মাদরাসা বলতে আমরা বুঝি এমন ব্যবস্থাপনাকে যেখানে ছাত্রদের থাকার জন্য ভবন এবং তাদের প্রয়োজনীয় সকল উপকরণের ব্যবস্থা রয়েছে। যার দেখাশোনার সাথে জড়িত আছেন আলিমগণ। যারা একান্তভাবে দরস-তাদরিসে নিয়োজিত।

চতুর্থ হিজরি শতাব্দী পর্যন্ত জামে মসজিদ্গুলোই ইলম শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গণ্য ছিল। ইলমচর্চার প্রধান কেন্দ্র ছিল তখন মসজিদে মসজিদে শাইখগণের মজলিস। এ মজলিস থেকেই শাইখগণ নিজেদের সুযোগ্য শাগরিদ গড়ে তুলতেন। সে সময়ে শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর ছিল শাইখের কাছ থেকে লিখে নেয়া। তবে কালের বিবর্তনে এসে তালিবুল ইলমের থাকা-খাওয়ার এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের সুব্যবস্থার জন্য পৃথক দরসগাহ নির্মাণের প্রচলন হয়। এভাবেই শুরু হয় বর্তমান মাদরাসা ব্যবস্থার প্রচলন।

ইসলামি ইতিহাসে মাদরাসাব্যবস্থার সূচনা এবং প্রথম নিয়মতান্ত্রিক মাদরাসা কোনটি, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ এবং জ্ঞানীদের মাঝে আছে মতানৈক্য। তাদের কারো দাবি হচ্ছে নিজামুল মুলকের সময়েই এই মাদরাসাব্যবস্থার উৎপত্তি, যিনি ৪৫৯ হিজরিতে মাদরাসায়ে নিজামিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে অন্যদের দাবি হচ্ছে এর আরও অনেক আগেই মাদরাসাব্যবস্থার সূচনা হয়েছে।

ঐতিহাসিক উৎস এবং বিশেষায়িত গ্রন্থাবলীর বরাতে আমরা জানতে পারি যে, দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দীর সমাপ্তি এবং তৃতীয় হিজরি শতাব্দীর সূচনালগ্নে এসে সর্বপ্রথম মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। বুখারার প্রসিদ্ধ ফকিহ ইমাম আবু হাফসের (১৫০-২১৭ হিজরি) হাতে এ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর প্রাচ্যের দেশগুলোতে শুরু হয়ে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার এ ধারা। হিজরি চতুর্থ শতাব্দির শুরুতেই নিশাপুরে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থ ‘সহিহু ইবনি হিব্বান’ রচয়িতা ইমাম আবু হাতিম মুহাম্মাদ ইবনু হিব্বান আত-তামিমি আশ-শাফিয়ি (২৭০-৩৫৪ হিজরি)। [আল-ইদারাতুত তারবুওইয়্যাহ ফিল মাদারিস: মুহাম্মাদ আলি আর-রুজুব, ৯৪]

সে সময়ের প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাগুলো ছিল মাজহাবের ভিত্তিতে। যেগুলোতে শুধু নির্দিষ্ট একটি মাজহাবের শিক্ষা প্রদান করা হতো। কারণ, আব্বাসীয় খেলাফতের সময় বাগদাদে যে মাজহাবভিত্তিক প্রতিযোগিতা চলছিল, তা বিস্তৃত মাওরায়ান্নাহার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। [আল-মাদরাসাতু মাআত তারকিজি আলান নিজামিয়্যাত: হুসামুদ্দিন আস-সামাররাই, ৩৩৬.৩৩৭]

তবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কথা হচ্ছে, বাগদাদে মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে দামেস্কে মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ৩৯১ হিজরিতেই সেখানে প্রথম মাদরাসা প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হয়। প্রতিষ্ঠাতা সাদির ইবনু আবদুল্লাহর দিকে সম্বন্ধ করে এ মাদরাসাকে আল-মাদরাসাতুস সাদিরিয়্যাহ বলা হয়। তাঁর পরবর্তীতে চতুর্থ শতাব্দীর গণ্ডিতেই রাশা ইবনু নাসিফ প্রতিষ্ঠা করেন ‘আল-মাদরাসাতুর রাশাইয়্যাহ’। এ সকল মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ফলে ইতোপূর্বে যে সকল তলাবা মসজিদের দরসি মজলিসগুলোতে অংশগ্রহণ করতো, সেখান থেকে তারা নির্দিষ্ট একটি স্থানে অবস্থান করে ইলম চর্চার সুযোগ পেয়ে যায়। তাদের জন্য এবং তাদের শায়খগণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সম্পদ ওয়াকফ করা হয় এবং তালিবুল ইলমগণের জন্য পর্যাপ্ত ইলমি উপকরণও রাখা হয়। [নিজামুত তালিম ইনদাল মুসলিমিন: আরিফ আবদুল গনি, ৮৯]

মাদরাসায়ে নিজামিয়ার আগে যে সকল মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছে ইতিহাসের কবর থেকে উদঘাটন করি চলুন সে সকল মাদরাসার এক ঝলক। তবে ঐতিহাসিক উৎসগুলোতে এ সকল মাদরাসার ব্যাপারে খুব বেশি কিছু জানা যায় না।

এক. মাদরাসাতুল ইমাম আবু হাফস ফকিহুল বুখারা (১৫০-২১৭ হিজরি)

প্রতিষ্ঠাতা আবু হাফস ছিলেন আবু হাফস আল-কাবির নামে প্রসিদ্ধ। তিনি ছিলেন হানাফি মাজহাবের দুই বিখ্যাত ইমাম আবু ইউসুফ এবং মুহাম্মাদ রহিমাহুল্লাহুর ছাত্র। তিনিই মাওরায়ান্নাহার অঞ্চলে ইমাম মুহাম্মাদ রচিত ‘আল-মাবসুত’ এবং ‘আল-মাখারিজু ওয়াল হিয়াল’ গ্রন্থদ্বয়ের প্রচার করেন। ইমাম বুখারি ছিলেন তারই সামসময়িক। ফকিহ আবু হাফস ইমাম বুখারিকে ফতোয়া প্রদানে নিষেধ করেছিলেন। এর ফলেই ইমাম বুখারিকে বুখারা ত্যাগ করতে হয়েছিল। শুরুতে এটি ছিল মাশইয়াখা । যেখানে একজন শায়খ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা হতো। অতঃপর পঞ্চম হিজরি শতাব্দীতে এসে এটি মাদরাসায় পরিণত হয়। তাঁর পুত্র আবু হাফস সগিরও ছিলেন হানাফি মাজহাবের একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি। যার রচনাসম্ভার ছিল অনেক সমৃদ্ধ। [মাশইয়াখা ও মাদরাসাতু আবি হাফসিল কাবিরিল হানাফিয়্যাহ ফি বুখারা: ডক্টর আবদুর রাজ্জাক আহমাদ ওয়াদি আস-সামাররাই]

দুই. মাদরাসাতু ইবনি হিব্বান

প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থ ‘সহিহ ইবনি হিব্বান’ রচয়িতা আবু হাতিম ইবনু হিব্বান আল-বুসতি ছিলেন এ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা। চতুর্থ হিজরি শতাব্দীর শুরুতে ৩০৫ হিজরির দিকে তিনি নিজ শহর বুসতে (বর্তমান লাশকার গহ, আফগানিস্তান) একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। সেখানে তিনি তাঁর গ্রন্থভাণ্ডার রাখেন এবং ছাত্রদের জন্যও আলাদা কক্ষ নির্ধারণ করেন। এখান থেকেই এই মাদ্রাসার সূচনা।

তিন. মাদরাসাতু আবিল ওয়ালিদ

শাফেয়ি মাজহাবের আলিম আবুল ওয়ালিদ হাসসান ইবনু আহমাদ নিশাপুরিকে এ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা গণ্য করা হয়। ৩৪৯ হিজরিতে ইন্তেকালের পূর্বে তিনি নিজ শহর নিশাপুরে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। জানা যায়, মাদরাসাটির প্রতি তিনি ছিলেন খুবই আসক্ত।

চার. মাদরাসাতু মুহাম্মাদ ইবনি আবদুল্লাহ ইবনু হাম্মাদ

এ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু হাম্মাদ ইন্তেকাল করেন ৩৮৮ হিজরিতে। ইন্তেকালের আগে তিনি এই মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। ইমাম তাজুদ্দিন সুবকি তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, তিনি মসজিদ এবং মাদরাসার সাথে সম্পৃক্ত থেকেই দুনিয়া ত্যাগ করেন।

পাঁচ. আল-মাদরাসাতুস সাদিরিয়্যাহ

৩৯১ হিজরিতে আমির শুজাউদ্দৌলা সাদির ইবনু আবদুল্লাহ দামেস্ক শহরে এ মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। দামেস্কের বিখ্যাত উমাইয়া মসজিদের পশ্চিমপ্রান্তে অবস্থিত। এখানে প্রথম দরস প্রদান করেন ইমাম আলি ইবনু জিনকি আল-কাশানি। [আদ-দারিস ফি তারিখিল মাদারিস: ১/৪১৩]

ছয়. আল-মাদরাসাতুল বাইহাকিয়্যাহ

উজির নিজামুল মুলকের জন্ম হয় ৪০৮ হিজরিতে। তারও প্রায় এক যুগ আগে নিশাপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় আল-মাদরাসাতুল বাইহাকিয়্যাহ। তাজুদ্দিন সুবকি তাঁর উস্তাদ ইমাম শামসুদ্দিন জাহাবির বরাতে এমনটিই উল্লেখ করেছেন। [আত-তবাকাতুশ শাফিইয়্যাহ]

সাত. মাদরাসাতু আবি বকর আল-বুসতি

প্রতিষ্ঠাতা আবু বকর আল-বুসতি ইন্তেকাল করেন ৪২৯ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি ছিলেন নিশাপুরের একজন প্রসিদ্ধ শিক্ষাবিদ এবং তার্কিক। নিশাপুরের জ্ঞান অন্বেষীর জন্য তিনি নিজ গৃহে এই মাদরাসাটি নির্মাণ করেন এবং নিজস্ব সম্পদ থেকে ওয়াকফ করেন।

আট. মাদরাসাতুল ইমাম আবি হানিফা

এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহু এর সমাধির পাশে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আবু সাদ ইবনুল মুসতাওফা। মাদরাসায়ে নিজামিয়্যাহ চালু হওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পূর্বে এ মাদ্রাসার আনুষ্ঠানিক দরস শুরু হয়। [আত-তালিমুল ইসলামি বাইনাল ইসালাতি ওয়াত তাজদিদ: ফারুক আস-সামাররাই, ৩৫১]

নয়. আল-মাদরাসাতুস সা’দিয়্যাহ

নাসর ইবনু সবুক্তগীন ছিলেন গজনভী সাম্রাজ্যের নিযুক্ত একজন প্রশাসক। তিনি নিশাপুরের প্রশাসক থাকাকালীন সময়ে সেখানে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর নাম রাখেন ‘আল-মাদরাসাতুস সা’দিয়্যাহ। [আল-খুতাত: মাকরিজি]

এসবই ছিল উজির নিজামুল মুলকের প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত মাদরাসায়ে নিজামিয়্যাহর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হওয়া মাদ্রাসা। নিজামুল মুলক এসে তার সম্মুখে এ সকল মাদরাসার নমুনা দেখতে পান। অতঃপর সালজুক সম্রাট আলপ আরসালানের প্রত্যক্ষ মদদে উজির নিজামুল মুলক বাগদাদে প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত মাদরাসায়ে নিজামিয়্যাহ। যার অন্যতম উদ্দেশ্যে ছিল ক্রমাগত ফিতনা ছড়াতে থাকা শিয়ায়ে ইসমাইলিয়্যাহ এবং বাতেনিয়্যাহদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

Facebook Comments