সালাফ পরিচিতি

ইমাম আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন হাম্বল আশ শায়বানি (রাহিমাহুল্লাহ) | কে এম শরিয়ত উল্লাহ

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

ইমাম আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন হাম্বল আশ শায়বানি (রাহিমাহুল্লা)

জারির ইবন আব্দুল হামিদ, বিশিষ্ট একজন মুহাদ্দিস। শত শত হাদীসের শিক্ষার্থীরা তার কাছে বসে হাদীসের দারস নিচ্ছেন। ক্লাসের বাইরে দাড়িয়ে আছেন এক যুবক। অর্থের অভাবে ভর্তি হতে পারেননি। শুধু জারির ইবন আব্দুল হামিদের চেহাড়া দেখেই নিজের স্বাদ মেটাচ্ছেন। এই যুবকটিই ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)। আর্থিক সংকটে ক্লাস করতে পারছেন না।

আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)। পিতার নাম মুহাম্মাদ আর দাদার নাম হাম্বল। দাদা ছিলেন তৎকালীন মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজধানী বাগদাদের গভর্নর (কারো কারো মতে সেনাপতি)। দাদার যশ ও খ্যাতির কারণে আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ না ডেকে তাকে ডাকা হলো আহমাদ ইবন হাম্বল নামে অর্থাৎ তার দাদার নামে। আহমাদের পিতা মুহাম্মাদ ইবন হাম্বল একজন সেনাপতি ছিলেন (কারো কারো মতে যোদ্ধা)। আহমাদ যখন খুবই ছোট তখনই মারা যান তার পিতা মুহাম্মাদ। এদিকে আহমাদকে দেখে বাগদাদের এক লোক, আল হাইসাম ইবন জামিল বলেন, “এ ছেলে যদি বেঁচে থাকে তবে আমি আশা করি এ তার লোকের বিরুদ্ধে প্রমাণস্বরূপ হবে।”[1]

আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মার খুব শখ। পুত্রকে বড় আলিম বানাবেন। তার পুত্রের জ্ঞানের মাধ্যমে দ্বীনের খেদমত হবে। এদিকে স্বামীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিবাহ করলে পুত্রের কুর’আন ও হাদীস শিক্ষায় ব্যঘাত ঘটতে পারে এ চিন্তায় দ্বিতীয় বিয়ে করেননি আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মা। যতটুকু সম্পদ ছিলো তা দিয়েই কুর’আন ও হাদীস শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ পূরণ করিয়েছিলেন তার আদরের সন্তানের। আহমাদের শিক্ষার প্রতি তার মার এ আগ্রহ দেখে আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) নিজেও সিদ্ধান্ত নেন, ‘যেভাবেই হোক, কুর’আন ও হাদীস শিখতেই হবে’।

১৪ বছর বয়সে আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) কুর’আন হিফজ সম্পন্ন করেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি বাগদাদের নানা উস্তাদের কাছ থেকে হাদীস শিক্ষা শুরু করেন। তার শিক্ষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুইজন হলেন-

ইমাম আবু ইউসুফ (যিনি ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ-এর প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন ও তৎকালীন বাগদাদের অন্যতম একজন ফিকাহবিদ ছিলেন)
ইমাম আশ শাফি’ঈ (যিনি একাধারে একজন ফিকাহবিদ, মুহাদ্দিস, কবি ও বিতার্কিক ছিলেন।)

দীর্ঘ ৪ বছর আহমাদ বাগদাদের অলিতে গলিতে গিয়ে হাদীস সংগ্রহ করেন ও বাগদাদের যত শিক্ষকের কাছে গিয়ে শিক্ষা অর্জন করা তার দ্বারা সম্ভব ছিলো সকলের কাছে গিয়ে শিক্ষা অর্জন করেন। বাগদাদের হাদীস সংগ্রহের পর তিনি বের হন বাগদাদের বাইরের হাদীস সংগ্রহে। মক্কায় গিয়ে তিনি দেখা পান মুহাম্মাদ ইবন ইদরীস আশ শাফি’ঈ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর। যেখানে আহমাদ ইবন হাম্বলের সকল সহপাঠীরা হাদীস শিখছিলেন সুফিইয়ান ইবন উওয়াইনাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছ থেকে, সেখানে আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীস শিখতে বসে গেলেন ইদরীস আশ শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ)এর কাছে। তখনো ইমাম শাফিঈকে মক্কার লোকেরা ভালোভাবে চিনতো না। ইমাম শাফিঈর কাছ থেকে ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুমাল্লহ) হাদীস থেকে ফিক্বহ বের করার মূলনীতি শিক্ষা লাভ করেন।

আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) তার প্রতিজ্ঞায় অনড় থাকতেন, যাই হোক না কেন। যেমন একবার আহমাদ ইবন হাম্বলের বন্ধু ইবন মাঈনের অনেক জোড়াজুড়িতে দুই বন্ধু সেবার হজ্জে বের হয়েছেন। তবে আহমাদ ইবন হাম্বল ও ইবন মাঈন নিয়্যাত করেছেন হজ্জের পর তারা সানা’-এ যাবেন ও সেখানে আবদুর রাযযাকের কাছ থেকে হাদীস শিখবেন। হজ্জ করতে গিয়ে দেখেন, আবদুর রাযযাক হজ্জ করতে মক্কায় চলে এসেছেন। ইবন মাঈন খুশির খবরটা আহমাদ ইবন হাম্বলকে জানালেন। কিন্তু আহমাদ বললেন, “না। আমরা নিয়্যাত করেছি সানা’তে গিয়েই আবদুর রাযযাক (রাহিমাহুল্লাহ) এর কাছ থেকে হাদীস শিখব, তাই সেখানে গিয়েই আমরা শিখব। শিক্ষার্থী জ্ঞানের কাছে যায়, জ্ঞান শিক্ষার্থীর কাছে আসে না। এখানে তার থেকে হাদীস শিখে আমি আমার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করব না।” হজ্জের পরে তারা আসলেই সানা’এ গিয়ে আবদুর রাযযাক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছ থেকে হাদীস শিখেন।

ইমাম আহমাদ শিক্ষার প্রতি সর্বদা তৃষ্ণার্ত ছিলেন। তাইতো তিনি জ্ঞানীর সঙ্গা দিতে গিয়ে বলেন, “সেই জ্ঞানী যে জ্ঞান অন্বেষণ করে। আর যে মনে করে তার জ্ঞান অন্বেষণ করা শেষ সে আসলে মূর্খ।” এমনকি তার যেসকল ছাত্ররা অন্য শিক্ষকের কাছ থেকেও হাদীস শিক্ষা করতো তিনি তাদের কাছে গিয়ে বলতেন, “কী শিখে এসেছ? আমাকে শিখাও।”

আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ পালনে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) সর্বদা চেষ্টা চালাতেন। আল্লাহ রাসূল (সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন ও তার আত্মীয়দের মাঝে ইসলামের দাওয়াত প্রদান শুরু করেন। এ সুন্নাহ রক্ষা করতে তিনি ৪০ বছর বয়সে শিক্ষকতা শুরু করেন ও ইসলামের জ্যোতি সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব বহন করেন। উল্লেখ্য, আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর যখন ৩৯ বছর বয়স তখন তার কাছে কিছু ছাত্র শিক্ষালাভের জন্য আসলে তিনি তাদেরকে ফিরিয়ে দেন। আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হিজামা করানোর পর ১ দিনার পরিমাণ খেঁজুর দানের হাদীস পালন করতে গিয়ে ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)- হিজামাকারীকে ১ দিনার প্রদান করেন। যদিও ১ দিনার তার জন্য অনেক কষ্টের, কিন্তু সুন্নাহ পালন নিশ্চয় ১ দিনারের চেয়ে কম মূল্যবান নয়!

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) নিয়ে কথা বলার সময় যে বিষয়ে কথা আসবেই তা হচ্ছে মু’তাজিলা সম্প্রদায়। উমাইয়্যা খিলাফাতকালে জা’দ ইবন দিরহাম নামে এক ব্যক্তি প্রচার করা শুরু করে, ‘কুর’আন সৃষ্ট। কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহকে দেখা যাবে না।’ ধীরে ধীরে এ মত বাগদাদেও প্রবেশ করে। ইমাম আবু ইউসুফ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ছাত্র বিশর আল-মারিসি মু’তাজিলা মতবাদকে আঁকড়ে ধরে ও তার সঙ্গী সাথী নিয়ে বাগদাদে লুকিয়ে লুকিয়ে এ মতবাদ প্রচার করতে থাকে। তাদের একটি দল বাদশাহ হারুন-অর-রশিদ কর্তৃক আটক করা হয়। বাদশাহ হারুনের মৃত্যুর পর সিংহাসনে আসেন তার পুত্র আল-মা’মুন। আল-মা’মুন মু’তাজিলাদের পক্ষে চলে যান। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, আল-মা’মুনের যে শিক্ষক ছিলো, সেই আবু হুদাইল আল-আল্লাফ ছিলেন একজন কট্টর মু’তাজিলি। ২১২ হিজরীতে আল-মামুন মু’তাজিলিদের বিশ্বাস গ্রহণ করে নেন। ২১৮ হিজরীতে আল-মামুন মু’তাজিলিদের এ ভ্রান্ত বিশ্বাস রাষ্ট্রের সকলের উপর চাপিয়ে দেওয়া শুরু করেন। এক এক করে সকল আলিমও তার শাস্তির ভয়ে মু’তাজিলিদের আক্বিদার বাহ্যিকভাবে গ্রহণ করে নিয়েছেন বলে জানান। কেবলমাত্র ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল ও তার প্রিয় বন্ধু মুহাম্মাদ ইবন নূহ (রাহিমাহুমাল্লহ) এ ভ্রান্ত আক্বিদাকে কোনো দিক দিয়েই স্বীকৃতি দিলেন না। তাদেরকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে খলিফা আল-মামুনের কাছে। পথিমধ্যে একজন সৈন্য এসে তাদেরকে খবর জানালো যে খলিফা আল-মামুন মৃত্যুবরণ করেছেন। ইবন নূহ এতে খুশি হয়ে গেলেন, এতে চটে গিয়ে এক সৈন্য তাকে আঘাত করে ও ইবন নূহ মৃত্যুবরণ করেন। আহমাদ ইবন হাম্বলকে পুনরায় জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। খলিফা আল-মা’মুনের পরে খিলাফাতের দায়িত্ব নেন আল-মু’তাসিম। তবে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই বছর পর পর্যন্ত আহমাদ ইবন হাম্বলের কোনো বিচার তিনি করলেন না। ফলে দুই বছরের অধিক সময় আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জেলেই কাটাতে হলো। ২৮ মাস পরে আল-মু’তাসিমের সামনে আহমাদ ইবন হাম্বলকে হাজির করা হয়। আল-মু’তাসিম আহমাদকে বলেন, “বিশ্বাস করে নাও, কুর’আন সৃষ্ট। তাহলে তোমাকে মুক্তি দিব। অন্যথায় তোমাকে শাস্তি দিব।” আহমাদ জবাবে বললেব, “আমি যদি বিশ্বাস করে নেই কুর’আন সৃষ্ট তাহলে আল্লাহ আমাকে শাস্তি দিবেন, আর বিশ্বাস করুন সে শাস্তির তুলনায় আপনার শাস্তি কিছুই না।” আল-মু’তাসিম কোনো গতি না দেখে তাকে ছেড়ে দেন।

আল মু’তাসিমের পর শাসনভার নেন আল-ওয়াসিক। তিনি এবার আহমাদ ইবন হাম্বলকে নতুনভাবে শাস্তি দিতে থাকেন। গৃহবন্দী আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)। এমনকি জুম’আর সালাতে শরিক হওয়ার অনুমতিটুকুও ছিল না। ২৩২ হিজরিতে আল ওয়াসিক মৃত্যুবরণ করেন। ক্ষমতায় আসেন আল মুতাওয়াক্কিল। তিনি কুর’আন ও সুন্নাহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন ও মু’তাজিলিদের ভ্রান্ত আক্বিদাকে রাষ্ট্র থেকে উৎখাতের জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)-কে অনেক ভালোবাসতেন। এ ভালোবাসাকে আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) নতুন পরীক্ষা মনে করলেন। আল-মুতাওয়াক্কিল ভালোবেসে আহমাদ ইবন হাম্বলকে দশ হাজার দিনার পাঠালেন। কিন্তু আহমাদ এ মুদ্রা গ্রহণ করতে রাজি হলেন না। অনেক জোরাজুরির পর তার হাতে এ মুদ্রার থলেটি ধরিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু তিনি এ মুদ্রার এক অংশও নিজের কাছে রাখলেন না। বরং সকল মুদ্রা এমনকি সেই থলেটিও ফকিরদের মধ্যে দান করে দিলেন। তার পরিবারের লোকেরা যখন জিজ্ঞাসা করলেন, “বাবা! এ মুদ্রার মাধ্যমে আমরা কি আমাদের জীবনকে আরো উন্নত করতে পারতাম না?” এর জবাবে আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, “হে আমার পুত্র! শুনে রাখো! ডান হাত দিয়ে কেউ কোনো উপহার দিলে, বাম হাত দিয়ে সে তোমার মুখ চেপে ধরে। ফলে তুমি তার দোষক্রুটি সম্পর্কে তাকে জানাতে সংকোচবোধ করো।” আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ও তার সাহাবী ও তাবেঈদের দুনিয়া বিমুখতার এরকম উদাহরণগুলো নিয়ে আহমাদ ইবন হাম্বল সংকলন করেছেন ‘কিতাবুয যুহদ’।

২৪১ হিজরীর ১২ রবিউল আউয়াল, রোজ শুক্রবার আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার জানাজায় প্রায় তিন লক্ষ লোক শরিক হয়। তার মতো একজন ইমামকে হারিয়ে পুরো বাগদাদ শোকে ঢলে পরে।

কৃতজ্ঞতাপ্রকাশ
প্রবন্ধটি রচনা করতে গিয়ে আমাকে বেশ কয়েকটি বই পড়তে হয়েছে। এরমধ্যে আরিফুল ইসলাম ভাইয়ের ‘চার তারা’ বইটি আমাকে বেশ সহায়তা করেছে। তাছাড়া আক্বিদাগত মাসআলার ব্যাপারে ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মত জানতে ‘উসুলুস সুন্নাহ’ বইটি বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছে। বইটি সম্পর্কে আমাকে অবগত করার জন্য আব্দুর রাফি ভাইকে ধন্যবাদ। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

ফুটনোট
[1] বাহ্যিক জ্ঞান ও আচার আচরণ দেখে এরূপ ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব। একে ফিরাসা বলে। এটি মূলত কোনো গায়েবী বিষয় নয়।বরং ছাত্রের লেখাপড়ার অবস্থা দেখে তার পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে শিক্ষক যেমন আগে থেকেই জানেন, এ বিষয়টিও তেমনই।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: