জ্ঞান সম্রাট ইমাম গাজালি রহ. । মাহদি হাসান

salaf
ইমাম আবু হামিদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ আত তুসী আশ-শাফিয়ী আল-গাজালি। ইতিহাস যাকে ইমাম গাজালি নামে চিনে৷ গাজালি বলা হয় তাঁর জন্মস্থান গাজালার দিকে নিসবত করে৷ অনেকে তাঁকে ইমাম গাজ্জালিও বলে থাকেন৷ এই নিসবত করা হয় তাঁর পিতার পেশার প্রতি লক্ষ্য করে৷ উভয় নিসবতই সহিহ।
ছিলেন ইসলামি ইতিহাসের সেই বিরলপ্রজ আলিমগণের একজন যারা পৃথিবীময় নিজেদের জ্ঞানের অবদান রেখে গেছেন৷ ইলমি পাণ্ডিত্য এবং চিন্তার গভীরতা ও শুদ্ধতায় উম্মাহকে করে গিয়েছেন চির ঋণী। তিনি যখন পৃথিবীর আলো বাতাসে চলাফেরা করেছেন তখন মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব ছিল সেলজুকদের হাতে৷ অপরদিকে বাজছিল ক্রুসেড যুদ্ধের ডংকা। তিনি ছিলেন সেলজুকদের অবিসংবাদিত উজির নিজামুল মুলকের সামসময়িক ব্যক্তিত্ব৷ সমাজে বিরাজমান আকিদাগত রুগ্নতাকে বিদূরিত করতে তিনি হেঁটেছেন স্বতন্ত্র এক ইসলাহি পথে৷ শিক্ষা, শিষ্টাচার, সমাজে ইসলামি আকিদাকে প্রোথিত করা এবং বিকৃত চিন্তাধারাকে প্রতিহত করতে তিনি দেখিয়ে গিয়েছিলেন পথের দিশা৷ প্রণয়ন করেছিলেন আদর্শ এক মানহাজ৷ এজন্য তাঁকে মুজাদ্দিদ তথা সংস্কারক ও বলা যায়৷
৪৫০ হিজরীতে ইরানের তুস শহরে জন্ম হয়েছিল এই মনীষীর। তাঁর পিতা ছিলেন একজন হতদরিদ্র ব্যক্তি। তবে দারিদ্র্য কখনোই তাঁকে মানুষের দুয়ারে ঠেলে দেয়নি৷ নিজ উপার্জন থেকেই জীবনযাপন করতেন তিনি৷ পশম থেকে সুতা বুনতেন এবং তুস শহরে নিজস্ব দোকানে বিক্রি করতেন৷ অবসরে নিজেকে সপে দিতেন আলেম-উলামার খেদমতে৷ তাদের সংস্পর্শ লাভে ধন্য মনে করতেন নিজেকে৷ নসীহত শুনার সময় তাঁর চোখ বেয়ে গড়িত অশ্রুজল৷ প্রভুর দ্বারে কাতর কন্ঠে প্রার্থনা করতেন একটি পুত্রসন্তানের জন্য৷ যাকে তিনি আলিম, ফকিহ এবং নসীহতকারী হিসেবে গড়ে তুলবেন। আল্লাহ তাঁকে দান করেন দুটি পুত্র৷ আবু হামিদ এবং আহমাদ৷ তবে ছেলেদেরকে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে দেখে যাওয়া তার ভাগ্যললাটে লেখা ছিল না৷ ইমাম গাজালির শৈশবেই তিনি ইন্তেকাল করেন৷ কিন্তু তাঁর আকাংখা মহান আল্লাহ তায়ালা কবুল করেছিলেন৷ এদিকে ইমাম গাজালির সম্মানিতা মাতা বেঁচেছিলেন পুত্রের উজ্জল সূর্যোদয় পর্যন্ত৷ নিজ সন্তানকে একজন সমাদৃত আলিমের আসনে দেখে চক্ষু শীতল করেই তিনি ধরা ত্যাগ করেন৷
