প্রতিযোগিতা-২

নীড়ে ফেরার গল্প-৩৭ | তাসমিয়া রহমান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

কে তার অভিভাবক সাজে, যে অন্ধকারে ডুবে আছে?

কোনো এক ভোরের আলোতে এই পৃথিবীতেই জন্মেছিলাম, খেলেছি, বড় হয়েছি আবার এই পৃথিবীরই কোনো এক স্থানের মাটিতে হয়তো আমার কবর হবে৷ কিন্তু, এরই মাঝে বহু সময় কেটে যাবে৷ হাসি,কান্না কতই না উৎসব-আয়োজন!

আমিও যে এসবের মাঝেই বেড়ে ওঠা এক ক্ষুদ্র, অতিসাধারণ মানবসত্তা৷ ধরণির সেই সব চাকচিক্যতা যে আমার মনেরও কাম্য, আমারও যে ইচ্ছে করে বিস্তৃত এই জলরাশিতে মুক্ত হয়ে ছুটে বেড়াই, কেউ যেনো আমার মনে সেই জলরাশির একবিন্দু ভালবাসার আঁচড় কেটে দিয়ে যাক৷ মুক্ত পাখি হয়ে এই সমাজে ভেসে বেড়াই,যেখানে কেউ কোনো নিয়ম,বিধিনিষেধ দিয়ে আমার চলায় বিঘ্ন ঘটাবে না৷

হ্যাঁ, এমনই ছিলাম আমি৷ যার মাঝে দ্বীনের তেমন কোনো নিয়ম-নীতির বেড়াজাল ছিলো না৷ আমার পরিবারে ইসলামের সব নিয়মই চলতো, নামাজ,রোজা,কুরআন পাঠ সবই ঠিক মতো হতো৷ কিন্তু, নিজের কাছে এবিষয়ে তেমন কোনো চাপ মনে হতো না৷ আমিও ছোটবেলায় মায়ের সাথে তাকে দেখাদেখি শুধু রুকু-সিজদাহ করেই নামাজ পড়তাম, ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে ভোর রাতে  আমিও সেহরি খাওয়ার বায়না ধরতাম৷ রোজাও থাকতাম৷ এভাবেই চললো বছরের পর বছর৷

আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন থেকে বোরকা পরি৷ সিম্পল এক ধাচের বোরকা৷ আমি একটু দ্রুত হাটি৷ তাই হাটতে গেলে প্রায়ই পায়ে বোরকা বেধে যেতো৷ প্রতিদিন এই সমস্যা নিয়ে স্কুলে যাওয়াটা দুঃসাধ্যই ছিলো৷ অনেকবার মনে হয়েছে বোরকা আর পরবো না৷ বোরকা না পরলেই ভালো ভাবে হাটতে পারবো৷ কিন্তু, আমার রবের ইচ্ছায় আমি আবারও ফিরে এসেছি৷

ক্লাস সেভেন থেকে আবারও বোরকা পরা শুরু করি৷ কিন্তু তখন যে শুরু হলো আরেক সমস্যা৷ আমরা মেয়েরা সাধারণত সালওয়ার-কামিজ পরি৷ কামিজের দুই পাশ ফাঁড়া থাকে৷ যখন বোরকা পরে স্কুলে যাওয়ার সময় রাস্তা দিয়ে হাটতাম তখন কামিজের দুই পাশ হাটার জন্য পায়ের মাঝখানে জড়ো হয়ে যেতো৷ আর সেই পরিস্থিতিটা একটা মেয়ের জন্য যে কতটা অসস্তিকর সেটা একজন মেয়ে বা নারী ছাড়া অন্য কেউ বুঝতে পারবে না৷ আর রাস্তার মাঝে বার বার বোরকার ভেতর জামা টেনে ঠিক করাটাও লোকচক্ষুতে কটু দেখায়৷ আর সেটা ঠিক মতো হয়ও না৷

আমি এটা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলাম৷ তাই আমার এক আত্মীয়কে জানালাম৷ তিনিও নাকি কলেজে থাকতে এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন৷ তিনি একটা পদ্ধতি ব্যবহার করতেন,সেটা আমাকেও শিখিয়ে দিলেন৷ বোরকা পরার আগে কামিজের দুই পাশে পায়জামার সাথে দুইটা সেফটিপিন লাগিয়ে নিলে কাপড় আর এক জায়গায় জড়ো হয়ে থাকবে না৷ তারপর থেকে আমার আর সমস্যা রইলো না৷ বোরকা পরেও ঠিক মতো হাটতে পারতাম৷

এই তো গেলো পর্দা করার কথা৷ ইবাদত করতে গিয়েও শয়তানের ওয়াসওয়াসা আসতো৷ আমি এমনিতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তাম৷ তবে কোনো ওয়াক্তেই নফল আলসেমি করে পড়া হতো না৷ যখন দ্বীনের পথে এগিয়ে আসা শুরু করলাম, তখন ভাবলাম যদি এই নফল নামাজ বাদ দেওয়া আমার আমলের ঘাটতির কারণ হয় তবে?

তারপর থেকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলাম আমি তাহাজ্জুদ এর নামাজ পড়া শুরু করবো৷ তারপর থেকে আল্লাহর রহমতে নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া চালিয়ে যেতে পেরেছি৷ প্রতি রাতে উঠে একা একা রবের নিকট হাজির হতাম৷ প্রার্থনা করতাম৷ হয়তো বা কোনোদিন উঠতে দেরি হয়ে যেতো, তবুও চালিয়ে গিয়েছি৷ মনোবল ধরে রেখেছি৷ এভাবেই ১মাস পর্যন্ত পড়তে পেরেছি৷ তারপর শীতের কারনে একটু কষ্ট হয়ে যেতো৷ তবুও এখনো আশায় আছি কোনো এক রাতে উঠে ফিরবো প্রভুর দারে৷

দ্বীনের পথে আসতে গিয়ে সমাজের অনেকের কটু কথাও শুনতে হয়েছে বহুবার৷ ক্লাসে সবাই যখন অশ্লীল গল্পে ব্যস্ত তখন তাদের বাধা দিলেই কতই না অপমান শুনতে হয়েছে৷ আমি মজা করতে বাধা দেই, আমি বেশি ভাব দেখাই আরও অনেক!
তাদের কেউই আমাকে সহ্য করতে পারতো না৷ কারণ, আমি আল্লাহর পথে আছি, ন্যায়ের পক্ষে, আছি তাদের সেইসব কথাগুলো অগ্রাহ্য করে আল্লাহর রহমতে আমি এখনো সেই পথেই আছি, ইন-শা-আল্লাহ থাকবোও৷

আবার, সমাজ ছাড়া নিজের নাফসই তো সবচেয়ে বড় বাধা৷ যখনই পৃথিবীর কোনো চাকচিক্যময় জিনিস দেখি, তখনই নাফসে-আমমারা আমায় সেটার প্রতি দুর্বল করে তোলে৷ ভুলিয়ে রাখে আল্লাহকে, আখিরাতকে৷ কিন্তু, মনকে তবুও শান্ত রেখে বারেবার ফিরে আসি প্রভুর কাছে৷ কুরআন তিলাওয়াত এবং হাদিস পাঠ করি৷ নিজেকে তৈরি করি পরকালে আল্লাহ তা’য়ালার দিদার লাভের আশায়৷

আমার নীড়ে ফেরার গল্পটা হয়তো সহজ ছিলো, তবে পথ চলাটা কঠিনই ছিলো৷ আমি সেই কাঠিন্য ভেদ করেই পথিক হবো জান্নাতের ইন-শা-আল্লাহ৷ কারণ, আমি যেই অন্ধকারে ডুবে ছিলাম, সেখান থেকে অভিভাবক হয়ে ফিরিয়ে এনেছেন তো আমার রব৷

লেখকঃ তাসমিয়া রহমান
শ্রেণীঃ সপ্তম
ঠিকানাঃ নাভারণ,শার্শা,যশোর,খুলনা

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: