ইবনুল মুবারকের যুহদ | মাহমুদ সিদ্দিকী

zuhd

আব্দুল্লাহ ইববনুল মুবারক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। যুগশ্রেষ্ঠ যে-কজন তাবে-তাবেয়ী আছেন ইবনুল মুবারক তাদের অন্যতম। কুতুবে সিত্তার সকল কিতাবে তার হাদীস বর্ণিত হয়েছে। একাধারে তিনি একজন ইমাম, একজন মুহাদ্দিস, একজন ফকিহ, একজন মুজাহিদ এবং একজন ব্যবসায়ী।

মুমিনের জীবনে সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি। সম্পদ অর্জন করেও যে সম্পদের মোহ থেকে মুক্ত থাকা যায়, তাঁর উদাহরণ ও প্রেরণা আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ.। মুমিন সম্পদ অর্জন করলেও সম্পদের মোহ সে অন্তরে ঢুকতে দিবে না।

ইবনুল মুবারক জীবিকা নির্বাহ করতেন ব্যবসার মাধ্যমে। যেমন ছিলেন ব্যবসায়ী, তেমনি ছিলেন দানশীল। আব্বাস ইবনুল মুসআব বলেন—আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক হাদিস, ফিকহ, ভাষাদক্ষতা, ইতিহাস, সাহসিকতা, দানশীলতা, ব্যবসা এবং ভালোবাসা—সবকিছুর আধার ছিলেন।

আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক শুধু ব্যবসায়ী ছিলেন না; ছিলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। কিন্তু নিজে ছিলেন দুনিয়াবিমুখ। প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন ব্যবসা করে। কিন্তু নিজে ভোগ করতেন না। আল্লার রাস্তায় দান করতেন। অকৃপণভাবে মেহমানের আপ্যায়নে ব্যয় করতেন৷ নিজে থাকতেন রোজাদার। জীবনযাপন করতেন সাদাসিধেভাবে।

ইমাম যাহাবি লেখেন, মিসর থেকে মক্কার সফরে একদল লোক তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন। সফরসঙ্গীদেরকে তিনি খেজুর ও ঘিয়ের তৈরি ‘খাবিছ’ (خبيص) নামের দামী খাবার খাওয়াতেন। কিন্তু নিজে সবসময় রোজা রাখতেন।

মার্ভে ইবনুল মুবারকের অনেক বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। হজের মৌসুম এলে তারা এসে আবদার জানাতেন—আপনার সোহবতে আমরা হজ পালন করতে চাই৷ ইবনুল মুবারক তাদেরকে বলতেন—তোমরা সবাই নিজ-নিজ পথখরচ জমা দাও। সবার রাহাখরচ জমা করে একটা বক্সে রেখে তালা লাগিয়ে দিতেন৷ তারপর সফরের সকল আয়োজন সম্পন্ন করে রওয়ানা দিতেন৷ মার্ভ থেকে যেতেন বাগদাদে। সব খরচ ইবনুল মুবারক বহন করতেন। সর্বোচ্চ ভালো মানের খাবার-দাবারের আয়োজন করতেন। বাগদাদ থেকে উত্তম পোশাক ও পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রওয়ানা দিতেন মদিনার উদ্দেশে। প্রত্যেকের পরিবারের যাবতীয় চাহিদা ও কেনাকাটা করে দিতেন৷

সেখান থেকে যেতেন মক্কায়৷ হজ শেষে মক্কা থেকেও সবার পরিবারের চাহিদা ও আবদার পূরণ করতে বিভিন্ন কিছু কিনে দিতেন৷ তারপর মক্কা থেকে মার্ভে ফিরতেন। ফিরে এসে সবার বাড়িঘর ঠিকঠাক করে দিতেন। তিনদিন পর বিশাল এক ভোজের আয়োজন করে সবাইকে কাপড়চোপড় হাদিয়া দিতেন। খাওয়া-পরার পর্ব শেষে খুলতেন সেই বক্স। প্রত্যেকের অর্থ আলাদা আলাদাভাবে নাম লিখে রাখা হতো। তারপর সবাইকে সবার টাকা-পয়সা ফিরিয়ে দিতেন৷

আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ.-এর বাৎসরিক দানের পরিমাণ ছিল এক লাখ দিরহাম। দানের ক্ষেত্রে একবার যা কলম দিয়ে বের হতো, সেটা আর ফেরত নিতেন না। একবার জনৈক দরিদ্র লোক এসে ঋণ পরিশোধের আবেদন জানায়। ইবনুল মুবারক তার অর্থসচিবকে বলেন, সাত হাজার দিরহাম পরিশোধ করে দিতে৷ সেই লোকের ঋণ ছিল সাতশো দিরহাম। অর্থসচিব জানান, ঋণের পরিমাণ সাতশো দিরহাম৷ কিন্তু আপনি লিখেছেন সাত হাজার দিরহাম। আমাদের অর্থাগারে অর্থ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ফিরতি পত্রে ইবনুল মুবারক লেখেন—অর্থ যদি শেষ হয়ে গিয়ে থাকে, তার মানে আমার জীবনও ফুরিয়ে এসেছে। কলম দিয়ে যা বেরিয়ে গেছে, তা পরিশোধ করে দাও।

অর্থ উপার্জনের নিয়ত যদি থাকে সহিহ, রবের সন্তুষ্টি যদি থাকে একমাত্র লক্ষ্য, তাহলে সেই অর্থও হয় রবের অনুগ্রহ।

অর্থবিত্ত নিয়েও কি দুনিয়াবিমুখ হওয়া যায়? অর্থ উপার্জন করেও কি মোহ থেকে বেঁচে থাকা যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য বুঝতে হবে—অর্থ উপার্জন আর দুনিয়ার মোহ দুটি ভিন্ন বিষয়। দরিদ্র হয়েও কেউ হতে পারে দুনিয়ালোভী, অর্থের মোহে অন্ধ। আবার অর্থবিত্ত অর্জন করেও অর্থ ও দুনিয়ার মোহ থেকে বেঁচে থাকা যায়। এর উত্তর ইবনুল মুবারকের মুখ থেকেই শুনুন৷

ফুজাইল ইবনে ইয়াজ একবার ইবনুল মুবারককে প্রশ্ন করেন—আপনি আমাদেরকে বলেন দুনিয়াবিমুখতা, অল্পেতুষ্টি অর্জন করতে; প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদে সন্তুষ্ট হতে৷ অথচ আপনাকেই দেখি বিশাল ব্যবসা-বাণিজ্য করতে। এ কেমন কথা?
ইবনুল মুবারক উত্তর দেন—আবু আলি, আমি ব্যবসা করি আমার মুখ রক্ষার জন্য। আমার সম্মান রক্ষার জন্য। আর এই অর্থ আমি আমার রবের আনুগত্যের পথে ব্যয় করি৷

আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. অর্থবিত্ত ও মোহহীনতার মাঝে সমন্বয় করে দেখিয়েছেন। বিপুল অর্থবিত্ত থাকার পরেও সম্পদের প্রতি বিন্দুমাত্র মোহ তাঁর ছিল না। অর্থ উপার্জন করেছেন ঠিক, কিন্তু ব্যয় করেছেন রবের সন্তুষ্টির জন্য। নিজের ভোগের পিছনে করেননি। বরং নিজে থেকেছেন রোজাদার। এজন্য সালাফদের মধ্যে দুনিয়াবিমুখতায় যাদের নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. তাদের অন্যতম। “কিতাবুয যুহদ” নামে তিনি স্বতন্ত্র কিতাবও রচনা করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের এই যুহদ ও দুনিয়াবিমুখতা আমাদের জন্য আদর্শ। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তা অর্জন করার তাওফিক দান করুন।

তথ্যসূত্র : সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৮/৩৮৩-৩৮৭

#সালাফ_পরিচিতি
#ইবনুল_মুবারকের_যুহদ

Facebook Comments