নীড়ে ফেরার গল্প-৮ | উম্মে যুহাইর

নীড়ে-ফেরার-গল্প

পাপের পাহাড় উঁচু হচ্ছে!

অবহেলায় পড়ে আছে শত হিসাবের পৃষ্ঠা।

এই পাপ বান্দাকে রহম থেকে সরিয়ে দেয়।

ঈমানের স্তর কে নিচে নামিয়ে দেয়।

সুখের সাগরে দুঃখেরা পাড়ি জমায়।

জমা হয় ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় করা শত গুনাহের বোঝা ।সেই হিসাব কষার সময় কি আর আছে!

উড়াল চন্ডী পাখির ন্যায় কোন বাধা ছাড়াই 

এদিক-সেদিক  ঘুরে বেড়ায় সে।

পাখিও তো কখনো একবুক কষ্ট নিয়ে নীড়ে ফিরে।ঠিক তাই হয়েছিলো নীরার জীবনে।

Tijarah Shop

বাড়ির গেইটে লোকজনের ভীর দেখে নীরা আতঙ্কিত হয়। বাড়ির উঠানে খাটিয়ায় বাবার লাশ।ঘর থেকে ভেসে আসছে মায়ের চিৎকারের আওয়াজ।নীরা নিস্তব্ধ হয়ে যায়!

বুঝে উঠতে পারে না কিছুই।

তার সুখের সুতোয় এতো তাড়াতাড়ি টান পড়বে, এটা হয়তো কখনো ভাবেনি!

 

বাবা মারা যাওয়ার পর ভয় চেপে ধরে নীরাকে।

নিজের ভবিষ্যৎ,মায়ের দেখাশোনা,

সব মিলিয়ে নিজেকে দিশেহারা মনে হয়।

কোথাও স্বস্তি খুঁজে পায়না।

একমাত্র সন্তান হওয়ায় সংসারের বোঝা এখন তার ওপর।টিউশনি করে কোন রকম দিন চলে।একটা চাকরির জন্য শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত দৌড়ে বেড়ায়।

কিন্তু তা কি এত সহজ?

চাকরি নামক সোনার হরিণ পেতে যে 

বড় কপাল লাগে!

সমাজের লোকজনের কটু কথা আর সহ্য হয় না।

 

‘আরে!নীরা না!চাকুরি পেয়েছো তো নাকি..?’

বাবা এতো টাকা খরচ করে পড়াশোনা করালেন।

মায়ের জন্য  কিছু করতে পারোনা।

এতো পড়াশোনা করে কি লাভ বলো!

বাবার সাথে সাথে মাকেও পাঠিয়ে দিতে ।

তারপর নিজে যেভাবে পারো চলতে!

তোমার মায়ের জন্য বড় কষ্ট হয়,আহ!

নিজের রূপে ঘায়েল করে তো অন্ততঃ একটা চাকরী যোগার করতে পারো বাপু!

 

সেদিন ঠিক এভাবেই বললো পাড়ার পরিচিত এক মুরব্বী।ওনার কথা শুনেই গা টা কেমন গিন গিন করে উঠলো নীরার।এতটাও খারাপ নয় নীরা।

 

ভাগ্য হয়তো সেদিন সুপ্রসন্ন হয়ে ছিলো!

কোনো রকম ঘুষ ছাড়াই অফিসের বস একটা ভালো পজিসনে চাকুরী দিয়ে দিলেন।

বসের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে তার।

তবে বসের চাহনিটা কেমন কেমন লাগে।

স্রেফ নিজের ভুল ভেবে নীরা নিজেকে সান্তনা দেয় ।কিন্তু এ যে ভুল ছিলো না!

তা বুঝতে পারে যেদিন বসের ব্যক্তিগত রুমে নীরাকে ডেকে পাঠায়,আর খারাপ কিছুর ইঙ্গিত দেয়।প্রচণ্ড জোড়াজুড়ি করে কোনোরকম নিজের সতীত্ব নিয়ে ঘরে ফিরে।নিজের শরীরের প্রতি ঘৃনা হয়।অমানুষের লোলপু দৃষ্টি থেকে নিজেকে বাচাতে চাকুরিটা ছেড়ে দেয়।জীবনটা আবারো কেমন এলোমেলো হয়ে যায়।শত যন্ত্রণার পাহাড় নেমে আসে কৃতকর্মের ফল নয়তো বা রবের পরিক্ষা স্বরূপ।

 

দুনিয়ার ভোগ বিলাশ, কোনোটার প্রতিই মন নেই।রবের তরে নিজেকে সপে দিতে চায়।রবের ভয় আর প্রচন্ড অপরাধবোধ চেপে ধরে নীরাকে।

কি জবাব দিবে রবের কাছে!

 দ্বীনের পথে চলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।

 

নিজেকে পবিত্র করে বাবার হাদিয়া দেওয়া মুসল্লাটা বিছিয়ে নীরা সেজদায় লুটিয়ে পড়ে।

অবুঝ শিশুর ন্যায় হাউ মাউ করে কেঁদে সকল গুনাহ থেকে তাওবা করে।চোখের পানি ফেলে রবের কাছে আকুতি জানায়।

মনটা প্রশান্তিতে ভরে যায়!

এই যে কম কিছু নয়।এই প্রশান্তিটা যেনো না চাইতে অনেক কিছু পেয়ে যাওয়া।

নীরা নিজেকে নতুন করে সাজাতে চায়।

যে সাজে রাসুলের আদর্শ ফুটে উঠবে।

দ্বীনের সৌন্দর্যতত্ত্ব অনুধাবন করা যাবে।

 

নীরা নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

সারা দিন টুকটাক টিওশনি,মায়ের দেখাশুনা,

ইবাদাহ,আর ইসলামিক বই নিয়ে কাটে।

 

কিছু দিন পরেই মায়ের ইচ্ছাতেই সরকারি চাকরিজীবী ইমরানের সাথে বিবাহ হয়।দিনকাল ভালোই চলছিলো তাদের।

নীরার কোনো ভাই বোন না থাকায় ইমরান

মায়ের সকল খরচ দেয়।

নিজে দ্বীনের পথে পুরোপুরি না থাকলেও 

নীরাকে তেমন বাধা দেয়না ইমরান।

কিন্তু হঠাৎ করেই ইমরানের চালচলনে পরিবর্তন

লক্ষ্য করে নীরা।ইমরান আগে মোটামুটি নামায পড়লেও এখন নামাযের কথা বললে বিরক্ত হয়।বেশি রাত করে বাড়ি ফিরে।

নীরাকে পর্দা করে চলতে বাধা দেয়।

অসৎ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে তাদের স্ত্রীদের মতো নীরাকে পার্টিতে নিয়ে যেতে জোড় করে।

পীড়াপীড়ি করলে এলোপাতাড়ি মারা যেনো তার নিত্যদিনের শখ হয়ে দাড়িয়েছে।ইমরানের এই পরিবর্তন নীরার কাছে ছিলো মানসাঙ্কের মত।

বন্ধু মহলের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের জবাব দিতে না পেরে স্ত্রীর উপর ক্ষোভ দিন দিন বেড়ে চলছে ইমরানের।

 

অফিসের কলিগ এর বিয়ের দাওয়াত। 

নীরা শাড়ি পড়ে সাজগোজ করে।

এদিকে ইমরান মনে মনে খুশি হয়।

এতদিনে তবে নীরার শুভবুদ্ধি হল।

কিন্তু যখনই শাড়ির উপর বোরকা পরতে নেয় তখনই ইমরানের মেজাজ চরমে উঠে।

 

‘এই অসভ্য মেয়ে!’

বলছিনা তোকে আর আমার সাথে বাহিরে গেলে বোরকা পড়বি না।

এক কথা বারবার বলতে হয় কেন!

স্বামীর আদেশ মানা স্ত্রীর উপর ফরজ!

এটা জানিস না?

 

‘শরিয়তের গণ্ডির বাইরে তোমার কোনো আদেশ পালন আমার জন্য ফরজ নয়।’

 

‘আবার মুখে মুখে কথা বলিস!’

স্পর্ধা তো কম নয়!

 

রাগে-ক্ষোভে শরীর কাঁপছে ইমরানের!

ডাইনিং টেবিলের উপর রাখা কাচের ফুলদানিটা নীরার দিকে ছুড়ে মেরে হন হন করে বাইরে বেড়িয়ে পরে।

কাচের ভাঙ্গা টুকরো তে হাত পা কেটে রক্তাক্ত হয়ে যায় নীরা।নিজেকে সামলাতে না পেরে ফ্লোরে পড়ে যায়।প্রচন্ড ব্লিডিং হতে হতে ভিতরে থাকা তার অনাগত সন্তানটা অভিমানে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়ে।

 

তিন বছরের সংসার ছিল তাদের।

সংসারে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিল নীরা। কিন্তু ইমরানের অমানবিক আচরণ আর মেনে নিতে পারেনা।যন্ত্রনাগুলো গলায় দলা পাকিয়ে আসে।

যেদিন থেকে ইমরানের মানসিক শারিরিক অত্যাচার শুরু হয়েছে,তার বিপরীতে যেন রবের ভালোবাসা বহুগুণে অনুভব করতে পারছে নীরা।

হয়তো এটা কষ্টের পুরস্কার।

 

চোখের নোনা জলে বালিশ ভিজিয়ে শেষ পর্যন্ত আর পেরে ওঠেনি নীরা।রবের ভালোবাসার কাছে এই সংসার নেহায়েত তুচ্ছ।

তাছাড়া অনাগত সন্তানের চাপা অভিমান, আত্মচিৎকার  মেনে নিতে পারেনি সে।

ইমরান নিজেও আর যোগাযোগ রাখেনি।

সে হয়তো এটাই চেয়েছিলো।

শেষপর্যন্ত দুজনের মাঝে বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

 

‘সে কি!নীরা!’

জামাইর সাথে ঝগড়াঝাঁটি করে চলে এসেছো নাকি?নাকি একেবারেই খেল খতম?

ওহ!বুঝতে পেরেছি!

কপালে একটা চাকুরি জোটাতে পারেনা যে সে আবার ঝগড়াও করতে পারে বুঝি!

ছেলে মানুষ একটু আধটু এমন হবেই!

এতেই ডিবোর্স পর্যন্ত যাওয়া উচিত না!

তোমাকে তো ভালোই মনে করেছিলাম!

কিন্তু…!’

 

পথেঘাটে লোকজনের এমন সব খারাপ মন্তব্য,আর তাচ্ছিল্য শুনতে শুনতে বিরক্তি এসে যায়।সকল বিরক্তি থেকে বাচতে আর পরিপূর্ণ দ্বীনের পথে চলতে নীরা তার মাকে নিয়ে তাবলীগের মাস্তুরাতে সময় কাটায়।

বাকি জীবনটা ঘরে বসে সামান্য জীবিকা অর্জন করে দ্বীনের পথে চলতে মনস্থির করে ।

কিন্তু রবের পরিকল্পনা যে ভিন্ন।

তিনি যা চান,তার বাহিরে যে অন্য কিছু সম্ভব না।

 

‘মা!তোমার দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা দেখে

আমি আপ্লুত!আমি তোমাকে আমার বড় ছেলে মুফতি জাবিরের বউ করে নিতে চাই!’

এভাবেই বললেন মাস্তুরাতের আমির সাহেবের স্ত্রী।নীরা ওনার কথা শুনে অবাকের শীর্ষে চলে যায়।তার পূর্ব জীবনবৃত্তান্ত শুনিয়ে তাদের অযোগ্য বলে নিজেকে সামলে রাখে।

কিন্তু তারা নাছোড়বান্দা!

শেষ পর্যন্ত নীরা জাবিরের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।সুখে চলছে তাদের সংসার জীবন।

জাবিরের জোড়াজোড়িতে নীরার মা তাদের সাথে আছেন।

 

রবের এতো সুন্দর নিখুঁত পরিকল্পনা দেখে নীরার চোখে পানি চলে আসে। আল্লাহ তার জীবনসঙ্গী হিসেবে এমন কাউকে নির্বাচন করেছেন যার চলাফেরা ভেশভুশা যেন সুন্নাতে রাসুলের প্রতিচ্ছবি।শুভ্র সফেদ জুব্বা আর মাথার পাগড়ী যেন জাবিরকে বেহেশতী মানুষ মনে হয়।

নীরা মনে মনে বারবার রবের ঐ প্রতিশ্রুতি আওড়ায়,

‘নিশ্চয় কষ্টের পর স্বস্তি রয়েছে!

তোমাদেরকে রব এতো বেশী দিবেন যে তোমরা খুশি হয়ে যাবে!

 

বাহিরে ঘুটঘুটে অন্ধকার!অমাবস্যার আঁধারে যেনো পৃথিবীতে  ঢেকে আছে।

এই আধারে আলোর নীড় খুঁজে ফিরে নীরা!

অদ্ভুত এক খারাপ লাগা মনটাকে বিষণ্ন করে তুলছে।অতীতের রক্তাক্ত স্মৃতিরা মনে 

বাসা বাধতে শুরু করেছে।

বাবার মৃত্যু,নিজের সতীত্ব রক্ষার জন্য চাকুরি ছেড়ে দেওয়া,সমাজের লোকজনের খারাপ চোখে দেখা,প্রথম যৌবনের সঙ্গীর সাথে ফেলে আসা অতিত,তার অনাগত সন্তানের চলে যাওয়া।

জীবনের বিরাট বড় ট্র্যাজেডি কে অতীত করে বর্তমানে ফিরে আসে নীরা।

 

অতীত আর বর্তমানের এই পার্থক্য যেন রবের উত্তম পরিকল্পনাকারী হওয়ার প্রমাণস্বরুপ।

কোটি কোটি আলোকবর্ষ পেরিয়ে আরশে আজিমের মালিকের কাছে হাত বাড়িয়ে দেয়।স্মৃতির জগত থেকে হারিয়ে যায় দূরে সুদূরে ঐ সৃষ্টিকর্তার পানে।ভুলে যায় তার অতিতের জীবন!কষ্টগুলো আনন্দে ভরে যায়!

 

জাবির নিজেকে সৌভাগ্যশীল মনে করে।

সেজদায় নত হওয়া এই বান্দীকে দেখে মুগ্ধ হয়। যার সঙ্গে আল্লাহ তার জোড়া বেঁধেছেন।

সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপের ন্যায় মিষ্টি আভা ছড়িয়ে আছে তার জীবন সঙ্গিনীর চোখে মুখে।

অস্ফুট স্বরে দুজনে বলে ওঠে, হে আল্লাহ আমাদেরকে চক্ষু শীতল কারী সন্তান দান করুন এবং যে হবে মুত্তাকীদের ইমাম।

 

লেখা_

Facebook Comments