বিশরে হাফি রহিমাহুল্লাহ | মাহদি হাসান

মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। ক্রমাগত যানবাহনের চলাচলে পিষ্ট হচ্ছে পিচঢালা পথ। হঠাৎই উড়ে এলো ছেড়া কয়েকটি পাতা। এর উৎস হয়তো হবে পাশ দিয়ে চলে যাওয়া কোনো অটোরিক্সা। কাগজগুলোর দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠি আমি। গুটি গুটি অক্ষরের আরবি লেখাগুলো দূর থেকেই সক্ষম হলো আমার নজর কাড়তে। কাছে যেতেই দেখি সেগুলো স্কুলের পাঠ্য ইসলাম শিক্ষা বইয়ের পাতা। অবহেলায় পড়ে আছে আল্লাহ তায়ালার পবিত্র কালাম। আর দেরী না করে কুড়িয়ে নিই কাগজগুলো। অতঃপর বিশর হাফি রাহিমাহুল্লাহুর মতো খুঁজতে থাকি কোনো ঊপযুক্ত স্থান। মনে পড়ে গেল বিশর হাফি রাহিমাহুল্লাহুর কথা। এক টুকরো কাগজে লেখা বিসমিল্লাহকে তাযীম করার ফলে আল্লাহ তাঁকে বানিয়ে দিয়েছিলেন বিরাট বড় ওলি। বিশর হাফির নাম হয়তো আপনারা সকলেই শুনে থাকবেন। গ্রামে-গঞ্জে, মফস্বলে-শহরে ওয়াজ মাহফিলের একটি বহুল চর্চিত ঘটনা হচ্ছে বিশর হাফি রাহিমাহুল্লাহুর ঘটনা।

তাঁর পুরো নাম আবু নাসর বিশর ইবনুল হারিস ইবনু আবদির রহমান ইবনু আতা ইবনু হিলাল ইবনু মাহান ইবনু আবদিল্লাহ। তাঁর পূর্বপুরুষ আবদুল্লাহর নাম ছিল আবুর। আলি ইবনু আবি তালিব রা.এর হাতে ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর নাম হয় আবদুল্লাহ। বিশর হাফি নামেই তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর আদি বাসস্থান মার্ভের মাবারসাম নামক গ্রাম। অতঃপর তিনি বাগদাদে বসবাস করতেন। ছিলেন সম্ভ্রান্ত এবং অভিজাত পরিবারের সন্তান। [ওফায়াতুল আইয়ান: ১/২৭৫]

তিনি ছিলেন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আলি ইবনু খাশরামের চাচাতো ভাই। ১৫২ হিজরিতে তিনি জন্মলাভ করেন। [সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৮/৪৮৮]

তাঁর সম্পর্কে বর্ণিত সেই প্রসিদ্ধ ঘটনায় আসি এবার। যে ঘটনা তাঁকে বানিয়ে দেয় একজন খোদাভীরু ব্যক্তি। সাধারণ লোকদের মিছিল থেকে এনে তাঁকে শামিল করে আল্লাহুর ওলিগণের কাতারে। একবার রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় নিজের অজান্তেই তিনি মাড়িয়ে বসেন আল্লাহর নাম লেখা একটি কাগজের পাতা। তখনই তিনি কুঁড়িয়ে নেন সেই কাগজটি। অতঃপর নিজের সাথে থাকা কয়েক দিরহাম দিয়ে একটি দামি সুগন্ধি ক্রয় করেন। তা দিয়ে পরিস্কার করেন আল্লাহর নাম লেখা সেই কাগজটি। অতঃপর একটি উঁচু দেয়ালের ওপর রেখে আসেন কাগজটিকে। বাড়িতে ফিরে এসে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেন নিদ্রার কোলে। স্বপ্নে দেখেন কেউ তাঁকে ডেকে বলছে, ‘হে বিশর, তুমি আমার নামকে পরিচ্ছন্ন করেছ, নিশ্চয়ই আমিও দুনিয়া ও আখিরাতে তোমার নামকে পরিচ্ছন্ন করব। ঘুম থেকে জাগ্রত হতেই তিনি ডুব দেন তওবার স্বচ্ছ সমুদ্রে। অতীতের সব পাপ-পঙ্কিলতা ধুয়ে মুছে একজন পবিত্র ব্যক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অতঃপর নিরত হন প্রভুর ইবাদাতে। [ ওফায়াতুল আইয়ান: ১/২৭৫। ইসলামি ইতিহাসের বিশুদ্ধ প্রায় সকল গ্রন্থেই তাঁর এ ঘটনা উল্লিখিত হয়েছে]

হাফি শব্দটি ছিল তাঁর উপাধি। এর অর্থ হচ্ছে নগ্ন পায়ে চলাফেরাকারী। তাঁর একটি জুতোর ফিতে ছিড়ে যাওয়ায় তিনি মুচির কাছে গিয়েছিলেন তা ঠিক করার জন্য। মুচি তাঁকে বলেছিল, এই জুতোর প্রতি মানুষের কতইনা আসক্তি! এ কথা শুনে তিনি হাতের জুতোটি ফেলে দেন। পা থেকে ছুড়ে ফেলেন অপর জুতোটি। শপথ করেন এরপর থেকে আর কখনোই তিনি জুতো পরিধান করবেন না। [ওফায়াতুল আইয়ান: ১/২৭৫]

একবার তিনি গিয়েছিলেন মুয়াফা ইবনু ইমরানের গৃহে। দরজার কড়া নাড়তেই ভিতর থেকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কে? তিনি বললেন, আমি বিশর হাফি। তখন ভেতর থেকে এক মেয়ে বলল, আপনি যদি দুই দানেক দিয়ে একটি জুতো ক্রয় করে নিতেন তবে আপনার এই হাফি নামটি চলে যেত। [ওফায়াতুল আইয়ান: ১/২৭৫]

তাঁর মাঝে সমাবেশ ঘটেছিল অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহের। ছিলেন একজন বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তি। উত্তম আচরণকারী। নিজ মতে অটল এবং কোমল হৃদয়ের অধিকারী। তিনি অনেকের কাছ থেকেই হাদীস শ্রবণ করেছেন। তবে নিজেকে ব্যাপকভাবে হাদীস বর্ণনায় নিয়োজিত করেননি। এ থেকে পরহেজ করতেন তিনি। এজন্যই তিনি নিজের লেখা হাদীসের গ্রন্থটিকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছিলেন। তবে তাঁর বর্ণিত কিছু হাদীস ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়। নিজ সময়ের মনীষীগণের মধ্যে তাঁর খোদাভীরুতা এবং দুনিয়াবিমুখতার কথা ছিল সুবিদিত।[মুখতাসারু তারিখি দিমাশক: ৫/১৯১]

ইবরাহিম ইবনু সাদ, হাম্মাদ ইবনু যায়েদ, আবুল আহওয়াস, শারিক, ইমাম মালিক, ফুযাইল ইবনু ইয়াজ, আবদুর রহমান ইবনু যায়েদ ইবনু আসলাম, খালিদ ইবনু আবদিল্লাহ আত-তাহহান, মুয়াফা ইবনু ইমরান এবং আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক রহিমাহুল্লাহু প্রমুখ মনীষীগণের কাছ থেকে তিনি হাদীস শ্রবণ করেছিলেন। আর তাঁর কাছ থেকে শ্রবণ করেছিলেন আহমাদ আদ-দাওরাকি, মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না, সারিয়্যিস সাকাতি (সিররি সাকতি ভুল উচ্চারণ), উমর ইবনু মুসা আল-জাল্লা এবং ইবরাহিম ইবনু হানি রহিমাহুমুল্লাহু প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ। [তারিখুল ইসলাম: ৫/৫৪০]

তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি কেন হাদীস বর্ণনা করেন না? তিনি উত্তর দেন, ‘আমার মন চায় হাদীস বর্ণনা করতে। কিন্তু আমার মন যা চায় আমি তা ত্যাগ করি।’ [ তারিখুল ইসলাম: ৫/ ৫৪০]

আবু বকর ইবনুল আফফান থেকে বর্ণিত আছে, আমি বিশর হাফিকে বলতে শুনেছি, ‘ক্ষুধা হৃদয়কে কলুষমুক্ত করে, প্রবৃত্তিকে হত্যা করে এবং সুক্ষ উপলব্ধির ক্ষমতা তৈরী করে।’ [তারিখুল ইসলাম: ৫/ ৫৪০]

খলিফা মামুনুর রশিদ বলেছিলেন, ‘আমি বিশর ইবনুল হারিস ব্যতিত আর কারও সম্মুখে কুণ্ঠিতবোধ করিনি।’ [তারিখুল ইসলাম: ৫/ ৫৪২]

ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রহ: বলেছিলেন, ‘বিশর যদি বিবাহিত হতেন তবে তিনি একেবারে পরিপূর্ণ হয়ে যেতেন।'[তারিখুল ইসলাম: ৫/ ৫৪২]

ইবরাহিম আল হারবি বলেন, ‘বাগদাদ শহর বিশর রহ: এর চেয়ে পূর্ণ জ্ঞানবান এবং সংযত জবানের আর কাউকে উৎপন্ন করেনি। তাঁর প্রতিটি পশমেই যেন জ্ঞান ছিল। পঞ্চাশ বছর লোকেরা তাঁর অনুসরণ করেছে। কারও ব্যাপারেই তাঁকে গীবত করতে শুনেনি। আর আমি আমার দু চোখে বিশরের চাইতে উত্তম কাউকে দেখিনি।’ [তারিখুল ইসলাম: ৫/ ৫৪২]

তাঁর কিছু স্মরণীয় উক্তি:

* ক্ষুধায় ছটফটকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় প্রাণ উৎসর্গ করে লুটোপুটি খাওয়া ব্যক্তির মতো।

* একজন দানশীল চতুর ব্যক্তি আল্লাহর কাছে কৃপণ সূফীর চেয়ে অধিক প্রিয়।

* মহিলাদের নিম্নাঙ্গের প্রতি আসক্ত ব্যক্তি কখনো সফল হয় না।

* যখন কথা বলা তোমাকে মুগ্ধ করে, তখন তুমি নীরব থাকো। আর যখন নীরবতা তোমাকে মুগ্ধ করে তখন তুমি কথা বলো।

* তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি তাঁর মৃত্যুর পরেও রিয়া তথা লৌকিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারে। প্রশ্ন করা হলো, তা কীভাবে সম্ভব? তিনি বললেন, জানাজায় অধিক লোকের উপস্থিতি কামনার মাধ্যমে। [তারিখুল ইসলাম: ৫/ ৫৪২]

* ইবাদাত এবং প্রবৃত্তির মাঝে লৌহপ্রাচীর নির্মাণ ব্যতিত তোমরা কখনোই ইবাদাতের স্বাদ লাভ করতে পারবে না। [তারিখুল ইসলাম: ৫/ ৫৪৩]

খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর ছয়দিন পূর্বে ২২৭ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের তেরো তারিখে তাঁর মৃত্যু হয়। [তারিখুল ইসলাম: ৫/ ৫৪৪]

Facebook Comments