কাসিমুল উলূম ওয়াল হিকাম মাওলানা কাসেম নানুতুবি রহ. | আবদুল্লাহ তালহা

কাসেম নানুতুবি রহ.
কাফেলা এখনো মাদীনা মুনাওয়ারা থেকে অনেক দূরে এমন সময় একজন ব্যক্তি উন্মাদের মতো আচরণ করতে লাগলেন। নেমে গেলেন সাওয়ারি থেকে। নগ্ন পায়ে দৌঁড়াতে লাগলেন সবুজ গম্বুজ পানে। পায়ের নিচে ছোটো ছোটো পাথর। পাথরের আঘাতে ক্ষত হলো পদদ্বয়। রক্তও বের হয়ে আসলো। কিন্তু ছুটে-চলা মানুষটির কোনো বিকার নেই। বগলে জুতাজোড়া নিয়ে তিনি প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা আতহারের দিকে পাগলের মতো ছুটে চলেছেন।
সঙ্গে থাকা দুয়েকজন সফরসঙ্গীও তাঁকে দেখে নেমে গেলেন। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর তাদের পক্ষে নগ্নপায়ে এই পাথুরে জমিনে চলা সম্ভব হলো না। জুতো পরেও অতদূর হেটে যাওয়া সম্ভব না।
অথচ নবীপ্রেমে পাগল লোকটি একভাবে ছুটতে ছুটতে নবীজির মসজিদে গিয়ে হাজির হলেন এবং মুহাব্বতের নযরানা পেশ করলেন।
পরবর্তীতে সফরসঙ্গীরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, আপনি এমন আচরণ করলেন কেন? বললেন, সবুজ গম্বুজ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সাথে সাথে কেমন যেন ঐ রওজাওয়ালার ভালোবাসায় অন্তর অস্থির হয়ে উঠল। তাঁর সম্মানে এই যমিনে জুতা পরে চলা বড়ো বেআদবি মনে হলো।
.
নবীপ্রেমে চঞ্চল যে মহান পূর্বসূরির কথা বলছিলাম তিনি হলেন ঐতিহাসিক ইলমী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা কাসিমুল উলুম মাওলানা কাসেম নানুতুবি রহ.।
.
মাওলানা কাসেম জন্মগ্রহণ করেন ১৮৩১ ঈসাব্দে। নানুতাহ জেলার সাহারানপুরে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান মনীষী। সাহারানপুর এলাকাটি দেওবন্দ হতে বারো মাইল দূরে অবস্থিত। নানুতাহ, কান্ধলাহ, গংগুহ ও দেওবন্দ- এসব এলাকা ছিল খান্দানিভাবেই ফারুকি, উসমানি ও সিদ্দিকি। এজন্য এসব এলাকা পূর্ব হতেই বুযুর্গানে-দ্বীন ও মাশায়েখদের আবাসস্থল ছিল।
হযরত নানুতুবি রহ.এর বংশ-পরম্পরা সাইয়িদুনা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.এর সাথে মিলিত হয়েছে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১২৪৮ হিজরীর শাবান বা রমজান মাসে। তাঁর পিতার নাম শায়খ আসাদ আলি বিন গোলাম শাহ। যিনি ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার ও দীনদার মানুষ।
হযরত নানুতুবি রহ. শৈশব হতেই অত্যন্ত ধীমান, উন্নত-স্বভাব, পরিশ্রমী ও সৌভাগ্যশীল ছিলেন। পড়াশোনার সময় সর্বদা সঙ্গি-সাথীদের থেকে এগিয়ে থাকতেন। অনেক অল্প বয়সে কুরআন কারিম শিখে নেন। দেওবন্দ নগরীতে তিনি আরবী ফার্সীর প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। অতঃপর মাওলানা মামলুক আলির সাথে ১২৬০ হিজরীতের দিল্লী আসেন। সেখানে শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভি রহ.এর কনিষ্ঠ পুত্র হযরত শাহ আবদুল গনি দেহলভি রহ.এর নিকট ইলমে হাদিসের জ্ঞান অর্জন করেন। শিক্ষা-সমাপ্তির পর তিনি হস্তলিখন বা লেখালেখির পেশা গ্রহণ করেন। তিনি সর্বপ্রথম মাওলানা আহমাদ আলী সাহারানপুরি রচিত বুখারী শরিফের তাসহিহ (বিশুদ্ধ-করণ) ও অনুলিখন করেন। তিনি বেশ দীর্ঘ সময় দিল্লি ও মিরাঠে হস্তলিখনের পেশায় জড়িত থাকেন। পাশাপাশি দরস-তাদরীসের কার্যক্রমও শুরু করেন। মিরাঠ ও দিল্লিতে হস্তলিখনের ব্যস্ততার সময় তিনি শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আহমাদ হাসান আমরুহি, মাওলানা হাকিম মুহাম্মদ সিদ্দিক প্রমুখ ব্যক্তিগণকে হাদিসের পাঠদান করেন। সে সময়েই তিনি শাইখুল মাশায়েখ হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি রহ.এর হস্ত মোবারকে বাইয়াত প্রদান করেন। হযরত হাজী সাহেবের একান্ত সহচর্য ও পবিত্র সান্নিধ্য গ্রহণ করে হযরত কাসেম নানুতুবি অল্প সময়েই তাছাওউফের পথে খিলাফতের মর্যাদা প্রাপ্ত হন।
.
যৌবন বয়স হতেই হযরত কাসেম নানুতুবি নেক আমল ও তাকওয়ার উপর অবিচল ছিলেন। নিজের জীবনকে তিনি একটি সুন্দর ধর্মীয় নিয়মনীতিতে পরিচালনা করেছেন।
হযরত নানুতুবি সম্পর্কে তাঁর শায়খ ও মুর্শিদ হযরত ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি রহ. বলেন, ‘এমন গুণসম্পন্ন ব্যক্তি প্রথম যুগে হতো। বর্তমানে দীর্ঘ কাল ব্যাপী এমন মানুষ মেলে না’।
একজন মুরিদের জন্য মুর্শিদের এমন সুন্দর অভিব্যক্তি অনন্য সৌভাগ্যের বিষয়।
.

হযরত নানুতুবির স্বভাব-চরিৎ

হযরত নানুতুবি ছিলেন সর্বদা হাসিখুশি স্বভাবের। অসম্ভব বিনয়ী। প্রসিদ্ধি ও আত্মপ্রচারকে খুব ভয় করতেন। তাঁর মাঝে এমনই আত্মবিলোপ ছিল যে, নিজ হতে কোনো মাসআলা বর্ণনা করতেন না, অন্য কোনো আলেমের বরাত দিয়ে বয়ান করতেন। ফতোয়ায় নিজের নাম বা সিল ব্যবহারকে অপছন্দ করতেন। অহংকার, রিয়া ইত্যাদি মন্দ স্বভাব থেকে জোযন জোযন দূরে অবস্থান করতেন তিনি। নামাজে ইমামতিকে ভয় করতেন। এজন্য সর্বদা মুক্তাদি হয়েই নামাজ আদায় করতেন। ইলম-আমল, যুহদ-তাকওয়া ইত্যাদি উৎকৃষ্ট গুণাবলীতে তিনি ছিলেন পাহাড়-সদৃশ।
হযরত নানুতুবি ছিলেন সে যুগের একজন বড় ধর্মীয় বিতার্কিক। বাহাস-মুবাহাসা ও তর্কে কখনো তিনি পরাজিত হননি। বিভিন্ন বাতিল ফেরকার পাদ্রী ও গুরুদের সাথে বিতর্ক কারে তাদেরকে পরাজিত করেছেন। ছিলেন বড় মুজাহিদ ও অক্লান্ত পরিশ্রমী।
ইংরেজরা যখন ভারত উপমহাদেশে ভিত গেড়ে অন্যান্য ধর্মের অবমাননা ও খ্রীস্টধর্মের প্রচার-প্রসারের চেষ্টা করল তখন তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য একটি সংগ্রামী বাহিনী গঠন করা হলো। এই বাহিনীর নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় তৃতীয় নেতা বা ইমাম ছিলেন হযরত শাহ আবদুল গনি দেহলভি রহ.। তাঁর ইন্তিকালের পর ১৮৪৬ খ্রীষ্টাব্দে এ গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয় হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি রহ.এর উপর।
১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের শুরুতে এ বাহিনী প্রকাশ্য আন্দোলনে আসে। হাজী সাহেবের একান্ত সহযোগীদের মধ্যে মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানতুবি, মাওলানা রশিদ আহমাদ গাংগুহি, মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াকুব নানুতুবি, মাওলানা মুহাম্মদ থানভি ও হাফেজ জামেন শহীদ ছিলেন অন্যতম। আযাদী আন্দোলনের এক পরামর্শ সভায় মাওলানা শায়খ মুহাম্মদ থানভি স্বীয় সহায়-সম্বলহীনতার অভিযোগ পেশ করে আযাদী আন্দোলনে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ না করার প্রস্তাব পেশ করেন। তখন হযরত কাসেম নানুতুবি এর বিরোধিতা করে বলেন, আমরা কি আসহাবে বদর থেকেই বেশি নিঃস্ব হয়ে পড়েছি?
হযরত হাজী সাহেব এ কথা শুনে উৎফুল্ল হয়ে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! বিয়য়টির সমাধান হয়ে গেছে।
এরপর সকলে মিলে জিহাদের প্রস্তুতি শুরু করেন। হাজী ইমদাদুল্লাহকে এই জিহাদ-সংগ্রাম ও নির্দিষ্ট এলাকার আমীর, মাওলানা কাসেম নানুতুবিকে সিপাহসালার ও মাওলানা রশিদ আহমাদ গাংগুহিকে কাজী নির্বাচিত করা হলো আর থানাভনকে দারুল ইসলাম ঘোষণা করা হলো। 

Facebook Comments