সংকলন
আয়িশাহ
প্রতিযোগিতা-২

নীড়ে ফেরার গল্প-১২ | আয়িশাহ

সেদিনের কথা খুব মনে পড়ে যেদিন এইচ এস সি তে ফেইল করেছিলাম। জীবনে প্রথম বার ফেইল। নিজের উপর সমস্ত বিশ্বাস কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিলো। আমি কী সেই মেয়েটা যে ছিলাম স্কুলের সব টিচারদের সবচেয়ে  প্রিয় স্টুডেন্টদের একজন। সে যাই হোক অনেক কষ্টে নিজেকে ঠিক করলাম। পারিবারিক সাপোর্ট ও পেয়েছিলাম অনেক।

নেক্সট ইয়ারে আবার পরীক্ষা দিয়েছিলাম।  সেবার অবশ্য পাশ করেছিলাম। এরপর অন্য এক ট্রাজেডি। এই আমার গতি হলো না কোনো ভালো জায়গায় মানে পাবলিক ভার্সিটি গুলো তে। অগত্যা কোনো এক প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম।  মনকে প্রবোধ দিলাম, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।

ধর্ম চিন্তা বলতে শিরক কে খুব ঘৃনা করতাম, বোরকা পড়তাম তবে নিকাব করতাম না। নামায কী পড়তাম না? হ্যাঁ পড়তাম। তবে প্রায় ই মিস হয়ে যেতো। ফজর টা কখনো ওয়াক্ত মতো পড়তে পারতাম না। আর এশা টা আলসেমির জন্য প্রায় ই হয়ে উঠতো না। গান শুনতে খুব ভালোবাসতাম। জানতাম হারাম। ছেড়ে দিতাম কিছুদিন পর পর। আবার কিভাবে যেন এটাক্টড হয়ে যেতাম। আমি ছিলাম বইপোকা। যা পেতাম তা ই গিলতাম প্রোগ্রাসে। এভাবেই একদিন হাতে আসে ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে। বইটি পড়ে আমার মনে হলে নিকাব না করলে চলবে না। শুরু করলাম নিকাব তবে তা শুধুই বাইরে।  বাসায় পর্দা করা সহজ ছিলো না। চেষ্টা ও করতাম না।

একজন কে পছন্দ করতাম খুব।  কিন্তু সে আমাকে একটু ও না। আল্লাহর  কাছে কতো চাইতাম তাকে। ডায়েরি জুড়ে শুধু সে আর সে। একটু অবসর পেলেই ওর চিন্তা পেয়ে বসতো।  ওকে ছাড়া একটা দিন ভাবাই যেতো না। দিনরাত যখন ই সুযোগ পেতাম কথা বলতাম ওর সাথে। সে ও বলতো। জানি এটা হারাম। কবীরা গুনাহ।  কিন্তু ছাড়াটাও ছিলো খুব কঠিন। প্রায় অসম্ভব মনে হতো।

Tijarah Shop

মাঝে আমার খুব বড় একটা অসুখ হলো। অবস্থা এমন যে কারো সাহায্য ছাড়া শোয়া থেকে বসতে পারি না, বসা থেকে উঠতে পারি না। দিনরাত বেডে শোয়া। খুব মনে পড়তো ওর কথা, কী যে কান্না পেতো। ওর জন্য আমি এতো পাগল। দিনরাত জ্বালিয়ে মারি। আর আমার অনুপস্থিতিতে আমার একটু খোঁজ ও নিচ্ছে না সে। আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠলাম।  খুব আগ্রহ নিয়ে ওর মেসেজ চেক করতে গিয়েছিলাম।  কিন্তু মেসেজ চেক করে আমি মর্মাহত। একটি মেসেজ ও না। ছোট বাচ্চার মতো কেঁদেছিলাম সেদিন।  অথচ কান্নাটা তেমন আসেই না আমার।

নামাযে অনীহা আগের মতোই।  তেমনই একদিন এশার নামাজ টা না পড়েই শুয়ে পড়েছি। গিলটি ফিল ও হচ্ছে। ঘুমাতে এলে আমার মাথায় জড়ো হয় সমস্ত ভাবনাগুলো। একের পর এক ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবছি। অর্থহীন সবই, হঠাৎ মনে হলো।  আচ্ছা নামাজ টা কেন পড়ছি না? শুধু শুধুই গুনাহগার হওয়া। হঠাৎ আল্লাহভীতি পেয়ে বসলো আমায়। তৎক্ষনাত উযু করে নামাযে দাড়িয়ে গেলাম। আল্লাহ কে শুধু একটা কথা বলেছি সেদিন, আল্লাহ আমি হারাম ছাড়তে চায়।  সেদিন তাহাজ্জুদ ও পড়েছিলাম।  জানি না হঠাৎ এই ফিলিংস গুলো কেনো এসেছিলো।

এর কিছুদিন পর একটা বই পড়ার সুযোগ হয় আমার। রেহনুমা বিনত আনিসের, “জীবনের সহজ পাঠ”। ওই বইটা আমার ওই ভাবনাগুলো তে  শান দিয়েছিলো। বলা যেতে পারে বইটা ছিলো আমার জন্য যথোপযুক্ত মেডিসিন।

  ” নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা সবচেয়ে উত্তম পরিকল্পনাকারী” [সূরা আনফাল: আয়াত ৩০]

এরপর আরো দুইটা বই হাতে এলো।  “রৌদ্রময়ী” ও “মেঘ রোদ্দুর বৃষ্টি ” এই বইগুলো পড়ে আমার মনটা অন্যরকম  প্রশান্তি তে ভরে গেলো।  অন্য মানুষ হয়ে গেলাম আমি। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা অনেক অনেক বেড়ে গেলো।  যে আমাকে এই দুটি বই এনে দিয়েছিলো  তাকে আমি অনেক অনেক দোয়া করি। আল্লাহ তাকে হেদায়েতের উপর অটল রাখুক, হারাম থেকে বাঁচিয়ে রাখুক, কালিমার সাথে মৃত্যু দিক।

অতঃপর আমি ফিরে এলাম, দীর্ঘ একুশ বছর পর আমার চিরপরিচিত নীড়ে।

     “আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন” [সূরা আল-বাকারা: ২৭২]

আর আমি তাঁর অনুগ্রহ লাভ করেছি।

আলহামদুলিল্লাহ!  আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ!

Facebook Comments

Related posts

নীড়ে ফেরার গল্প-২১ | সৈয়দ ইব্রাহিম আনোয়ার শিবলী

সংকলন টিম

নীড়ে ফেরার গল্প-৩০ | আনোয়ার হোসেন

সংকলন টিম

নীড়ে ফেরার গল্প-৪৭ | আল হুসাইন

সংকলন টিম

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!