ইমরান রাইহান

ধর্ম বনাম মানবতা: আত্মপরিচয়ের সংকট | জাহিদ সিদ্দিক মুঘল

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

সেক্যুলাররা জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার জন্য প্রশ্ন তোলে, আচ্ছা আমরা প্রথমে মুসলমান নাকি মানুষ? তারা নিজেরাই এর জবাব দেয়। তারা বলে আমরা শুরুতে মানুষ। এর পর আমরা মুসলমান। অর্থাৎ মুসলমান হওয়ার জন্য প্রথমে আমাদের মানুষ হওয়া জরুরী। সেক্যুলাররা সবসময় জোর দিয়ে বলে, একটি সমাজে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবাইকে মানুষ পরিচয়ে পরিচিত হতে হবে। নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম, বংশ বা অন্য পরিচয়ে পরিচিত হওয়া যাবে না। অর্থাৎ, সমাজের মানুষকে সেই পরিচয়ে পরিচিত হতে হবে, যা সকল সদস্যের মাঝে উপস্থিত। সেক্যুলাররা মানুষ পরিচয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়, কারণ, এই পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার পর ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়ে পরিণত হয়।

এজন্য সকল সেক্যুলার জীবনব্যবস্থায় ধর্মকে নাগরিকের ব্যক্তিগত বিষয় ধরে নেয়া হয়। যেমন লিবারেলিজম, ক্যাপিটালিজম, ইত্যাদী। সেক্যুলারিজম বলতে এখানে আমাদের উদ্দেশ্য হলো এমন জীবনব্যবস্থা যার ভিত্তি অহীর উপর প্রতিষ্ঠিত না হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানুষের বিবেক ও বুদ্ধির উপর। আপনারা দেখবেন সেক্যুলাররা প্রায়ই বলে থাকে, ‘আমাদের উচিত মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা’ ‘সবার চিন্তা ও দৃষ্টিভংগিকে শ্রদ্ধা করতে হবে, কারণ আমরা সবাই মানুষ’। আফসোসের বিষয় হলো আমাদের মুসলিম চিন্তাবিদরা যখন সেক্যুলারদের সাথে কথা বলেন তখন তারা মানবতা প্রতিষ্ঠা করার জন্যই নিজের পক্ষের দলীল দিতে থাকেন। এর ফলে হয় তারা এই বিতর্কে পরাজিত হন অথবা নিজেদের দলিলের জন্য অপব্যাখা খুজে নেন। প্রকৃতপক্ষে মানবতার পূজা বন্ধ না করলে ধর্মকে সমাজ জীবনে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়ার পক্ষে কোনো শক্তিশালী দলিল থাকে না।

প্রশ্ন এসেছে আমরা প্রথমে মানুষ নাকি মুসলমান? এর সরাসরি জবাব হলো, আমার মূল পরিচয় আমি মুসলমান (তথা আবদ বা বান্দা)। আমার মানুষ হয়ে জন্ম নেয়াটা নিছক একটি ঘটনামাত্র এবং এটি আমার মুসলমানিত্ব প্রকাশের মাধ্যম। অর্থাৎ আমার মূল পরিচয় হলো আমি আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর গোলাম। আরেকটি ভাবার বিষয় হলো, আমি যদি মানুষ না হতাম তাহলে কী হতাম? একটি সম্ভাবনা হলো জ্বীন বা ফেরেশতা হতাম, আরেকটা সম্ভাবনা হলো জড় পদার্থ কিংবা উদ্ভিদ হতাম। কিন্তু আমি যাই হইনা কেন সবসময় আমি মাখলুকই হতাম, অর্থাৎ বান্দা হতাম। আমার দাসত্বের পদ্ধতী একেকবার একেকরকম হত। যদি আমি ফেরেশতা হতাম তাহলে আমার আবদিয়্যতের চিত্র একরকম হতো, উদ্ভিদ হলে এই চিত্র হতো আরেকরকম।

এখন আমি মানুষ তাই দাসত্বের চিত্রও ভিন্ন। অর্থাৎ আমার অবস্থা যতই বদলাক আমার অবস্থান একই থাকছে, সর্বাবস্থায় আমি আল্লাহর একজন বান্দা-ই থাকি, এতে কোনো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আমার অস্তিত্বের প্রতিটি অবস্থা আমার জন্য contingent, কোনো অবস্থাতেই আমি খালেক নই, বরং আল্লাহ আমার ইচ্ছা ব্যতিত তিনি যেভাবে চেয়েছেন সেভাবেই আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি কখনো বাধ্য ছিলেন না যে আমাকে মানুষই বানাতে হবে। ব্যস এটাই কথা। আমার মূল পরিচয় হলো আমার মুসলমানিত্ব, আর মনুষ্যত্ব হলো আমার মুসলমানিত্ব প্রকাশের একটা মাধ্যম মাত্র। এর বাইরে আমার মুসলমানিত্বের আলাদা কোনো চিত্র বা বৈশিষ্ট্য নেই। আমরা আবদিয়্যত বা গোলামি কে মুসলমানি দ্বারা ব্যক্ত করেছি কারণ, প্রতিটি মুসলমানই মূলত আবদ বা দাস, এবার সে এটা স্বীকার করুক বা না করুক। সে যদি অন্তরে ও মুখে এই কথা ব্যক্ত করে তাহলে তাকে মুসলমান (নিজের মূল বৈশিষ্ট্য স্বীকারকারী) , এবং অস্বীকার করলে কাফের (নিজের মূল বৈশিষ্ট্য অস্বীকারকারী) বলা হয়। স্পষ্ট হলো আমাদের মূল পরিচয় ইসলাম আর মনুষ্যত্ব হলো তা প্রকাশের মাধ্যম। তাহলে মনুষ্যত্ব প্রকাশের সেই মাধ্যমটিই গ্রহনযোগ্য হবে যার মধ্যে আবদিয়্যতের প্রকাশ ঘটবে।