তাঁর পিতা এক সুফী বন্ধুর কাছে সঞ্চিত সম্পদ দিয়ে দুই পুত্রের জন্য অসিয়ত করে গিয়েছিলেন৷ কিছুদিন যেতেই সেই সীমিত সম্পদ ফুরিয়ে যায়৷ সেই সুফি বন্ধুটি নিজেও ছিলেন দরিদ্র৷ তিনি দু ভাইকে বলেন কোনো এক মাদ্রাসায় গিয়ে ইলম অন্বেষণে মগ্ন হয়ে যেত৷ তারাও একনিষ্ঠ আল্লাহর তরে ইলম অন্বেষণে রত হয়ে যান৷
শুরুলগ্নে তিনি নিজ শহর তুসেই ফিকহের প্রাথমিক দীক্ষা নেন শাইখ আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ আর-রাযকানির কাছে৷ অতঃপর ইলমি রিহলা করেন জুরজান শহরে৷ সেখানে শিক্ষা লাভ করেন আবু নাসর আল-ইসমাইলির কাছে৷ লিপিবদ্ধ করেন তাঁর কাছ থেকে শ্রুত ইলমের সবক৷ এরপর তিনি পুনরায় তুসে ফিরে আসেন৷ এই ফিরতি পথেই ঘটে যায় এক ঐতিহাসিক ঘটনা৷ যা লিপিবদ্ধ হয়েছে ইতিহাসের পাতায়৷ জুরজান থেকে ফেরার পথে ডাকাতি হয় ইমাম গাজালির কাফেলায়। ডাকাতরা ইমাম গাজালির সাথে থাকা সবকিছু নেয় ছিনিয়ে৷ তিনি নিতে থাকেন ডাকাতদলের পিছু৷ ডাকাত সর্দার তাঁর দিকে তাকিয়ে ফিরে যেতে বলেন৷ নয়তো হত্যা করা হবে বলে দেন হুমকি৷ তিনি সর্দারকে বলেন তাঁর লেখার খাতাটি ফিরিয়ে দিতে৷ সর্দার জিজ্ঞাসা করে, এতে এমন কী আছে যে তা নিতেই হবে। তিনি বলেন, আমি যে উদ্দেশ্যে সফর করেছি, যা শ্রবণ করেছি, যে ইলম অর্জন করেছি তাঁর সারনির্যাস লিখে রেখেছি তাতে। এ শুনে ডাকাত সর্দার হেসে বলে, তুমি কি এমন ইলম অর্জন করলে যে, এই লেখা খাতা ছাড়া তুমি ইলম শূণ্য হয়ে গেলে! অতঃপর তিনি সেই খাতা ফিরিয়ে দিলেন৷
ইমাম গাজালি রহ.বলেন, আমাকে পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ তায়ালাই তার মুখে এ কথা উচ্চারিত করেছেন৷ তুসে ফিরে আসার পর আমি তিন বছর ব্যস্ত হয়ে পড়ি৷ এই তিন বছরে আমি যা লিখেছি সব মুখস্থ করে ফেলি৷ যেন আবারো ডাকাতি হলে আমি ইলম শূন্য হয়ে না পড়ি।
এরপর তিনি পদার্পণ করেন ঐতিহাসিক নিশাপুর শহরে৷ সেলজুকদের রাজধানী নিশাপুর৷ ইলমি শ্রেষ্ঠত্বে তখন বাগদাদের পরেই ছিল তাঁর অবস্থান। এখানে এসে তিনি লাভ করেন প্রখ্যাত আলিম ইমামুল হারামাইন জুওয়াইনি রহ.এর শিষ্যত্ব৷ নিজের অক্লান্ত প্রচেষ্টা এবং মেধায় তিনি উস্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। চারশত সহপাঠী থেকে তিনি নির্বাচিত হন উস্তাদের নায়েব হিসেবে৷
৪৭৮ হিজরিতে ইমামুল হারামাইনের ইন্তেকালের পর তিনি সেলজুক উজির নিজামুল মুলকের কাছে যান। তাঁর বয়স তখন সবেমাত্র আটাশ৷ ইতোমধ্যেই তাঁর সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল৷ নিজামুল মুলকের মজলিস ছিল আলিম, ফকিহ এবং কালাম শাস্ত্রবিদগণের আনাগোনায় মুখরিত। প্রত্যহই সেখানে বসতে মুনাজারা বিতর্কের আসর৷ সেই আসরে ইমাম গাজালি তাঁর পাণ্ডিত্য এবং বিচক্ষণতায় বিপক্ষকে করেছেন ঘায়েল৷ সেখানে উপস্থিত জ্ঞানীগুণীজন পরিচিত হন তাঁর অতুলনীয় জ্ঞানের সাথে৷ মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিযুক্ত করা হয় বাগদাদের ঐতিহাসিক মাদরাসায়ে নিজামিয়ার মুদাররিস হিসেবে৷ যা ছিল আলিমদের জন্য কাঙ্ক্ষিত এক মর্যাদার পদ। লক্ষ আলিম স্বপ্ন দেখত এ পদের৷ হতো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা৷ ৪৮৪ হিজরিতে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে মাদরাসায়ে নিজামিয়ার মুদাররিস হিসেবে তিনি বাগদাদে আসেন৷ এত কম বয়সে এমন উচ্চ মর্যাদা লাভের ভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয়েছিল৷ এরপর ইমাম গাজালির ইলমি প্রস্রবণ প্রবাহিত হতে থাকে নিরলস গতিতে৷ শত শত ইলমপিপাসু সেই সুপেয় ঝর্না থেকে করেন আকণ্ঠ পান৷ বাগদাদবাসীর মাঝে তিনি লাভ করেন আকাশসম জনপ্রিয়তা৷ এমনকি হয়ে উঠেন খলিফাদেরও ঈর্ষার পাত্র। ইলমের বিভিন্ন শাস্ত্রে তিনি লিখেছেন অসংখ্য গ্রন্থ৷ ইসলাহে উম্মাহর জন্য রেখে গেছেন ইহইয়াউ উলুমুদ্দীনের মতো জগদ্বিখ্যাত এক গ্রন্থ৷ যে গ্রন্থ চির ঋণী করেছে মুসলিম উম্মাহকে৷
তিনি অমর হয়ে আছেন ইসলামি ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়ে। নিজের ইলমি উদ্দীপনা, জ্ঞানসাধনা, শেকড়সন্ধানী সত্ত্বা এবং সামসময়িক জ্ঞানশাস্ত্রসমূহে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে৷ নিজের অত্যাশ্চর্য মেধাশক্তি দিয়ে এবং নিজের প্রচেষ্টা, সাধনা এবং বিনিদ্র রজনী ও শত ক্লান্তির ফসল কিতাবের পাতায় পাতায় লেখা কালো হরফের ঝর্ণাধারা দিয়ে৷ তিনি অমর হয়ে থাকবেন মুসলিম উম্মাহর অন্তরে৷
৫০৫ হিজরির ১৪ই জমাদিউল উখরা মোতাবেক ১১১১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে ডিসেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন৷ এই নক্ষত্রের জন্য আমরা করি অকৃপণ দোয়া৷ আল্লাহ তায়ালা যেন তাঁর কবরকে করেন সুশীতল এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে বানান তাঁর আবাসস্থল।
তথ্যসূত্র:
(১) ওফায়াতুল আইয়ান, ইবনু খাল্লিকান: ১/২০৭৷
(২) সিয়ারু আলামিন নুবালা, শামসুদ্দিন যাহাবি: ১৮/৩২২।
(৩) আল-ইমাম আল-গাজালি ওয়া জুহুদুহু ফি হারাকাতিল ইসলাহি ওয়াত তাজদিদ, ড.আলি সাল্লাবি।

Facebook Comments