নীড়ে ফেরার গল্প-৩৬ | বিনতে আলম

লেলিহান শিখা থেকে রক্ষা করে অন্তরে এমন এক শীতলতার চাদর জড়িয়ে দিলেন যা আমার জীবনের মোড়টাকে আলোর পথে ঘুরিয়ে দিলো। এমন এক নেয়ামত দান করলেন যাতে আমার অধিকারত্বও নেই আধিপত্বও নেই। এটা কেবল মহান রবের রহ…যার নাম হেদায়েত।
যখন উপলব্ধি হয়েছিল, বুকে প্রচন্ড আঘাত করেছিল আমার নিকট আত্মীয়ের বলা সামান্য কথা “হুম পড়ি তো, আমি পাআআচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি” প্রচন্ড ঝড় শুরু হল বুকে। উনি অনেক আধুনিকা ছিলেন। সিদ্ধান্ত নিলাম নামাজ পড়বো ৫ ওয়াক্তই পড়ব।শুরু করলাম নামাজ পড়া।তবে নামাজের দোয়া সুরা এমন কোনোই মুখস্থ নেই ছাড়া ছাড়া  ভাবে এতদিন যা পড়েছি তা দিয়ে তো আর পরিপুর্ন নামাজ আদায় হবে না।তাই শুরু হলো আমার ছোটো সুরা মুখস্থর কার্যক্রম।
Tijarah Shop
মুসলমান হিসেবে যেনো এ আমার নতুন অঙ্কুরোদগোম।শুনতে অদ্ভুদ হলেও প্রতিটা সুরা আর নামাজের দোয়াগুলো বই দেখে মুখস্থ করেছিলাম, এর আগে আগ্রহই ছিল না আল্লাহুম্মাগফিরলী। কিন্তু এটা যে চিরন্তন সত্য আল্লাহর দিকে একহাত এগোলে আল্লাহ এক বিঘত এগিয়ে আসেন, যে হেটে হেটে আল্লাহর দিক অগ্রসর হয়, আল্লাহ তার দিক দৌড়ে আসেন। এর উদাহরণ আমি। সুবহানাল্লাহ!
লিখেছি, ভুলে গিয়েছি আবার পড়েছি।দরূদ পর্যন্ত আমার মুখস্থ ছিলোনা, কোন নামাজে কত রাকাত পড়তে হয়, নামাজ আদায়ের পদ্ধতি জ্ঞানের ত্রিসীমানার কাছেও ছিলো না।হ্যা এটাই সত্যি।সব চেয়ে কষ্ট হয়েছিল আমার আয়াতুল কুরসি মুখস্থ করতে…সামনে পড়ি পিছনে ভুলে যাই,আবার পিছন এর দিক পড়লে সামনের দিক ভুলে যাই।
একদিনে মুখস্থ হয়না পরে অনেক কষ্ট করে মুখস্থ করি।নামাজে যেদিন প্রথম আয়াতুল কুরসি পড়ি সেদিনের অনূভুতি হয়তো পরিপুর্ণ প্রকাশ করবার ভাষা প্রকাশ করতেই পারব না।মনে হচ্ছিল আমি কোনো পরীক্ষার জন্য পড়া মুখস্থ করেছি এখন ঠিক ঠিক বলতে পারলে তবেই পাশ! আমি পড়ছি আর আল্লাহ সুবহানুওয়াতাআলা খোদ যেনো শুনে আছেন। ভয়,আশা,ভক্তিতে হৃদয় ভরে যাচ্ছিল।
আমার নামাজ এই প্রক্রিয়ায় আগাচ্ছিলো যে নতুন কোনো দোয়া মুখস্থ হলে সেদিন কেবল ওটা, পরেরদিন আরেকটা। এভাবে ধাপে ধাপে আগাতে যেদিন প্রথম সলাতের সকল দোয়া দিয়ে যখন পরিপূর্ণ ভাবে একদিন পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করি।আলহামদুলিল্লাহ…আহঃ সে অনুভূতি হয়তো কখনো ফেরাতে পারবো না। এখনো সেই অনূভুতি মিস করি।
