কারিমা আল-মারওয়াযিয়্যাহ | মাসুম মুনতাসির

karima
(৩৬৫-৪৬৩ হিজরি বা ৯৭৫-১০৭০ ঈসায়ি)
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুগন্ধিমাখা মুখনিসৃত হাদিস সংকলন ও সংরক্ষণের মহান দায়িত্ব পালনে উৎসর্গিতপ্রাণ একজন কীর্তিমান নারী। যিনি নারী হয়েও হাদিস শাস্ত্রের প্রচার-প্রসারে মোটেও পিছিয়ে থাকেননি; বরং জীবনের শতটি ফুলবসন্ত ইলমের জন্য বিসর্জন দিয়েছেন। বিলিয়ে দিয়েছেন নিজ জীবন ও যৌবন। আজনম থেকেছেন চিরকুমারী। শত বছর হায়াত পেয়েও ইলমে দীন অন্বেষা ও হাদিস পাঠদানের সৌভাগ্যময় কর্মব্যস্ততায় বিবাহিত জীবনযাপনের ফুরসতটুকু পাননি। তাঁর এ দীর্ঘ জীবনব্যাপী ইলম শিক্ষাদানের বরকতময় কর্মে নিজেকে নিয়োজিত রাখার কারণে, ইতিহাসবেত্তাগণ তাকে ‘উম্মুল কিরাম’ উপাধিতে ভূষিত করেন। [১]
তিনি জন্মেছিলেন ৩৬৫ হিজরীর কোন এক রহমঝরা প্রহরে খোরাসানের মার্ভ শহরে। পিতার হাত ধরেই শুরু হয়েছিল তাঁর শিক্ষা-দীক্ষার পথচলা। ইলমি সফরে গিয়েছিলেন বাইতুল মাকদিস। জ্ঞানার্জনে সফর করেছেন আরও বহু দেশ। গিয়েছেন খোরাসান, বাগদাদ ও সারখসে। হাদিসের দরস গ্রহণ করেছেন যুগশ্রেষ্ঠ ও জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস আবু হাইসাম মুহাম্মাদ বিন মাক্কি আল-কুশমিহানির (৩৮৯ হি.) সোহবতে। ফিকহের পাঠ নিয়েছেন যাহের বিন আহমদ আস-সারাখসি আশ-শায়েফি (৩৮৯ হি.), আব্দুল্লাহ বিন ইউসুফ ইস্পাহানি (৪০৯হি.) প্রমুখ ইতিহাস-শ্রেষ্ঠ ফিকাহবিদ থেকে। [২]
অবশেষে তিনি ফিরে এসেছেন পবিত্র মক্কা নগরীর প্রাণকেন্দ্রে। আশ্রয় গড়েছেন মসজিদে-হারামের ছায়া-সুশীতল আঙিনায়।
হাদিস শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জনে তাঁর সাধনা-অধ্যাবসাও স্মরণীয়। তিনি জিলহজ মাসের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনতেন। প্রখ্যাত কোন মুহাদ্দিসের হজে উপস্থিতির কথা জানলে, হাদিস ধারণের অনন্ত পিয়াস বুকে ছুটে যেতেন। অজানা হাদিসপাঠের সুরব্যঞ্জনায় আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠতেন। অনাবিল হৃদয়ের শুভ্র মখমলে লিখে রাখতেন হাদিসের শব্দ-ছন্দ!
এভাবে তিনি তাঁর স্মরণের আয়নাঘরে সযত্নে সাজিয়ে রাখেন লক্ষাধিক হাদিসের সূত্র ও মূলপাঠ।[৩] তাই প্রতি বছর হজের মৌসুমে দূর দেশ-দেশান্তর হতে শত শত হাদিসের শিক্ষার্থী তাঁর ইলমে হাদিসের অফুরান ফোয়ারা হতে হাদিসের অমৃত সুধা আঁজলাভরে পান করতে ছুটে আসতেন। এসময় তিনি মসজিদে হারামে কাবা ঘরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অনর্গল হাদিস বয়ান করতেন। আবার কখনও কখনও মিনার মসজিদে খাইফে তাঁর হাদিসের মজলিশ বসত।[৪] খতীব আবুবকর আল-বাগদাদি, আলি বিন হুসাইন আল-ফাররা, আলি বিন ইবরাহিম আন-নাসিব ও আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন সদাকাহের মতো শত-সহস্র মুহাদ্দিস তাঁর থেকে শুধু একটি হাদিস শ্রবণের জন্য ব্যাকুল প্রত্যয়ে অপেক্ষা করতেন।
তিনি হাদিস-জগতের রাজাধিরাজ ইমাম বুখারি রচিত পৃথিবীর সবচে নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থ সহীহ বুখারি একাধিকবার হাদিসের ছাত্রদের উদ্দেশে বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারির সর্বোচ্চ মানের সনদ ছিল তাঁর অর্জনের ঝুলিতে।[৫] তিনি ৪৫ খণ্ডে সহীহ বুখারির একটি পাণ্ডুলিপি সংকলন করেন। সহীহ বুখারির নির্ভরযোগ্য পাণ্ডুলিপির মধ্যে তাঁর পাণ্ডুলিপিটি অন্যতম। আল্লামা ইবনু হাজার আসকালানির মতো খ্যাতনামা মুহাদ্দিসও সেই পাণ্ডুলিপির ভূয়সী প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ![৬]
তিনি হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি ব্যাপারে বেশ সচেতন ও সজাগ ছিলেন। তাই তিনি কোন হাদিস বর্ণনা করা মাত্রই, তা মূল পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে নিতেন।[৭]
তিনি ছিলেন গভীর বুদ্ধিমত্তা, অসম্ভব ধীশক্তি ও কল্পনাতীত অনুধাবনশক্তির আধার। আরব্য ইতিহাসের সোনালি পাতায় তাঁর মতো অধিক হাদিস বর্ণনাকারী আর কোনো নারীর সন্ধান মেলে না। তাইতো তিনি পঞ্চম শতাব্দী শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হিসেবে আজও বরিত ও নন্দিত![৮]
কারিমা আল-মারওয়াযিয়্যার মতো অমন মহীয়সী নারী আমৃত্যু হাদিস সংরক্ষণের সুমহান দায়িত্ব পালন করেছেন বিধায়, আমরা হাজার বছর পরও অমূল্য হাদিসগ্রন্থ বুখারি শরীফ অক্ষত ও অবিকৃত পেয়েছি এবং কোন ধরনের পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও সংযোজন-বিয়োজন ব্যতীত বিশুদ্ধ হাদিসগুলি পাঠের সৌভাগ্য লাভ করছি।
কেয়ামত অবধি মুসলিম উম্মাহর কাছে রাসূলের হাদিস পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তাঁর এ স্বর্ণালি অবদান, পৃথিবীর ইতিহাস কোনদিন ভুলে যেতে পারবে না। তাইতো হাফেজ যাহাবি, ইবনে কাসীর ও ইবনে হাজারের মতো প্রসিদ্ধ হাদিস-বিশারদগণ তাঁদের সুবিশাল জীবনীগ্রন্থে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে রেখেছেন তাঁর প্রশংসাকাব্য।[৯] তাইতো তিনি হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও আজও অসংখ্য কিতাবের রুপালি পাতায় ভেসে ওঠে তাঁর অবিস্মরণীয় নাম! ঝলমল করে তাঁর অবিস্মৃত কীর্তিগাঁথা!
৪৬৩ হিজরির কোন শুভক্ষণে কারিমা বিনতে আহমদ আলমারওয়াযিয়্যার হায়াতের পাখি অনন্তের পথে উড়াল দেয়।[১০]
আল্লাহ তায়ালা তাঁর কবরকে জান্নাতি সৌরভে সুরভিত করে দিন! আমিন!
তথ্যসূত্র:
[১] সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড-১৩, পৃষ্ঠা-৩৯৮, হাফেয শামসুদ্দিন যাহাবি রহ., দারুল হাদিস।
[২][৩] প্রাগুক্ত
[৪] মাশিখতু ইবনু জামাআহ, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা- ৪৫২।
[৫] সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড-১৩, পৃষ্ঠা-৩৯৮, হাফেয শামসুদ্দিন যাহাবি রহ., দারুল হাদিস।
[৬] যাইতুল তাক্বিদ ফি রুওয়াতিস সুনানি ওয়াল মাসানিদ, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা- ৩৯১।
[৭][৮] সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড-১৩, পৃষ্ঠা-৩৯৮, হাফেয শামসুদ্দিন যাহাবি রহ., দারুল হাদিস।
[৯] আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ, খণ্ড-১২, পৃষ্ঠা-১০৫, হাফেয ইমাদুদ্দিন ইবনু কাসির রহ.।
[১০] সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড-১৩, পৃষ্ঠা-৩৯৮, হাফেয শামসুদ্দিন যাহাবি রহ., দারুল হাদিস।

Facebook Comments