নীড়ে ফেরার গল্প- ৪০ | উজায়ের আহমদ

উজায়ের আহমদ

২০১২ সাল সবেমাত্র শুরু হয়েছে।

বারোর সাথে মিলে আমার বয়সও তখন বারো। এই বয়সের পোলাপানগুলো এমনিতেই একটু চঞ্চল স্বভাবের হয়। সামনে যা পায়- তা-ই সে গোগ্রাসে গ্রহণ করে। একবারও ভেবে দেখে না- এখানে কী খারাবি আছে। প্রত্যেক ভালো বা খারাপ হওয়ার পেছনে তার পরিবারের অবদান অনেক বেশি। বর্তমানে দীনহীন পরিবারের কথা বাদই দিলাম; দীনদার পরিবারগুলোর সন্তান গড়ার ক্ষেত্রে অবহেলা চোখে পড়ার মতো। সমাজে এমন বাবা-মায়ের শেষ নেই, যারা ব্যক্তিগত জীবনে খুবই দীনদার; কিন্তু সন্তানের তরবিয়তের ক্ষেত্রে চরম অবহেলা প্রদর্শন করেন। মনে রাখবেন, ভরণপোষণ দিলেই সন্তানের হক আদায় হয়ে যায় না। সে যদি আপনার অবহেলার কারণে খারাপ হয়- তাহলে হাশরের ময়দানে আপনাকেই জবাবদিহি করতে হবে। তো এই এলোমেলো জগতে আমার পাঁচ বছর চলে গেলো। এই সময়ে ইসলাম সম্পর্কে আমার ধারণা খুবই সংকীর্ণ ছিলো। এরই মধ্যে হঠাৎ করে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন তরুণ শিক্ষক নিয়োগ পেলেন। কতোজনই তো আমাকে দাওয়াত দিলেন! কিন্তু কারো দাওয়াত আমায় এতোটা অাকৃষ্ট করেনি। তিনি ইসলাম সম্পর্কে আমার ধারণা আরও বিস্তৃত করেন।

তিনি বলেন-
ইসলাম একটি সার্বজনীন ধর্ম। দোলনা থেকে নিয়ে কবর পর্যন্ত একটা মানুষের যা-কিছু প্রয়োজন- সব ইসলাম বলে দিয়েছে। আমি বুঝতে শুরু করলাম- ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে বিস্তৃত। ইসলাম এতো ঠেকায় পড়েনি যে, গাইরুল্লাহ থেকে আইন ধার করে শাসনকার্য পরিচালনা করতে হবে। ইসলামের এতো মুরোদ নেই যে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ধার করে তার অর্থনীতি সাজাতে হবে। আসলে যতোদিন আমরা সেক্যুলারিযম, ব্যাংকিং, মানবাধিকার, সম অধিকার ইত্যাদি শব্দের গভীরে পৌছুতে না পারবো, ততোদিন এগুলোর মিশেলে ইসলামের জগাখিচুড়ি ব্যাখ্যা দিতে থাকবো। এ শব্দগুলো তৈরির পেছনে প্রবর্তকদের বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। সে উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে শুধু শাব্দিক অর্থ দেখে ব্যাখ্যা দিলে ভুল হবে। সেক্যুলারিযমের মূল তত্ত্ব হলো- ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে দেওয়া। যদিও এ দেশের সেক্যুলাররা এটা স্বীকার করতে চায় না। নইলে মুসলমানরা এদের পিঠের চামড়া তুলে নেবে। মির্জা ফখরুল তো বলেই ফেলেছে- বিএনপি ইসলামি শাসন চায় না। আরেক সেক্যুলার জাফরুল্লাহ ফতোয়া প্রকাশিত হবে এই ক্ষোভে বলে ফেলেছে- বোরকা সাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আর ড. কামাল তো যুদ্ধপরবর্তী সংবিধান প্রণয়ন করে নিজেকে খোদার আসনে বসিয়েছে। এ কর্মাকাণ্ডের ভিত্তিই হলো ‘ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে দেওয়া’ থিউরির উপর।

Tijarah Shop
আমার আত্মশুদ্ধির পথে রসদ যুগিয়েছে কুয়েতের বিখ্যাত আলেম ও স্কলার শাইখ খালিদ আল-হুসাইনান (র.) এর ‘যেমন ছিলেন তাঁরা’ বইটি। আরবের প্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন তিনি। আফগানিস্তানে জিহাদও করেছেন। উনার আত্মশুদ্ধিমূলক বইগুলো খুবই উপকারী। আমি উনার তিনটি বইয়ের নাম জানি। সেগুলো হলো: যেমন ছিলেন তাঁরা, আলোকিত জীবনের প্রত্যাশায়, আযকার। উনার ‘যেমন ছিলেন তাঁরা’ বইয়ের তিনটি লেখা আমায় কঠিন ভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রথম লেখাটি মনে পড়লে এখনও যেন লজ্জায় মরে যায়। লেখাটি তিনি ‘আল্লাহকে ভয় করা’ শিরোনামে আলোচনা করেছেন। একবার ইমাম আবু হানিফা (র.) কে কেউ বললো, আল্লাহকে ভয় করুন! ইমাম মাথা নীচু করলেন এবং কেঁদে ফেললেন। বললেন, আল্লাহ তোমাকে রহম করুন!

এক যুবক এক সুন্দরী মেয়েকে খুব ভালোবাসত। মেয়েটি ছিলো খুব দীনদার। মেয়েটি কখনও যুবকের সামনে আসেনি। একদিন যুবক মেয়েটিকে তার সামনে আসতে খবর পাঠালো। কিন্তু মেয়েটি তা প্রত্যাখ্যান করলো। যুবক এ ব্যথা সহ্য করতে না পেরে মারা গেলো। মেয়েটিকে বলা হলো- কী এমন হতো যদি একবার তার সামনে আসতে!?
উত্তরে সে যা বলেছিলো- তা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো। সে বলেছিলো- আল্লাহর কসম! আমি তাকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম। কিন্তু আল্লাহর ভয়ে কখনও তার সামনে আসিনি।

দ্বিতীয়ত তিনি ‘নামায’ শিরোনামে বিখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) এর ব্যাপারে বলেছেন- তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে রুকুতে গেলে পাখিরা তাঁকে গাছের কর্তিত ডাল মনে করে তাঁর পিঠে এসে বসত।

তৃতীয়ত তিনি ‘আল্লাহর প্রতি সু-ধারণার তাৎপর্য’ খুব সুন্দর আলোচনা করেছেন। আমি আমার জীবনের প্রত্যেক পরতে পরতে এর যথার্ততার প্রমাণ পেয়েছি। হাদিসে আল্লাহ তাঅালা বলেন-
‘আমি আমার বান্দার সাথে সেরূপ আচরণ করি; যেরূপ সে আমার প্রতি ধারণা করে’।

আর উনার ‘আযকার’ বইটিও উপকারী। এতে সকাল-সন্ধ্যার সকল আমল সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রতিদিন এগুলো পাঠ করলে সকল বিপদ-আপদ থেকে আল্লাহ তাঅালা আপনাকে রক্ষা করবেন ইনশাআল্লাহ। কেউ কেউ আমার কাছে নিজের কঠিন বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। এইতো মাসকয়েক পূর্বে আমাদের পরিবারের অনেক সদস্য অসুস্থ হয়েছেন এবং আমার পাড়া-প্রতিবেশির অনেকে অসুস্থ হয়েছেন এবং দুজন করোনায় মারাও গিয়েছেন; কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ আমি এখনও সুস্থ আছি। শুধু করোনার প্রাথমিক সময়ে একটু জর হয়েছিলো। এই আযকার পড়ে আমি এমন কঠিন বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি, যা শুনলে আপনি আঁতকে উঠবেন। আল্লাহ তাঅালা আমাদের আজীবন এমন বিপদ থেকে রক্ষা করুন! আমাদের ক্লাস হতো দোতলায়। তিন তলায় অন্য বিভাগের ক্লাস হতো। তো আমি একবার কোনো এক প্রয়োজনে তিনতলায় গিয়েছিলাম। তখন তিনতলায় নির্মাণকাজ চলছিলো। সেখানকার একটা বাশ সিঁড়ির দিকে তাক করা ছিলো। আমি সিঁড়ি দৌড়ে উঠছিলাম। আমি বাশটিকে খেয়াল করিনি। হঠাৎ বাশের সামনে আসামাত্রই আমার মাথা অাপনাঅাপনি নীচু হয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সেই দুর্ঘটনায় আজ আমায় কবরে থাকতে হতো। এ ঘটনা মনে পড়লে অন্তরের গভীর থেকে আল্লাহ তাঅালার শুকরিয়া আদায় করি। আরেকবার তো নিশ্চিত গাড়ি এক্সিডেন্টের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম।

দৃঢ়তার কথা বলবো? সেতো খুব কঠিন কাজ। তবে আলহামদুলিল্লাহ! দীনে পরিপূর্ণ অটল থাকার চেষ্টা করি। আমার কোনো যোগ্যতা নেই; কিন্তু গুনাহ করে ফেললে অনুতপ্ত হওয়ার যোগ্যতা তো আছে। এটাই সাত রাজার ধন! সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়েও এই ধন পাওয়া মুশকিল। নিজেকে জাহির করার জন্য বলছি না। শুধুই আমাদের কল্যাণের জন্য ইনশাআল্লাহ। বেশি বেশি ইস্তেগফার করবেন। এতে তিনটি উপকার রয়েছে: এক. আল্লাহ তাঅালা আপনার যে কোনো দুঅা কবুল করবেন। দুই. আল্লাহ তাঅালা আপনার সব প্রয়োজন পূর্ণ করে দেবেন। তিন. এমন স্থান থেকে আল্লাহ তাঅালা আপনার রিজিকের ব্যবস্থা করবেন- যা আপনি জীবনেও কল্পনা করেননি। অন্ধকার জীবনে এক মেয়েকে খুব ভালোবাসতাম। এটা তার পরিবারও জানতো। অনেকে এটা শুনে হয়তো আশ্চর্য হয়েছেন। কিন্তু সমাজের বাস্তবতা এটাই। তারা ভেবেছিলো- যেহেতু তাদের মেয়ের সাথে আমার সম্পর্ক আছে, আমি বোধ হয় তাদের মেয়েকে বিয়ে করবো। কিন্তু হয়েছে এর উল্টো। এরই মধ্যে আল্লাহ তাঅালা আমাকে হেদায়েত দিয়ে দেন। সুতরাং আমি তাকে এড়িয়ে চলতে থাকি। ঐ সময়টা আমার জন্য খুব কঠিন ছিলো। তার অবস্থা ছিলো আরও শোচনীয়। এখন সে এবং তার পরিবার আমার প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করে। তারা ভাবে- হয়তো আমি অন্য কোন মেয়ের সাথে রিলেশন করেছি। খারাপ ধারণা করুক, এতে আমার কিছুই আসে যায় না। আমি তো ত্যাগ করেছি একমাত্র আল্লাহর জন্য।

সুদর্শন ছেলেদের একটাই বিপদ, মেয়েদের চোখ লেগে থাকা। কতোবার যে এই ফিতনায় পড়েছি! তবে প্রতিবারই চেষ্টা করেছি সফলতার সাথে মুকাবেলা করতে। এ ফিতনায় পড়লে মনকে এই বলে প্রবোধ দিবেন- তোর জন্য আল্লাহ তাঅালা জান্নাতে আরও সুন্দরী হুরের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। কয়েকদিন নানু বাড়িতে একটা বিয়ে হয়েছিলো। বিয়ের দাওয়াত পেলাম। না গেলেও সমস্যা। তো মেয়ের বাড়ির দাওয়াত খেয়েছি; তবে ছেলের বাড়িতে যাইনি। কারণ বিয়ের প্রথম দিনেই বুঝে গিয়েছিলাম- আমার জন্য সেখানে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে! এমনিতেই আমি ওলিমা ও আকিকার দাওয়াত সাধারণত মিস দেইনা, কিন্তু সেবার দিতে হলো। যদিও অন্য অজুহাতও ছিলো; কিন্তু প্রথম অজুহাতের কাছে দ্বিতীয় অজুহাত একেবারেই নস্যি ছিলো। সুদর্শন ছেলেদের বলছি- নিজের চেহারার অপব্যবহার করবেন না। আপনি আল্লাহর সাথে সৎ থাকুন। আল্লাহ তাঅালা আপনার দুনিয়াতে একজন সৎ স্ত্রী এবং আখেরাতে অসংখ্য নেয়ামতের ব্যবস্থা করে রেখেছেন ইনশাআল্লাহ।

আর বিপদ? সেতো মুমিনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আপনি নিজেকে মুমিন দাবি করবেন আর বিপদ আসবে না-এটা হয় না। যেহেতু নিজেকে মুমিন দাবি করেন তাই জেনে রাখুন, আপনার উপর বিপদ আসবেই। আল্লাহ তাঅালা বলেন-
‘মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? অবশ্যই আমি তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি, যাতে তিনি জেনে নিতে পারেন কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী’।

আমার জীবনেও বহু বিপদ এসেছে। এমনকি আমার পরিবার থেকেও বাধা এসেছে। তবে আমার প্রতিবাদের কারণে তারা চুপ হয়ে গেছেন। এখন আমার দাওয়াতের কারণে তারা কিছুটা হলেও বুঝেছেন আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু সামাজিক বাধাগুলো এখনও দূর হয়নি। সমাজ থেকে কম ট্যাগ পাওয়া হয়নি আলহামদুলিল্লাহ। সমাজে কিছু খারাপ লোক থাকে। দেখবেন- সারাক্ষণ এরা আপনার পেছনে লেগে থাকবে। অযথা আপনার দোষ-ত্রুটি নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। মানুষের কাছে আপনার দোষচর্চা করবে। কিন্ত নিজের দোষের ব্যাপারে এরা মুখে কলুপ এঁটে থাকে।

আল্লাহ তাঅালা বলেন-
‘তেমনি অবাধ্যচারী মানুষ ও জিনকে প্রত্যেক নবির শত্রু বানিয়েছি প্রবঞ্চনার জন্য। তারা একে অন্যকে চমকপ্রদ বাক্য দ্বারা প্ররোচিত করে। যদি আপনার প্রতিপালক ইচ্ছা করতেন, তাহলে তারা এরূপ করতো না। সুতরাং আপনি তাদেরকে তাদের মিথ্যা রচনাকে বর্জন করুন’।
(সুরা অানঅাম)

সুতরাং আপনি নবিদের পথে যতো বেশি এগুবেন, এরা আপনার ততো বেশি লেগে থাকবে। অতএব এদের পথ ছেড়ে দিন। দেখুন এরা কতটুকু যেতে পারে। এদের মাফ করে দেওয়াই সর্বোত্তম। যদি মাফ না করেন তাহলে জেনে রাখুন, পঞ্চাশ বছর পরে হলেও আল্লাহ তার বিচার করবেন। জীবনে অনেক জালেমকেই পরিণতি ভোগ করতে দেখেছি। কাউকে জীবন সায়াহ্নেও পরিণতি ভোগ করতে দেখেছি। আবার কাউকে যুগ যুগ পর পরিণতি ভোগ করতে দেখেছি। মজলুম হন; কিন্তু জালেম হবেন না। ইতিহাস পড়ে দেখুন। জুলুমের পরিণতি থেকে কেউ রক্ষা পায়নি। যে মোগল শাহযাদারা মানুষের উপর জুলুম করতো; তাদেরকেই ভারতবাসী দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভিক্ষা করতে দেখেছে। তবে পার্থক্য হলো; গুটিকয়েক শাহযাদার জুলুমের পরিণতি গোটা ভারতের মুসলমানরা ভোগ করেছে। যে উসমানি খেলাফত দোর্দণ্ড প্রতাপে শাসন করেছে বিশাল ভূখণ্ড, সেই খেলাফতের পাশাদের জুলুম ও স্বেচ্ছাচারিতার মুসলমানরা হারালো শাশ্বত খেলাফতব্যবস্থা। আল্লাহ তাঅালা জুলুমের শাস্তিস্বরূপ তাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন মাদহাত পাশা ও কামাল পাশার মতো নষ্ট মানসিকতার লোকগুলোকে। পাকিস্তানের এক লোক তার মা জীবিত থাকা অবস্থায় মায়ের খোঁজখবর রাখত না। তো এই অসহায় অবস্থায়ই সেই অবলা নারী মারা যান। এর পরিণতিতে ঐ লোকের ছেলেরাও তার খোঁজখবর রাখত না। সে এভাবেই তার বাড়িতে বৃদ্ধ হয়ে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।

ষাটের দশকের শেষের দিকে যখন ইসলামি চিন্তাবিদ সাইয়েদ কুতুবকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো, সেই একই কারাগারে মুহাম্মদ ও বোন হামিদা কুতুবও বন্দি ছিলেন। কিন্তু একই কারাগারে থাকা সত্ত্বেও তাঁদের একে অপরের সাথে দেখা করার কোনো উপায় ছিলো না। কারণ কারাকমিটির নির্দেশ অনুযায়ী এটা ছিলো সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শারাওয়ি জুমা আরেকটি আইন জারি করেছিলেন যে, কোনো ইসলামপন্থী কয়েদিকে তাদের দর্শনার্থীদের কাছ থেকে কোনো খাবার বা ফল খেতে দেওয়া হবে না। বেশ কয়েক বছর কেটে যাওয়ার পর মুহাম্মদ কুতুব তার বোনের সাথে দেখা করার সুযোগ চেয়ে জেলকমিটির কাছে আবেদন জানালেন। শারাওয়ি জুমা উত্তর পাঠালো- জীবিত বা মৃত কোনো অবস্থাতেই তুমি তোমার বোনকে দেখতে পাবে না। এক বছরের মতো পার হবার পর নতুন এক সরকার ক্ষমতায় এলো এবং ক্ষমতাসীন হওয়ামাত্র তারা পূর্ববর্তী সরকারের সকল সদস্যকে জেলে ছুঁড়ে দিলো। হঠাৎ করেই মুহাম্মদ কুতুব এবং হামিদা কুতুব আবিষ্কার করলেন তারা এখন মুক্ত। আর শারাওয়ি জুমা নিজেকে আবিষ্কার করলো চার দেয়ালের মাঝে বন্দি। সেই একই কারাগারে। এরই মাঝে একদিন তার স্ত্রী একদিন ফল নিয়ে এলো তার সাথে দেখা করতে। কারারক্ষী নিয়ম মতো তার তল্লাশি করলো এবং ঝুড়িভর্তি ফলও দেখতে পেলো। কারারক্ষী জিজ্ঞেস করলো, এই ফল কার জন্য? আমার স্বামী শারাওয়ি জুমার জন্য। মুচকি হেসে প্রহরী জবাব দিলো- দুঃখিত, আমি নিয়ম মানতে বাধ্য। ফল হাতে প্রবেশ নিষেধ! সুবহানআল্লাহ! এভাবেই দুঅা কাজ করে।

অনেক সময় বিপদের স্রোতে পা পিছলে পড়ার আশঙ্কা হয়। কোনো কোনো তো পদস্খলন হয়েই যায়- কীরে! এতো দুঅা করছিস, আল্লাহ তো কবুল করছে না! তাহলে দুআ করে কী লাভ?

কিন্তু পরে আবার ইস্তেগফার করি। তারপর আল্লাহ তাঅালা আমাকে আবার বিপদে ফেলেন। যাতে আমি শুকরিয়া আদায় করার সুযোগ লাভ করি। এতে আমার অন্তর প্রশান্ত হয়। যাক, গুনাহের কাফফারা হয়ে গেলো। এইতো ক’দিন আগে আমার উপর দিয়ে কী ঝড়টাই না বয়ে গেলো! কিন্তু অন্তর ছিলো আল্লাহর দিকে পরিপূর্ণ নিবদ্ধ। এভাবেই আল্লাহ তাঅালা আমাদের বিপদ দিয়ে দেখতে চান- আমরা দীনের উপর অটল থাকি কিনা। বিপদ আসলে তাকে হালক ভাবে নেবেন। ভাববেন- এটা আমার তাকদিরে ছিলো। দেখবেন বিপদ হালকা হয়ে যাবে।

সব শেষে বলতে চাই- আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তাঅালা এখনও দীনের উপর রেখেছেন।
আমার জন্য দুঅা করবেন।

Facebook Comments