ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহিঃ | ইব্রাহিম বিন হানিফ

wahab bin munabbeh
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহিঃ। আল্লাহর জন্য যিনি ছিলেন উৎসর্গ প্রাণ। এলমের অন্বেষণে ছিলেন সার্বক্ষণিক ব্যস্ত। ছিলেন এবাদতের নিরবতায় অতিশয় নিমগ্ন। নিয়মিত এলম শেখা ছিল তার স্বাভাবিক অভ্যাস। ছিলেন প্রকৃতার্থে একজন দূনিয়া ত্যাগী ব্যক্তিত্ব।
বর্ণিত আছে যে, তিনি ও তা-উস রাহিঃ এশার অজুতে ফজর পড়েছেন লাগাতার চল্লিশ বছর।
কাসির নামক জনৈক লোক বলেন। আমি তার সাথে একবার ভ্রমণে বের হই। এক ব্যক্তির ভূমিতে যাত্রা বিরতি হয়। রাতে হঠাৎ জমির মালিকের মেয়ে বের হন কোন এক প্রয়োজনে। তিনি দেখতে পান একটি বাতি ঝলমল করে জ্বলছে। মেয়েটির কল্যাণে বাবাও নিজ চোখে দেখেন এই অলৌকিকতা। তিনি লক্ষ করেন এটা কোন বাতি নয়। বরং সূর্যের শুভ্রতায় সজ্জিত হয়ে ওয়াহাব রাঃ এর পায়ের গোছাদ্বয় এমন প্রণবন্ত আলো ছড়াচ্ছে।
ঘটনা দেখে সকালে তিনি বললেন, রাতে তো আপনার এই অবস্থা দেখলাম। জবাবে ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বললেন, যা দেখেছো দেখেছো, আর কেউ যেন না জানে এই কাহিনি।
উসমান রাঃ এর খেলাফত কালীন ৩৪ হিজরি সনে মা বাবার কোল আলো করে জন্ম গ্রহণ করেন ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহিঃ। অতঃপর ধীরে ধীরে বেড়েন উঠতে থাকেন বড় বড় সাহাবী ও জলিলুল কদর তাবেয়ীদের স্নেহময় সান্নিধ্যে। এমনকি এ উম্মার হিবর বা শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ এর স্নেহধন্য সাগরেদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
আবু হুরায়রা, আবু সাঈদ খুদরী, নু’মান ইবনে বাশির, জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ , ইবনে উমর ও আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাঃ এর মত বড় বড় সাহাবীদের থেকে তিনি হাদিস বর্ণনা করার সুখ্যাতি লাভ করেন।
মুসনাদে হাদিসের কিতাবে তার রিওয়াত অল্প হলেও মূলত তার জ্ঞানের এক মহা সমুদ্র ছিল পূর্ববর্তী উম্মাহদের নিয়ে। বনী ইসরাইল ও তত্পরবর্তী সব বিষয়ে তিনি ছিলেন অনন্য জ্ঞানী এক ব্যক্তিত্ব।
তার সফলতা আর দ্বিনী খেতমতের ফসল হিসাবে ইতিহাসের পাতা আলোকিত করে আছেন যে সব নক্ষত্র তাদের অন্যতম হলেন, “
আমর ইবনে দিনার। সিমাক ইবনে ফজল। আওফুল আ’রাবী। আসেম ইবনে রজা, ইয়াজিদ ইবনে ইয়াজিদ। আব্দুল্লাহ ইবনে উসমান ইবনে খাইসাম রহিঃ প্রমূখ।
সর্বপরি তিনি একজন দরদী মানুষ ছিলেন। যুগের প্রয়োজনে বা উম্মাহর সংশোধনে তার বাণীগুলো এক অমূল্য রত্ন। তার শাগরেদ আতা খুরাসানীকে নাসীহাহ করে তিনি বলেন,৷
” পূর্বসূরি উলামায়ে করাম অন্য সব মানুষের পার্থিবতা থেকে বিমুখ হয়ে নিজেদের এলম নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। ফলে তারা তো অন্যের ধনসম্পদের দিকে ফিরেও তাকাতেন না বরং দুনিয়াদাররা নিজ থেকেই এলমের প্রতি তীব্র আগ্রহী হয়ে তাদের পিছনে অকাতরে সম্পদ ব্যায় করতেন। অথচ আজ-কালের আলেমগণ তো দূনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেছেন। সামান্য টাক-পয়সা হাসিলে নিজেদের এলম ব্যবহার করেন। ফলে আলেমদের এমন নৈতিক অবক্ষয় দেখে,দূনিয়াবাসী তাদের এলম থেকে পরিপূর্ণ বিমুখ হয়েগেছে।
সাবধান! তুমি রাজা বাদশাহদের দরবারে কখনো আসা-যাওয়া করবে না। কারণ তাদের দরবারে প্রচুর ফেতনা। তুমি তাদের দূনয়া ঠিক যতটুকু অর্জন করবে তারা তোমার দ্বীনের ঠিক ততটাই কেড়ে নিবে।
অতপর তিনি বলেন, হে আতা! তুমি যদি তোমার প্রয়োজন পরিমাণ নিয়েই তুষ্ট থাকো, তবে তুমি দূনিয়ায় যেকোনভাবেই সুখী। আর যদি তোমার প্রয়োজনাতিরিক্ত চাও তাহলে মনে রেখো তোমার বাসনা পুরণের কোন পথ নেই। কারণ তোমার পেট তো হলো একটি সাগর, একটি উপত্যকা, যা মাটিতেই কেবল পূর্ণ হতে পারে।
জনৈক ব্যক্তি এসে বললেন, মানুষের সাথে আমার একদমই মিশতে ইচ্ছে হয়না। তিনি বললেন, তুমি এমনটি করো না। কারণ না তুমি মানুষদের ছাড়া চলতে পারবে, আর না মানুষ তোমাকে ছাড়া। তাদের যেমন তোমার কাছে অনেক প্রয়োজন আছে, তোমারো তেমন আছে। তবে হ্যাঁ তুমি তাদে মাঝে এমনভাবে থাকো যেন তুমি বধীর শ্রোতা, অন্ধ চক্ষুষ্মান, আর বোবা বাকশালি।
তোমাকে যদি কেউ কাটা দেয়, তুমি তাকে ফুল দাও। তোমাকে যদি কেউ আঘাত দেয়, তুমি তার মুহসিন হও। এই কথার একজন জাজ্বল্যমান উদাহরণ ছিলেন তিনি। ইবনে আবু আইয়াশ বলেন, ‘ একবারের ঘটনা। আমি ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহিঃ এর সাথেই বসা। জনৈক লোক এসে বললো, ওমুক তো আপনাকে অনেক গালাগালি করেছে। এ কথা শুনে তিনি চরমভাবে চটে গিয়ে বললেন, শয়তান কী তোমাকে ছাড়া আর কোন দূত পেলো না!
অল্পসময়ের মধ্যেই গালমন্দের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি এসেও হাজির। বিনয়ের সাথে ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ কে সালাম দেয় সে। ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহো সালামের জবাব দিয়ে তাকে বুকে টেনে নেন। এবং তার খুব কাছে নিয়ে বসান।
উম্মাহর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তার রেখে যাওয়া অমূল্য বাণীগুলোই তার প্রজ্ঞার প্রখরতার প্রমাণ। তিনি বলেন,
إذا مدحك الرجل بما ليس فيك فلا تأمنه أن يذمك بما ليس فيك.
মনে রেখো! কোন লোক যদি তোমাতে নেই এমন প্রশংসাও তোমার কারে তবে এই লোক তোমার মাঝে না থাকা দোষ চর্চাও করতে পারে।
তিনি আরো বলেন, ” এলম মু’মিনের বন্ধু আর প্রজ্ঞা তার সাথী,
আকল মু’মিনের দলীল, আর আমল তার মূল্যায়ন।
ধৈর্য মু’মিনের সেনাপ্রধান, সদাচার তার আভিজাত্য, এবং নম্রতা তার ব্রত।
তিনি আরো বলেন, মু’মিন যদি কোথাও তাকায় তবে, শেখার জন্য তাকায়,যদি কথা বলে তবে বোঝার জন্য বলে, যদি চুপ থাকে তবে নিরাপদ থাকার জন্য চুপ থাকে, যদি একাকীত্বে থাকে তবে প্রবোধ কল্যাণ সময় ব্যায় করতেই থাকে।
মহান এই সালাফের ওফাত হয় ১১৪ হিজরি সনে। আল্লাহ তার পরবর্তী জীবনে প্রশান্তির হাওয়া জারী রাখুন। এবং আমাদেরকে দান করুন তাদের মত শক্তি, শাহস, এলম, আমল আর প্রজ্ঞা।
_________________________
তথ্যসূত্র:
১/ আততারিখুল কাবীর
২/রুওয়াতুত তাহজিবীয়্যিন
৩/সিয়ারু আ’লামিন নুবালা
৪/সিফাতুস সফওয়াহ
৫/মাশাহিরু উলামাইল আমসার
৬/ হিলাতুল আওলিয়া
৭/ আসসিক্বাত লিবনি হিব্বান।

Facebook Comments