নীড়ে ফেরার গল্প-২৬ | প্রাকৃতজন (ছদ্মনাম)

প্রাকৃতজন

 ইমরান রাইহান ভাই জানালেন- শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ কতো হবে সেটা নির্দিষ্ট নয়। শুনে জানে পানি পেলাম। নীড়ে ফেরার গল্প কি আঁটসাঁট করে শব্দের মোড়কে বেঁধে ফেলা সম্ভব? নীড়ে ফেরার গল্প হবে বহমান স্রোতের মতো যে ‘ জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা একা কথা কয় ’।

প্রথমেই পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার- নীড়ে ফেরা বলতে আদতে আমি কী বুঝি? আমার কাছে নীড়ে ফেরার অর্থ হচ্ছে আত্মসমর্পণের মানসিকতা তৈরি হওয়া। আমার কাছে নীড়ে ফেরার অর্থ হচ্ছে নিজের মস্তিষ্ককে, নিজের মননকে, নিজের সকল যুক্তি-তর্ককে মহান রবের কাছে বর্গা দেওয়া। একজন মানুষের সামনে কুরআন হাদীস থেকে কোনো দলীল পেশ করা হলে যদি সে বিনাবাক্যব্যয়ে সেটা মেনে নেয়, খোঁড়া অজুহাতে নিজের জাহিলিয়্যাতকে জাস্টিফাই না করে- তাহলে নিঃসন্দেহে সে হেদায়াতের নিকটে রয়েছে। এই জাহেলী সমাজে থেকে একজন মানুষ রাতারাতি সিরাতুল মুস্তাকীমের রাহী হবে- এতোটা আশা করা বাতুলতা। হয়তো সে নামায পড়ছে না কিন্তু সে তার এই গাফিলতিকে জাস্টিফাই করছে না, সে মেনে নিচ্ছে যে তার এই উদাসীনতা অন্যায্য। হয়তো সে সারাক্ষণ গান শুনে কিন্তু এই জাহিলিয়্যাত নিয়ে তার ভেতর অপরাধবোধ কাজ করে, সে নিজের এই জাহিলিয়্যাতকে আধুনিকতার মোড়কে গ্লোরিফাই করে না।

এহেন সংজ্ঞায়নের কারণঃ এমন বহু মুসলিমকে দেখেছি যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ছে, সুন্নাত সিয়াম পালন করছে অথচ ইসলামের প্রশ্নে আপোষ করতে তার ভেতর কোনো অস্বস্তি নেই। এমন বহু মুসলিমকে দেখেছি যার গালে সুন্নতী দাড়ি, কপালে সেজদার দাগ, প্যান্টের কাপড় টাখনুর উপরে অথচ নিজের সুদ খাওয়ার পেছনে সে একটা মোরাল জাস্টিফিকেশন দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। এই মানুষগুলো যতোই প্র্যাকটিসিং হোক, তারা নীড়ে ফেরে নি।

নীড়ে ফেরার একটা চিহ্ন হচ্ছে- ইসলামের সঙ্গে অন্য যে কোনো মতাদর্শ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলে সেই মতাদর্শকে লাথি মেরে ছুঁড়ে ফেলা; দুনিয়ার স্বার্থের সঙ্গেআখিরাতের বিরোধ তৈরি হলে দুনিয়াকে অবজ্ঞাভরে উপহাস করা। অন্যথায় আপনি কেবল ময়ূরের পালক গায়ে লাগিয়ে নিজের বস্তুবাদী কদর্যতাকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন।

ফেসবুক পোস্টে দেখলাম বলা হয়েছে- “ আমরা শুনতে চাই কোন পথ ধরে শুরু করেছেন, কোন পথে এগিয়েছেন, কার হাত ধরে পথ চলেছেন, কীভাবে ইলম অর্জন করেছেন, কোন কোন সমস্যা আপনাকে হতাশ করে তুলেছিলো, আপনাকে আবারো জাহেলিয়াতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, পরিবার, আত্মীয়স্বজনের ভুমিকা কী ছিলো, তাদের হক্ব কীভাবে আদায় করছেন। ” পয়েন্ট ধরে ধরে আলোচনার চেষ্টা করছিঃ

(০১) যে পথ ধরে শুরু করেছি

শুরুটা ২০০৯ সালে। সেসময় আমি দশম শ্রেণীর স্টুডেন্ট। নিজের একটা মোবাইল নাই, পিসি নাই, ইন্টারনেট কানেকশন তো বহু দূরের ব্যাপার। বাসায় আছে শুধু একখান কালার টেলিভিশন- তাতে ‘ ইসলামিক টেলিভিশন ’ নামের একটা চ্যানেলে প্রায় সারাদিন রাত জাকির নায়েক নামে এক ভদ্রলোকের লেকচার প্রচারিত হয়। এসএসসি পরীক্ষা আরও এক বছর পর। আমার হাতে একরকম অখণ্ড অবসর। আমি সময়-সুযোগ পেলেই টিভি সেটের সামনে বসে যাই, জাকির নায়েকের লেকচার গোগ্রাসে গিলতে থাকি।

২০১০ সাল। টাখনুর উপর প্যান্ট পরা শুরু করলাম। কারণ কি ইসলাম? কভু নয়, কভু নয়। ততোদিনে আমার কাছে পরিষ্কার যে- টাখনুর উপর প্যান্ট পরার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। নিঃসংকোচে একদিন দর্জির কাছে গিয়ে সবগুলো প্যান্ট কাটিয়ে আনলাম। আমার এখন আর টাখনুর নীচে পরার মতো একটাও প্যান্ট নাই। কাজিনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যাই- আমার প্যান্টের কাপড় থাকে টাখনুর উপর। ব্যবহারিকের ভাইভা দিতে যাই- আমার প্যান্টের কাপড় থাকে টাখনুর উপর। প্রায় পুরো পরিবার একযোগে আমার উপর হামলে পড়লো- “ দেখতে খ্যাঁত লাগে ”, “ সভ্য সমাজে তোর এই ড্রেসআপ মানানসই নয়। ” আমি নির্বিকার। আমি মনে মনে বলতে থাকি- “ আমি যা জানি তোমরা তা জানো না ! ”

২০১২ সাল। সবে এইচএসসি দিয়েছি। সারা দিনরাত ঘরবন্দী হয়ে পড়াশোনা করি; আর মুয়াজ্জিনের ‘ হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাল ফালাহ ’ কানে আসা মাত্র মসজিদে ছুটে যায়। কারণ কি ইসলাম? কভু নয়, কভু নয়। জাকির নায়েক বলেছেন- “ সেজদাহর বৈজ্ঞানিক উপকারিতা রয়েছে, এটা মানুষের আর্থিং হিসাবে কাজ করে। ” পরিবারের মানুষজন আমাকে নিষেধ করে- “ সামনে অ্যাডমিশন টেস্ট, মসজিদে যাওয়া আসায় প্রচুর সময় নষ্ট হয়। নামাযটা বাসায় পড়লে কী হয়? ” আমি বিরক্ত হই। কিন্তু পরিবারের অনুৎসাহকে আমলে নেই না। আমি আমার মতো মসজিদে যেতে থাকি কিন্তু সালাম ফিরিয়েই দৌড়। আমাকে ভালো কোথাও চান্স পেতে হবে, সময় নষ্ট করার ফুরসত কোথায়?

২০১৩ সাল। আমি তখন ভার্সিটির প্রথম বর্ষের স্টুডেন্ট, থাকি ভার্সিটির হলে। ক্লাস থেকে ফিরে কানে হেডফোন গুঁজে লম্বা সময় পার করে দিই। অন রিপিট বাজতে থাকে অঞ্জন দত্ত, বেনডোভার, কৈলাস খের, ফরীদা খানম। ভার্সিটির তাবলীগের ভাইয়েরা প্রায়ই আসরের পর রুমে আসেন। খুবই নম্র স্বরে নসীহত করেন- “ বাদ্যবাজনা অন্তরের মদ। গান শোনাটা বাদ দিলে হয় না, ভাই? ” আমি তাতেও বিরক্ত হই। কিন্তু তাদের নসীহতকে আমলে নেই না। আমি আমার মতো নামায পড়ি, রোজা রাখি, আপনমনে গান শুনি। আমি গান শুনলে কারো তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না, তাহলে গান শুনতে সমস্যা কোথায়? সবচেয়ে বড়ো কথা- আইনস্টাইন নিজে বেহালা বাজাতেন। এইসব হুজুর কি আইনস্টাইনের চেয়ে বেশি জ্ঞানী?

(০২) যেসকল সমস্যা আমাকে হতাশ করে তুলেছিলো

সময়টা শাহবাগ থেকে শাপলার। আমার তত্ত্বীয় উদারতাবাদ বাস্তবতার কড়াঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো।যাদের এতোদিন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বুলি আওড়াতে দেখেছি, তাদের নিরপেক্ষতার কুর্দির নীচে নিষ্ঠুরতার কঙ্কাল মূর্তি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেলো।আমি উপলব্ধি করলাম- দাসত্বও কখনো কখনো স্বাধীনতার খোলসে আত্মপ্রকাশ করে। আমার মনোজগতে সেক্যুলারিজমের বধ্যভূমির উপর রচিত হলো কুরআনের সৌধ, সেই সৌধে স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা- “ মানুষকে দু’টো হৃদয় দেওয়া হয়নি। ” আমি বুঝে গেলাম-সংঘাতের বাস্তবতা চিরন্তন। মেরুকরণের এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি রাজা, আমি উজির, আমিই ইতিহাস। এই সংঘাতে আমার পক্ষই ঠিক করে দিবে- কালের কোনো এক ভগ্নাংশে আমি জালিমের তোষামোদি করেছি নাকি হক্বের গোলামি।

(০) যে পথে এগিয়েছি

কোনো এক উইকেন্ডে আমি নিজের রুমে বসে ইউটিউব স্ক্রল করছি। এমন সময় ওয়েস্টার্ন একজন স্কলারের একটা লেকচার সাজেশনে এলো। থাম্বনেইলে লেখা ‘ Life of Umar Ibn Al-Khattab RA. ’ লিঙ্কে ক্লিক করে শুনতে আরম্ভ করলাম। প্রথম প্রথম বোর হচ্ছিলাম। নতুন কিছুই তো বলে না- সেই এক ইসলাম কবুলের কাহিনী, তার প্রজাবাৎসল্য, দাসকে উটের পিঠে চড়িয়ে জেরুজালেম যাত্রা- হোয়াট’স নিউ?

হঠাৎ শুনি শায়খ বলছেনঃ “উমার (রঃ) একবার ক্বাবা শরীফ তাওয়াফ করছিলেন। এসময় তিনি হাজরে আসওয়াদকে লক্ষ্য করে বলে উঠলেন- ‘ আমি জানি, তুমি একটি মামুলি পাথর ছাড়া আর কিছুইনও। কারো কোনো উপকার বা ক্ষতি করার কোনো ক্ষমতা তোমার নেই।আমি যদি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে তোমায় স্পর্শকরতে এবং চুম্বন করতে না দেখতাম,তাহলে আমি কখনোই তোমাকে স্পর্শ এবং চুম্বন করতাম না। ’

আমি আমার আত্মসমর্পণের সূত্র পেয়ে গেলাম। কী মনে হলো জানি না- সঙ্গে সঙ্গে ল্যাপটপে থাকা মিউজিক ফোল্ডার ডিলেট করে দিলাম। এক ক্লিকে ১০০ জিবি নাই ! ফেসবুকে ঢুকলাম। একরকম ঘোরের মধ্যে জাহিল সব পেজ আনলাইক করতে আরম্ভ করলাম। ক্লিক ক্লিক ক্লিক ক্লিক ! এমন সময় শুনি এশার আযান দিচ্ছে। মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে মসজিদের দিকে এগোচ্ছি, শিউলি ফুলের চাপা সৌরভ নাকে এসে লাগছে। আমি গোলামীর সুবাস অনুভব করতে পারছি।

(০৪) যার হাত ধরে পথ চলেছি

যে পরিবার আমাকেটাখনুর উপরে কাপড় পরার কারণে উপহাস করেছে, জামাআতে নামায পড়তে অনুৎসাহিত করেছে, গান-বাজনা যে হারাম এই বোধটাও কখনো তৈরি হতে দেয়নি; সেই একই পরিবার আমাকে মাত্র সাত বছর বয়সে আরবী শেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ফজরের পরপর বাসায় হুজুর আসতেন। চোখ কচলাতে কচলাতে গিয়ে ঢুলে ঢুলে পড়তাম আলিফ বা তা সা ! আমাকে যে হুজুর পড়াতেন তিনি ছিলেন খুবই সজ্জন মানুষ। খুব ছোটো বয়স হতে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছি বলেই কিনা জানি না- সেক্যুলার মিডিয়ার তৈরি করে দেওয়া ‘ হুজুর মাত্রই বদরাগী, ক্রুর, শিশু নিপীড়ক ’ ইমেজ কোনো কালেও ক্ষণিকের জন্যও আমার মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।

আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। মাগরিবের নামায পড়ছি বাসায়, পরনে হাফ প্যান্ট। সেজদায় গেলে প্যান্টের কাপড় হাঁটুরও এক বিঘত উপরে উঠে যায়। নামায শেষে দেখলাম- আমাকে বাসায় এসে আরবী পড়ান যে হুজুর, তিনি আমার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে; তাঁর ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ! আমার মাথায় হাত রেখে বললেনঃ

“ বাপজান, তুমি যে এত্তো অল্প বয়সে নামায পড়তেসো এটাই কিন্তু বিরাট ব্যাপার, তোমার বয়সে তো আমাকে মসজিদের ত্রিসীমানায় পাওয়া যাইতো না !নামায যখন পড়তেসোই, তখন এটাকে আরেকটু সুন্দর করা গেলে ক্যামন হয়, ভালো হয় না? ”

তাঁর কথা লিখতে গিয়ে গভীর আবেগে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। গাঢ় অন্ধকার থেকে হঠাৎ তীব্র আলোর মুখোমুখি হলে সেই আলোর ছটায় চোখ ধাঁধিয়ে যায়; তখন পেছন ফিরে তাকালে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে বড্ড বেশী কুৎসিত দেখায় !  একবারের জন্যেও মনে আসে না- ‘ একটাসময় আমি নিজেও সেই একই অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলাম। গভীর মমতায় কোনো আলোকিত মানুষ এই আঁধারবাসীকে হাত ধরে টেনে না নিলে অতলে নিমজ্জনই হতো আমার নিয়তি ! ’

(০৫) যেভাবে ইলম অর্জন করেছি

আমি বরাবরই অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার ভীষণ ভক্ত। কিছুটা বোধহয় ভুল বললাম। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা না বলে বলা উচিত-স্ট্রাকচারড কারিকুলাম আমাকে আকর্ষণ করে। আজকে একটা বইয়ের দুই পাতা উল্টে রেখে দেওয়া, আরেকদিন অন্য আরেকটা পিডিএফের কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে শীতনিদ্রায় যাওয়া- এরকম খাপছাড়া পড়াশোনাকে আমি ইলম অর্জনের সমার্থক ভাবতে নারাজ।উপরন্তু,ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে হায়ারার্কিমেইনটেইন করা ভীষণ জরুরী। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়ঃ আক্বীদার পাঠ আয়ত্তে আসার আগে ‘ আল ওয়ালা ওয়াল বারাআ ’র দীক্ষা উপকারী তো নয়ই বরং ধ্বংসাত্মক। সেকারণে শুরু থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি অর্গানাইজড স্টাডির ভেতর দিয়ে যাওয়ার। আমার জন্যে এই ইলমের প্রধান উৎস ছিলো অনলাইন রিসোর্স কারণ অফলাইনে মেহনতের সময়-সুযোগ সেভাবে ছিলো না; কিন্তু যাদের সে সুযোগ আছে আমি তাদেরকে সাজেস্ট করবো- আলেমের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দ্বীন শেখার জন্য।

ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মদীনার এক শায়খ একবার বলেছিলেন- “ ইলমের অর্ধেক হচ্ছে আদব। ”আমার কাছে আদবের মূর্তিমান আদর্শ হচ্ছেন খন্দকার আবদুল্লাহ্ জাহাঙ্গীর স্যার। স্যারের সঙ্গে ইহজনমে এক মুহূর্তের জন্যেও দেখা হলো না- এই আক্ষেপ বোধহয় আমার আমৃত্যু থাকবে।


(০৬) যা আমাকে আবারো জাহেলিয়াতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো

প্রথমেই বলে রাখি- জাহিলিয়্যাতে ফেরত যাওয়া স্বয়ং একটা জুলুম। এতো বড়ো একটা জুলুম যে কোনো কার্যকারণই এর সমকক্ষ নয়। দ্বীনে আসার পর ছোটোবড়ো অনেক ঘটনাই অনেক সময় আহত করেছে কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই কভুও জাহিলিয়্যাতে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়। ‘ যাহা দিলাম তাহা উজাড় করিয়াই দিলাম। এখন ফিরিয়া তাকাইতে গেলে দুঃখ পাইতে হইবে।’ যাহোক,ছোটোবড়ো যে ঘটনাগুলো বিভিন্নসময় আহত করেছে তার একটি ব্যক্তিগত দুঃখগাঁথা, অপরটি বাঙ্গালি মুসলমানদের ব্যাপারে আমার পর্যবেক্ষণ।

  • ব্যক্তিগত দুঃখগাঁথাঃ২০১৫ সাল। দ্বীনের পথে হাঁটিহাঁটি করে পথ চলা কেবল শুরু হয়েছে। ছোটো বাচ্চা কেবল হাঁটতে শিখলে যেমন টলমল করতে করতেপা ফেলে, আমার অবস্থা তখন তেমনই। আশেপাশে দাড়ি-টুপিওয়ালা যাকেই দেখি তাকেই খুব আপনজন মনে হয়, এক অজানা আনন্দে মনটা ভরে উঠে। রিকশা ঠিক করতে গেলে দাড়িওয়ালা কারো রিকশায় ওঠার চেষ্টা করি, পাশাপাশি দুজনের হোটেল থাকলে চেষ্টা করি টুপিওয়ালা কারো হোটেলে খানা খাইতে। এমন সময় একদিন আমার তিন টেরাবাইটের হার্ডডিস্ক আমার রুম থেকে চুরি গেলো। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। টিউশনির টাকা জমিয়ে অনেক কষ্টে কিনেছিলাম হার্ডডিস্কটা। হার্ডডিস্ক ভর্তি ছিলো মুভি, গান, ওয়াজ-নসীহত, ধর্মীয় বইপত্র এবং অবশ্যই গল্প-উপন্যাস। ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে। আমি আঁকড়ে ধরলাম আমার ভার্সিটির (এবং আহলে হাদীস ঘরানার) এক বড়ো ভাইকে। সেদিন আসরের পর চা খাইতে খাইতে বললাম- “ ভাই, হার্ডডিস্কটা অনেক কষ্ট করে কিনেছিলাম। আপনি কি ফিরে পেতে কোনোরকম সাহায্য করতে পারেন? ”

তিনি ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে বললেন- “ হার্ডডিস্কে মিউজিক ভিডিও ছিলো না? বেগানা মেয়েমানুষ নাচানাচি করে যেগুলাতে? তাইলে মনে করো তোমার পাপের কাফফারা হয়ে গেছে। এই ভেবে খুশি থাকো ! ”

আমার স্বপ্নভঙ্গ হলো। আমি বুঝলামঃ

“ হায় সখা ! এতো স্বর্গপুরী নয়-
পুষ্পে কীট সম হেথা তৃষ্ণা জেগে রয় ”

সেদিন আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেলো- দাওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমাহ অবলম্বন কী ভীষণ জরুরী !

  • বাঙ্গালি মুসলমানদের ব্যাপারে আমার পর্যবেক্ষণঃ যে বিষয়ে নিজের এক্সপার্টিজ নেই, সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত দেওয়া- এটা বোধ করি এই উপমহাদেশের মানুষের সহজাত প্রবণতা ! জাফর ইকবাল, শাহরিয়ার কবীরদের মতো পতিত বুদ্ধিজীবীদের ধারণা- “ যেহেতু আমার সেক্যুলারিজমের ঈমান আক্বীদা ঠিক আছে; সেহেতু স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসলামী আক্বীদা, খিলাফাহ, শরীয়ত, ফিকহ্ এসকল গূঢ় বিষয়ে আমার বিশেষজ্ঞ মতামত দেওয়ার অধিকার তৈরি হয়। ” তাদের এহেন আস্পর্ধা আমাদের দ্বীনি মহলকে ক্রুব্ধ করে। কিন্তু পরক্ষণে দেখা যায়- আমাদের অনেক শায়খ নিজেরাই পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন, মেডিক্যাল সায়েন্স এসকল বিষয়ে কোনোরকম অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার তোয়াক্কা না করেই সমানে স্পেশালিষ্ট অপিনিয়ন দিয়ে চলেছেন। ভাবখানা এমন যেনো- “ আমার ইসলামি ঈমান আক্বীদা যেহেতু ঠিক আছে, সেহেতু স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাপর সকল শাখার জ্ঞান আমার উপরে ওহী হবে। ” নিজের অওকাতের বাইরে গিয়ে কথা বলাটা যে সেই শাখার একজন বিশেষজ্ঞের কাছে কী ভীষণ বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়,এই এমপ্যাথি আমাদের সম্মানিত আলেমরা সময়ে সময়ে হারিয়ে ফেলেন ক্যানো?

আমার বক্তব্য পরিষ্কার- আমার কোনো ফতোয়ার দরকার হলে আমি একজন আলেমের কাছে যাবো। একজন দেশবরেণ্য আর্কিটেক্ট আমাকে ফতোয়া দিতে এলে আমি তার কথাকে আমলে নিবো না। একইভাবে, অসুখ হলে আমি চিকিৎসার জন্যে একজন ডাক্তারের কাছেই যাবো। কোনো আলেমের মনগড়া প্রেসক্রিপশন সেই ডাক্তারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে আমি সেই আলেমের কথাকে ছুঁড়ে ফেলতে কুণ্ঠাবোধ করবো না।

(০৭) পরিবার, আত্মীয়-স্বজনের ভূমিকা

আমার পরিবার, আত্মীয়-স্বজনের ভূমিকা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক ছিলো- এটা বলতে পারলে আমার নিজের কাছেই ভালো লাগতো কিন্তু তাতে করে মিথ্যা বলা হবে। আমার অ্যাকাডেমিক রেজাল্ট বরাবরই বেশ ভালো থাকায় আমি কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেয়েছি। দ্বীনের পথে চলতে শুরু করার পর আমার ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটার দায়ভার প্রথমেই ইসলামের উপর পড়তো। কারণ তাদের কাছে একটা আদর্শের হক্ব অথবা বাতিল হওয়ার মানদণ্ড হচ্ছে- এটা কতোখানি দুনিয়াবী সাফল্য সার্ভ করতে পারছে।পুঁজিবাদী সমাজে উসমান গণি (রঃ) হইতে পারলে তুমি হক্বের উপর আছো কিন্তু আলী (রঃ) হইলে তোমার আদর্শের সঠিকতা প্রশ্নের সম্মুখীন হবে ! এই  ন্যাক্কারজনক বাস্তবতাআমলে নিয়ে এখনো পথ চলছি। মনে ক্ষীণ আশা- কোনো একদিন হয়তো বস্তুবাদকে ছাপিয়ে তাকওয়াকে তারা মানদণ্ড হিসাবে আপন করে নিবে।

 

 

Facebook Comments