নীড়ের ফেরার গল্প-১৮ | মিজানুর রহমান সাব্বির

মিজানুর রহমান সাব্বির

গল্পের মতো জীবন

আসরের সালাত শেষ করে রুমে এসেছি দশ  মিনিট হয়ে হলো । অনেকেই বাইরে গেছে । সারাদিন দরস, তাকরার আর ঘুমের পর সবাই চায়  খোলা বাতাসে একটু ঘোরাফেরা করতে ।
সবুজ ঘাসের মাঠে বসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে।

আমি আজ বাইরে যাব না । জানালার সামনে কোরআন নিয়ে বসে গেলাম । অবসরে কোরআন তেলাওয়াত করা আমার অন্যতম কাজগুলোর একটি ।

সূরা মাআরিজ । আজকে তরজমাতুল কুরআন ক্লাসে পড়া হয়েছে । পড়তে শুরু করলাম । আমার চোখ ভিজে উঠছে । শরীর অন্য রকম একটা অনুভূতি বোধ করলাম । আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল । তেলাওয়াত শেষ করে উঠে গেলাম । ছাদে এসে এক সাইডে বসলাম ।
দূর আকাশে কয়েকটা পায়রা দলবেঁধে উড়ছিল ।

আজকের আমি কবে এমন হলাম । সাত বছর আগেও বিকেলগুলো কেটে যেত কোন আনন্দ উপভোগে ।
******

খুব আনন্দের সাথেই স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিলাম । জুতা মোজা খুলে ঘরে আসতেই লেবুর শরবত নিয়ে আম্মু হাজির । শরবত খেয়ে ঠান্ডা হয়ে নিলাম । ফুল পাওয়ারের চলা ফ্যানের নিচে বসে  খাওয়া-দাওয়া শেষে কোচিংয়ের পথ ধরলাম । হাসানা আর জাবেরের সাথে রাস্তায় দেখা ।
– কিরে দোস্ত !? আজকে পুরোটা ক্লাস তুই একদম চুপচাপ ছিলি । কারনটা বলতো ?
– আমি কিছুটা অপ্রভিত হয়ে বললাম এমনেই ।
-এমনিতে কিছু হয় না । কাহিনী টা বলতো । -বিকেলে আমাদের মসজিদে আসিছ । সব বলব ।
– তোর কথা শুনতে আবার মসজিদে আসা লাগবে । চাইলে এখন বলতে পারিস । নয়তো শুক্রবার দেখা হবে ‌।
স্কুলের গেটের সামনে আসতেই দেখি স্যার ঢুকছেন । আমরা ক্লাসে চলে গেলাম । সেদিন কোচিং শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায় । আমির সাহেব বসিয়ে রেখেছিল। বলল মাগরিব পড়ে বাসায় যাবে।

******
আমীর সাহেবের সাথে আমার পরিচয় গত সপ্তাহ থেকে ।
যোহরের সালাত শেষ করে বসেছিলাম । মসজিদের মেহরাব দেখছিলাম । সুন্দর কারু কাজ । গত মাসেই পুরো কাজ শেষ হয়েছে । পেছন থেকে কারো ‘এই যে বাবা’ ডাকে ফিরে তাকালাম সাদা রঙের ধোপদুরস্ত জামা পরা একজন ভদ্রলোক । কুচকুচে কালো শশ্রূতে তার চেহারায় বাড়তি একটা সৌন্দর্যের আভা ফুটে উঠেছে । আমার নাম ,ক্লাস, স্কুল ,বাসার ঠিকানা জিজ্ঞেস করলেন । খুব ভালো লাগছিল তার কথার উত্তর দিতে। বললাম আমার এখন গ্রীষ্মের ছুটি চলছে । আগামী সপ্তাহে স্কুল খোলা । আমীর সাহেব চমৎকার একটা হাসি দিয়ে বললেন , আলহামদুলিল্লাহ । প্রতিদিন সালাত পড়তে আসবে । আর সালাতের পর আমার সাথে দেখা করে যাবে । আমি এখানে বসে থাকি  সব সালাতের পর ।

এভাবেই শুরুটা ।
তিনি সালাতের পর বসতেন । অন্যান্য মানুষ থাকত  । সবাই  দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত করত । তারা জোহরের পর তালীম করে । কখনো কখনো নবীদের ঘটনা ও অন্যান্য দ্বীনি বিষয়ে মুযাকারা  করে।
*****