সালাত তখন পড়ি কিন্তু পাশাপাশি সব আগের মতই চলছিলো। কিন্তু প্রতিদিন চেষ্টা করতাম ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের। এত প্রশান্তি সে সময়টায় পেয়েছিলাম আমি।ভিতরে কিছু একটা হচ্ছিল।আমি কিছুকিছু পাপ কাজ চায়েও কেনো জানি করতে পারছিলাম না।যেমন থ্রী কোয়াটার বা হাফ হাতা জামা,আটসাট পোশাক পড়তে অ্সস্তি লাগতে শুরু করলো,তাই ফুল স্লিভ জামা পড়া শুরু করলাম,মিথ্যা বলতে গেলে খটকা লাগতো-মনে হোতো আমি নামাজ পড়েও কেমন করে এটা করতে পারি।অন্তর খা খা করে উঠলো ভাবলাম আমাকে ইসলাম সম্বন্ধে তো আরো জানা দরকার।নামাজেই তো কেবল সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।পরিবর্তন খুব দ্রুত হতে লাগলো।
নিশ্চয় সালাত সকল অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে আসলেই আমাকে রাখছিলো। এই প্রক্রিয়াটা আমার সাথে এমন ভাবে হচ্ছিল খুবই দ্রুত,গানের পোকা ছিলাম,যখন পড়লাম গান শুনা হারাম গান বাদ দিয়ে দিলাম শুনা,সাথে বাদ পড়লো নাচও,ছবি আকা ভীষণ ভালো লাগত বিশেষ করে মানুষ আকা,বই খাতার কোণে নিমিষেই বিভিন্ন কিছুর স্কেচ একে ফেলতাম,কিন্তু যখন পড়লাম অকারনে মানুষ বা ছবি অঙ্কনের কঠিন আযাব- সেটাও ছেড়ে দিলাম,সাজসজ্জা করলে অপরকে দেখানর উদ্দেশ্যে তার শাস্তির কথা এতটাই প্রভাব ফেলল আমার  মনে এই সবচেয়ে প্রিয় কাজটাও বন্ধ করে দিলাম, এভাবে একে একে  খারাপ আর পাপ কাজগুলো আমার জীবন থেকে মুছে যেতে শুরু করলো।কিন্তু কখনোই আমার জন্য সহজ ছিল না এসব ছাড়া।কতটা নেশার মত জড়িয়ে ছিল এসব কিছু আমার জ়ীবনে -তা যারা আমায় কাছ থেকে দেখেছে তারাই বলতে পারবে। কিন্তু আল্লাহ তো বলেছেনই-
“কাজেই যাকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখানোর ইচ্ছা করেন, তার অন্তরকে তিনি ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন।” সূরা আনআম, আয়াত ১২৫
 আল্লাহু আকবার, খেলা শুরু হলে ধারাভাষ্যকার এর কথা বা সিরিয়াল শুরু হলে সবাই যখন আনন্দে এক সাথে দেখেছে চিৎকার করেছে। তখন একা অন্য ঘরের মধ্যে বসে থাকাটা সহজ ছিলনা আমার জন্য, তাদের আনন্দ চিৎকারে নফসের ধোকায় যেতে চেয়েও দরজা পর্যন্ত যেয়ে আর ঘরে ঢুকতে পারিনি। আমার সালাত আমাকে বাধা দিচ্ছিল, বাহিরে যাবার সময় মাথা আবৃত করা কেউ আদেশ করেনি, কিন্তু আমার সালাত আমাকে আমাকে অনাবৃত রাখা থেকে বিরত রাখছিল, আমার সমবয়সী অনেকে তথাকথিত সম্পর্কে জড়ালেও আমার চোখে এটাকে ঘৃনীত করে দিলেন মহান রাব্বুল আলামিন, আর সবচেয়ে বেশি আমার মধ্যে তিনি দিলেন ‘হায়া ‘বা লজ্জা’।খুব বেশি পরিমাণ লজ্জা কাজ করতো সেই সময়। লজ্জার কারণেই অনেক পাপ আর করতে পারতাম না।
এতদিন সবাই আমাকে সাগ্রহে গ্রহন করছিলো পরিবর্তনটা। কিন্তু আস্তে আস্তে যখন আমি প্র্যাক্টিসিং হচ্ছি, আ্মি তখন আসল রূপ দেখতে পাচ্ছিলাম সবার। আমি যাই করি সব কিছুর নাম তারা দিল বাড়াবাড়ি।ধর্মে চর্চায় যে বাধা আসতে পারে সত্যি আশা করি নি তাও একটা মুসলিম পরিবারে!
