নীড়ে ফেরার গল্প-২৯ | মুহাম্মদ ইবরাহিম খলিল সিরাজী 

মুহাম্মদ ইবরাহিম খলিল সিরাজী 

আসসালামু আলাইকুম। সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। যিনি আমাকে মুসলিম ঘরে জন্ম দিয়েছেন। আমি একজন ছোট্ট বালক। নিজ পরিবার থেকেই ইসলামের প্রাথমিক ধারণা লাভ করি। সবেমাত্র একটু-আধটু বুঝতে শিখেছি। স্কুলে বেশ ভালো লেখাপড়াও চলছে। প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত অত্যন্ত সুনাম ও কৃতিত্বের সাথে সমাপ্ত করলাম।

তৃতীয় শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত এই তিন বছর শিক্ষানবিসকালীন একটি কথা আমার কর্ণকূহুরে বারবার ঘুরপাক খায় এবং আমাকে ভাবিয়ে তোলে।

আমার ‘মা’ আমাকে মাদরাসায় লেখাপড়া করাবে। আমাকে হাফেজ-আলেম হিসেবে গড়ে তুলবে। তিনি হবেন একজন হাফেজে কুরআনের ‘মা’। কিন্তু আমার পরিবারের কেউ আমাকে মাদরাসায় পড়াতে রাজি না। পরিবারের সকলের বক্তব্য হলো  মাদরাসায় লেখাপড়া করা অনেক কষ্ট । এতো কষ্টের ভিতর থাকতে পারবে না। শুধু-শুধু আমাদের সম্মান-মর্যাদা নষ্ট করবে। (এই নয় যে, তারা মাদরাসা শিক্ষার বিরোধী। )

আমার মায়ের আশা পূরণে পরিবারের কেউ সহযোগী হলো না। মাদরাসায় ভর্তি করানোর বিষয়ে কেউ কিছু বললোও না। একমাত্র আমার ‘মা’ ব্যতীত। এরই মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হলাম। দেখতে-দেখতে ষষ্ঠ শ্রণীর বছরটাও অতিবাহিত হয়ে গেল। এবার আমার সিদ্ধান্ত পরিবারের কাছে ব্যক্ত করলাম, আমি মাদরাসায় পড়বো হাফেজ হবো! আমাকে মাদরাসায় ভর্তি করে না দিলেও আমি কোন স্কুলে আর পড়বো না।

Tijarah Shop

প্রিয় পাঠক,

পর্বত_চূড়ায় উঠতে যার মনে ভয় কম্পন ,

ভূমির অতল গহ্বরে সে রয়ে যায় আমরণ  ।

একপর্যায়ে পরিবারের সবাই রাজি হলেন এবং আমাকে মাদরাসায় পড়ানোর ব্যাপারে একমত পোষণ করলেন। এরই ফাঁকে বাধার সম্মুখীন হতে হয় বিভিন্নভাবে। যে হাইস্কুলে পড়তাম সেখান থেকে অফার আসলো আমাকে বৃত্তি প্রদান করবে! মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই।  এবং পাশে একটি আলিয়া মাদরাসা থেকে কয়েকজন শিক্ষক আসে আমাকে তাদের মাদরাসায় নিতে, কিন্তু আমার মনের ইচ্ছে ছিল আমি হাফেজ হবো। আর আলিয়াতে ভর্তি হলে তো হাফেজ হওয়া সম্ভব না। তাই সবকিছু প্রত্যাখান করলাম। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য আরো কত কী! সেগুলো উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করছি না…।

প্রিয় পাঠক, দুনিয়ার তুচ্ছ লোভ-লালসা থেকে দূরে থাকুন! তারা আপনাকে বিভিন্নভাবে লোভ দেখাবে।

শুরু হলো জীবনের প্রথম অধ্যায়ে তুমুল লড়াই। তখনও আমি অপ্রাপ্ত বয়স্ক একজন বালক। সব বাধা ডিঙিয়ে চলতে লাগলাম অবিরাম। পরিবারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমার বাবা সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম একটি মাদরাসায় (দত্তবাড়ি দারুল হিফজ ইসলামিয়া মাদরাসা) ভর্তি করিয়ে দেন।

ভর্তির কাজ সম্পন্ন হলো।  ছোট ছেলেকে একা রেখে বাবা যখন বাসায় ফিরছেন বাবার চোখের কোণে অশ্রু, আমার চোখের কোণে ও অশ্রু চলে এলো বিচ্ছেদ বেদনায়! এদিকে আমার মমতাময়ী ‘মা’ আমার বিচ্ছেদে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তিনি শুধু এটুকু বলে আল্লাহর কাছে দুআ করতেন, হে আল্লাহ তোমার জান তোমার মাল তোমারই কুদরতি হাতে সঁপে দিয়েছি। তুমি আমার সন্তানকে দেখে রেখো! আমার ছেলেকে হাফেজে কোরআন হিসেবে কবুল করো!

প্রিয় পাঠক, মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য সবচেয়ে বেশি মকবুল! তাই, মায়ের থেকে দোয়া নিতে শিখুন!

শুরু হলো জীবনের নতুন অধ্যায়। একদিকে আল্লাহর দয়া। অন্যদিকে মায়ের দোয়া। আমার প্রচেষ্টা। সম্পন্ন হলো কোরআনের হিফজ। এখন আমি একজন কমপ্লিট হাফেজে কোরআন। মাদরাসায় শুরু লগ্ন থেকে হিফজ শেষ করা পর্যন্ত অভ্যন্তরীন বিভিন্ন বিষয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছি। সেগুলো আজ উল্লেখ করছি না অন্য একদিন…

প্রিয় ভাই,

আপনার জীবনের বাধা গুলোও আপনার সফলতার পথের কাটা নয়, বরং জীবনের সৌন্দর্য। সফল অনেকেই হয় তবে বিখ্যাত সফল তো তারাই হয়, যারা বাধা ডিঙাতে পেরেছে। তাই বলি,মনোবল হারাতে নেই।

হিফয চলাকালীন অবস্থায় বিভিন্ন হিফজুল কোরআন প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছে। হুফফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশন কর্তৃক জেলা ব্যাপী হিফযুল কোরআন প্রতিযোগীতায়, প্রথম পর্যায়ে ১০ পারা গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করি। আলহামদুলিল্লাহ। যার হাত ধরে আমার পথচলা তার নামটি উল্লেখ না করলে নিজেকে অপরাধী বলে মনে হচ্ছে। অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করছি আমার ওস্তাদ হাফেজ মাও.একরামুল হক সাহেব দা. বা. কে। তার সুদৃষ্টিতে আমার  পথচলা। (আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা দান করুণ! আমিন)

হিফয শুনানি শেষের দিকে এরই মাঝে সিরাজগঞ্জ জেলা ব্যাপী হিফজুল কোরআন প্রতিযোগীতায় ৩০পারা গ্রুপে প্রথম স্থান অর্জন করি। এবং টিভি শো মাছরাঙা চ্যানেলের আয়োজনে হিফযুল কোরআন প্রতিযোগীতায় বিভাগীয় পর্যায়ে রাজশাহী বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করি। আল্লাহর অশেষ কৃপায়!  আলহামদুলিল্লাহ।

প্রিয় পাঠক,

কোন একজন যোগ্য মানুষের কাছে আপনার পথচলার লাগাম ছেড়ে দিন!

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো অন্তরে জন্ম নিলো দুনিয়ার তুচ্ছ সম্মান ও লোভ লালসা। সংকল্প করলাম বিশ্বসেরা হাফেজ হতে হবে। কোটি-কোটি টাকা ইনকাম করতে হবে আরো কত ভ্রান্ত চিন্তা ভাবনা। নিছক এটি একটি কল্পনা মাত্র। এখানে আর একটি কথা সংযুক্ত করা যুক্তিযুক্ত । সেটি হলো, যে ভালো কাজ করার নিয়ত করে সাথে সাথে তার আমল নামায় একটি সাওয়াব লিখিত হয়। সে কাজটি করুক বা না করুক।  পক্ষান্তরে যে মন্দ কাজের সংকল্প করে সাথে সাথেই তার আমল নামায় গুনাহ লেখা হয় না বরং কর্মে প্রকাশ করলেই কেবল তার গুনাহ লেখা হয়।

(আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুণ! আমিন)

বছরের শেষ লগ্ন। আসলো রমযান। ঢাকায় ভর্তি হবো পুরো প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যে আমার অন্তর পরিবর্তন হলো সম্ভবত একজন ওস্তাদের পরামর্শে। আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফি রহ. কোন প্রতিযোগীতা করেছেন? এই প্রতিযোগীতা?  উত্তর আসলো না। তখন ভাবতে লাগলাম বড় বড় ব্যক্তিত্বরা যে প্রতিযোগীতা করেছেন আমাকে সে প্রতিযোগীতাই করতে হবে। একপর্যায়ে দুনিয়ার ভূত মাথা থেকে নামলো। এর অর্থ এই নয় যে,হিফযুল কোরআন প্রতিযোগীতা করতে হবে না। বরং অবশ্যই করতে হবে সারাবিশ্বে কোরআনের আওয়াজ ছড়িয়ে দিতে হবে তবে নীতিমালা ঠিক রেখে।

প্রিয় পাঠক, অবশ্যই আপনাকে মনে রাখতে হবে আমি কিন্তু হিফযুল কোরআন প্রতিযোগীতার বিরোধিতা করছি না। বরং আমি বিরোধিতা করছি আমার এবং আমার মতো যাদের উদ্দেশ্য থাকে তাদের। অধিকাংশ ছাত্রের টার্গেটে সমস্যা থাকে। তাই অভিভাবক মহোদয়কে বলবো আপনার সন্তানের খেয়াল আপনাকেই রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যোগ্য আলেমের অভাব। আপনার সন্তানকে যোগ্য আলেম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাছাড়া আমি যে বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছি তা হলো একজন ছেলে হিফয শেষে শুনানি কমপ্লিট করার পরেও বছরের পর বছর হিফয খানায় কাটিয়ে দেয়। এই আশায় যে,আমি আন্তর্জাতিক মানের হাফেজ হবো। আমাকে বহির্বিশ্বে প্রতিযোগীতা করতে হবে। অবশ্য এক্ষেত্রে ওস্তাদের ভূমিকাটাও কম থাকে না।

প্রিয় পাঠক, নেক ছুরোতে ধোকা থেকে বাঁচতে হবে! বাঁচাতে হবে!

আমার প্রশ্ন হলো তাহলে যে ছেলেটা আন্তর্জাতিক মানের হাফেজ হওয়ার আশায় বছরের পর বছর হিফয খানায় সময় পার করছে। সে শরিয়তের মাসআলা শিখবে কবে? ভালো আলেম হবে কবে? অথচ আন্তর্জাতিক মানের হাফেজ হওয়া ফরজ না। আল্লাহ সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুণ! আমিন

শুরু হলো জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। 

অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে আমার পথচলা। আমার স্বপ্ন দ্বীনের একজন দ্বাঈ হওয়া। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কিতাব বিভাগে অধ্যায়ন করার জন্য ছুটে চলে আসি ইলমের শহর, আমলের মারকায চট্টগ্রাম ফটিকছড়িস্থ ওবাইদিয়া নানুপুর মাদরাসায়। আল্লাহর উপর ভরসা করে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করি। শুরুতে হাতেখড়ি উর্দু কায়দা দিয়ে। বিভিন্ন শয়তানি কুমন্ত্রণা মনের ভিতর বাসা বাধে একবার মনে হয় ভালোভাবে পড়বো আবার পরক্ষণেই মনে হয় পড়বো না হিফয খানায় খেদমত করবো।

প্রিয় ভাই,

আকাশের রং মানুষের মন ঘন ঘন হয় পরিবর্তন।

আমার একান্ত ইচ্ছা ছিল বড় একজন বক্তা হওয়া সেই নিমিত্তে ওয়াজের নামে বিভিন্ন কুমন্ত্রণা আমার মনে স্থান পায়। সেগুলোও একপর্যায়ে মন থেকে মুছে ফেলি। ভাগ্যক্রমে সাক্ষাৎ লাভ হয় একজন যোগ্য আলেমের সাথে বেফাকুল মাদরিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের ইংরেজি সম্পাদক, মারকাজুল উলুম কাঁচপুরের শায়খুল হাদীস মুফতি কাজী মুহাম্মদ হানিফ সাহেব দা. বা.। হযরতের সান্নিধ্য লাভ করি বেশ কিছুদিন।

প্রিয় পাঠক, বড়দের সান্নিধ্য গ্রহন করুন!

এরপর বাবুনগর মাদরাসায় আদব বিভাগে ভর্তি হই। অধ্যায়ন ভালোভাবেই চলছিলো । কিন্তু সেই ভালোটা বেশিদিন থাকলো না। অসুস্থতা অনুভব করি। অনেক ডাক্তারের প্রেসক্রিপসনেও রোগ ভালো হলো না। আবার এদিকে বাবুনগর আদব বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী কোরবানির বন্ধে সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপী নাহু-সরফ ও আদবের কোর্স। আমি অযোগ্যকেও মুয়াল্লিম হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এদিকে আমি অসুস্থতায় ভুগছি আবার অন্যদিকে আদিব সাহেব হুজুরের নির্দেশ পালন করতেই হবে। অসুস্থ শরীর নিয়েই রওয়ানা হলাম কোর্স করানোর জন্য। এরপর…

কোরবানির ছুটি শেষ হয়ে এলো কিন্তু অসুস্থতার দরুন মাদরাসায় যেতে পারছি না। শরীরের অবস্থা ও ভালো হচ্ছে না। অবশেষে একজন মুফতি সাহেবের শরণাপন্ন হয়ে জানতে পারলাম আমাকে ‘বান’ মারা হয়েছে অর্থাৎ জাদুটোনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে আল্লাহই অধিক জ্ঞাত। নেমে এলো জীবনের কালো অধ্যায়। বিছানায় পড়ে ছিলাম দীর্ঘদিন। পরিশেষে মহান রব্বুল আলামীনের অশেষ মেহেরবানীতে আরোগ্য লাভ করি। আলহামদুলিল্লাহ।

প্রিয় পাঠক, এতো শত্রুতার পরও আমি থেমে ছিলাম না। নির্ধারিত গন্তব্যে পৌছার জন্য সর্বাত্বক চেষ্টা করেছি। এখনও করছি। আল্লাহ আমার সহায় হোন!

নেই কোন ক্লান্তি, নেই কোন বিশ্রাম।

হতাশ হতে নেই, বিচলিত হতে নেই। আপনাকে চলতেই হবে অবিরাম। শত্রুর শত বাধা ডিঙিয়ে পাড়ি দিতে হবে আপনার গন্তব্যের দিকে।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যারা এত সুন্দর একটি চমৎকার  আয়োজন উপহার দিয়েছেন তাদের সকলের । সর্বশেষ সকলের কাছে দোয়া চাই আল্লাহ যেনো আমাকে দ্বীনের দ্বাঈ হিসেবে কবুল করেন! এখন আমি আল- জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসায় মেশকাত জামাতে অধ্যায়ন করছি। আল্লাহ যেন আমাকে এবং আপনাদের সবাইকে উভয় জাহানে সফলতা দান করেন! সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আজ এখানে শেষ করছি।

আল্লাহ হাফেজ

Facebook Comments