সংকলন
মাহদি হাসান সালাফ পরিচিতি

আমের ইবনু শুরাহবিল | মাহদি হাসান

চলছে বনু উমাইয়ার শাসনকাল। খেলাফতের মসনদে আসীন আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান। প্রতিদ্বন্দ্বী রোমের সম্রাটের কাছে এক দূতকে পাঠালেন তিনি। জরুরী বার্তা নিয়ে।

এই দূতই আমাদের গল্পের নায়ক। তিনি কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন। একজন বর্ষীয়ান আলেম। সাধারণত দূতেরা কোথাও গিয়ে বেশীদিন অবস্থান করতেন না। কিন্তু সে যাত্রায় রোমে তাঁর অবস্থান দীর্ঘায়ত হয়। অবশেষে ফেরার পালা আসে যখন, তখন রোম সম্রাট সেই দূতকে লক্ষ্য করে বলেন, আপনি কি রাজবংশের কেউ? দূত উত্তর দিলেন, না। বরং আমি সাধারণ একজন মুসলিম। রোম সম্রাট তখন তাঁর হাতে একটি চিরকুট তুলে দেন। বলেন, আপনি যখন উমাইয়া খলিফাকে জবাবি চিঠি পৌঁছাবেন, এর সাথে এই চিরকুটটিও দিবেন।

অতঃপর ফিরে আসেন সেই দূত। খলিফার হাতে তুলে দেন রোম সম্রাটের জবাবি চিঠি। কিন্তু তিনি ভুলে যান সেই চিরকুটটি দিতে। অতঃপর তাঁর স্মরণে এলে তিনি খলিফার হাতে চিরকুটটি পৌঁছে দেন। খলিফা তা পাঠ করার পর তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, এটি দেয়ার সময় সম্রাট কি কিছু বলেছে? তিনি তখন প্রশ্নোত্তর পর্বের ঘটনা বিবৃত করেন। তারপর খলিফা জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি চিরকুটটি পড়েছেন? তিনি বললেন, না। খলিফা তাঁকে চিরকুটটি পড়তে বললেন। তাতে লেখা ছিল, ‘ঐ জাতির প্রতি আমি বিস্ময়বোধ করি, যাদের মধ্যে এর মতো ব্যক্তিত্ব থাকতেও তাঁরা অন্য কাউকে ক্ষমতায় বসায়।’

এই মনীষীর জন্ম কুফায়। ১৬ হিজরি মতান্তরে ২০ হিজরিতে। তখন চলছে উমর রাঃ এর খেলাফতকাল। খলিফা ইবনু খাইয়াত বলেন, তাঁর এবং হাসান বসরির জন্ম একই বছর হয়েছিল।

কেনইবা তিনি বিদগ্ধ হয়ে উঠবেন না। সান্নিধ্য পেয়েছিলেন আলি, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস, সাইদ ইবনু যায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস, ইবনু উমর এবং উসামা ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখ পাঁচশত সাহাবির। ইমাম মাকহুল, আতা ইবনুস সায়িব এবং ইমাম আবু হানিফার হাম্মাদ ইবনু আবি সুলাইমানের মতো জগদ্বিখ্যাত নক্ষত্র ছিলেন তাঁর শিষ্য। ইমাম আবু হানিফাও পেয়েছিলেন তাঁর সান্নিধ্য।

ইলমে আমলে তিনি এতটাই উৎকর্ষ লাভ করেন যে, তিনি হয়ে উঠেন নিজ সময়ের আলিমদের শীর্ষ চারের একজন। ইমাম যুহরি রহ. বলেন, আলিম হলেন চারজন। মদিনায় সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব, কুফায় শাবি, বসরায় হাসান বসরি এবং শামে মাকহুল।

ইমাম মাকহুল বলেন, আমি শাবির চেয়ে অধিক বিজ্ঞ কাউকে দেখিনি।

আবু হুসাইন বলেন, আমি শাবির চেয়ে অধিক প্রাজ্ঞ এবং ধীশক্তিসম্পন্ন কাউকে দেখিনি।

আল্লামা ইবনু সিরীন বলেন, আমি যেদিন কুফায় আসি সেদিন ইমাম শাবির মজলিসে অনেক লোকের সমাগম দেখেছি। অথচ তখনো অনেক সাহাবি জীবিত ছিলেন।

আমাদের গল্পের এই নায়ককে সকলে চিনে ইমাম শাবি নামে। তাঁর পুরো নাম আমের ইবনু শুরাহবিল ইবনু আবদ ইবনু যি কিবার আবু আমর আল-হামদানি আশ-শাবি। ৮৭ বছরের এক বর্ণাঢ্য জীবন শেষে কুফায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ১০৩ হিজরি মতান্তরে ১০৪ হিজরিতে। মৃত্যুর আগে রেখে যান ইলম এবং আমলের অসাধারণ কীর্তি। যা তাঁকে চিরভাস্বর করে রেখেছে উম্মাহর মনের আকাশে।

সুত্র:

(১) সিয়ারু আলামিন নুবালা।
(২) হিলইয়াতুল আউলিয়া৷
(৩) আখবারুল কুজাত।
(৪) তবাকাতু খলিফা ইবনি খাইয়াত।
(৫) আল-ওয়াফি বিল ওফায়াত৷
(৬) ওফায়াতুল আইয়ান।

Facebook Comments

Related posts

আবুল হাসান বুশানজি রহ. | মাহদি হাসান

সংকলন টিম

সমকালীন জনজীবনে সালাফদের প্রভাব: পর্ব -৩ | ইমরান রাইহান

সংকলন টিম

সালাফদের ইলমচর্চা | ইমরান রাইহান

সংকলন টিম

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: