সালাফ পরিচিতি-১ | ইমরান রাইহান

salaf-porichiti

সিরিয়া। ১৩২ হিজরী।

সদ্যই পতন ঘটেছে বনু উমাইয়ার শাসনের। রক্ত ও লাশের সারি মাড়িয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেছে আব্বাসিরা। তাদের তরবারি থেকে এখনো শুকায়নি বনু উমাইয়ার রক্তের দাগ।

ক্ষমতা সুসংহত করতে সিরিয়ায় এলেন আবদুল্লাহ বিন আলি , আব্বাসী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আব্বাস সাফফাহর চাচা। নিষ্ঠুরতায় তিনি ছিলেন কয়েক ধাপ এগিয়ে। প্রথমদিকের ঐতিহাসিকরা নিষ্ঠুরতার জন্য তাকে সম্বোধন করতেন সাফফাহ বলে। আবদুল্লাহ বিন আলি সিরিয়ায় এসেই উমাইয়াদের শেষ করার কাজে নেমে পড়েন। পুড়িয়ে দেয়া হয় তাদের ঘরবাড়ি। নিহত হয় অনেকে। কদিন যেতেই আবদুল্লাহ বিন আলির কানে এলো একজন আলেমের কথা। এই আলেম জ্ঞানে-গুনে অবস্থান করছেন উচ্চ মর্যাদায়। একইসাথে সাহসিকতায়ও তিনি অনন্য। মানুষের মাঝেও রয়েছে তার বেশ প্রভাব।

‘ডেকে আনো তাকে’ রুক্ষ কন্ঠে আদেশ দিলেন আবদুল্লাহ বিন আলি ।

আলেমের কানে সংবাদ পৌছলো তাকে ডাকা হয়েছে আবদুল্লাহ বিন আলি র দরবারে। আলেম চিনতেন আবদুল্লাহ বিন আলি কে। তিনদিন অপেক্ষা করে চতুর্থ দিন তিনি রওনা হলেন আবদুল্লাহ বিন আলি র গৃহে।

আবদুল্লাহ বিন আলি র চেহারা রাগে থমথম করছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে নাংগা তলোয়ার হাতে প্রহরী। আলেম তার দরবারে প্রবেশ করে সালাম দিলেন। তার কন্ঠে নেই কোনো দ্বিধা বা ভয়। আবদুল্লাহ বিন আলি কোনো জবাব না দিয়ে তার হাতে ধরে রাখা ছড়ি মাটিতে ঠোকরাতে থাকেন।

‘আপনি আউযায়ি ?’ আবদুল্লাহ বিন আলি কিছুক্ষন চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলেন।

‘হ্যা’

‘আউযায়ি , আমি বনু উমাইয়ার সাথে যা করছি এ সম্পর্কে আপনার মত কী? এটা কি জুলুম হচ্ছে ? নাকি জিহাদ ?’

‘আমাকে ইয়াহইয়া বিন সাইদ আল আনসারি একটি হাদিস বর্ননা করেছেন। তিনি শুনেছেন, মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম আত তাইমির কাছ থেকে, তিনি আলকামা বিন ওয়াক্কাস থেকে, তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) থেকে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক মানুষ যা নিয়ত করবে তাই পাবে।’ ইমাম আউযায়ি শান্তকন্ঠে বললেন। আবদুল্লাহ বিন আলির চেহারা রাগে লাল হয়ে গেল। সে আগের চাইতে দ্রুতগতিতে ছড়ি দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে লাগলো।

‘আমি বনু উমাইয়ার লোকজনকে হত্যা করছি এ সম্পর্কে আপনার মত কী?’ আবদুল্লাহ বিন আলির দ্বিতীয় প্রশ্ন।

‘আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বর্ননা করেছেন, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন কারন ব্যতিত কোন মুসলমানের রক্তপাত ঘটানো বৈধ নয়, ১.বিবাহিতব্যক্তি যদি যেনা করে ২.কাউকে বিনা কারনে হত্যা করে, ৩.স্বীয় দ্বীন ত্যাগ করে , মুসলিম জামাতে ফাটল সৃষ্টি করে।

‘বনু উমাইয়ার সম্পদের ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?’

‘তারা যদি এই সম্পদ বৈধভাবে অর্জন করে তাহলে আপনার জন্য তা হারাম। আর যদি তারা অবৈধ পন্থায় অর্জন করে তবুও শরয়ী কোনো কারণ ছাড়া আপনার জন্য তা হালাল হবে না’ ইমাম আউযায়ির জবাব শুনে আবদুল্লাহ বিন আলির চেহারা রাগে লাল হয়ে যায়।

কিছুক্ষন পর সে বলে, ‘আমরা কি আপনাকে কাজী নিয়োগ করবো?’

‘আপনার পূর্ববর্তীরা আমার কাধে এই দায়িত্ব চাপাননি। তারা আমার উপর অনুগ্রহ করেছেন। আমি চাই আপনার সময়েও এই অনুগ্রহ বলবত থাকুক’

‘এই তিনদিন কেনো আসেননি’

‘আমি রোজা রেখেছিলাম’

আবদুল্লাহ বিন আলি কোনো কথা না বলে চুপ হয়ে যান। ইমাম আউযায়ির ব্যক্তিত্বে তিনি বেশ প্রভাবিত হয়েছেন। কিছুক্ষণ পর তিনি ইমাম আউযায়িকে ইফতারীর আমন্ত্রন জানান। ইমাম আউযায়ি এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বিদায় নিয়ে বের হয়ে আসেন। তিনি ফটকের কাছে পৌঁছলে এক চাকর দৌড়ে আসে।

‘আমীর আপনাকে এই দুইশো দিনার হাদিয়া করেছেন’ বলে সে।

ইমাম আউযায়ি হাদিয়া গ্রহন করেন এবং সেখানেই তা সদকা করে দেন।

এমনই নির্ভীক ও দুনিয়া-বিমুখ আলেম ছিলেন ইমাম আউযায়ি।

ইমাম আউযায়ি রহিমাহুল্লাহ। উম্মাহর শ্রেষ্ঠ আলেমদের অন্যতম। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের মত খ্যাতিমান আলেম যার সম্পর্কে বলতেন, যদি আমাকে বলা হয় এই উম্মাহর জন্য দুজন আলেম বেছে নিতে, তাহলে আমি ইমাম আউযায়ী ও সুফিয়ান সাওরিকে বেছে নিবো। আর যদি বলা হয় দুজনের একজনকে বেছে নিতে তাহলে আমি আউযায়িকে বেছে নিবো। ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন, আউযায়ি এমন একজন ইমাম, যার অনুসরণ করা যায়।

ইমাম আউযায়ির জন্ম ৮৮ হিজরীতে, বা’লাবাক শহরে। তার মূল নাম আবদুর রহমান বিন আমর। দামেশকের নিকটে অবস্থিত আউযা নামক এলাকার বাসিন্দা হওয়ার কারণে তাকে আউযায়ি বলে হয়। ইমাম আবু যুরআ দিমাশকির মতে, তার পূর্বপুরুষ ছিল সিন্ধের বাসিন্দা। তবে মুহাম্মদ বিন সাদের অভিমত হলো, ইমাম আউযায়ির পূর্বপুরুষ ছিলেন হামদান গোত্রের একটি শাখা আউযা এর সদস্য।

ইমাম আউযায়ির বাল্যকাল কেটেছে এতিম অবস্থায়, একজন অনাথ শিশুর মত। ইমাম আউযায়ির বাল্যকালে তার মা তাকে নিয়ে বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়াতেন। একদিন ইমাম আউযায়ি শিশুদের সাথে খেলছিলেন। এ সময় পাশ দিয়ে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যাচ্ছিলেন। তাকে দেখে অন্য শিশুরা ভয়ে সরে পড়ে, কিন্তু ইমাম আউযায়ি দাঁড়িয়ে থাকেন। এ দৃশ্য দেখে সেই ব্যক্তি বুঝতে পারেন শিশুটি অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম। তিনি ইমাম আউযায়িকে নিজের দায়িত্ব নেন এবং তাকে ইয়ামামা পাঠিয়ে দেন। সেখানে তিনি ইয়াহইয়া ইবনু আবি কাসিরের কাছে পড়াশোনা করেন। তার মেধা ও পরিশ্রম দেখে উস্তাদ তার উপর খুবই সন্তুষ্ট হন। কিছুদিন পর ইমাম আউযায়ি যান বসরায়। সেখানে তার সাথে মুহাম্মদ ইবনু সিরিনের সাক্ষাৎ হয়। এ সময় মুহাম্মদ ইবনু সিরিন ছিলেন মৃত্যুশয্যায়। তার সাথে ইমাম আউযায়ির সাক্ষাতের কদিন পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন।

এরপর ইমাম আউযায়ি, মাইমুন বিন মেহরান ও ইবনু শিহাব যুহরির মত বরেন্য আলেমদের কাছেও পড়াশোনা করেন। দিনে দিনে তার ইলমের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি যখন দরস দেয়া শুরু করেন তখন তার ছাত্র হয়ে সামনে বসেছিলেন সুফিয়ান সাওরি, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের মত বরেন্য আলেমরা। তার থেকে হাদিস বর্ননা করেছেন আবু আসেম আন নাবিল, আবু ইসহাক আল ফাযারি, সাইদ বিন আবদুল আজিজ প্রমুখ।

ইসমাইল বিন আইয়াশ বলেন, ১৪০ হিজরিতেই লোকজন বলাবলি করছিল, বর্তমানে ইমাম আউযায়ি উম্মাহর আলেম।

ইলম অর্জনের পাশাপাশি ইবাদাতের দিকেও ইমাম আউযায়ি অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। রাতে তিনি নফল নামাজ ও তিলাওয়াতে ব্যস্ত থাকতেন। একবার এক মহিলা ইমাম আউযায়ির গৃহে প্রবেশ করে দেখেন তার সেজদার জায়গাটি ভিজা। পরে তিনি জানতেন পারেন ইমাম আউযায়ি সেজদায় গিয়ে কান্না করেন। ১৫০ হিজরীতে ইমাম আউযায়ি হজ্ব করেছিলেন। সে বছর তার সাথে হজ্ব করেছিলেন যমরাহ বিন রবিয়া। পরে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, এই হজ্বের সফরে আমি তাকে দিনে রাতে কখনো ঘুমাতে দেখিনি। তিনি নামাজ পড়তেন। যখন ঘুম আসতো তখন একটু হেলান দিতেন।

১৩০ হিজরীতে সিরিয়ায় একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। এই ভূমিকম্পে ইমাম আউযায়ির অনেক কিতাবাদি নষ্ট হয়ে যায়।

ইমাম আউযায়ি প্রায় সময় লোকজনকে ওয়াজ নসিহত করতেন। একবার তিনি লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, হে লোকসকল, তোমরা সেই আগুন থেকে বেঁচে থাক, যা অন্তরকে পুড়ে ফেলে। তোমরা এমন এক দেশে আছ, যেখানে অবস্থানকাল অতি সামান্য। এখান থেকে তোমাদের আবার যাত্রা করতে হবে। তোমাদের আগে অনেক প্রজন্ম দুনিয়ার শান শওকত প্রত্যক্ষ করেছে। তারা ছিল তোমাদের চেয়ে দীর্ঘ আয়ু প্রাপ্ত। শক্তির বিচারেও তারা ছিল এগিয়ে। কিন্তু তাদের আয়ু শেষ হওয়ার সাথে সাথে তারা বিদায় নিয়েছে। তারা হারিয়ে গেছে মানুষের স্মৃতি ও আলোচনা থেকে।

সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ইমাম আউযায়ির ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত প্রবল। একবার তিনি তার ছাত্র বাকিয়্যা বিন ওয়ালিদকে বলেছিলেন, হে বাকিয়্যা, সবসময় রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের উত্তমভাবে আলোচনা করবে। মনে রেখো, ইলম সেটিই যা সাহাবিদের মাধ্যমে এসেছে। যা তাদের মাধ্যমে আসেনি তা ইলম নয়।

আরেকবার তিনি বলেছিলেন, শুধুমাত্র মুমিনের অন্তরেই হজরত উসমান (রা) ও হজরত আলী (রা) এর ভালোবাসা একত্র হতে পারে।

একবার তিনি বলেন, মুমিন কথা কম বলে, আমল বেশি করে। মুনাফিক কথা বলে বেশি, আমল করে কম।

ইমাম আউযায়ি ছিলেন হালকাপাতলা গড়নের মানুষ। দাঁড়িতে মেহেদি লাগাতেন। বেশিরভাগ সময় নীরব থাকতেন। অনর্থক কথাবার্তা বলতেন না। তার ব্যাপারে প্রত্যক্ষদর্শিদের বক্তব্য ছিল,

তার মুখে কখনো কোনো অনর্থক শব্দ শোনা যায়নি। তিনি ঠিক ততটুকুই বলতেন, শ্রোতাদের যতটুকু শোনা প্রয়োজন। তাকে কখনো অট্টহাসি দিতে দেখা যায়নি। যখন তিনি আখিরাতের আলোচনা করতেন তখন মজলিসে এমন কেউ থাকতো না, যার উপর এক বিশেষ হাল তৈরী হতো না।

ইয়াম্ম আউযায়ি ছিলেন সাহসের স্তম্ভ। জালিম শাসকের মুখের উপর কথা বলতে তিনি কোনো পরোয়া করতেন না। আবদুল্লাহ বিন আলীর মত অত্যাচারী ব্যক্তির সামনেও তিনি কোনো পরোয়া করেননি। আবদুল্লাহ বিন আলির সাথে তার সাক্ষাতের ঘটনা বর্ননা করে ইমাম যাহাবী মন্তব্য করেছেন, আবদুল্লাহ বিন আলী ছিলেন প্রভাবশালী ও রক্তপিপাসু শাসক। কিন্তু এর পরেও ইমাম আউযায়ি তার সামনে তিক্ত সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি ভন্ড আলেমদের মত আচরণ করেননি, যারা শাসকদের অত্যাচার সমর্থন করে। তাদের সামনে বাতিলকে হক হিসেবে উপস্থাপন করে এবং সত্য বলার সামর্থ্য থাকার পরেও নীরব থাকে।

একবার খলিফা আবু জাফর মানসুর বলেছিলেন, আপনি আমাকে কিছু নসিহত করুন। তখন তিনি বলেছিলেন, আমি আপনাকে তাকওয়া ও বিনয়ের নসিহত করছি। আল্লাহ যেদিন অহংকারীদের দর্প চূর্ন করবেন সেদিন তিনি আপনার মর্যাদা উচ্চ করবেন। মনে রাখবেন, নবিজির সাথে বংশীয় সম্পর্কের কারণে আপনার উপর আবশ্যক হলো আরো বেশি করে আল্লাহর আনুগত্য করা।

ইমাম আউযায়ির ইন্তেকালের পর একজন আমীর বলেছিলেন, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুক হে আবু আমর। যারা আমাকে এই পদে বসিয়েছে তাদের চেয়েও আপনাকে আমি বেশি ভয় পেতাম।

ইমাম আউযায়ি জীবনের শেষদিনগুলো কাটিয়েছেন বৈরুতে। ১৫৭ হিজরীতে সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন নিজ যুগে সিরিয়ার শ্রেষ্ঠ ফকীহ। তার সময়ের আলেমরা বলাবলি করতেন, তিনি খলিফা হওয়ার যোগ্য ছিলেন। তিনি মুজতাহিদ ছিলেন। তার স্বতন্ত্র ফতোয়ার সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার।

এক সময় ইমাম আউযায়ির নিজস্ব মাজহাব টিকে ছিল। বিশেষ করে আন্দালুসে আমির প্রথম আবদুর রহমানের যুগ পর্যন্ত আন্দালুসে তার মাজহাব প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু পরে সেখানে মালেকি মাজহাবের প্রচলন হয়। ধীরে ধীরে ফিকহে আউযায়ি বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে ইমাম আউযায়ির ফতোয়াগুলো এখনো ফিকহের কিতাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিক্ষিপ্তভাবে।

(সিয়ারু আলামিন নুবালা থেকে সংক্ষেপিত)

Facebook Comments