ইমরান রাইহান

সালাফদের ইলমচর্চা | ইমরান রাইহান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

শহর এবং মানুষগুলো ছিল স্বপ্নের মত।

সূর্যের আলো মসজিদের জানালার কাঁচে প্রতিফলিত হতেই শুরু হত দিনের ব্যস্ততা। লম্বা পোশাকের প্রান্তদেশ টেনে ধরে মৃদু পায়ে এগিয়ে আসতো তালিবুল ইলমের দল। বৃদ্ধ আলেমরা বসতেন মসজিদের ভেতরে কোনো খুঁটির পাশে। সমরকন্দের কাগজ হাতে জড়সড় হয়ে বসতো তালিবুল ইলমরা। বাইরে খেলারত শিশুদের হৈ-চৈ কানে আসার আগেই শুরু হত দরস। নিশাপুর থেকে কর্ডোভা, কাইরাওয়ান থেকে মার্ভ সর্বত্র মুসলমানদের দিনের শুরুটা হত এভাবেই।

ইমাম কিসাইর কিরাতের দরস অনুষ্ঠিত হত ফজরের পর। তার সামনে উপস্থিত থাকতেন কুতাইবা বিন মেহরান, নুসাইর বিন ইউসুফ, আবু উবাইদ, ইয়াহইয়া আল ফাররা, খালাফ বিন হিশামের মত বরেণ্য ক্বারিরা। ইমাম শাফেয়ি যখন মিসর যান, সেখানে জামে আমর ইবনুল আসে তিনি দরস শুরু করেন। সেখানে তিনি ফিকহের পাশাপাশি সাহিত্য ও ব্যাকরণও পড়াতেন। তার এসব দরস অনুষ্ঠিত হত ফজরের পর। ইমাম তাবারি যখন মিসর যান তিনিও ফজরের পরে জামে আমর ইবনুল আসে দরস দিতেন। আবু হামেদ হাম্মাদ বিন ইবরাহিম ছিলেন বুখারার জামে মসজিদের খতিব। প্রতি শুক্রবার সকালে তিনি হাদিসের দরস দিতেন জামে মসজিদে।

মুয়াজ বিন জাবাল (রা) দরস দিতেন হিমসের জামে মসজিদে। তার দরসে বসতেন বয়স্ক সাহাবিরাও। আবু মুসলিম খাওলানি একবার হজরত মুয়াজ বিন জাবাল (রা) এর দরসে অন্তত ত্রিশ জন সাহাবিকে দেখেছিলেন।

হজ্বের সময়টা ছিল আলেমদের জন্য নিজের ইলমকে সুসজ্জিত করার চমৎকার সুযোগ। আন্দালুসের আলেম পরিচিত হতেন মা ওয়ারাউন্নাহারের আলেমের সাথে। আলোচনা হত ফিকহি ধারা-উপধারা নিয়ে। একে অন্যের কাছে পৌঁছে দিতেন নিজেদের গবেষণা ও পর্যবেক্ষন। সকালের কোমল রোদে মসজিদে নববির উন্মুক্ত চত্বরে বসে ইলমি বিতর্ক শুরু করতেন আলেমরা। হালাব থেকে আসা তরুণ শিক্ষার্থী, বুখারার বস্ত্র ব্যবসায়ী, বাগদাদের চিকিৎসক, দামেস্কের ইস্পাত কারিগর সবাই মুগ্ধ চোখে শুনতো সে আলোচনা। হজ্বের সফর হয়ে উঠতো একইসাথে ইবাদত ও ইলমে নিজেকে সমৃদ্ধ করার উত্তম সুযোগ। এমনই এক হজ্বের সফরে মুজাহিদ বিন রুমি বসেছিলেন মসজিদে খফিফে, হাকাম বিন উতাইবার দরসে।

‘মুসলিম বিশ্বের নামজাদা আলেমরা বসেছিলেন তার দরসে। হাকামের সামনে তাদেরকে বাচ্চা মনে হচ্ছিল’ পরে স্মৃতিচারণ করেছিলেন মুজাহিদ বিন রুমি।

ইলমচর্চার জন্য আলেমরা বেছে নিতেন মসজিদের উন্মুক্ত চত্বর। মসজিদেই দরস দিতেন সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব। ইমাম ওয়াকেদী তুলে ধরতেন মাগাজির ঘটনাবলী। মুসলিমবিশ্বের সর্বত্র, মসজিদই ছিল শিক্ষালয়। কুফার মসজিদে ইমাম আবু হানিফার ফিকহের মজলিস, বসরার মসজীদে আইয়ুব সখতিয়ানীর হাদিসের দরস, সর্বত্র একই দৃশ্য। মসজিদের চত্ত্বরে কিংবা কোনো খুটির পাশে বসেছেন শিক্ষক, তার সামনে ছাত্ররা। ইবরাহিম বিন মোহাম্মদ নাফতুইয়াহ বাগদাদের জামে মনসুরের একটি খুটির পাশে বসে ৫০ বছর দরস দিয়েছেন। এই জামে মনসুরে পড়িয়েছেন খতীব বাগদাদীও। শাফেয়ী মাজহাবের বিখ্যাত আলেম আবু হামেদ আহমদ বিন মুহাম্মদ, বাগদাদে আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারকের মসজিদে দরস দিতেন। তার দরসে ৩০০-৭০০ উলামা , ফকীহ উপস্থিত হতেন। ফাতেমা বিনতে মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ ফিহরী ও তার বোন মরয়ম ফাস শহরে যে দুটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন তাতে ছাত্রদের থাকার জন্য আবাসিক হল নির্মাণ করা হলেও, পাঠদান মসজিদেই হতো। ‘জামেয়া আজহারের মসজিদে এশার পর ১১০ টি ইলমের মজলিস বসতো’ লিখেছেন একজন ইতিহাসবিদ।

বাগদাদে কারুকাজ করা জামে মানসুরে দরস দিতেন আবু বকর আহমাদ বিন সুলাইমান হাম্বলি। তিনি একইসাথে ফিকহ ও হাদিস পড়াতেন। তার দরসে উপস্থিত হতেন শুভ্র পোশাক পরিহিত আলেমরা। ওয়াসিতের মসজিদে দরস দিতেন আবদুল গাফফার হুসাইনি। শুধু তালিম-তরবিয়ত নয়, দূর্বল ছাত্রদের আর্থিক দূরাবস্থার প্রতিও সতর্ক দৃষ্টি ছিল তার। দরিদ্র, মুসাফির ও এতিম ছাত্রদেরকে তিনি দিতেন নিয়মিত অর্থ।

আবু ইসহাক ইবরাহিম বিন সাইদ তার বাল্যকালে যখন ওয়াসিত আসেন, তখন তার সঙ্গী ছিল দারিদ্রতা ও অসুস্থতা। আবদুল গাফফার হুসাইনির দরসে বসে তিনি কোরআনুল কারিম শিখেন। সে সময় তার খাবার দাবারের ব্যবস্থা করতেন আবদুল গাফফার হুসাইনি। আবু ইসহাক ইবরাহিম এখানে লেখাপড়া সমাপ্ত করে বাগদাদ যান। সেখানে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে যখন ওয়াসিত আসেন, ততদিনে ইন্তেকাল করেছেন আবদুল গাফফার হুসাইনি। তার মসনদে বসে দরস দেয়ার দায়িত্ব পড়ে আবু ইসহাক ইবরাহিমের কাঁধে।

কত প্রতিকূলতা ছিল। কারো হাতে অর্থ নেই, কারো নেই শারিরিক সুস্থতা, কারো উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে প্রশাসন, কাউকে করা হয়েছে দেশান্তর, কাউকে বিদাতি আখ্যা দিয়ে পেছনে লেগে গেছে শত্রু। তবু সালাফরা তালিম থেকে পিছু হটেননি। সকল প্রতিকূলতার মূখোমুখি হয়ে সেসব অতিক্রম করেছেন। অর্জিত ইলমকে পৌঁছে দিয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে।

আবু মুহাম্মদ আবদুল করিম বিন আলি বসবাস করতেন আলেকজান্দ্রিয়ায়। তিনি ছিলেন অন্ধ। ‘অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার জামে মসজিদে দরস দিতেন’ অবাক বিস্ময়ের সাথে লিখেছেন একজন জীবনিকার।

অন্ধ ছিলেন আবুল কাসেম হিবাতুল্লাহ বিন সালামাহও। কিন্তু তিনি দরস চালু রেখেছিলেন বাগদাদের জামে মানসুরে। তিনি ছিলেন একাধারে কারি ও মুফাসসির। দেয়ালে হেলান দিয়ে শান্তভাবে তিনি শুনতেন ছাত্রদের পাঠ। কারো ভুল হলে হাত নেড়ে সতর্ক করতেন তাকে।

তাসাউফ, হাদিসের ভাষায় যাকে বলা যায় ইহসান, এটিও বাদ ছিল না পাঠ্যসূচী থেকে। অনেকেই তাসাউফের দরস দিতেন বিভিন্ন মসজিদে। আবু হামযা মুহাম্মদ বিন ইবরাহিম সুফি সম্পর্কে ইবনুল জাওযি লিখেছেন, তিনি প্রথমে রুসাফাহ শহরের জামে মসজিদে তাসাউফের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দরস দিতেন। পরে তিনি বাগদাদ চলে আসেন এবং এখানকার জামে মসজিদে দরস চালু করেন।
হাদিস অর্জনের জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতেও সালাফদের ছিল না কোনো ক্রান্তি। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক বসবাস করতেন মার্ভ শহরে। একবার তিনি একটি হাদিস সংগ্রহের জন্য রায় শহরে গেলেন, হারুন বিন মুগিরার কাছে। এজন্য তাকে অতিক্রম করতে হয়েছিল ১০০০ কিলোমিটার পথ। মূলত এটি ছিল সালাফদের ইলমের প্রতি পিপাসা, ইলম ছাড়া আর কিছুতেই তাদের এই পিপাসা নিবারণ হত না। ঈসা বিন ইউনুস বলেন, একবার আমি ও আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রোমে অবস্থান করছিলাম। সে আমার সেবা করত, আমি লজ্জিত হতাম। সে আমার জন্য খেজুরের তৈরী সুস্বাদু খাবার নিয়ে আসতো। তারপর আমার সামনে বসে হাদিস শুনতো। লিখে নিতো। একদিন আমি তাকে বলি, হে ইবনুল মুবারক, কবে তুমি তৃপ্ত হবে? ইবনুল মুবারক বললো, হে শায়খ, এই মর্যাদা থেকে কেই বা তৃপ্ত হতে পারে?

ইলমকে কাগজে বন্দি না রেখে সালাফরা সংরক্ষণ করতেন নিজেদের হৃদয়ে। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের আম্মা একবার তার উপর বেশ রেগে গিয়েছিলেন। রাগের মাথায় তিনি বলে বসলেন, আমি যদি তোমার খাতাপত্র পাই তাহলে সব পুড়িয়ে ফেলবো। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক মুবারক হাসতে হাসতে বললেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। এসব আমার বুকের ভেতর জমা করা আছে। অর্থাৎ সব আমি মুখস্থ করে ফেলেছি।

ইলমের জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রমে সালাফদের ছিল না কোনো ক্রান্তি। আন্দালুস থেকে আরবে ছুটে এসেছিলেন বাকি ইবনু মাখলাদ। আন্দালুস থেকে মদীনায় ইমাম মালেকের দরসে এসেছিলেন ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া মাসমুদি। আফ্রিকা থেকে এসেছিলেন আসাদ ইবনুল ফুরাত।

নামাজের পর জামে মসজিদের ফটকে মৃদু ভিড় দেখা যেত প্রায়ই। মসজিদের সুউচ্চ খিলানের নিচ দিয়ে মুসল্লিরা বের হতেন মসজিদ থেকে। বাবার হাত ধরে থাকা শিশুরা প্রায়ই হাত ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু মূল সড়কে ছিল মামলুক অশ্বারোহিদের বেশ যাতায়াত। ফলে পিতারা তাদের সন্তানের হাত আরো জোরে আঁকড়ে ধরতেন। ধীরে ধীরে মসজিদে কমে আসতো নীরবতা। কিছু লোক তবু থেকে যেতেন মসজিদেই।

পোশাক গুছিয়ে ওয়াজের জন্য তৈরী হতেন আলেমরা। পেছনের কাতার থেক এগিয়ে এসে গোল হয়ে বসতো মুসল্লিরা। মাসজিদুল আকসায় হানাফি আলেমরা প্রায়ই দরস দিতেন হানাফি ফিকহের। কখনো কখনো করতেন ওয়াজ। মাকদিসির বিবরণ থেকে জানা যায়, সিরিয়ায় ফজর ও মাগরিবের পর বসতো ইলমের মজলিস। পারস্যে আছরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত চলতো ইলমের মজলিস। মিসরের প্রায় সকল মসজিদেই নিয়মিত অনুষ্ঠিত হত দরস। মাকদিসি নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন এভাবে, মিসরে থাকাকালে আমি নিয়মিত এসব মজলিসে শরিক হতাম। একরাতে আমরা এক মসজিদে বসে গল্প করছিলাম। কেউ একজন বললো, সবাই মজলিসের দিকে ফেরো। তাকিয়ে দেখি আমাদের দুপাশে দুটি মজলিস শুরু হয়ে গেছে। মিসরের বেশিরভাগ মসজিদেই ছিল এমন দৃশ্য।

মাকদিসি একবার এক মসজিদে একশো দশটি মজলিস গননা করেছেন। এশার পর সাধারণ লোকজন ফিরে গেলেও আলেমদের এসব মজলিস কখনো কখনো মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘ হতো।

(চলবে… ইনশাআল্লাহ)
#সালাফদের_ইলমচর্চা

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: