প্রতিযোগিতা-২

নীড়ে ফেরার গল্প-২৭ | আবদুল্লাহ (ছদ্মনাম)

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

প্রত্যেকটা মানুষ বাল্যকাল থেকেই স্বপ্ন দেখে। যদিও একটা শিশুর উপলব্ধি শক্তি থাকে না। তবে তার এ স্বপ্ন দেখাতে সহায়ক হয় তার বটবৃক্ষ মা। আর তা বাস্তবায়নে সহায়তা করে একজন পিতা।

কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এই বাস্তব নীতির ভিত্তিটা ছিল নড়বড়ে। হাঁটতে ও চলতে পারার গত হয়েছে মাত্র তিনটি বছর। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ মায়ের বিচ্ছিন্নতায় হয়েছি একেবারে নিঃস। তাই এ অন্তরে কোনো ভবিষ্যৎ স্বপ্নের পাখিকে লালন করিনি। আবার কর্মব্যস্ততায় দিনাতিপাত করা পিতারও স্থায়ি বাসস্থানের ব্যবস্থা করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

জীবন আকাশে নব হেলালের উদয়

এমন দোদুল্যমান অবস্থার অবসান ঘটলো। খোদার সুদৃষ্টি এ অধমের প্রতি নিবদ্ধ হলো। পিতার মাথায় শুভবুদ্ধির উদয় হলো। আমাকে মাদ্রাসার ফুল বাগিচার পথ দেখালেন।

সেই যে শুরু হলো বাগানের পথে ফুল মাড়ানো। আজব্দী সংযুক্ত আছি এমন ইলমের সৌরভে সুরভিত ভ্রমরের সাজে।

তবে এমন পরিবেশে ভয়ংকর প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়নি তা কিন্তু নয়। বাগানে অনেক পরগাছা জন্মেছিল। অনেক বিষাক্ত সর্পের আগমন ঘটেছে।

আবার খোদা পদত্ত দরদী মালিরও দেখা মিলেছে এ বাগানে। তাদের পদচারণায় মুখরিত ছিল এ বাগান। এর মালিক সেও ছিল সহানুভূতিশীল একজন সত্তা।

এমন কিছু বাস্তব ঘটে যাওয়া জীবনের চিত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ।

 

 মরণব্যাধি রোগে আক্রান্ত  আর কিছু ফেরেশতা তুল্য মানুষের অবদান

আমি জন্ম থেকেই হাঁপানি রোগে আক্রান্ত। আর এদিকে মাদ্রাসার পরিবেশ এ রোগের প্রতিকূলে অবস্থান।

এই যেমন:

শিশির ঢাকা শীতের ভোরে জাগ্রত হয়ে হিমশীতল পানিতে অজু করে নামাজ আদায়।

মেঝেতে বিছানা পেতে ঘুমানো।

নিজের কাপড় ধোয়া।

অবুঝ শিশুর নিজের ঔষধ নিজেই খাওয়ার তাগাদা।

আরো অনেক কিছু।

কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো: এসব কষ্ট লাঘব করতে অনেকটা সহায়তা করেছেন আমার পিতৃতুল্য কিছু উস্তাদগন। যাদের এ ঋন আমি কখনোই শোধ করতে পারব না। তাদের সেসকল অবদানের কথা যখন হৃদয়ের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে, ভাবতে অবাক লাগে কাদের সাথে আজ আমরা বলাৎকার আর নির্যাতন নামক শব্দটি ব্যবহার করছি বা কাদের কে তাদের আসনে জায়গা দিয়েছি!!

স্বরণীয় একটা ঘটনা।

মধ্যরাত। আশেপাশের পরিবেশ নিরব-নিস্তব্ধ। হঠাৎ শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। দু-চোখের পাতা ক্রমেই বুঝে আসে।

শ্বাসকষ্ট ক্রমাগত বাড়ছে। শুধু একটা চিৎকার করতে পেরেছি বলে যতদূর মনে আসছে। পরবর্তীতে জানতে পারি আমার সেই মক্তবের হুজুর আপন বাইসাইকেলের পিছনে চাপিয়ে ভিশন অন্ধকারে বের হয়ে পড়ে চিকিৎসকের উদ্দেশ্যে। এবং সেই রাতেই আমার জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। ছিল না আমার পাশে বাবা। আর মা তো আগেই নিজের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। কাছে আপন হিসেবে পেয়েছি আমার প্রিয় উস্তাদ কে।

ছোটতে বর্ণনাতীত দুষ্ট ছিলাম। যা আমার পিতাও সহ্য করতে পারত না। সে সময়ও তো কোনোদিন শিক্ষক কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়নি। বরং; পিতার অসহনীয় প্রহার থেকে তারাই আমাকে রক্ষা করেছেন।

সর্বদাই আপন সন্তানের মত আমাকে তারা আগলে রেখেছিলেন স্বীয় আশ্রয়ে। তাদের সেই সোহাগ-শাষন মিশ্রিত প্রতিপালনে আজ আমি ইজতিহাদ মাহমুদ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। সত্যিই এই স্মৃতিগুলো আজো অমলিন। ভেসে ওঠে মনোস্পটে।

খোদার সমীপে মিনতি ভরা আবেদন, আমার সেই সকল উস্তাদগনকে ওপারে রাসূলের সঙ্গি হিসেবে স্থান দিও। আল্লাহ ছাড়া তাদের উত্তম প্রতিদান দানকারী আর কেউ নেই।

এটা ছিল অনুভূতিতে না আসা সেই বাল্যকালে কিছু মানুষের অবদানের কথা।

ভয়ংকর সাপের দংশন

বড় হয়ে যখন সমাজের সাথে চলতে থাকলাম। শুরু হলো কিছু মানব নামের দানবের মরণকামড়। গভীর অরণ্যে বাঘেরা যেমন স্বাধীন, গুহায় যেমন সাপেরা- ঠিক তেমনি সমাজে জ্ঞানশূন্য কথিত বুদ্ধিজীবীরাও স্বাধীন। মুখ ভর্তি বিষের থলি। সুযোগ পেলেই ছুড়ে মারে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ওপর।উদ্ধত ফণা তুলে ছোবল মারতে উদ্যত হয়। এমন কিছু অসভ্য মানুষের আমাকে নিয়ে করা তিক্ত মন্তব্য গুলোও বিনম্র চিত্তে গ্রহণ করেছি।

কখনো বলেছে: এসব মৌলবাদীরা জীবনে কিইবা আর করতে পারবে??

সেসকল লোকদের জানাজা পড়িয়ে চোখে আঙুল দিয়ে সমাজকে বলেছি: আমি জীবনে এমন কিছু করেছি যে, শেষ সময়ে আমি বা আমরা ছাড়া গতি হলো না। আমার চৌকাঠে এসেই কড়া নাড়তে হলো।

কখনো শুনতে হয়েছে: আসলে এরা (মাদ্রাসার ছাত্ররা) হলো সমাজের বোঝা। এরা সাধারণত উগ্রপন্থী হয়ে থাকে।

আবার কেউ কেউ তো ভিখারি আর মিসকিন বলতেও দ্বিধা বোধ করেনি।

মাদ্রাসায় পড়ার কারনে এমন শত শত বিষবাষ্প উড়ছিল আমার চারিদিকে। দেখতে হয়েছে কারো চোখ রাঙানি। কারো আবার বাঁকা চোখের লক্ষ্যেও পরিনত হতে হয়েছে।

এতসব গালমন্দ আর বাজে মন্তব্য কে উপেক্ষা করে চলেছি সর্বদাই। আর আজ খোদার মহিমায় এমন একটা অবস্থানে রয়েছি যে, সেই সব লোকেরাই আজ আমার পিতাকে বলছে

” ভাই তুই একটা কাজের কাজ করেছিস।

বঞ্চিত এই ছেলেটিকে আজ মাথায় তুলে রাখতে চায়।

আমি তাদের কে দেখাতে সক্ষম হয়েছি। বরং: আল্লাহ আমাকে তৌফিক দিয়েছেন তাদের সকল মন্তব্য গুলোকে অবাঞ্ছিত আর ভিত্তিহীন প্রমাণ করতে।

তাই এখন আর মনে আফসোস হয় না বা আমি নিজেও কখনো হতাশ হই না। কারন; আল্লাহ আমাকে এমন একটা পরিচয় দিয়েছেন যার যোগ্য আমি ছিলাম না।

আজ আমি মাতৃহারা তবে নিরক্ষর নই।

নিজেকে নিয়ে গর্ব করি খোদার নিকটস্থ বান্দার পরিচিতি পেয়ে।

এখন আমি খুশি কু-মন্তব্যকারীর উচিত জবাব দিতে পেরে।

তাই কেউ হতাশ হবেন না যে, মাদ্রাসায় পড়ে কি করব?? আর কি খাব?? একই সাথে সমাজের কে কি বললো এটা দেখলে চলবে না। আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে সকল বাঁধা ডিঙিয়ে এটাই থাকবে আপনার মূল লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য।

আপনি মানুষ। আপনিও পারবেন এ মধুময় বাগানের ভ্রমর হতে। পড়তে পারবেন স্বীয় ধর্মগ্রন্থ। বুঝতে সক্ষম হবেন আপন প্রতিপালকের অমিয় বাণী। জানতে পারবেন নিজ ধর্মের নীতিমালা আর বিধান। চলতে পারবেন আপনার নাবীর দেখানো পথে। আর সর্বশেষ আপনি পেতে পারেন খোদার নিপুণ হাতে গড়া কল্পনাতীত সুখ-সাচ্ছন্দময় বেহেশত নামের স্থায়ি ঠিকানা।

আল্লাহ! আমাদের সকলকে কবুল করুন। আমিন।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: