প্রতিযোগিতা-২

নীড়ে ফেরার গল্প-৪৩ | নুসাইবাত আইশা

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

জীবন মানেই সব অদ্ভুত কাহিনী, ইসলামী পরিবারে বেড়ে ওঠার পরও সবকিছুই কেমন যেন অগোছালো হয়ে গিয়েছিল।

প্রাইমারি স্কুল থেকেই জীবনটা আমার পারসিয়েলিটিতে ভরপুর শুধুমাত্র প্রাক্টিসিং মুসলিম পরিবার এ বিলং করার জন্য। আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক দিনগুলো ছিলো ১০বছরের স্কুল জীবন।  ক্লাস ৬ এ ওঠার পর দুনিয়াতে যে এতকিছু আছে তা আমি জানলাম নতুন বান্ধবীদের থেকে,এই দিবস ওই দিবস ব্লা ব্লা..।জন্মদিন বলে যে কিছু আছে আমি তাও জানতাম না।জীবনে সব কিছু একবারে নতুন,যাকে বলে ব্রান্ডনিউ।

Tijarah Shop

জীবন আমার অন্যদিকে মোড় নেয়া শুরু করলো,তাদের সাথে আমার নতুন জীবন শুরু। দিবস-টিবস পালন করা শুরু করলাম,কিন্তু আমি আমার জায়গায় স্থির ইসলামি ব্যাপারে। মানে মোটামুটি সবদিকে আছি আমি এমন টাইপ অবস্থা আমার।ক্লাস ৮এ উঠে গেলাম,তারপর কেন যেন কোন ভাবেই কিছু হচ্ছিল না।তাদের মত চলতাম তাও হলনা হেয় দৃষ্টি যেন আমার পিছু ছাড়তে চায় না।আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না কি করব। আল্লাহতায়ালা অশেষ মেহেরবানীতে রেজাল্ট ভালো হল।তারপর ও আমাকে নিয়ে ক্লাসমেট থেকে শুরু করে শিক্ষক পর্যন্ত সবাই হেয় দৃষ্টিতে দেখত,প্রাক্টিসিং মুসলিম পরিবার এ বিলং করার জন্য।আমি আসলে এগুলো নিয়ে ভাবাভাবি আর করতে পারছিলাম না,অন্য স্কুলে ভর্তি হব সিদ্ধান্ত নিলাম তাও হলনা।

এই স্কুলেই থাকা লাগলো।যত সম্ভব ক্লাস নাইন এর ঘটনা এটি আমি একদিন দেখি সবাই গোল হয়ে বসে কি যেন দেখছে আমি আগ্রহ নিয়ে গিয়ে দেখি একটা পেজে কি যেন পড়ছে।ওই মেয়ের থেকে আমি কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলাম কি সব লিখা আমি আগ্রহ নিয়ে পড়তে গিয়ে দেখলাম আমি কিছুই বুজতে পারছিনা কিন্তু এতটুকু  বুঝলাম হিন্দি কিংবা উর্দু কিছু কথা বাংলায় লেখা।আমি কিছু ই বুঝতে না পারায় মোটামুটি ক্লাস এ হাসির রোল পরে গেল,নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিলো।পরে গুনলাম ওইটা একটা হিন্দি গান।

আমার মধ্যে আগ্রহ হল গানটি শোনার,পরে আমি গানটি শুনি তারপর ৯-১০ এ  কিছু গান শুনেছি,কিছু নাটক ও দেখেছি।এগুলো গুনতে বা দেখতে গিয়ে ইসলামি ব্যাপারে অনেক বেশীই অবহেলা চলে আসে আমার মধ্যে,নামাজ পড়া লাগবে তাই পরতাম। হিজাব পরার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়েগেলাম আমি,নামমাত্র মুসলিম!!

কাজে গাফিলতি শুরু হয়ে গেল। ইন্টারে ওঠার প্রথম বছর এভাবেই চললো। সেই সময় আমি গান শুনেছি, নাটক দেখছি  এগুলো তেই সীমাবদ্ধ ছিলাম আমি।ইন্টারে ওঠার পর মাথার মধ্যে তখন শুধু এই এককথায় বুয়েট এ চান্স পাওয়াই লাগবে আমাকে।পড়াশোনা করতাম প্রাইভেট এ পরিক্ষায় ভালো নম্বর ও পেতাম,কিন্তু দিনশেষে কোনভাবাবেই শান্তিতে থাকতে পারতামনা আমি।

মনোযোগ দিয়ে নামাজ পড়া আবার শুরু করলাম,গান আর নাটক দেখা বাদ দিতে লাগলাম কিন্তু মাঝে মাঝে আবার কেমন করে যেন শোনা হয়ে যেত,কথা আছে না সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে ওইরকম ব্যাপার। গান শোনা বা নাটক দেখাতেই সীমাবদ্ধ “আমি”কলেজ, প্রাইভেট এ হুজুরই থেকে গেলাম।

আমি বুঝতে পারছিলাম আমি যা করছি তা কোনভাবেই ঠিক না,কুরআনের কিছু আয়াতের কথা মনে পরছিল,মাথার মধ্যে এটাই চলতো আমার বাসায় তো কেউ কখনো গান শুনেনা বা নাটক দেখেনা,আমি কি করছি এগুলো?? এমনকি বাসায় টেলিভিশন ও ছিলো না আমাদের বাসায়!!কান্না পেত খুব ইন্টারের এক বছর আমি মোটামুটি ভালো পরিমানে গান শুনেছি এই কথাগুলো মনে করলে।

আমার পাশে এক মেয়ে থাকতো সে একদিন আমি ইফতারে বসেছি তখন আমার রুমে আসে আমার সাথে ইফতার করতে,৪-৫মিনিট বাকি আছে ইফতার এর তখন সে নাটক দেখতে লাগে আমি যতই তাকে বোঝায় কোন কিছু শুনে না সে,ইফতারে আগে যে এমন কিছু হতে পারে আমার জীবনে প্রথম দেখলাম কি করব কিছু বুজতে পারছিলাম না। আশেপাশে এগুলো দেখে আরও ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলাম,আমি আমার আগের জীবনকে কোনভাবেই ফেরত নিয়ে আসতে পারছিলাম না খুব বেশী অপরাধবোধ কাজ করত,যদিও তখন  গান শোনা বা নাটক দেখা তখন বাদ দিয়েছি।

খুব খারাপ লাগতো আব্বু আম্মার  জন্য।আমার পরিবার এক্সটিম লেভেলের বিশ্বাস করে আমাকে আমি কোন ভাবেই খারাপ কিছু করতে পারিনা এটাই তাদের বিশ্বাস।

কিন্তু একটা বিষয় আমাকে খুব ভাবাতো ইন্টারে ওঠার পর থেকে আমার জন্য  গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকলেই আমি তা করতে পারতাম না,কোনো না কোনো ভাবেই কিছু একটা হয়ে যেত,বেশিরভাগ সময় অসুস্থ হয়ে যেতাম,অসুস্থ অবস্থায় আমি কলেজ এ ইয়ার চেঞ্জ আর টেস্ট পরিক্ষা দেই তছাড়া অন্যকোনো পরিক্ষা সবগুলা দিতে পারিনি।

নিজের ঠিক করার চেষ্টা আমি করেই যাচ্ছি কিন্তু আমি আগের আমি হতে পারছি না কোনো ভাবেই। অবশেষে ইন্টার পরিক্ষা শুরু হয়ে গেল,পরিক্ষা দিতে পারলাম না।কাশি ও অন্য অসুখ এর অত্যাচার এ অথচ আমার বুদ্ধি হওয়ার পর কবে আমার শেষ কাশি হয়েছিল আমার মনে নেই।

মেডিকেল কোচিং এ ভর্তি হয়ে ছিলাম তাই ক্লাস করা শুরু করলাম,আর এটাই আমার জীবনকে আস্তে আস্তে পুরাতন আমিতে নিয়ে যেতে শুরু করে।বুয়েটে পড়ার চিন্তা আমি মাথা থেকে ফেলে দেই অনেক ভেবে যে এটা আমাকে আমার আমিতে নই অন্য কিছু তে নিয়ে যাবে।কোচিং এর ক্লাসগুলোতে স্যাররা এত বেশি পজেটিভ মাইন্ডের ছিলেন যে, আমার চিন্তা ভাবনাগুলো পজেটিভ হতে থাকে।আমার জীবন এর ৯-১০এর কিছু অংশ এবং ইন্টারের প্রথম বছর কে আমি সহজভাবে নিতে থাকি,নিজেকে চিন্তা ভাবনা সহজ করার চেষ্টা করতে থাকি, সবসময় ভাবতে থাকি আমি মানুষ ভুল করেছি অনেক কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তো তার বান্দার ভুল গুলো ক্ষমা করতে পছন্দ করেন।

নিয়মিত হাদিস কুরআন পরার চেষ্টা করতে থাকি,এর মধ্যে আমার এক মামাতো বোন এর বিয়ে হয়।বিয়েটা বাংলাদেশের অন্য সব বিয়ের মত হয়।বুদ্ধি হওয়ার পর আমি প্রথম কোন বিয়েতে এটেন্ড করেছিলাম।পাত্রী বসে আছে সবাই ছবি তুলছে, আপু আমাকে ডেকে বললো তার পাশে বসতে।বাসার বড়মেয়ে বলে কথা আমার কাছে কিছুই বলার ছিলনা তাই বসতে হল।বসার পর সবাই ছবি ওঠানোর জন্য পোজ দিতে বলছে,ছবি তুলছে দেখে আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না,শেষে আমার মুখটা আমি আমার হিজাব এর খোলা অংশ দিয়ে ঢেকে  ফেলি,নিজের মধ্যেই তখন অন্য রকম অনুভুতি হচ্ছিল আমার ছবি উঠলেও চোখ ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছিল না।নিজেকে খুব বেশি সেফ মনে হচ্ছিলো।এর পর আর আমি কখনও মুখ খুলে শুধু হিজাব পরে বের হইনি।একটা সাধারন মেয়ে  দ্বীনের  পথে আসতে কি পরিমান স্ট্রাগল করতে হয় তা আমি এখন বুঝতে পারি।

মানুষ জন তো বলবেই।আমাকেও বলে তুমি মাঝখানে দুই এক বছর ভালই তো ছিলে এগুলো আবার কি শুরু করেছ জংগী জংগী লাগে তোমাকে।বাসা থেকে বাইরে বের হতে সমস্যা কি তোমার,সারাদিন মুখ মাথা ধেকে রাখ কেন?আমরা মনে হয় আর মুসলিম নয়।আরো কত মেয়ে আছে….. হেনতেন ইত্যাদি।

এত বাজে কটু কথার মধ্য যখন আমার ভাই আমার আম্মাকে বলে আমার বোন অন্য কারো মত নয়।আমার বোন আমার কাছে সবচেয়ে  মুল্যবান,আমার শান্তির জায়গা।

এগুলো শুনলে কোন বোন এর কি কোন কষ্ট থাকতে পারে?কখনও না।

এখন ভাবলেই অবাক হই,আমি এর আগের বছর ইন্টার পরিক্ষায় দিতে পারলাম না, আর এবার পরিক্ষাই দেয়া লাগলো না।আলহামদুলিল্লাহ।

জীবনে এই পরিস্থিতি না আসলে হয়তো বুঝতাম না অনেক কিছু।জীবনের সব উদ্দেশ্যে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। Alhamdulillah For everything.O Allah save me from myself.

(সমাপ্ত)

NB:আমার জীবনে যা হয়েছে তা হয়ে গিয়েছে, বোন বা ভাই কষ্ট পাবেন না।হতাশ হবেন না আপনার রব খুব শীঘ্রই আপনাকে এমন কিছু দিবেন যা আপনার কল্পনা অতীত…..।কিন্তু আমার গল্পটা নীড়ে ফেরার নয়,শান্তির নীড়ে থেকে পথভুলে আবারও ফিরে আসা।আমি কি করেছিলাম তখন ভাবলেই অবাক লাগে,এটার কষ্ট কাউকে বোঝানো যায়না।আমার বিষয়টি অন্য কাউকে বোঝানো আমার জন্য কষ্টকর।

এটা আসলে কোন গল্পের ক্যাটাগরিতে পরবে না, কিন্তু সবাইকে সচেতন করার জন্য, নিজের জীবনের কিছু অংশ তুলে ধরেছি,কেউ যদি উপকৃত হয় তবে এটাই আমার জন্য অনেক।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: