ইলমের অফুরন্ত দরিয়া আমরাহ বিনতে আব্দুর রাহমান রাহিমাহাল্লাহ | তাসনীম জান্নাত

সাহাবাগনের পবিত্রময় সান্নিধ্যে যাদের জীবন কেটেছে তারা ছিলেন স্বর্ণযুগের মানুষ । সাহাবাদের সান্নিধ্যের ছোঁয়ায় তারা হয়ে উঠেছিলেন ইলম-আমল ও তাকওয়া পরহেযগারিতায় অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব । নারীরাও কিন্তু পিছিয়ে ছিলেন না । তারাও ছিলেন ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ । ইলমে ওহীর তালিব ছিলেন তাঁরাও । সেই স্বর্ণযুগের মহিয়সীদের অন্যতম একজন হলেন হযরত আমরাহ বিনতে আব্দুর রাহমান রাহিমাহাল্লাহ ।

তখন তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান বিন আফফান (রাযি.)-এর যুগ । ২৯ হিজরীতে মদিনায় হযরত আব্দুর রাহমান বিন সাদ বিন যুরারাহ ও সালিমা বিনতে হাকীম দম্পতির কোলজুড়ে আসে এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান । মেয়েটির নাম রাখা হয় আমরাহ বিনতে আব্দুর রাহমান (রাহ.) । দাদা সাদ বিন যুরারাহ (রাযি.) ছিলেন একজন আনসারী সাহাবী । দাদার ভাই আসআদ বিন যুরারাহ (রাযি.) ছিলেন বাইয়াতে আকাবায় অংশগ্রহণকারী আনসারী সাহাবীদের অন্যতম একজন । কেউ কেউ বলেছেন, বাবা আব্দুর রাহমান বিন সাদ বিন যুরারাহ (রাযি.)ও সাহাবী ছিলেন ।

শৈশব থেকেই আমরাহ (রাহ.) বেড়ে উঠতে থাকেন পবিত্রময় পরিবেশে । সান্নিধ্য লাভ করেন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি.)-এর । তাঁর সোহবতের বরকতে ইলমুল হাদীসে তিনি পৌঁছে যান অনন্য উচ্চতায় । উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জানতেন । তিনি ছিলেন সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারীদের একজন । আর উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি.)-এর হাদীস সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জানতেন আমরাহ বিনতে আব্দুর রাহমান (রাহ.) । প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে হিব্বান (রাহ.) বলেন, আমরাহ (রাহ.) উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি.)-এর হাদীস সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত । ন্যায়পরায়ণ খলীফা হযরত উমার বিন আব্দুল আজিজ (রাহ.) বলেন, আমরাহ (রাহ.)-এর চাইতে আয়েশা (রাযি.)-এর হাদীস সম্পর্কে অধিক অবগত আর কেউ অবশিষ্ট নেই ।

মদিনার বড় বড় ফকীহ এবং মুহাদ্দিসদের অন্যতম একজন হলেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে শিহাব যুহরী ( রাহ.) । যার সম্পর্কে আনাস বিন মালিক ( রাযি.) বলেছেন, আমি একজন ছাড়া মদিনায় আর কোন ফকীহকে মুহাদ্দিস পাই নি । জিজ্ঞেস করা হল, কে সে ? তিনি বললেন,ইবনে শিহাব আয-যুহরী ( রাহ. ) ।

ইমাম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (রাহ.) বলেন, মহান তাবেয়ী কাসিম বিন মুহাম্মাদ ( রাহ.) যিনি ছিলেন মদীনার সাত ফকীহের একজন । তাকে বললেন, যদি তুমি আয়েশা (রাযি.)-এর হাদীস সম্পর্কে জানতে চাও তাহলে আমরাহ (রাহ.)-এর কাছে যাও । কেননা তিনি আয়েশা (রাযি.)-এর হাদীস সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত এবং তিনি তাঁর সান্নিধ্যে ছিলেন ।

মহান সাহাবী হারিসা বিন নুমান (রাযি.)-এর নাতি আব্দুর রাহমান বিন আব্দুল্লাহ বিন হারিসা (রাহ.)-এর সাথে আমরাহ (রাহ.)-এর বিবাহ হয় । তাঁদের সন্তান হলেন মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রাহমান (রাহ.) । তিনি ছিলেন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস । নির্ভরযোগ্য হাদীস বর্ণনাকারীদের একজন । ইমাম মালিক ( রাহ. ) তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন । মুয়াত্তা মালিকে তাঁর বর্ণিত হাদীস রয়েছে । তাঁর কুনিয়াত ছিল আবু আব্দুর রাহমান । উপাধি ছিল আবুর রিজাল । কেননা তিনি দশজন পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন । আর আমরাহ (রাহ.)-এর কুনিয়াত ছিল উম্মে মুহাম্মাদ ।
আমরাহ (রাহ.) উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযি.) থেকে সবচেয়ে বেশী হাদীস বর্ণনা করেছেন। এছাড়া তিনি উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রাযি.), বোন উম্মে হিশাম (রাযি.), হামনা বিনতে জাহাশ(রাযি.),হাবিবা বিনতে সাহল( রাযি. ), এবং রাফে বিন খাদিজ ( রাযি.) থেকেও হাদীস বর্ণনা করেছেন ।

তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন আবু বকর সিদ্দীক ( রাযি. )-এর নাতি মহান তাবেয়ী উরওয়া বিন যুবাইর (রাহ.) যিনি ছিলেন মদিনার সাত ফকিহের একজন । তাঁর থেকে ‍আরও হাদীস বর্ণনা করেছেন ইমাম ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল আনসারী (রাহ. ) যিনি ছিলেন মদিনার একজন বড় আলিম , নিজ সন্তান আবুর রিজাল মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রাহমান (রাহ.), আমরাহ (রাহ.)-এর দুই নাতি মুহাম্মাদের দুই ছেলে হারিসা এবং মালিক (রাহ.), বোনের ছেলে কাযী আবু বকর বিন মুহম্মাদ বিন আমর বিন হাযম (রাহ.) যিনি হযরত উমার বিন আব্দুল আজিজ (রাহ.)-এর সময়ে মদীনার গভর্নর ছিলেন এবং তাঁর দুই ছেলে আব্দুল্লাহ এবং মুহাম্মাদ (রাহ.), ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে শিহাব আয-যুহরী ( রাহ. ) প্রমুখ ।

হযরত কাসিম বিন মুহাম্মাদ (রাহ.) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে শিহাব আয-যুহরী ( রাহ. ) কে লক্ষ্য করে বললেন, হে বালক ! আমি ইলমের প্রতি তোমার অনেক আগ্রহ লক্ষ্য করছি । আমি কি তোমাকে ইলমের খনির ব্যাপারে অবগত করব না ? ইমাম যুহরী বলেন, আমি বললাম, অবশ্যই । তিনি বললেন, তুমি আমরাহ ( রাহ. ) – এর কাছে যাও । কেননা তিনি আয়েশা ( রাযি. )–এর সান্নিধ্যে ছিলেন । অতপর আমি তাঁর কাছে আসলাম এবং তাকে ইলমের এক অফুরন্ত সমুদ্রের মতো পেলাম ।

ইবনে হিব্বান তাকে নির্ভরযোগ্য হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে গন্য করেছেন ।
ইমাম হাফেজ ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ছিকাহ এবং হুজ্জাহ ।
ইমাম যাহাবী (রাহ.) এই মহিয়সীর ব্যাপারে বলেন, তিনি ছিলেন আলিমা,ফাকীহা,হুজ্জাহ,অধিক ইলমের অধিকারী ।

হযরত উমার বিন আব্দুল আজিজ ( রাহ. ) যখন হাদীস সংকলন করতে চাইলেন তখন মদীনার গভর্নর আবু বকর বিন মুহাম্মাদ বিন হাযম ( রাহ. ) কে আমরাহ ( রাহ. )–এর বর্ণিত হাদীসগুলো লিখে রাখতে আদেশ করেছিলেন । তিনি তাঁর কাছে এই মর্মে পত্র প্রেরণ করেছিলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, তাঁর বিগত সুন্নাহ অথবা আমরাহ (রাহ.)-এর বর্ণিত হাদীসের প্রতি দৃষ্টি দাও এবং তা লিখে রাখো । কেননা আমি ইলমের দারসসমূহের ( বিলুপ্তি ) এবং আলিমদের ইন্তিকালের আশঙ্কা করছি।

ইমাম বুখারী (রাহ.)-এর উস্তাদ ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী (রাহ.) আমরাহ (রাহ.) কে সম্মানের সাথে স্বরণ করে বলেন, আমরাহ (রাহ.) হলেন আয়েশা (রাযি.)-এর বর্ণিত হাদীসের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য আলিমদের একজন ।
ইবনে আবি দাঊদ বলেন, তাবিইয়াদের সর্দার হলেন হাফসা বিনতে সীরীন (রাহ.) ও আমরাহ বিনতে আব্দুর রাহমান (রাহ.) । এরপর হলেন উম্মুদ দারদা আস সুগরা (রাহ.)।

আমরাহ (রাহ.) তাঁর ভায়ের ছেলেদের বললেন, তোমরা বাগানের মধ্যে আমার কবরের জায়গা দিও (বাকীর পাশে তাদের একটি বাগান ছিল )। কেননা আমি আয়েশা (রাযি.) কে এই হাদীস বলতে শুনেছি যে, মৃতের হাড় ভেঙ্গে ফেলা জীবিত ব্যক্তির হাড় ভেঙ্গে ফেলার মতই (গুনাহের কাজ) ।

এই মহিয়সী নারী ৯৮ হিজরীতে মতান্তরে ১০৬ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন ।

তথ্যসূত্র :
الطبقات الكبرى ط العلمية (8/ 350)
تاريخ الإسلام ت بشار (2/ 1151)
سير أعلام النبلاء ط الرسالة (4/ 507)
تهذيب الكمال في أسماء الرجال (35/ 241, 242)
تهذيب التهذيب (12/ 438, 439)
صفة الصفوة (1/ 376)
سير أعلام النبلاء ط الرسالة (1/ 299, 300)
اعلام الحفاظ والمحدثين (388-400/4)

Facebook Comments