আহনাফ ইবনে কায়স: বীরত্বে যুগ যেন তার কাছে হার মেনেছিল | মঈনুদ্দিন তাওহীদ

ahnaf

১.

নবীজি তখন মদীনায়। কাফেরদের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে। আরবের পথ এখন মুসলমানদের জন্য অনেকটাই নিরাপদ। নবীজি এই সুযোগে সাহাবায়ে কেরামকে দলে-দলে ভাগ করে বিভিন্ন গোত্র, গোত্রপতি আর অনারব রাজাবাদশাদের নিকট পাঠাতে থাকেন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে।

নবীজির নির্দেশে একটি দল ছুটে যায় বনু তামীমে। তাদেরকে আহবান জানায় ইসলামের পথে।
ইসলাম সম্পর্কে তখন অনেকেরই জানাশোনা ছিল। তবুও গোত্রের লোকেরা কি করবে না করবে—দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়। কিছুতেই তারা চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে না।

জনগণের মধ্য থেকে হঠাৎ এক ব্যক্তি ভরাটগলায় সাহসী কণ্ঠে বলে উঠলেন, “লোক সকল, তোমরা এত আগপিছ কী ভাবছ, কেন এত দোদুল্যমনতায় ভুগছ?! আল্লাহর শপথ করে বলছি, এই দলটি কোনো অকল্যাণ নিয়ে আসেনি, তারা কল্যাণের বার্তাবাহী হয়ে এসেছে। তারা তোমাকে সদাচরণের দিকে আহবান করছে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করছে। আমি তো তাদের থেকে খারাপ কিছু শুনছি না! তোমরা দ্বিধাদ্দ্বন্দ্বে না থেকে তাদের আহবানে সাড়া দাও; ইহকাল ও পরকালের সফলতা দুহাতভরে অর্জন করো।’
স্বদলীয় তরুণের এমন বক্তব্যে গোত্রের অন্যান্য সকলে দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে আশ্রয় নেয় ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে।

বয়সে অল্প হওয়ার কারণে এই তরুণ রাসূলের দর্শন লাভ করতে পারেননি। তবে তিনি রাসূলের দুআ পেয়েছিলেন। সাহাবীদের সেই দলটি রাসূলের কাছে গিয়ে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পেশ করলে, নবীজি প্রভুর দরবারে প্রার্থনা করে বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দাও!’

২.
বেশ কিছু দিন হলো হাসানের সাথে মধ্যস্ততা করে খিলাফতের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এক সময়ের দাপুটে প্রদেশপাল, বহু রণাঙ্গনের সমর বিজেতা, ইসলামী নৌবাহিনীর উদ্ভাবক, কাতিবে রাসূল মুআবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুমা। তার খিলাফত লাভের পর থেকেই ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রতাপ আর জাগতিক জৌলুস তড়তড় করে বেড়েই চলেছে।

সিরিয়ায় তখন বসন্তের আমেজ। ঘন সবুজ পত্র পল্লবে সুশোভিত হয়ে আছে পাহাড়ের ওপারে হারিয়ে যাওয়া দিগন্ত। নারগিস ফুলসহ নাম না জানা অসংখ্য ফুলের ঘ্রাণে মৌ-মৌ করছে শামের বরকতমন্ডিত পরিবেশ।
খলিফা মুআবিয়া অন্যন্য বছরের মতো এ বছরও আয়োজন করেছেন সাম্রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আতিথেয়তার আয়োজন। এ আয়োজনে সম্মানিত ব্যক্তিদের বরণ করে নেওয়া হয়, জ্ঞানের আসর বসে, জমে ওঠে হাদীসে নববীর চর্চা-জলসা।

নানান সাজসজ্জায় খলিফার কার্যালয়ের রওনক বৃদ্ধি করা হয়েছে। দরজা আর খিলানে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে উন্নতমানের পর্দা। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবেশ করবেন সাম্রাজ্যের মর্যাদাবান ব্যক্তিরা। এদিকে পর্দার ওপার উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক নারীমুর্তি। এ পাশ থেকে বোঝার কোনো সুযোগ নেই। তবে ওপাশ থেকে দরবারের দৃশ্য পরিস্কার দেখা না গেলেও কথাবার্তা স্পষ্ট শোনা যায়। দাঁড়িয়ে থাকা রমণী আর কেউ নন; খলিফার বোন উম্মু হাকাম ।

উম্মু হাকাম একজন বুদ্ধিমতী রমণী। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন তার ভাইয়ের স্বভাব-চরিত্র। ব্যক্তিকে তার যোগ্যতা অনুসারে মর্যাদা দেওয়া যে তার ভাইয়ের অনুপম গুণ; এ কথা তার অজানা ছিল না।

এখনই খুলে যাবে দরবারের কপাট। প্রবেশ করবে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। খলিফার অভ্যাস এবং উম্মু হাকামের ধারণা অনুযায়ী প্রথমে প্রবেশ করার কথা সাহাবীদের। তারপর তাবেয়ী, তারপর তাবে তাবেয়ী। এভাবে ক্রমান্বয়ে দরবারের আসন অলঙ্কৃত করবেন এক স্তর থেকে অন্য স্তরের প্রভাবশালীগণ।

কিন্তু না। কোনো সাহাবী নন; খলিফা প্রথমেই একজন সাধারণ মানুষকে বরণ করে নিচ্ছেন। উম্মু হাকাম আরো আশ্চর্য হলেন, যখন শুনলেন তার ভাই বরিত সেই ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ‘আমি তো আপনাকে সিফফিন যুদ্ধের দিন আলী ইবনে আবী তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাহিনীত দেখেছিলম। দৃশ্যটি আমার একদম পসন্দ হয়নি।’

বরিত ব্যক্তির চেহারায় কোনো ভাবান্তর নেই। শান্ত অথচ দৃৃঢ়কণ্ঠে খলিফাকে লক্ষ করে বললেন, ‘মুআবিয়া, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমার হৃদয়ে আপনার প্রতি যে অসন্তোষ ছিল, তা আজও দাউদাউ করে জ্বলছে। আপনার বিরুদ্ধে আমরা যে তরবারীর ঝলক দেখিয়েছি, তা আজও আমাদের কোষে ঝুলছে। আপনি যদি লড়াই করতে এক হাত এগিয়ে আসেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমরা দুই হাত ছুটে যাব। খোদার কসম, আমি কখনোই আপনার থেকে কোনো উপঢৌকনের প্রত্যাশা করি না, আপনার অত্যাচারকেও সামান্যতম ভয় পাই না। আমি তো কেবল ঐক্য, সম্প্রীতি এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ একটি পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে এসেছি।’

কথাগুলোর বলার শেষ মুহুর্তে তার কণ্ঠ রুক্ষ হয়ে ওঠে। রাগে গজগজ করতে করতে তিনি দরবার থেকে বেরিয়ে যান। খলিফা অবাক! হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পর্দার আড়ালে থাকা উম্মু হাকাম। কে এই বীর ব্যক্তি, খলিফার সামনে এমন নির্ভয় আচরণ। দ্যর্থহীন কণ্ঠে সত্য জানিয়ে দেওয়া এই সুপুরুষ কে? জানতেই হবে। উম্মু হাকাম পর্দা সরালেন। তাকিয়ে দেখেন এক জীর্ণকায়, অমশ্রিণ দেহ, বিক্ষুব্ধ নেত্রের এক ব্যক্তি হনহন করে বেরিয়ে যাচ্ছে। উম্মু হাকাম খলিফাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমীরুল মুমিনীন, খলিফার সামনে রুদ্রস্বরে কথা বলা এই ব্যক্তি কে?”

মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু তখনো তার ফিরে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। বোনের প্রশ্নে চকিত হয়ে শান্ত অথচ ভারি গলায় বলে উঠলেন, ‘সে এমন ব্যক্তি, যখন সে রাগ হয়, তার সাথে বনু তামিমের এক লাখ লোক ক্রোধে ফেটে পড়ে, অথচ তারা জানারও প্রয়োজন মনে করে না কেন সে ক্রুদ্ধ হয়েছে। এই ব্যক্তির নাম আহনাফ ইবনে কায়স। গোটা আরবের সম্মানিত ব্যক্তি। একের পর সমরবিজেতা বীর সেনানী।” [১]
সূত্র : [১] ওয়াফায়াতুল আইয়ান : 2/186।

Facebook Comments