বই পড়ার নেশাটা কবে কিভাবে হয়েছিল মনে নেই ।
দুই সপ্তাহ ধরে পড়ার বিষয় বস্তুর মধ্যে পরিবর্তন এসে গেল । নবীগণ কেমন ছিলেন । কে কোথায় এসেছিলেন । তাদের কওমের  নাম । অবস্থা ।  এ প্রশ্নগুলো সারাদিন মাথায় বাজত।  ওই যে বললাম জোহর সালাতের পর হওয়া তালীম , মুযাকারা।  নবীদের গল্প শোনা। জানার পিপাসা । সব মিলিয়ে নবীদের গল্প লেখা বই খুঁজতে লাগলাম । তবে কাউকে জিজ্ঞেস করতাম না । কেন করতাম না সেটা না হয় আমার ব্যাপার হয়েই থাক।

একদিন মসজিদের বুকশেলফে পেলাম কাসাসুল আম্বিয়া নামের একটি বই ।
প্রথমে খুলতে চাইনি । ভাবছিলাম কোন দু’আর বই হবে হয়তো । এই ভাবাভাবির মধ্যেই সূচিপত্র দেখা শুরু করলাম । আনন্দে লাফ দিতে ইচ্ছে হলো । মসজিদ না হলে হয়তো লাফ দিতাম । পড়তে শুরু করলাম । প্রতিদিন বিকেলে সব কাজ ফেলে মসজিদের যে পাশ দিয়ে ঈদগাহ মাঠ সেই পাশের জানালার কাছে বসতাম । আগ্রহভরে পড়তে  থাকতাম । আদম আঃ থেকে শুরু হয়েছিল।
কখনো চলে যেতাম হাবিল কাবিলের হত্যার স্থানে ‌ । আবার কখনো নূহ নবীর ঈমানী কিস্তিতে । ইসমাইল আঃ এর ধৈর্য আমাকে দুই দিন পর্যন্ত আচ্ছন্ন রেখেছিল।

আজ যখন এই কথাগুলো লিখছি তখন খুব হাসি আসছে ‌ । ইসরাইলি বর্ণনাগুলো কত গোগ্রেসে গিলতাম । তবুও তো এই বর্ণনাগুলো আমার বিকাল কাটানোর মাধ্যম হতো ।
এভাবে তিন মাস কেটে যায় ।

*******
স্কুলে যেতাম ।  প্যান্ট পরতাম । বাসায় আসতাম পাঞ্জাবি পরতাম । কেমন যেনো ভালো লাগতো পাঞ্জাবি পরতে । বাসার সবাই খুব খুশী হতো। খেলাধুলা কমে গেছে তাই ।
আজান হলে মসজিদে চলে যেতাম । মসজিদের সাথে লাগোয়া একটি মাদ্রাসা ছিল । শরহে বেকায়া পর্যন্ত । প্রতিটি ক্লাসের সামনে দিয়ে হাঁটতাম । কখনো যদি দেখতাম কোন ক্লাসে গল্প চলছে ঢুকে যেতাম । পরিচিত হতাম । গল্প করতাম ।

একদিন বিকেলের ঘটনা ।
কাসাসুল আম্বিয়া পড়ছিলাম । পড়ার মাঝে  পিছনে কারো উপস্থিতি টের পেলাম। পেছন ফিরে  দেখি একজন হুজুর । মাথায় সাদা পাগড়ি । মুখে কালো দাড়ি । কয়েকটা সাদাও আছে । তবুও খুব সুন্দর লাগছিল ।
লজ্জিত অবস্থায় পড়ে গেলাম । মনে হলো তিনি এই বই সম্পর্কে কিছু বলবেন । কিন্তু না । পরিচয় নিলেন । পরিবারের হাল হাকিকত জানলেন ।
কথার ফাঁকে  কিভাবে যেন ডাক্তার জাকির নায়েকের কথা উঠল ।
সে জানতে চাইল জাকির নায়েককে আমার কাছে কেমন লাগে । লেকচার ভালো লাগে । তবে শুনি না ।‌ স্বাভাবিক ভাবেই বললাম।

মাগরিবের পর তার সাথে দেখা করতে বলে চলে গেলেন । আমি কিছুই বুঝলাম না । মাগরিবের নামাজ শেষ করে তার কাছে গেলাম । খুব স্নেহের সাথে আমাকে বসতে দিলেন । হালকা নাস্তাও করালেন । তার উদ্দেশ্য ছিল স্কুলের ছেলেরা সাধারনত জাকির নায়েকের ভক্ত হয় আমি এর বিপরীত কেন । এই কথা জানার জন্য তিনি ডেকেছেন ।

ব্যাপারটা আমার কাছে কঠিন লাগল । কি বলব বুঝতে পারছিলাম না । মূল কারণটা বললাম ইমাম সাহেব উনার লেকচার শুনতে নিষেধ  করেছেন ।
হুজুর খুশি হলেন । বললেন না শোনাই ভালো তবে শুনলে আগে কিছু বিষয়  জানতে ও বুঝতে হবে ।
চমৎকার ভাবে তিনি আমাকে বুঝাতে লাগলেন । এশার আযান হল তবে কথা শেষ হল না ।

আজ পর্যন্ত হুজুর আমাকে বুঝিয়ে জান । জানান দ্বীন দুনিয়া । ইলম । তাযকিয়া ।
তার এই রাহবারির আলো জ্বলে  থাকুক পুরো জীবন ।
**********

প্রতিদিন উনার কাছে কোরআন শিখতে শুরু করলাম । কখনো বিকেলে পড়তাম । কখনো মাগরিবের পর বা এশার পর ।
হুজুর প্রায় সময় মসনবী শরীফ থেকে আমাকে কবিতা শোনাতেন । অনেকে কিছুই বুঝতাম না । কিন্তু ভালো লাগত।
আমি হুজুরের সব কথা অক্ষরে অক্ষরে মানতে লাগলাম ।

তিনি বললেন স্কুলে কোন মেয়ের দিকে তাকানো যাবে না । আমি মাথা নিচু করে হাঁটতাম ।বললেন গান শোনা যাবে না । টিভি দেখা যাবে না । গান শোনা বাদ দিলাম । টিভি চললে অন্য রুমে চলে যেতাম । হুজুর কিছু বই দিয়েছিল সেগুলো পড়তাম ।
একদিন মাগরিবের পর যথারীতি হুজুরের কাছে পড়ছিলাম।

পড়া শেষে বললেন । এই রমজানের পর আপনি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে যান । আমি হাসলাম । বললাম আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা । আর আমি বড় হয়ে গেছি । এই বয়সে মাদ্রাসায় ভর্তি হলে কি আর শিখতে পারব।
হুজুর শান্তকণ্ঠে বুঝাতে লাগলেন সম্ভব।

আমি বাসায় চলে আসি  ।
রাতে খাওয়া শেষে বিছানায় যাই । চিন্তার কোন অন্ত পাচ্ছিলাম না । কি করব ।
******

স্কুলে গেলাম । অস্বস্তি লাগছিল  ক্লাস করতে । হাসানকে বললাম ও হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাওয়ার জোগাড় ।

মাগরিবের সালাত পড়ে বসে আছি ।

দুই রাকাত সালাত পড়লাম । দু’আ করলাম । খুব সহজ করে কয়েকটা কথা বললাম আল্লাহর কাছে ।

বাসায় এসে আম্মুকে বললাম , কাল থেকে আর স্কুলে যাচ্ছি না মাদ্রাসায় ভর্তি হবো । আম্মু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন । ভাবলেন রসিকতা   করছি । যখন সিরিয়াসলি বললাম প্রচন্ড জোরে এক থাপ্পর দিলেন ।
রাতে যখন আব্বু শুনলেন । আব্বু তার একজন পুলিশ বন্ধুকে ফোন দিলেন । বললেন জঙ্গী বানাচ্ছে তার ছেলেকে ।
চিন্তায় পড়ে গেলাম কি করব । বুঝতে পারলাম না । পরেরদিন হুজুরকে বললাম । তিনি হাসলেন  দোয়া করলেন । চিন্তামুক্ত থাকতে বললেন।

স্কুলে টুপি পড়ে যেতে বললেন ।
*****

স্যার  টুপি খুলে নিলেন । বললেন মানুষ  জামাত-শিবির বলবে ।  স্কুলের মনোগ্রাম থাকায় স্কুলকেও দোষারোপ করতে পারে ।
দুনিয়াতে নিজেকে খুব একা মনে হতে লাগল । যোহরের সালাত পড়ে আল্লাহর কাছে সব দুঃখ বললাম ।

সন্ধ্যা হলো । চারদিকে দিনের কোলাহল থেমে গেছে ।
রাতে আব্বু আর আম্মু কে সামনে বসিয়ে কিছু কথা বললাম । কান্নায় আমি কথা বলতে পারছিলাম না ।
মাদ্রাসায় পড়লে চাকরি পাওয়া যাবে না । টাকা কম  । এই যদি তোমাদের অভিযোগ হয় তাহলে বলছি,  নিজের রক্ত বিক্রি করে তোমাদের কে সুখে রাখব ।

তোমরা যদি আমার কথা না শুনো আমি কাল বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছি ।
আম্মু কাঁদলেন । আব্বু কাঁদলেন ।
আমি বুঝতে পারছিলাম না কি থেকে কি বলে ফেললাম ।
রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে দুআ করলাম ।

সকালে আম্মু ডেকে বললেন মাদ্রাসায় যাবে ঠিক । কিন্তু আমি বুঝছি না কিভাবে পারবি । আমি অভয় দিলাম।

তারা রাজি হলো । আমার নতুন জন্ম হলো । দেখলাম নতুন সূর্যোদয়।

শিক্ষার্থী — জামিয়া সাঈদিয়া কারীমিয়া।

Facebook Comments