 প্রথম মানসিক যন্ত্রনা কথার বিষ ভরা বানে আমাকে হতাশাগ্রস্ত করতে কেউ বাদ ছিলনা,বিশেষ করে আত্মীয়রা। একা আমি আমি সহ্য করতাম আর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতাম। ব্যাপারটা  তাদের কাছে এতটাই সন্দেহজনক যে তারা ভাবে কি করে একটা কম বয়সের মেয়ের পক্ষে সম্ভব একা এত পরিবর্তন হওয়া কিন্তু তারা জানতো না যে আল্লাহ যিনি সকলের মালিক তিনি আল জাব্বার তার কোনো কিছুর সম্ভবনার দরকার হয় না…তিনি যা চান কেবল বলেন হও আর তা হয়ে যায়।আমার পরিবর্তনটাও এমন করেই হচ্ছিলো।
কুরআন পড়তে পারিনা কিন্তু বুকে তীব্র ইচ্ছা পড়তেই হবে…তাই বাংলা অর্থগুলোই কেবল পড়া শুরু করলাম,কেনোনা রবের আদেশগুলো তো আমাকে জানতে হবে। পর্দা বিষয়ক একটা আয়াত পড়লাম-সুরা নূরের ৩১ নাম্বার আয়াত…কিভাবে পর্দা করতে হয় জানিনা সুরা আহযাব পড়লাম অনুবাদ সেখানে আছে নির্দেশনা,বড় চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলতে হবে।হ্যা তাই করলাম  তবে আমার মন মত। সুতির বড় ওড়নাকেই মাথাসহ পেচিয়ে নিলাম। আর বলা হয়েছিল কাপড়ের কিয়োদংশ যেন মুখের উপর টেনে নেয়া হয় এই কিয়দংশ বলতে যে কি বোঝায়, আমি না বুঝে ভেবেছি মাথার কাপড়কে কপালের দিক হয়তো টানতে বলা হয়েছে, আমি বড় ওড়না দিয়ে আমার কপাল পুরোটা ঢেকে রাখতাম,ভাবতাম হয়ত ওই আয়াতে এটারই কথা বলা হয়েছে।যেহেতু কেউ নেই বলবার। যা বুঝেছি তাই করেছি আল্লাহ যেন ক্ষমা করেন।
 সে সময়,মুখ খোলাই থাকতো।
সাল ২০১৬,শেষের দিক,সেবার হলি আর্টিজানে হামলা হলো দায়  স্বীকার করলো আইএস,অপরাধীরা সকলেই কম বেশি ভালো প্রতিষ্ঠান এর শিক্ষিত ছেলে আর সভ্রান্ত পরিবার হতে। তাদের বন্ধু বান্ধবরা বলেছে তাদের মাঝে হঠাৎ ইসলামের প্রতি বেশি ভালো লাগা দেখেছে তারা, বিশেষ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে,হঠাৎ তাদের ভাষায় একটু বেশি ইসলামিক হয়ে গিয়েছে…!
এই একটা ঘটনা আমার জীবনে ব্যপক জড়িয়ে গেলো,আমাকেও সবাই তাদের মতনই ধরে নিল। সব বন্ধুবান্ধব সরে যেতে লাগলো। ক্লাস করছি এমন সময় আমার হাতে একটা চিরকুট আসলো”কী রে তোর কী হইছে?আইএসে যোগ দিসিস নাকী!!” সাথেই সকলের হাসি আর আমার নিস্তব্ধতা!!
এলাকার গলি দিয়ে হেটে আসছি তখন”কী রে তোর বাবা হজ্জ করিয়েছে নাকী”
নামাজের ওয়াক্ত না হলেও”নামাজ পড়বি না?যাযা দৌড় দে যায়ে নামাজ পড়ে আয়,সামান্য পাপসের উপরেও পা না রাখায়, “ওখানে পা রাখতে হয়না,রাখলে পাপ হয় তাই না?”
বিধবা,খাল্লাম্মা,হাজীয়ানী,আন্টি আরো নানা রকম টিটকারী সহ্য করতাম। এমন একটা দিন যেত না হয়ত..ক্লাস টেনে নের শেষের দিক-যে বাসার কাছে রাস্তায় হেটে যেতাম কিন্তু আমাকে নিয়ে তাদের কথা হতো না! আমাকে তারা কথা শোনাতো না!! আর ,প্রায় দিনগুলোয় বুক ভরা কান্না নিয়ে বাসায় আসতাম। সত্যিই কষ্টকর ছিল।আমার ছোট মনে ভীষন দাগ কাটতো কথা গুলো।
আল্লাহর সামনে সালাতে দাঁড়াতাম আমার এই কষ্টগুলো নিয়ে! বুক ভরা কান্না দিয়ে নামাজ শুরু হত আর আমার নামাজ শেষ হতো খুবই হাল্কা বুক নিয়ে। যেনো বোঝা নেমে গিয়েছে।।আল্লাহ যেনো আমার মনের কষ্টটাকে হাল্কা করে দিয়েছেন। দুই বোন,আমার পরিবর্তন  হলেও আমার আপু আগের মতোই থেকে গেলো।তাও আমি আবার ছোট, আমার এই অতি পরিবর্তনে সবার চক্ষু শুলে পরিণত হলাম।কেনোনা আমি ফুল স্লিভ জামা,বড় ওড়না,পায়জামা আর আমার আপু তথাকথিত আধুনিক পোশাক আশাক!স্বাভাবিক ভাবে সবাই অনেক কথা বলাবলি করত।আমি ওকে বোঝাতাম কিন্ত সে বুঝতোনা…হেদায়েত তো আল্লাহর হাতে।তাই আমি কেবল দোয়া করে যেতাম।
কিন্তু সে পরিবর্তন হচ্ছিল ইসলামের বিপরীতে আর আমি ঠিক এর দিকেই।কতটা সাংঘর্ষিক ছিলো,আমার মা বাবার জন্য ব্যপারটা।কিন্তু কিছু করার ছিলো না। আস্তে সবাই গুটে যাচ্ছিল আমার কাছ হতে…এক সময় পূর্নতায় ছেয়ে ছিল আশপাশ আর এখন শূন্যতায় হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছি!
উপলব্ধির প্রতিবেদনে ভীষণ বাড়ি খেলো।ভাবলাম কেবল আমি তাদের পথ থেকে সরে এসে সত্যের পথ ধরেছি তাতেই তারা আমাকে ছেড়ে চলে গেলো,তাহলে কবরে বা আল্লাহর সামনে কী হবে।নিশ্চয় এখন কার মতোই তারা বিস্বাসঘাতকতা করবে…ছেড়ে যাবে।
কষ্টে বুক যেনো ফেটে যাচ্ছিল প্রচুর পরিমান কেদেছিলাম সেদিন।ঠিক করলাম যতই বাধা আসুক আমি আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হব না,আত্মসমর্পণ করবই। যেনো এইসব ঘটনাই ঈমান বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। এসএসসি পরীক্ষা শেষ হল আমার। পরিক্ষার মাঝেই ঘটছিলো এসব ঘটনা। এখন কলেজে ভর্তি হবার পালা। আগেই ঠিক করেছিলাম আমার ধর্মের প্রতি আরো আনুগত্য বাড়াবো…সময়ের প্রাসঙ্গিকতায় তা যেনো আরো সম্ভবপর হয়ে আসছিলো।
এক গার্লস স্কুল থেকে পড়াশুনা করলেও ভর্তি করানো হলো এমন এক প্রতিষ্ঠানে যেখানে ছেলে মেয়ে একসাথে। ঠিক করেই রেখেছি  পর্দার বিষয়ে আরো সচেতন হবো। বাসায় কী করে বলা যায়। নিকাব পড়বো কিন্তু অনুমতি দেয়া হবেনা জানি। বাসার সাথে অনেক তর্ক লেগে গেলো আমার, কেদেই দিলাম তাও বুঝাতে পারলাম না।
 বললাম আমি মুখ ঢাকতে চাই…বরখা পড়তে চাই।বলা হলো কেনো বর্তমানে যে অবস্থাতে আছ তাতে কী পর্দা হচ্ছে না? আমি যুক্তির পর যুক্তি দেখাই তারা প্রতিটারই পালটা যুক্তি দেয়। আমি পারলাম না…হেরে গেলাম তাদের সাথ।
