সালাফ পরিচিতি

বারকে খান ও সোনালি সাম্রাজ্য | সেলিম আব্দুল্লাহ

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

এক.
ওরা যাযাবর। ঘুরে বেড়ানোই ওদের কাজ। স্থিতি নেই কোথাও। নেই স্থায়ী কোনও ঠিকানাও। শুধুই চলতে থাকে ওরা। কখনও পূর্বে, কখনও পশ্চিমে। কখনও উত্তরে, কখনও দক্ষিণে। যেখানে রাত হয় সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। পশু-পাখি আর তৃণলতাই ওদের প্রধান খাবার। এ খেয়েই ওরা বেঁচে থাকে।
বংশীয় পরম্পরায় ওরা তুর্কি। আর তুর্কির একটি শাখা হলো কিমাক। সেই কিমাক শাখার ‘কিপচাক’ সম্প্রদায়ই ওদের মূল গোত্র। [১]

বেশ লম্বা সময় ধরে ওরা সংখ্যায় অনেক অল্প। কিন্তু এগারোশো খ্রিস্টাব্দে পদার্পণ করতেই ওরা ফুলেফেপে ওঠে। ওদের সাথে যোগ দেয় অসংখ্য বেদুইন। সখ্যায় বৃদ্ধি পেয়ে অস্থির হয়ে পড়ে ওরা। নির্দিষ্ট কোথাও স্থির হতে চায়। সম্প্রদায়ের মোড়লরা পড়ে বিপাকে। ওরা জানে— বেদুইনদের কোনও স্থিতি নেই। ওদের স্থির হওয়ার অর্থই হলো পঙ্গু হয়ে যাওয়া। কিন্তু মোড়লদের কিচ্ছু করার নাই। সাধারণরা চাইলে সবকিছু করতে পারে। চাইলে মোড়লদের খুন করে ওদের স্থান দখল করে নিতে পারে; বিদ্রোহ একবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেই হলো, ব্যাস; আর কিছুই লাগবে না। এজন্য মোড়লরা একরকম বাধ্য হয়ে কোথাও স্থির হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ওদের বসতভিটা হবে কোথায়? বেদুইনদের বসতির জন্য চাই সুবিশাল খোলা ময়দান। চাই দিগন্ত বিস্তৃত স্তেপ। হিজিবিজি জায়গায় অবস্থান করলে ওদের দম বন্ধ হয়ে যাবে, ওরা মারা পড়বে। তাহলে উপায়?

বেদুইনরা ছুটে চলে। খুঁজতে বেরোয় বসতভিটা। চলতে চলতে পৌঁছে যায় খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য ও ট্রান্সঅক্সানিয়ার [২] একদম উত্তরে। যার অদূরেই ভলগা নদীর তীর। দূর থেকে ওদের দৃষ্টিগোচর হয় বালুময় বিস্তৃত প্রান্তর। আরও কিছুদূর পথ মাড়িয়ে ওরা ঠিক সেখানে গিয়ে পৌঁছে। জায়গাটি পছন্দ হয় ওদের। ওখানেই বসতি গড়ে তোলে এবং নির্বিঘ্নে বসবাস শুরু করে। কিন্তু এই অনুর্বর বালুময় মাটিতে ওরা কতদিন টিকে থাকবে? ভাববার বিষয়।
কিছুদিন পর ওরা ঠিকই বিষয়টি নিয়ে ভাবে এবং জীবন-যাপন নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকে। একদিন তারা আবার চলতে শুরু করে। বেরিয়ে পড়ে উর্বর স্তেপের খোঁজে। তেপান্তরের খানা-খন্দক মাড়িয়ে গিয়ে পৌঁছে “ইতাল” ও “ইরতাশ” নদীর মধ্যবর্তী স্থানে। জায়গাটি বেশ উর্বর; চারিদিকে তৃণলতার ছড়াছড়ি, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। এসব দেখে ওরা মুহূর্তেই সিন্ধান্ত নেয়— এখানেই থাকবে। সেমতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পুরো দমে কাজ শুরু করে দেয়…
ওদের বসবাসের কারণে জায়গাটির নাম হয়ে যায় ‘কিপচাক মরুভূমি’। অথচ কদিন পূর্বেই জায়গাটির নাম ছিল ‘গাজান মরুভূমি’। [৩]

এভাবেই কিপচাক জাতি কঠোর ভৌগলিক পরিবেশে বেড়ে ওঠে। ঘনঘন জায়গা বদল ও গতিশীলতা ওদেরকে বানিয়ে দেয় শক্তিশালী আর দুর্বার। [৪]

দুই.
ওরা যাযাবার। তাই ওদের দীন-ধর্মের কোনও বালাই নেই। মূর্তিপূজাই ওদের মূল ধর্ম। কিন্তু তুর্কি খাওয়ারিজমদের বসবাস অতি নিকটে হওয়ায় ধীরে ধীরে ওদের ওপর ইসলামের প্রভাব পড়তে থাকে। এছাড়াও ওদের প্রতিবেশী তখন বুলগেরিয়ান মুসলমান। তবে হ্যা, এটাও সত্য যে— রাশিয়া ও পশ্চিম ইউরোপ থেকে আসা খ্রিস্টানদের উত্থাপিত ইসায়ি ধর্মের চক্করেও ওরা ঘুরপাক খেতে থাকে। [৫]

কিপচাকরা অনেক সাহসী হওয়া সত্ত্বেও ওরা অবাধ্য নয়। ওদের রক্তে নেই দাগাবাজি। স্বচ্ছ মানসিকতা নিয়ে ওরা চলাফেরা করে। বিখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল আব্বাস আল কালকাশান্দি বলেন—
”কিপচাক অত্যন্ত অনুগত ও সাহসী জাতি। ওরা বিশ্বাসঘাতকতা করে না। সহজ-সরল। মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব ও ভালো ইমেজের কারণে ওদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়”। [৬]

একপর্যায়ে এই সহজ-সরল বেদুইনরা বৈদেশিক সম্পর্কের বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ে। আক্রমণ চালায় প্রতিবেশী খাওরিজম সাম্রাজ্যের ওপর এবং ওদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য কারাজ (জর্জিয়া) রাজ্যের সাথে জোটবদ্ধ হতে বাধ্য হয়। এই হাঙ্গামার মাঝেই ওরা নিয়ন্ত্রণ করে নেয় “ডারবেন্ট” এলাকা। [৭]

এরপর থেকে ওদের পিছনে একটার পর একটা যুদ্ধ লেগেই থাকে। এমনকি রাশিয়া ওদের পার্শ্ববর্তী ভূখণ্ড হওয়ায় তাদের সাথেও যুদ্ধ বাঁধে। রাশিয়ানরা পেরে ওঠতে না পেরে ভরকে যায় এবং বিপদ এড়াতে কিপচাকদেরর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু বাস্তবে ওরা কিপচাকদের পিছু ছাড়ে না। নিজেদের সুবিধার্থে এবং কিপচাকদের ঘায়েল করতে ওদের বিরুদ্ধাবাদী বাইজেন্টাইনদের সাথে মিতালী করে। কিন্তু এতে রাশিয়ানরা বেশি সুবিধে করতে পারে না। কারণ এরই ভেতর কিপচাক জাতিগোষ্ঠি ৬০০ হিজরি মোতাবেক ১১০৪ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব ইউরোপের কিয়েভে হামলা করে এবং বসফরাস ও ব্লু ওসানের উপকূল দখল করে নেয়। এতে করে রাশিয়ানরা বাইজেন্টাইনদের সাথে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়।

একপর্যায়ে রাশিয়া ও কিপচাকদের এই দীর্ঘ যুদ্ধ উভয় পক্ষকেই ক্লান্ত করে দেয়। আর এ বিষয়টি তাদের অজান্তেই অপ্রতিরোধ্য ও তৃষ্ণার্ত মঙ্গোলদেরকে ৬২০ হিজরি মোতাবেক ১২২৩ খ্রিস্টাব্দে উভয়ের ওপর বিজয়ী হওয়ার সুযোগ এনে দেয়। [৮]

তিন.
এসব যুদ্ধের মাঝেও ওরা ওদের স্তেপের উর্বতার প্রতি দৃষ্টি দেয়। কারণ বিস্তৃত অঞ্চলটির প্রচুর চারণভূমি তাদের আয়ের পথকে সুগম করে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো— এলাকাটি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। অন্যসব এলাকায় প্রচণ্ড গরম বা প্রবল শীতে মানুষ যখন অতিষ্ঠ, সে সময় কিপচাকরা নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় আনন্দে উদ্বেলিত। বলা চলে— ওদের এলাকায় শীতাকালে গরম পড়ে আর গ্রীষ্মকালে পড়ে শীত।
এজন্য ওদের অঞ্চলে আমদানি রপ্তানি বেশ ভালোভাবে শুরু হয়। বাণিজ্যিক শহর হিসেবে সবচে উপযুক্ত ও সুপ্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে ‘সাওদাক’। [৯]

অঞ্চলটি উর্বর হওয়ায় সেটা চাষাবাদেরও অনেক উপযুগি হয়ে ওঠে। এমনকি ধীরে ধীরে কিপচাক অঞ্চল চাষাবাদে প্রসিদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয়— প্রতি বছরই প্রচণ্ড জলবায়ু ফসলের যারপরনাই ক্ষতি সাধন করে। যে ক্ষতি কোনওভাবেই ওরা পুষিয়ে নিতে পারে না। যদ্দরুন বিষয়টি জনগণের আর্থ-সামাজিক জীবনে প্রচুর প্রভাব বিস্তার করে। একপর্যায়ে তারা তাদের জীবন-যাপনের লক্ষ্যে এবং জীবন বাঁচিয়ে রাখতে আপন সন্তানদের বিক্রি করতেও বাধ্য হয়। [১০]
কিন্তু তখন কি তারা ঘুণাক্ষরেও টের পেয়েছিল যে, এ বিষয়টিই তাদের দেশকে আইয়ুবিদের শাসনামলে দাস রপ্তানির একটি অঞ্চল হিসাবে গড়ে তুলবে?

চার.
৬২০ হিজরি মোতাবেক ১২২৩ খ্রিস্টাব্দ। কুখ্যাত চেঙ্গিস খানের বড় ছেলে জোচি খানের চোখ পড়ে কিপচাকদের ওপর। সাথে সাথেই মঙ্গোলিয়ান আক্রমণ চালায়। একেবারে নাস্তানাবুদ করে দেয় ওদের। তবে সম্পূর্ণ শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেয় না; বিপচাকদের হাতেই রেখে দেয়। তবুও তখন থেকেই কিপচাকরা মঙ্গোলদের আওতাধীন হয়ে যায়, তখন থেকেই ওদেরকে বিবেচনা করা হয় মঙ্গোলদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনগণ হিসেবে।

এরপর রাশিয়া ও কিপচাক জাতি চেঙ্গিস খানের নাতি বাতু বিন জোচির মাধ্যমে ৬৩৬ হিজরি মোতাবেক ১২৩৮ খ্রিস্টাব্দে পূর্ণরূপে পরাজিত হয়। কিপচাকের খাকানরা হাঙ্গেরির দিকে পালিয়ে বাঁচে। [১১] ফলে তাদের সাম্রাজ্য একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর থেকে এই জাতি মোঙ্গলদের সাথে এমনভাবে মিশে যায় যে, তাদেরকে মোঙ্গলদের থেকে নির্দিষ্ট করে চেনা দুষ্কর হয়ে পড়ে। বলা চলে— তারা মোঙ্গলদের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যায়। যদ্দরুন তারা ধীরে ধীরে মোঙ্গলদের রাজত্ব ও সালতানাতের অংশীদার হয়ে যায়।

তথ্যসূত্র এবং টীকাঃ

[১] আতা জুবাইদা, আত তুরক ফিল উসুরিল উসতা, দারুল ফিকরিল আরাবি, পৃষ্ঠা: ৬।
[২] মধ্য এশিয়ার অংশবিশেষের প্রাচীন নাম। বর্তমান উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, দক্ষিণ কিরগিজস্তান ও দক্ষিণপশ্চিম কাজাখিস্তান জুড়ে এই অঞ্চল বিস্তৃত… আরবরা একে ‘মাওয়ারা উন নাহর’ বলত, যার অর্থ; নদীর অববাহিকা। ইরানিদের কাছে এই অঞ্চল তুরান বলে পরিচিত ছিল।
[৩]আল গাজ বা গাজানরাও তুর্কি উপজাতি; যারা চীনের সীমানা থেকে ক্যাস্পিয়ান সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত স্তেপে বসবাস করত এবং বুখারা-সমরকন্দের সামানি সাম্রাজ্যেরর সাথে যোগাযোগ থাকার কারণে একপর্যায়ে তারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মুহাম্মদ সুহাইল তুকুশ, এশিয়া মাইনরে রোমের সেলজুকিদের ইতিহাস, দারুন নাফায়েস, বৈরুত, ২০০২, পৃষ্ঠা ১৫।
[৪] ভ্যাসিলি বার্থোল্ড, তারিখুত তুরক ফি আসিয়াল উসতা, তাহকিক; আহমাদ আস সাইদ সুলাইমান, মিশরীয় জেনারেল বুক অথরিটি, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা: ১৩৩।
[৫] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৯৪।
[৬] আবুল আব্বাস আল কালকাশান্দি, সুবহুল আ’শা ফি সানাআতিল ইনশা, আল মাতবায়াতুল আমিরিইয়া, কায়রো, ১৯১৪, পৃষ্ঠা: ৪৫৬।
[৭] ডারবেন্ট; এটি ‘ডারবেন্ট শেরওয়ান’ নামে পরিচিত, শহরের দ্বার; যা নির্মান করেছিল পার্সিয়ান রাজা “অনুশেরওয়ান” বা প্রথম খসরু। পরবর্তি সময়ে তার নামেই দরজার নামকরণ করা হয়। বর্তমানে তা রাশিয়ার একটি শহর, যা কাস্পিয়ান সাগরের তীরে এবং আজারবাইজান সীমান্তের উত্তরে অবস্থিত। এটি রাশিয়ার দক্ষিণতম শহর এবং দাগেস্তানের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর। প্রয়োজনে দেখুন— ভূগোলবিদ ইয়াকুত ইবনে আব্দুল্লাহ আল হামাবির রচিত মু’জামুল বুলদানের তৃতীয় খণ্ডের ৩৯৯ পৃষ্ঠা, বইটির প্রকাশক বাইরুতের ‘দারু সাদের’।
[৮] আব্দুল হালিম রজব, ইনতিশারুল ইসলাম বাইনাল মাগুল, দারুন নাহদা আল আরাবিইয়া, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা: ১০৬।
[৯] ইবনে বাতুতা ‘সাওদাক’ না বলে বলতেন ‘সারদাক’ বা ‘সাওয়াদাক’। শহরটির পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেন— এটি সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত ‘দাশতে কিপচাকে’র শহরগুলোর একটি, সর্বশ্রেষ্ঠ নোঙ্গরটি এই উপকূলেই ফেলা হত। শহরের বাইরে রয়েছে বাগান এবং পানি, তার অধিবাসী ছিল কারিগর শিল্পী। লিখেছেন ইবনে বাতুতা, তুহফাতুন নাজ্জার ফি গারায়িবিল আমছার, দারুশ শারকিল আরাবিইয়ি, বৈরুত, ২/২৬৩-২৭২।
[১০] আল কালকাশান্দি, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৪৭৫।
[১১] মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ, তারিখু মাগুলিল কাবিলাতিজ জাহাবিইয়া ওয়াল হিনদ, দারুন নাফায়িস, বৈরুত, পৃষ্ঠা: ১৪।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: