আল্লাহ তায়ালার অবস্থানঃ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আক্বীদা কি?

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আক্বিদা কি

আহলুস সুন্নাহর যে আক্বীদায় আসারী, আশআরী, মাতূরীদির মূলধারার সকল ইমামগন একমত তা হচ্ছে-
“আল্লাহ তা’লা স্থান,কাল,দিক,সময়,হুলুল,দেহ, স্থানান্তর, পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সীমাবদ্ধ হওয়া থেকে মুক্ত।”
.
নিচে আমি এই বিষয়ে সাহাবাদের যামানা থেকে ৫১১ হিজরী পর্যন্ত সালাফদের বক্তব্য নকল করব যেখানে আসারী আশ’আরী ও মাতূরীদি আলেমদের মাঝে প্রসিদ্ধ ইমামগন থাকবেন।
.
) আলী রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু বলেন –
كان- الله- ولا مكان، وهو الان على ما- عليه- كان اهـ. أي بلا مكان.

আল্লাহ ছিলেন কোন স্থান ছিলনা।এবং এখনও তিনি আছেন আগে যেখানে ছিলেন। (অর্থাৎ কোন স্থানেই নেই)
[আল ফারকু বাইনাল ফিরাক্ব,বাগদাদীঃ ৩৩৩]
.
তিনি রাদিঃ আরো বলেন-
إن الله تعالى خلق العرش إظهارًا لقدرته لا مكانا لذاته
” নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’লা আরশ সৃষ্টি করেছেন তার ক্ষমতা প্রকাশের জন্য। তার নিজের বাসস্থানের জন্য নয়।”[প্রাগুক্ত]
.
তিনি আরো বলেন-
من زعم أن إلهنا محدود فقد جهل الخالق المعبود
” যে ভাবে আমাদের ইলাহ কোন স্থানে সীমাবদ্ধ সে একমাত্র ইবাদাতের যোগ্য স্রষ্টার ব্যাপারে অজ্ঞ!”
[হিলইয়াতুল আউলিয়া-আলী রাদিঃ এর তরজমা ১/৭৩]
.
২) তাবেয়ী ইমাম যাইনুল আবেদীন(৯৪ হি.) বলেন-
أنت الله الذي لا يحويك مكان
আপনিই আল্লাহ যিনি কোন স্থান দ্বারা পরিসীমিত নয়। [ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকীন,যাবেদী ৪/৩৮০]
.
তিনি আরো বলেন-
أنت الله الذي لا تحد فتكون محدودا
আপনার এমন কোন সীমারেখা নেই যাতে আপনি সীমিত। [প্রাগুক্ত ]
.
) ইমাম জাফর আস সাদেক(১৪৮ হি.) বলেন-
من زعم أن الله في شىء، أو من شىء، أو على شىء فقد أشرك. إذ لو كان على شىء لكان محمولا، ولو كان في شىء لكان محصورا، ولو كان من شىء لكان محدثا- أي مخلوقا
” যেই ব্যক্তি ভাবে- আল্লাহ কোন কিছুতে, কোন কিছু থেকে, অথবা কোন কিছুর উপর সে শিরক করল!যদি তিনি কোন কিছুর উপর থাকেন তাহলে ঐ জিনিস তাকে বহন করছে!!, আর যদি কোন কিছুর মাঝে থাকেন তাহলে তিনি পরিসীমিত!, এবং যদি তিনি কোন কিছু থেকে হয় তাহলে তাহলে তিনি নশ্বর (তথা সৃষ্টি)!”
[রিসালাতুল কুশাইরিয়াহঃ৬]
.
) ইমাম আবু হানীফাহ(১৫০হি.) বলেন-
ونقر بأن الله سبحانه وتعالى على العرش استوى من غير أن يكون له حاجة إليه واستقرار عليه، وهو حافظ العرش وغير العرش من غير احتياج، فلو كان محتاجا لما قدر على إيجاد العالم وتدبيره كالمخلوقين، ولو كان محتاجا إلى الجلوس والقرار فقبل خلق العرش أين كان الله، تعالى الله عن ذلك علوا كبيرا”
” আমরা এই বিশ্বাস স্থাপন করি যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা আরশের উপর ইস্তেওয়া করেছেন আরশের প্রতি কোন প্রয়োজন ও স্থির হওয়া ছাড়াই।….. যদি তিনি আরশে বসা ও স্থির হওয়ার মুখাপেক্ষীই হতেন তাহলে আল্লাহ আরশ সৃষ্টির পূর্বে কোথায় ছিলেন?? আল্লাহ তা’লা এসব থেকে অনেক অনেক উর্ধ্বে। ”
[ কিতাবুল ওয়াসিয়্যাহঃ২ -শায়খ যাহেদ আল কাওসারীর টীকাযুক্ত]
.
ইমাম আবূ হানীফাকে জিজ্ঞেস করা হল, আল্লাহ কোথায়? তিনি বললেন –
كان الله تعالى ولا مكان قبل أن يخلق الخلق، وكان الله تعالى ولم يكن أين ولا خلق ولا شىء، وهو خالق كل شىء
” (যেমনিভাবে)আল্লাহ তা’লা সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করার আগে কোন স্থানে ছিলেন না (তেমনিভাবে সৃষ্টি করার পরেও কোন স্থানে নেই)।অনুরূপ আল্লাহ তা’লা ছিলেন কিন্তু তিনি কোথাও ছিলেন না কোন সৃষ্টি ছিলেন না এবং কোন কিছুই ছিলেন না,কেননা সব কিছু তো তিনিই সৃষ্টি করেছেন।”

[আল ফিক্বহুল আবসাত্ব, আল্লামা কাওসারী রহ. এর টীকাযুক্তঃ২৫; আদ দালীলুল ক্বউইম, আব্দুল্লাহ আল হারারী আল হাবশীঃ৫৪]
.
তিনি আরো বলেন-
“والله تعالى يرى في الآخرة، ويراه المؤمنون وهم في الجنة بأعين رؤوسهم بلا تشبيه ولا كميّة، ولا يكون بينه وبين خلقه مسافة” اهـ.
“আল্লাহকে আখিরাতে দেখা যাবে, মুমিনরা তাকে জান্নাতে নিজ চক্ষু দিয়ে দেখবেন (সৃষ্টির কোন) সাদৃশ্য ও আকৃতি ব্যতিতই।আর সেসময় আল্লাহ ও তার সৃষ্টির মাঝে কোন দূরুত্বের পরিমান থাকবেনা (কেননা দুরুত্ব হাদেস যা সৃষ্টির সাদৃশ্য, আর আল্লাহ ইহা থেকে মুক্ত)।” [শারহুল ফিক্বহিল আকবার, মুল্লা আলী আল ক্বারীঃ১৩৬-১৩৭]
.
ইমাম সাহেব আরো বলেন-
ولقاء الله تعالى لأهل الجنة بلا كيف ولا تشبيه ولا جهة حق
জান্নাতীদের আল্লাহর সাথে সাক্ষাত হওয়ার বিষয় সত্য। তবে সৃষ্টির কোনরুপ সাদৃশ্য,ধরণ ও দিক ব্যতিতই।
[আল ওয়াসিয়্যাহঃ৪; শরহুল ফিক্বহিল আকবারঃ১৩৮]
.
৫) ইমাম শাফেয়ী (২০৪ হি.) রহঃ বলেন-
إنه تعالى كان ولا مكان فخلق المكان وهو على صفة الأزلية كما كان قبل خلقه المكان لا يجوز عليه التغيير في ذاته ولا التبديل في صفاته
” তিনি আল্লাহ ছিলেন কিন্তু কোন স্থান ছিলনা। অতঃপর তিনি স্থান সৃষ্টি করলেন, এতেও তিনি তার অনাদি গুনেই গুনান্বিত যেমনটি স্থান সৃষ্টি করার পূর্বে ছিলেন (অর্থাৎ তিনি কোন স্থান গ্রহন করেন নি)। আল্লাহর সত্ত্বা ও গুনের কোন পরিবর্তন জায়েয নেই। (অর্থাৎ স্থান সৃষ্টির আগে তিনি স্থান হীন ছিলেন এখন স্থান সৃষ্টি করে তিনি কোন স্থানে দাড়িয়ে বা বসে নেই, নতুবা তা আল্লাহর যাত ও সিফাতকে আগয়ীর ও তাবদীল তথা পরিবর্তন যোগ্য ধরা হবে!!)
[ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকীন ২/২৪]
.
৬) ইমাম ইব্রাহীম ইবনুস সিরিরী আয যুজাজ (৩১১ হি.) বলেন-
فالله تعالى عال على خلقه وهو عليٌّ عليهم بقدرته، ولا يجب أن يذهب بالعلو ارتفاع مكاني، إذ قد بينا أن ذلك لا يجوز في صفاته تقدست، ولا يجوز أن يكون على أن يتصور بذهن، تعالى الله عن ذلك علوا كبيرا
“আল্লাহ তা’লা তার সৃষ্টি হতে সুউচ্চে,তিনি তার সৃষ্টির উপর নিজ ক্ষমতাবলে কর্তৃত্বশীল। আর আল্লাহ এই সিফাতে ঊলূর দ্বারা কোন স্থানের উপরে সুউচ্চ এটি ধরা যাবেনা। এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহর পবিত্র সিফাতের ক্ষেত্রে এরুপ (স্থানের উর্ধ্ব) সাব্যস্ত করা জায়েয নেই। এবং কল্পনা করেও আল্লাহর এই সিফতকে আকৃতি দেওয়া যাবেনা। মহান আল্লাহ এসব থেকে অনেক উচ্চে।”
[তাফসীরু আসমায়িল্লাহিল হুসনা- ‘আল আলীউ’ শব্দের ব্যাখ্যায়ঃ৪৮,৬০ নং পৃষ্ঠাতেও কিছু আলোচনা আছে]
.
৭) ইমাম ত্বহাবী(৩২১হি.) রহঃ বলেন-
وتعالى- أي الله- عن الحدود والغايات والأركان والأعضاء والأدوات، لا تحويه الجهات الست كسائر المبتدعات
“আমাদের আক্বীদাহ হলো- আল্লাহ সকল সীমা-পরিসীমা, দিগন্ত,দৈর্ঘ্য -প্রস্থ, দেহ,উপাদান ইত্যাদি থেকে অনেক উর্ধ্বে। তিনি ছয় দিকের পরীসীমা হতে মুক্ত যা অন্যান্য বিদ’আতি ফিরক্বাহ মনে করে না!””
[আক্বীদাতুত ত্বহাবিয়্যাহ]
.
৮) ইমাম আবুল হাসান আল আশ’আরী (৩২৪ হি.) রহঃ বলেন আল্লাহর জন্য আরশে স্থান সাব্যস্ত করাকে নাকোচ করেছেন।
” كان الله ولا مكان فخلق العرش والكرسي ولم يحتج إلى مكان، وهو بعد خلق المكان كما كان قبل خلقه ”
” আল্লাহ ছিলেছন কোন স্থান ছিলনা। অতঃপর তিনি আরশ,কুরসীকে সৃষ্টি করলেন স্থান পাওয়ার কোন প্রয়োজন ছাড়াই। তিনি স্থান সৃষ্টি করার পূর্বে যেখানে ছিলেন স্থান সৃষ্টি করার পরেও সেখানেই আছেন।
[তাবয়ীনু কাযিবিল মুফতারি,ইবনু আসাকিরঃ১৫০]
.
৯) ইমাম আবু মানসূর আল মাতূরীদি (৩৩৩হি.) রহঃ বলেন-
إن الله سبحانه كان ولا مكان، وجائز ارتفاع الأمكنة وبقاؤه على ما كان، فهو على ما كان، وكان على ما عليه الان، جل عن التغير والزوال والاستحالة.
” আল্লাহ আগে থেকে স্থান ছাড়াই ছিলেন। আল্লাহকে সুউচ্চ স্থানে আসীন করা বৈধ। তবে এই ভেবেই যে, তিনি আগে যেখানে ছিলেন এখনও সেখানেই। আর আগে যা ছিল তা এখনও আছে। তিনি সকল পরিবর্তন, রুপান্তর, বিকাশ ও নিঃশেষ গুনাবলী থেকে অতি পবিত্র।”
[কিতাবুত তাওহীদঃ৬৯]
.
তিনি আরো বলেন-
“فإن قيل: كيف يرى؟ قيل: بلا كيف، إذ الكيفية تكون لذي صورة، بل يرى بلا وصف قيام وقعود واتكاء وتعلق، واتصال وانفصال،
যদি বলা হয়ঃ আল্লাহকে কিভাবে দেখা যাবে? তবে উত্তর হবেঃ কোন ধরণ ছাড়াই। কেননা ধরণ আকৃতি বিশিষ্ট হয়। বরং আল্লাহকে দাড়ানো,বসা, হেলান দেওয়া, ঝুলে থাকা, লেগে থাকা কিংবা পৃথক হওয়ার কোন গুনেই দেখা যাবেনা।”
[কিতাবুত তাওহীদঃ৮৫]
.
১০) ইমাম ইবনু হিব্বান (৩৫৪হি.) রহঃ বলেন-
الحمد لله الذي ليس له حد محدود فيحتوى، ولا له أجل معدود فيفنى، ولا يحيط به جوامع المكان ولا يشتمل عليه تواتر الزمان
“আলহামদুলিল্লাহ, যার এমন সীমা-পরিসীমা নেই যা তাকে ঘিরে আছে।… তাকে কোন স্থানই ঘিরে রাখেনি, আর তার উপর সময়ও অতিবাহিত হয়না। (অর্থাৎ তিনি সময়ের উর্ধ্বে)
[আস সিক্বাত ১/১]
.
তিনি আরো বলেন-
كذلك ينزل- يعني الله- بلا ءالة ولا تحرك ولا انتقال من مكان إلى مكان.
“এমনিভাবে আল্লাহর কোন উপাদান,উঠা-নামা, এবং এক স্থান হতে অন্য স্থানে স্থানান্তর হওয়া ছাড়াই নুযূল (১ম আসমানে অবতারণ) করেন।”
[সহীহ ইবনে হিব্বানঃ৮/৪]
.
১১) ইমাম আবু সুলাইমান আল খাত্তাবী (৩৮৮হি.) বলেন-
وليس معنى قول المسلمين إن الله على العرش هو أنه تعالى مماس له أو متمكن فيه أو متحيز في جهة من جهاته، لكنه بائن من جميع خلقه، وإنما هو خبر جاء به التوقيف فقلنا به ونفينا عنه التكييف إذ (لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ).
“আর মুসলমানদের- ‘আল্লাহ আরশের উপর’ এই কথা অর্থ এই না যে, তিনি আল্লাহ আরশকে স্পর্শ করেছেন কিংবা এর উপর স্থান গেড়েছেন, অথবা আরশের কোন দিক দ্বারা তিনি বেষ্টিত নন।বরং তিনি সমগ্র সৃষ্টিকে ঘিরে রয়েছেন।মূলত এই বিষয়ে চুপ থাকা শর্তে কুরআন ও হাদীসে সংবাদ এসেছে। তাই আমরা এটি বলে থাকি আর এর ধরণ কে নাকোচ করি। যেহেতু আল্লাহ বলেন- ” তিনি কারো মত না,অথচ তিনি শুনেন ও দেখেন।” [মা’আলিমুস সুনানঃ২/১৪৭]
.
১২) ইমাম আবু আব্দিল্লাহ আল হুলাইমী (৪০৩হি.) রহঃ বলেন-
ومنهم من أجاز أن يكون على العرش كما يكون الملك على سريره، وكان ذلك في وجوب اسم الكفر لقائله كالتعطيل والتشريك.
“আর তাদের কেউ কেউ আল্লাহ কে আরশের উপর উপবিষ্ট বলে থাকে যেমন বাদশা তার সিংহাসনে বসে থাকেন। এই ধরনের কথা যে বলে তার জন্য কুফর সাব্যস্ত করা ওয়াজিব যেমনটি আল্লাহর গুন অস্বীকার কারীদের ও আল্লাহর শরীক স্থাপন কারীদের করা হয়। ” [ শুয়াবুল ঈমানঃ১/১০৩; আল মিনহাজ ফি শুয়াবিল ঈমানঃ ১/১৮৪]
.
১৩) ইমাম ক্বাযী আবু বকর আল বাক্বিল্লানী (৪০৩হি.) রহঃ বলেন-
ولا نقول إن العرش له- أي الله- قرار ولا مكان، لأن الله تعالى كان ولا مكان، فلما خلق المكان لم يتغير عما كان
” আর আমরা এটাও বলিনা যে, আরশে আল্লাহ স্থির হন বা জায়গা গাড়েন। কেননা আল্লাহ সৃষ্টির আগেও ছিলেন কিন্তু তখন কোন স্থান ছিলনা, অতঃপর স্থান সৃষ্টি রার পর আল্লাহর আগের থাকার মাঝে কোন পরিবর্তন হয়নি।”
[আল ইনসাফ ফীমা ইয়াজিবু ই’তেক্বাদুহু ওয়ালা ইয়াজুযুল জাহলু বিহিঃ৬৫]
.
১৪) আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ওরফে ইবনু ফূরাক (৪০৬হি.) রহঃ বলেন-
لا يجوز على الله تعالى الحلول في الأماكن لاستحالة كونه محدودا ومتناهيا وذلك لاستحالة كونه محدثا
” আল্লাহর জন্য হুলুল (সৃষ্টির মাঝে প্রবেশ করা) ও স্থান সাব্যস্ত করা জায়েয নেই।কেননা স্থানের সীমা ও পরিসীমা রয়েছে। এছাড়াও এতে হাদেস তথা নশ্বর হওয়া সাব্যস্ত হয়।”
[মুশকিলুল হাদীসঃ৫৭]
.
তিনি আরো বলেন-
واعلم أنا إذا قلنا إن الله عز وجل فوق ما خلق لم يرجع به إلى فوقية المكان والارتفاع على الأمكنة بالمسافة والإشراف عليها بالمماسة لشىء منها.
“মনে রাখবে যখন আমরা বলি ‘আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা তার সৃষ্টির অনেক উপরে’ তার অর্থ এই হয়না যে, তিনি কোন স্থনের উপরে যা দুরুত্বের আওতাধীন, অথবা কোন কিছুর উপরে স্পর্শ করে তাশরীফ নিয়েছেন (তথা বসেছেন)।
[মুশকিলুল হাদীসঃ৬৪]
.
১৫) ইমাম আব্দুল কাহের আল বাগদাদী আল ইসফারায়েনী (৪২৯ হি.) রহ. বলেন-
وأجمعوا- أي أهل السنة- على أنه- أي الله- لا يحويه مكان ولا يجري عليه زمان.
” এই ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইজমা হয়েছে যে, কোন স্থান আল্লাহকে বেষ্টন করতে অয়ারেনা, আর আল্লাহর উপর সময় অতিবাহিত হয়না।( অর্থাৎ তিনি স্থান ও কাল থেক্ব মুক্ত)
[আল ফারকু বাইনাল ফিরাক্বঃ৩৩৩;তিনি তার অন্য কিতাব উসূলুদ দ্বীনঃ৭৩ পৃষ্ঠায় এর বিশদ আলোচনা করেছেন।]
.
১৬) ইমাম বুখারী রহঃ তার ‘সহীহ’ কিতাবের তা’লীকে একটি অধ্যায় -‘ বাবুর রাদ্দি আলাল জাহমিয়্যাতিল মুজাসসিমাহ’ শিরোনামে অধ্যায় রচনা করেছেন। এর ব্যাখ্যা হিসেবে ইমাম ইবনু বাত্ত্বাল আল মালেকী (৪৪৯ হি.) রহঃ বলেন-
غرض البخاري في هذا الباب الرد على الجهمية المجسمة في تعلقها بهذه الظواهر، وقد تقرر أن الله ليس بجسم فلا يحتاج إلى مكان يستقر فيه، فقد كان ولا مكان، وإنما أضاف المعارج إليه إضافة تشريف، ومعنى الارتفاع إليه اعتلاؤه- أي تعاليه- مع تنزيهه عن المكان.
“এই শিরোনাম রচনার দ্বারা বুখারীর উদ্দেশ্য হচ্ছে- আল্লাহ ত’লা দেহময় নন। সুতরাং স্থির হওয়ার জন্য তার কোন স্থানের প্রয়োজন নেই। তিনি তো আগেও ছিলেন কোন স্থান ছিলনা। আর তার নিকিট বিভিন্ন হুকুম আহকাম উঠার ইজাফত (সম্পৃক্ততা) মূলত মর্যাদার দিকে ইঙ্গিত করে। আর আর ‘ইরতেফা’ মূলত স্থানের কোন প্রকার সাদৃশ্য ছাড়াই ‘ইতেলা’ তথা ‘তা’আলী’ অর্থে ব্যবহৃত হবে।”
[ফাতহুল বারীঃ১৩/৪১৬]
.
এবং তিনি রহঃ এদের এই আক্বিদাকে মুজাসসামিয়া তথা দেহবাদিদের আক্বিদার সাথে তুলনা করেছেন।যার সাথে ইমাম বুখারীর কোন সম্পৃক্ততা নেই।
لا تعلق للمجسمة في إثبات المكان، لما ثبت من استحالة أن يكون سبحانه جسما أو حالا في مكان.
[ফাতহুল বারী,আসক্বালানী ১৩/৪৩৩]
.
১৭) ইমাম ইবনু হাযাম আল উন্দুলুসী (৪৫৬হি.) রহ. বলেন-
وأنه تعالى لا في مكان ولا في زمان، بل هو تعالى خالق الأزمنة والأمكنة، قال تعالى: (وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيراً)(سورة الفرقان/2)، وقال (قَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا)(سورة الفرقان/59)، والزمان والمكان هما مخلوقان، قد كان تعالى دونهما، والمكان إنما هو للأجسام.
” এবং তিনি আল্লাহ কোন স্থানে নেই, না কোন সময়ে আবদ্ধ। বরং আল্লাহ তা’লা স্থান ও কালের স্রষ্টা। (দলিল হিসেবে তিনি সুরা ফুরক্বানঃ ২, ২৫৯ আয়াত আনেন) স্থান ও কাল উভয়ই আল্লাহর দুইটি সৃষ্টি। আল্লাহ এই দুই সৃষ্টি ব্যতিতই অনাদিকাল থেকে ছিলেন। আর স্থান তো শরীর ও দেহের প্রয়োজন হয়।(আর আল্লাহ এ থেকে মুক্ত)”
[ইলমুল কালামঃ মাসআলাতু ফি নাফয়িল মাকান আনিল্লাহি তা’আলাঃ৬৫]
.
১৮) ইমাম বাইহাক্বী (৪৫৮হি.)ও আল্লাহর জন্য উপর নিচ সহ যাবতীয় স্থান থেকে মুক্ত হওয়ার ব্যাপারে সহীহ মুসলিম এর একটি হাদিসকে দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। তিনি বলেন-
والذي روي في ءاخر هذا الحديث إشارة إلى نفي المكان عن الله تعالى، وأن العبد أينما كان فهو في القرب والبعد من الله تعالى سواء، وأنه الظاهر فيصح إدراكه بالأدلة، الباطن فلا يصح إدراكه بالكون في مكان. واستدل بعض أصحابنا في نفي المكان عنه بقول النبي (صلّى الله عليه و سلّم) “أنت الظاهر فليس فوقك شىء، وأنت الباطن فليس دونك شىء”، وإذا لم يكن فوقه شىء ولا دونه شىء لم يكن في مكان.
[আল আসমা ওয়াস সিফাতঃ৪০০,এছাড়াও তিনি আরশ কুরসীতে আল্লাহর উপবেশন নিয়ে উক্ত কিতাবের ৩৯৬,৩৯৭ পৃষ্ঠায় আলোচনা করেছেন।]
.
ইমাম বাইহাক্বী সুনানুল কুবরা ৩/৩ এ নিজ সনদে ইমাম মুযানী থেকে একই বিষয় আরো সুবিস্তর বর্ণনা সহকারে উল্লেখ করেনঃ
أخبرنا أبو عبد الله الحافظ، قال: سمعت أبا محمد أحمد بن عبد الله المزني يقول: حديث النزول قد ثبت عن رسول الله (صلى الله عليه و سلّم) من وجوه صحيحة وورد في التنزيل ما يصدقه وهو (وَجَاء رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفّاً صَفّاً)(الفجر/22) والنزول والمجيء صفتان منفيتان عن الله تعالى من طريق الحركة والانتقال من حال إلى حال, بل هما صفتان من صفات الله تعالى بلا تشبيه، جل الله تعالى عما تقول المعطلة لصفاته والمشبهة بها علوا كبيرا. قلت: وكان أبو سليمان الخطابي رحمه الله يقول: إنما ينكر هذا وما أشبهه من الحديث من يقيس الأمور في ذلك بما يشاهده من النزول الذي هو تدلٍّ من أعلى إلى أسفل وانتقال من فوق إلى تحت وهذه صفة الأجسام والأشباح، فأما نزول من لا تستولي عليه صفات الأجسام فإن هذه المعاني غير متوهمة فيه وإنما هو خبر عن قدرته ورأفته بعباده وعطفه عليهم واستجابته دعاءهم ومغفرته لهم يفعل ما يشاء لا يتوجه على صفاته كيفية ولا على أفعاله كمية سبحانه ليس كمثله شىء وهو السميع البصير.
.
১৯) ইমাম আবুল মুজাফফর আল ইসফারায়েনী(৪৭১হি.) এর মতে আল্লাহকে সীমানা,স্থান,দিক, স্থিরতা, চলমান,পরিবর্তন যোগ্য গুনের আওতায় আনা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা নয় বলে উল্লেখ করেছেন।
الباب الخامس عشر في بيان اعتقاد أهل السنة والجماعة: وأن تعلم أن كل ما دل على حدوث شىء من الحد، والنهاية، والمكان، والجهة، والسكون، والحركة، فهو مستحيل عليه سبحانه وتعالى، لأن ما لا يكون محدثا لا يجوز عليه ما هو دليل على الحدوث.
[আত তাবসীর ফিদ দ্বীনঃ১৬৮]
.
২০) ইমাম আবু বকর আশ শীরাযী (৪৭৬হি.) ইস্তিওয়াকে স্থির হওয়া,স্পর্শ করা ও স্থান নির্ধারণ অর্থে নেওয়াকে নাকোচ করছেন।
وان استواءه ليس باستقرار ولا ملاصقة لأن الاستقرار والملاصقة صفة الأجسام المخلوقة، والرب عز وجل قديم أزلي، فدل على أنه كان ولا مكان ثم خلق المكان وهو على ما عليه كان.
[শারহুল লাময়ি ১/১০১]
.
২১) ইমামুল হারামাইন আবুল মা’আলী আল জুয়াইনী(৪৭৮হি.) ও একই মত পোষণ করেন।
“البارىء سبحانه وتعالى قائم بنفسه ، متعال عن الافتقار إلى محل يحله أو مكان يقله ”
[আল ইরশাদু ইলা ক্বওয়াত্বিউল আদিল্লাহঃ৫৬]
مذهب أهل الحق قاطبة أن الله سبحانه وتعالى يتعالى عن التحيز والتخصص بالجهات.
[প্রাগুক্তঃ৫৮]

واعلموا أن مذهب أهل الحق: أن الرب سبحانه وتعالى يتقدس عن شغل حيز، وبتنزه عن الاختصاص جهة.
[আল শামিল ফি উসূলিদ দ্বীনঃ৫১১]
.
উল্লেখিত ইমামগন ছাড়াও আরো হাজার হাজার আহলুস সুন্নাহর ইমামগনের মতামতও অনুরুপ। দীর্ঘ হয়ে যাওয়ায় ইতি টানলাম।( ওয়ামা তাওফীক্বী ইল্লা বিল্লাহ)
.
আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে সহীহ আক্বীদাহ নসীব করুন।

Facebook Comments