুল মালিক ইবনু উমাইর রহ. ইমাম মাসরুক্ব রহ. থেকে বর্ণনা করেন,
نَكَدُ الْحَدِيثِ الْحَدِيثِ الْكَذِبُ، وَآفَتُهُ النِّسْيَانُ، وَإِضَاعَتُهُ أَنْ تُحَدِّثَ بِهِ غَيْرَ أَهْلِهِ
[আল জামে লি আখলাকির রাউই ওয়া আদাবিস সামি’, খত্বীব বাগদাদী ১/৩২৭; জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদ্বলিহি,ইবনু আব্দিল বার পৃঃ ১৭৫; আল মুহাদ্দিসুল ফাসিল, রামাহুরমুযী পৃঃ৫৭১ ; আল জামে ফিল ইলালি ওয়া মা’রিফাতির রিজাল, আহমাদ ইবনু হাম্বল পৃ.১২৩ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়া); আল কামেল (মুকাদ্দিমা), ইবনু আদী ১/৫১ (ইবনু আদী আব্দুল্লাহ ইবনু মুখতার,ক্বায়েস ইবনু রাবী, আ’মাশ রহ. থেকে এটি বর্ণনা করেন); ফাতহুল মান্নান (শারহু মুসনাদিল জামে) ৩/৪৬৫ (মাকতাবাতুল মাক্কিয়া)- এই বক্তব্যটি বিভিন্ন সূত্রে বিভিন্ন রাবী থেকে এবং শব্দের কিছু ভিন্নতার সাথে বহু গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। ]
১২. ইমাম ইবনু হাজার আসক্বালানী রহ. বলেন,
”যারা আগ্রহী ও ইচ্ছুক নয় তাদের নিকট ইলমের মণি-মুক্তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা উচিৎ নয়।”
لا يَنبغي نشرُ العلمِ عندَ مَن لا يَحرص عليهِ.
[ফাতহুল বারী ১১/১৩৯]

Facebook Comments