কিন্তু আমার আলোর পথের অভিযাত্রা তো হারিয়ে যায়নি, যাবেও না।
ঠিক করলাম কৌশল করতে হবে তাদের সাথে।-কিছুদিন পর বুঝিয়ে বললাম আচ্ছা আমাকে নাহয় হাফ বরখাই বানিয়ে দাও, আর একটা দোকান থেকে রেডিমেট বড় হিজাব কিনে দাও, তারা আপত্তি তুললেন না আর যেহেতু আমি সেসময় বড় ওড়না আর জামা হাটু পর্যন্ত পড়তাম।তাই তাদের বলেছিলাম ওটার বিকল্প হিসেবে পড়ছি। আল্লাহ সহায় হলেন…আমায় কিনে দেয়া হলো। বাসা থেকে বের সেই হিজাবের ভিতরে ছোট একটা কাপড় পিন দিয়ে আটকাতাম …বাসার বাহিরে আমাদের গলির মাথায় এসে নিকাবের মতো সেটা তুলে দিতাম যাতে প্রতিবেশি কেউ বাসায় না বলে দেয় কেউ না জানতে পারে। তাই এটা করতাম লুকিয়ে লুকিয়ে, প্রথমবার আমার নেকাবে ঢাকা মুখ ।আহঃ সে অনুভুতি।অপার্থিব!প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ পেলাম যেনো,কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই  আমার প্রতি…কেউ চোখ কুড়ে কুড়ে আমাকে খাচ্ছেনা…নিরাপত্তার এক টুকরো আব্রু যেনো আমাকে প্রশান্তি আর আত্মতৃপ্তির সিহরণ দিচ্ছিল।
এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে বেশ কয়েকদিন গোপনে গোপনে আমার পর্দা চলল। আমি কলেজে অমন করে যাই বাড়িতে কেউ জানেনা।কিন্তু  বাহিরে গেলে তো আর এমনভাবে যেতে পারিনা অন্তরটা কুরে কুরে খেত। কলেজের পোশাক তো আর বাহিরে পড়ে যাওয়া যায়না। প্রাইভেটেও কলেজের সেই পোশাক পড়ে যেতাম। আর কোথাও যেতে গেলে বুক দুরুদুরু করত, কী পড়ব বরখা তো নেই। তাও কোথাও যাওয়াও কমিয়ে দিলাম।
আল্লাহর কাছে চাইতাম যেনো পরিপুর্ন পর্দার ব্যবস্থা হয়। আল্লাহ একটু একটু করে ব্যবস্থা করছিলেন। একদিন এমনিতেই আমার বাবা রাস্তা থেকে হকার এর কাছ থেকে বিনা কারনেই আমার মায়ের জন্য বরখা কিনে আসলেন কিন্তু আমার মায়ের তা হলোনা আমি খুশিতে আলহামদুলিল্লাহ পড়ছিলাম ভাবলাম আমারই জন্য আল্লাহ হয়তো এটা ব্যবস্থা করেছেন।কিন্তু বাসা থেকে বলা হলো না পড়া যাবেনা-পড়তে দেয়া হবে না।আমি আর তর্কে গেলাম না  আরেকটা কৌশল অবলম্বন করলাম,সে সময়টায় আমি একটা কম্পিঊটার ট্রেনিং নিচ্ছিলাম…বললাম দেখো আমার প্রতিদিন ওখানে ক্লাস করতে যাবার সময় ড্রেস চেঞ্জ করতে সমস্যা হয়…সময়ও লাগে বেশি।এক কাজ করো আমাকে ওই বরখাটা কেটে নাহয় ছোট করে দাও তাহলে প্রতিদিন কেবল পোশাকের পিছনে এত সময় অপচয় হবে না!আর আমি কেবল ওটা ওখানেই পড়ে যাবো।আর কোথাও না! আল্লাহ আবার সহায় হলেন তারা প্রস্তাবে রাজি হলো।ফুল বরখা কেটে আমায় হাফ বরখা করে পড়তে দেয়া হলো।
যদিও প্রথমে কষ্ট পেয়েছিলাম পরে ভেবেছি না আমি তো কিছু পেয়েছি এটা দিয়েই এখন পর্দা করি।আল্লাহ হয়ত এক অংশ আব্রু দান করেছেন…পুরোটার ব্যবস্থা তিনি হয়ত শীঘ্রই করবেন।ধৈর্য আর আশা নিয়ে অপেক্ষায় থাকব।
আমাকে দেখতে খুবই হাস্যকর লাগতো।রাস্তায় অনেকেই দেখে হাসাহাসি করতো এই কেটে সেলাই করা ছোট বরখা দেখে…যখন তারা হাসত আমি চোখ দুটো বন্ধ করে দ্রুত হেটে যেতাম,দাতের উপর দাত চেপে কেবল সহ্য করতাম…আর নিজেকে বোঝাতাম যে যতই হাসুক আল্লাহ তোমার সন্বন্ধে কি ভাবছে আসল ভাবনা!সেটা থাকা উচিত তোমার ,আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা তোমার কাজ- যে যাই বলুক আল্লাহ এর প্রতিদান ইন শা আল্লাহ তোমাকে দিবেন।ঈমান আরো দৃঢ় থেকে দৃঢ় হচ্ছিল।
যদিও  বলেছিলাম ওই বরখা কম্পিউটার ট্রেনিং ব্যতীত আর কোথাও পড়ব না কিন্তু আমি আমার কথার বরখেলাফ হলাম অন্যান্য জায়গায় সেই হাস্যকর অর্ধেক বরখাটাই পড়ে যেতে লাগলাম। কথার যেনো আরো বিষ বান নেমে আসল। বলা হলো কথা দিয়ে যে কথা রাখছি না কোথায় থাকল আমার ঈমান।কথা বাড়াই নি আমার ঈমান আর বেঈমানির প্রাসঙ্গিকতায়।কিন্তু আমি আমার কাজ থেকে বিরত হলাম না।সব চলছে নিজের গতিতে।
ইসলামিক এক বইয়ে ইসলামে আল্লাহ তা য়ালা মায়ের কী পরিমাণ সম্মান দিয়েছেন…বাবার সম্মান।।আত্মীয়র হক ,মাবাবার হক সম্বন্ধে যখন জানলাম।সর্বোচ্চ দিয়ে মায়ের সেবা করা শুরু করে দিলাম,যেনো তিনি আমার কোনো আচরনে কষ্ট না পান সেই প্রচেষ্টা করতে লাগলাম। আমার এহসান পুর্ন আচরনে মা আমার প্রতি আরো এহসান পুর্ন আচরন করতে লাগলেন, আর আমি আমার  মায়ের প্রতি ভীষণভাবে অনুরক্ত হয়ে পড়লাম-আর তিনিও।ভালোবাসায় যেনো পুর্ন হয়ে গেলো আমাদের সম্পর্ক। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ সুবহানুওয়া তাআলা যিনি আমার এসবের বিরুদ্ধে ছিলেন তাকেই আমার সহযোগী বানিয়ে দিলেন। তারপর থেকে আমার মা আমার ঢাল হয়ে দাড়ালো। তিনি নিজে পালন না করলেও আমাকে সহযোগিতা করতে শুরু করলো।সব দিক হতে।মানসিকভাবে-কায়িকভাবে…আল্লাহ ওনার প্রতি রহম করুন।
এভাবেই আগাচ্ছিল সব কিছু। নিকাবের কারনে কলেজে মাঝে মাঝে স্যার ম্যামরা সমস্যা করতেন। বিশেষ করে ম্যামরা। অনেক অপমান করতেন ক্লাস রুমে, পরীক্ষার হলে, ভাইভা নেবার সময়। আল্লাহ সত্যিই সহায় ছিলেন আলহামদুলিল্লাহ খুলিনি নেকাব। পরিস্থিতি রাব্বুল আলামীন নিয়ন্ত্রন করেছেন।তারা যাই করতোনা…আমি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতাম আর চুপ থাকতাম। প্রতিকূলতা তো অবশ্যই ছিলো কিন্তু বেশি ছিলো প্রশান্তি আর সম্মান। মাঝে মাঝে ফিতনারও স্বীকার হতাম। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ  প্রশান্তির বাতাস আমার অন্তরে এমন ভাবে প্রবেশ করেছিলো হতাশ হতাম না। আল্লাহর কাছে আবার ইস্তেগফার করতাম অনুশুচনায় ভুগতাম। বাধার স্বিকার হতাম…উতরেও যেতাম। যেনো আল্লাহ আমার সব কিছু পর্যবেক্ষন করছেন আর ঝড়ো পাতার মতোন একটার পর একটা সাহায্য করে যাচ্ছেন!
সময় খুব দ্রুত চলে গেলো সাল ২০১৯।এর মাঝে আমার ঈমান মাঝে মাঝে  ক্ষীণ হয়েছে কখনো দৃঢ়। ২০১৮ সালে আমার সাথে পরিচিত হয়েছিল একজন ম্যামের। ওনার সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ অব্যাহত ছিল, আলহামদুলিল্লাহ উনি দ্বীনদার। উনিই ছিলেন আমার হেদায়েতের পর প্রথম যার মধ্যে আমি বাস্তবে জীবনে দ্বীন চর্চা দেখেছি। তাই ওনাকে অনেক বেশী ভালো লাগতো, আল্লাহর জন্য ওনাকে খুব ভালোবাসতাম। কখনো তালিমে যাওয়া হয়নি।উনি আমাকে এক তালিমে যাবেন বলে জানালেন আর জানতে চাইলেন আমি যেতে পারবো কী না।আমার যেহেতু কখনই কোনো ইসলামিক কমিঊনিটির সাথে থাকা হয়নি তাই নিজের ঈমান ঠিক রাখতে খুব করে চাচ্ছিলাম  দ্বীনদার কমিউনিটির সাথে কানেকটভিটি বাড়াতে। তাই খুশিতে রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু বাসা থেকে কী বলে যাবো জানি না! তাই ভাবলাম জানিয়েই যাবো কারণ বাবা তখন ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করেছিলেন।
বাবাকে ভীষণ ভয় পেতাম তাই অনেক ভেবে বাবাকে গিয়ে বললাম  একটা ইসলামিক আলোচনা আছে , তালিমের মতোন যাইতে চাই।যাবো? সরাসরি উত্তর দিলেন-“যেতে হবেনা।বাসায় কোরআন আছে নিজে নিজে পড়।”
এই পর্যন্ত ঠিকই ছিল কিন্তু তারপর যে বর্ননাতীত মানসিক অত্যাচার হলো তার জন্য সত্যিই প্রস্তুত ছিলামনা! আমি মন খারাপ নিয়ে ফিরে আসছিলাম বাবার রুম থেকে,আমার বাবা আবার ডাকলেন আমায়…ততক্ষনে আমার চোখে পানি। তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে আবার বাবার সামনে দাড়ালাম। বাবার রাগ তখন হঠাৎ তুমুলে চলে গেলো। জানি না কেন!প্রশ্ন করা শুরু করলেন-তোমাকে এইগুলা কে দাওয়াত দিছে ওখানে যাবার। সব জঙ্গি সংঘঠন! তোমাকেও জঙ্গি বানাবে,তুমি জানো কিছু এসব! বল আমাকে নাম বল, এখনি বল…আমি দেখবো কে এগুলা, বাবার নাম বলো বাসা কোথায় বল, ওদের মিশন তুমি জানো, কাদের টার্গেট করে জানো! আরো যা ইচ্ছা তাই বলেই যাচ্ছেন। আর আমার উপর একটার পর একটা মিথ্যা আরোপ করছেন।
আমার পা থেকে যেনো মাটি সরে গেলো, আমি ভাবছি উনি কেনো শুধু শুধু এইরকম করছেন।বললাম “বাবা কেঊ ধর্মচর্চা করলেই তো আর সে জঙ্গি হয়ে যায়না,বাবা আরো রেগে গিয়ে বললেন-” তোমাকে আমি অত কথা  জিজ্ঞেস করিনি, আমাকে নাম্বার দাও আর নাম বলো”।
কিন্তু আমি আমার প্রিয় ম্যামের নাম কী করে বলি।চুপ করে আছি…অবস্থা খুবই বেগতিক জোড়াজোড়ি আরো বেড়ে গেলো এক পর্যায়ে আমি মিথ্যা বললাম আমার এক বান্ধবীকে যাকে আমি নিজেই এই তালিমে  দাওয়াত দিয়েছিলাম, তার নাম বললাম। নাম্বার চাইলো বাবা ,ঠিকানা নিলো এবং আমাকে বলা হলো এখনি ফোন দাও আমার সামনেই শুনো,কথা আমার সামনেই বলবা লাউড স্পিকারে-বাবা বলল। মাথায় যেনো আমার বাজ ভেঙ্গে পড়লো,কারন তাকে আমি ফোন দিয়ে কী বলব সে তো জানেই না এই বিষয়ে। আর আমাকে আমার বাবা আবার ধমক দিলেন ফোন দেবার জন্য…বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী করবো।অঝরে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। আমাকে আরো নানান কথা বলা হলো- “আমার এত পরিমাণে ব্রেন ওয়াশ করা হয়েছে যে তাদের পরিচয় আমি বলছি না তার উপর তাদের জন্য কাদছি!কতদিন ধরে আমি এই সংঘটনের সাথে আছি?কার কার সাথে আমার কথা হয়? বল পুলিশে খবর দিতে হবে যদি তেমন কিছু জঙ্গি কার্যক্রম হয়েই থাকে ওরাই চেক করবে সেখানে কীসের আলোচনা হয়!”
কষ্টে আর সহ্য করতে পারছিলাম না,চোখ বন্ধ করে মনে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলাম-“আল্লাহ ব্যবস্থা করুন!!”
আমাকে ফোন দিতে বাধ্য করা হল,তারপর অনেক কিছু ঘটে গেলো।আমাকে এত কষ্টদায়ক কথা বলা হচ্ছিল বাবা প্রশ্ন করলেও কান্নায় উত্তর দিতে পারছিলাম না। তারপর শুরু হল আমার সব কিছু চেক। আমার ফেসবুক আইডি ,খাতা,ডায়েরী,ব্যাগ বই সব। যা যা মন্তব্য করা হলো যে আমি প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে যাচ্ছি অথচ আমি  কারো সাথেই কথা বলিনি রুঢ়ভাবে। হিংসাত্মক হওয়া দূরে থাক! আমার ডায়েরীতে আমি নিজে লক্ষ্য ঠিক করতাম কী কী আমার পরিবর্তন করা প্রয়োজন, ইসলামিক  ভাবে কীভাবে জীবন পরিচালনা করা যায় ইত্যাদি।
সেগুলো দেখে বাবা সন্দেহে বললেন তুমি কয়দিন ক্লাস কর এই বিষয়ে,কতদিন ধরে জড়িত তুমি সংগঠনের সাথে। তুমি যেই পথে আগাচ্ছো তাতো সরাসরি জঙ্গি হবার দিকে। আমাদের মান সম্মানের কথা তুমি বিবেচনা করবা না!সব কিছু নিয়ে নেয়া হল।
ফেসবুকে ঢুকে আমাকে বলা হল আমি কার সাথে কথা বলি। এই আপু কে ইনি কে। সারারাত জেগে তুমি এইগুলই করো তাহলে…হৃদয় যেনো চুরমার হয়ে যাচ্ছিল।
একটা সন্তানের জন্য এটা কতটা কষ্টের যখন বাবা মাই তাকে ভুল বুঝে অবিশ্বাস করে,যদিও আমি ছিলাম সম্পূর্ন নির্দোষ। আমি তখন এটাই মনে করেছি আল্লাহ হয়তো আমার পরিক্ষা নিচ্ছেন।সব উনি ঠিক করে দিবেন।সেদিন সালাতে এতপরিমান  কাদলাম…সিজদাহতে গিয়ে কাদলাম ফুফিয়ে ফুফিয়ে।আর বলছিলাম হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকিল।ব্যবস্থা করে দিন মালিক!! তারপর সময়ের পরিক্রমায় সেটাও এক সময় ঠিক হল।কিছু কিছু ঘা নাকি সময়ের পরিক্রমায় ঠিক হয়। ওটাও হয়েছিলো।সেই কষ্টের সময় আমাকে সাহস জুগিয়েছিলেন আমার মা আর প্রিয় কাছের বান্ধবী  যাকে আমি দোষ দিয়েছিলাম কিন্তু ওকে আমি বলেছি কেনো এমনটা করেছি। পরে যদিও সবার নাম্বার নাম বাবা পেয়েছিলো কিন্তু সম্পূর্ন পরিস্থিতি  আল্লাহ তা’য়ালা ঠিক করে দিয়েছেন।
মানসিক সমর্থন সে সময় বড় ছিলো আমার জন্য। প্রতিকুল পরিবেশ তো ছিলো কিন্তু আল্লাহ তা সহজ করে দিয়েছেন অনুকুল হয়েছে সব কিছু। দিয়েছেন পরিপুর্ন পর্দার ব্যবস্থা,আমার সম্পূর্ণ বরখা হয়েছে মা বাবাই কিনে দিয়েছেন,তবে সব সামগ্রী পৌছেছে আমার কাছে বিভিন্ন ওছিলায়…মহান রাব্বুল আলামিনের করুনাতে।এখন হাত মুজা পা মুজা ব্যবহার করি, নিকাবে ঢাকা থাকে মুখ…এই অনুকুল পরিবেশ আমাকে দান করেছেন আল্লাহ তা আলা নিজে।
স্থান বদলায়নি,চারপাশের মানুষ বদলায় নি।কেবল সবার মনটাকে বদলে দিয়েছেন তিনি আমার প্রতি।একটু একটু করে আগাতে চাই ঈমানের পথে।সেই অন্ধকার থেকে তিনি ফিরিয়েছেন,যাত্রাটা এখনো বহুদুর বাকী……
সূরাহ ইনশিরাহর প্রতিফলন আমার জীবনে ঘটেছিল।
আমি কী তোমার কল্যাণে তোমার অন্তরকে প্রশস্ত এবং প্রশান্ত করে দিইনি? আর তোমার উপর থেকে ভীষণ  বোঝা নামিয়ে দিয়েছি, যা তোমার পিঠ ভেঙে দিচ্ছিল। আর আমি তোমার জন্য তোমার স্মরণকে উঁচু করেছি। সুতরাং অবশ্যই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে। অবশ্যই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।
আলহামদুলিল্লাহ!

Facebook Comments