আল্লাহর কাছে আবদিয়্যত প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম হলো ইসলাম। সুতরাং আমার মনুষ্যত্ব বা ইনসানিয়্যত তখনই গ্রহনযোগ্য হবে যখন আমার জীবনের সব কাজ ইসলাম অনুসারে হবে। এজন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلاَمِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত। [ সুরা ইমরান ৩:৮৫ ]

মনে রাখবেন, আমার মনুষ্যত্ব পরিচয় তখনই স্বার্থক হবে যখন আমি একে আবদিয়্যত প্রকাশের মাধ্যম বানাবো। আর আবদিয়্যত প্রকাশের মাধ্যম একটিই, যা আল্লাহ তার নবি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মাধ্যমে আমাদের জানিয়েছেন। যখন স্থির হলো আমি আল্লাহর বান্দা, তাহলে আমি ব্যক্তিগত জীবনেও আল্লাহর বান্দা, সামাজিক জীবনেও আল্লাহর বান্দা। তাহলে এই চিন্তা কীভাবে সঠিক হতে পারে যে, আমি ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর বান্দা থাকবো এবং তার সকল বিধান মেনে নিব, কিন্তু যখনই সামাজিক জীবনে প্রবেশ করবো তখন আর আমি বান্দা থাকবো না, এবং সেক্ষেত্রে আল্লাহর কোনো বিধানও প্রযোজ্য হবে না। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, ব্যক্তিগত জীবন হোক কিংবা সামাজিক জীবন, কোনো অবস্থাতেই আমি স্বাধীন নই এবং কোনো বিধান দেয়ার অধিকারও রাখি না।

কেউ যদি প্রশ্ন করে আপনি মুসলমান নাকি মানুষ, তাহলে বিচলিত না হয়ে তাকেও পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিন। তাকে বলুন, আমার জীবনের এমন কোনো স্তর কি আছে, যখন আমি শুধুই মানুষ, মুসলমান নই, অর্থাৎ আমার উপর আবদিয়্যত প্রকাশ করা আবশ্যক নয়। মূলত মুসলমানদের মধ্যে যারা মানুষ পরিচয়কে প্রাধান্য দিতে চান, তাদের অনেকেই এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য ও সমস্যা ধরতে পারেন না।

আমি কে? এই প্রশ্নের জবাব দুটি।

১। আমি আল্লাহর বান্দা।
২। আমি স্বাধীন সত্তা।

মুসলমান হওয়ার পূর্বে আমি মানুষ, এই কথাটির মূল উদ্দেশ্য হলো নিজেকে স্বাধীন সত্তা বলে পরিচয় করিয়ে দেয়া। নিজেকে আল্লাহর বিধানের অমুখাপেক্ষী মনে করা। এজন্যই আপনারা দেখবেন, ধর্মের আগে মানুষ, এই কথা তোলা হয় সেসব ক্ষেত্রে, যেখানে ধর্মীয় কোনো বিধানের কথা আসে। যেমন, আপনার এলাকায় পূজা হচ্ছে। এখন কোনো আলেম বললেন এই পূজায় যাওয়া যাবে না। তখন সেক্যুলার ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত লোকেরা বলে দেয়, ধর্মের আগে মানুষ। আমাদের উচিত একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা। পরস্পর কাছাকাছি আসা। ভালো করে মনে রাখুন, এই প্রশ্ন তোলার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ধর্মের বিধান অস্বীকার করা।

পুরো আলোচনার সারকথা হলো, আমাদের মনুষ্যত্ব হলো আবদিয়্যত তথা ইসলাম প্রকাশের মাধ্যম। সুতরাং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, চাই তা সামাজিক জীবনে হোক বা ব্যক্তিজীবনে, আমাকে ইসলামের সাথে সম্পর্ক রাখতেই হবে। এই আলোচনা দ্বারা ‘ধর্ম শেখানোর আগে শিশুদের মানবতা শেখান’ এই শ্লোগানের অসারতাও প্রমান হয়ে গেল। এই শ্লোগান অনুসারে প্রথমে শিশুদের শেখাতে হবে মানুষ কী? এরপর তাকে ধর্ম শেখানো হবে। এই শ্লোগান মূলত মানবতা পূজার এক endorsement অর্থাৎ মানুষ আম্বিয়াদের শিক্ষা ছাড়াই নিজের পরিচয় নিজে লাভ করবে । যার অর্থ হলো মানুষ তার স্রষ্টা আল্লাহ ছাড়াই স্বতন্ত্র সত্ত্বা বা being without god . মনে রাখবেন আম্বিয়াদের শিক্ষা ছাড়া মানুষের হাকিকত অনুধাবনের আর কোনো পদ্ধতীই নেই।

মূল – যাহেদ সিদ্দিক মুঘল
ভাষান্তর – ইমরান রাইহান

#অনেক_চোরাবালি_পেরিয়ে

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: