প্রতিযোগিতা-২

নীড়ে ফেরার গল্প-১১ | আমাতুল্লাহ মেহেরুন্নেসা

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

এই দুনিয়ার জীবন শেষ আমার। এইতো আর একটু পরেই চলে যেতে হবে এ মুসাফিরখানা থেকে। মহান রব্বুল আলামীন যে আমার মৃত্যুর ফরমান জারি করেছেন! মালাকুল মাউত আদেশ মোতাবেক আসছেন আমার জান কবচ করতে!

এই ঠুনকো দুনিয়া ছেড়ে এবার বুঝি আমার চলে যাওয়ার পালা। কিন্তু কেন এত দ্রুত? হায় আল্লাহ! কী নিয়ে যাব আমি তোমার সামনে! আর কোনো সুযোগ তো পাব না তোমাকে একটিবার সিজদাহ করতে। কীভাবে থাকব অন্ধকার ঐ কবরটাতে!

শেষবারের মত সিজদায় পড়ে গেলাম আমি। হে আল্লাহ! ক্ষমা করুন আমাকে। পরিবারে আমার চেয়ে বয়সে কত বড় বড় মানুষজন আছেন। বাবা-মা-দাদা-নানা সবাইকে রেখে আমার বিদায় ঘন্টা বেজে গেল! আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটির নিচে হবে আমার ঠিকানা।  আমার আর কোনো ইবাদত কবুল হবে না। আর সুযোগ নেই।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ! সিজদায় লুটিয়ে পড়ে যাচ্ছি অনবরত।

হঠাৎ কী যেন হলো… মালাকুল মাউত চলে গেলেন। তবে কী মহান আল্লাহ…!  আলহামদুলিল্লাহ! মহান আল্লাহ আমাকে আরেকটি সুযোগ দিলেন। সুবহান আল্লাহ!

“এতক্ষণ কী হচ্ছিল এগুলো! আমি কই এখন?” আনমনে বকে যাচ্ছি নিজে নিজেই। এ কী স্বপ্ন দেখলাম আমি! হাত-পা এখনও কাঁপছে! বাস্তবতা আর স্বপ্নের ঘোরে পড়ে আছি এখনও। আলাদা করতে পারছি না দুটোকে।

যুহরের সালাত আদায় করে জায়নামাজেই গা এলিয়ে দিয়েছিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছি টেরই পাইনি! ঘটনার আকস্মিকতায় বুঝে উঠতে বাকি নেই এ আমার রবের পরিকল্পনা। স্বপ্নটা যেন আমাকে ও পথ থেকে টেনে আনার একটি উছিলা মাত্র। আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামীন। স্বপ্নটা যে একটা রিমাইন্ডার! আমার নীড়ে ফেরার শক্ত একটা বাঁধন। যার মাধ্যমে মহান রব্বুল আলামীন ঐ অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছেন আমাকে। আলহামদুলিল্লাহ।

ছোটবেলা থেকেই বেশ ধর্ম সচেতন ছিলাম আমি। এখনও মনে পড়ে, বেশ খানিকটাই ছোট তখন। সূরা ফাতিহা আর ইখলাস রপ্ত করেছি সবে, কিন্তু নামাজের আর কোনো দু’আই পারতাম না। তাই শুধু সুবহান আল্লাহ, সুবহান আল্লাহ বলেই নামাজ পড়তাম। আম্মু শিখিয়ে দিয়েছিলেন।

এভাবে বেশ ছোট থেকেই নামাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তবে ততটা গুরুত্ব ছিল না তখনও। গুরুত্বেরই বা কী বুঝি তখন!

তবে নামায সম্পর্কে মোটামুটি সচেতন থাকলেও পর্দা কি তা বুঝতামই না। পরিবারে পর্দা বলতে ছিল মাথার চুল ঢেকে বোরকা পরা এতটুকুই। তো আমি মাথা ঢেকেই চলতাম। তবে কোনো অনুষ্ঠান বা আনন্দোৎসব হলে ভিন্ন কথা। এই ছিল অবস্থা। অর্থাৎ পর্দা সম্পর্কে ছিলাম গাফেল। এছাড়াও আমার আমল মোটামুটি থাকলেও ইলমটা তেমন একটা ছিল না। যার কারণেই হয়ত হোঁচট খেয়ে ছিলাম!

পৃথিবী ছুটে চলেছে আপন গতিতে। সময় থেমে নেই। কালের আবর্তনে আমিও ছুটে চলছি জীবনের মহাসড়কে।

ক্লাস এইটে পড়ি যখন। বলা যায় এই পর্যন্ত সময়টা আমার জীবনের সোনালি দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম। নামায, কুরআন আর পড়া-লেখার বাইরে আর কিছুই ছিল না আমার। ক্লাস ফাইভের জিপিএ ফাইভ রেজাল্ট সবার কাছে মেধাবী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ। অন্যভাবে বললে, এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যয়ে একটা অনুপ্রেরণা ছিল। তারই ফলশ্রুতিতে ক্লাস এইটেও জিপিএ ফাইভ। আলহামদুলিল্লাহ।

আব্বুর চাকুরী পরিবর্তনের সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে। যার কারণে এবছর এক স্কুলে তো আরেক বছর অন্য কোনো জায়গায়, অন্য কোনো স্কুলে। এভাবে করে এসএসসি পরীক্ষার সময় চলে এলো। আলহামদুলিল্লাহ এসএসসিতেও জিপিএ ফাইভ।

কিন্তু… কোথায় যেন একটা কিন্তু থেকে যায়। বড় হবার সাথে সাথে কেমন যেন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছিলাম। কেন যেন আর আগের মত নেই। একেক এলাকায় মানিয়ে নেয়ার জন্য অনেকটা পরিবর্তন এসে যায়। এসএসসি পরীক্ষা শেষের সময়টা তখন। বেশ কিছুদিন সময় পেলাম। পড়া-লেখা নেই, চলছে সারাদিন অবাধে ফোন ব্যবহার।  যেখানে এর আগ পর্যন্ত ফোন মানে আমার কাছে কারও সাথে কথা বলা আর গেইম খেলার বস্তু ছাড়া অন্য কিছুই ছিল না। সেখানে শুরু হলো স্মার্টফোনের হরেক রকম ভেলকিবাজি। ফেইসবুক-ম্যাসেঞ্জার-ইউটিউব সবকিছুর সাথে নতুন করে পরিচিত হচ্ছিলাম।

শুরু হলো আমার অধঃপতন! নামায পড়ি, পড়ি না। পড়লেও মন নেই। কুরআনও আর ছোঁয়া হয় না আগের মত। ফোনের অবাধ ব্যবহারে হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে। বাসার সবাই তেমন একটা না ভাবলেও বিচলিত ছিল। তবে আমার প্রতি বিশ্বাস ছিল বলে তেমন একটা বাধা দেয়নি।

ইচ্ছা ছিল ভালো কলেজে পড়ব। বাসা থেকেও বলা হয়েছিল রেজাল্ট ভালো হলে ভালো কলেজেই ভর্তি করা হবে। রেজাল্টও দিল। কোনভাবে এসএসসিতেও জিপিএ ফাইভই পেলাম আলহামদুলিল্লাহ। কলেজে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। ঢাকার মধ্যে নামীদামী বেশ কয়েক কলেজে চয়েজও দিয়ে আসলাম। কিছুদিন পর চান্সও আসল ঢাকার বেশ ভালো একটি কলেজে।

এদিকে আমার অধঃপতন বেড়েই চলছে। হারামের দিকে অগ্রসর হচ্ছি অনবরত। বাসার সবাই ততদিনে আঁচ করে নিয়েছে। মেনে নিতে পারেনি আমার এই অবস্থা। যেখানে নামায-কুরআন ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, সেখানে কি-না!

শাসন, বুঝানো সবই চলছে। ফোন আর নিতে দিত না আমাকে। তবে আমি যে আর আগের মত নেই! ভুলের উপরই অটল আছি। ফলশ্রুতিতে আমাকে কলেজটাতে আর ভর্তি করা হলো না। তারা আমার এমন পরিবর্তন টা মেনে নিতে পারেনি।

বাসার কাছেই একটি সরকারি কলেজে ভর্তি করা হলো। এখানকার রেজাল্ট তেমন ভালো না হলেও মোটামুটি ছিল। হুম এটা ঠিক যে, ভালো রেজাল্টের জন্য নামীদামী কলেজ আর সরকারি কলেজ কোনো ব্যাপার না। ইচ্ছা থাকলে সব জায়গায়ই অনেক ভালো ফলাফল করা যায়। কিন্তু জেদ চেপে গিয়েছিল আমার। কোনও ভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না এই কলেজে ভর্তি করাটা। পরিবেশেরও তো একটা ব্যাপার থাকেই।

পড়া-লেখার প্রতি মন নেই। অনেকটা জেদের কারণেই। ক্লাস ফাঁকি দেয়া, আড্ডাবাজিসহ অনেক কিছুই হয়েছে। তবে চেষ্টা যে করিনি তা না। আশে-পাশে বিজ্ঞান বিভাগের তেমন কোনো টিচার খুঁজে পাইনি। দেখতে দেখতে চলে গেল ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার। সেকেন্ড ইয়ারে উঠে তাও যা টিচার পেলাম, তবে হিউজ সিলেবাসটা আর কভার করতে পারছিলাম না। মনে মনে অনুশোচনা হত তখনও। কিন্তু কেন যেন বের হতে পারছিলাম না।

এভাবেই চলছিল আমার অবাধ চলাফেরা। “কলেজে উঠলে পাঙ্খা গজায়” টাইপ অবস্থায় উড়ছিলাম যেন। ফোন আর দেয়া হয়নি আমাকে। তবুও কি থেমে থাকে! ভুলপথে হেঁটে চলছিলাম। যোগানি ছিল আমার কুপ্রবৃত্তির দাসত্ব আর জেদ। এমন অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে, ঠিক-ভুল বুঝার ক্ষমতা আর নেই।

সময় থেমে নেই। এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। এদিকে আমার প্রস্তুতিও তেমন ভালো না জানা কথা। যেভাবে হোক পরীক্ষাগুলো পার করলাম।

পরীক্ষার পরের সময়টা। নিজের বর্তমান আর অতীতের হিসাবটা যেন মিলছিল না কোনো ভাবেই। এ আমি কেমন আমি! এক জুম্মাবারে মসজিদের খুৎবা কানে আসছিল। কুড়িগ্রামের ঘুঘু মুন্সী সাহেবের কাহিনি শুনে আমার ব্যথিত হৃদয়ে যেন একটা আলোড়ন বয়ে গেল। তীব্র অনুশোচনা হচ্ছিলো। খুৎবা কানে আসছিল আর আমার অন্তর যেন ফেটে যাচ্ছিল। চোখ বেয়ে অশ্রুধারা ঝরছে। ভাবছিলাম, এক সময় আমিও তো আল্লাহর ইবাদতে দিন পার করতাম! যিকির করতাম কত। আর এখন এমন গাফেল হয়েছি! নামাযটাও ঠিকমত পড়ি না! আল্লাহুম্মাগফিরলি।

মনের মাঝে এ অনুশোচনার জোয়ার বইতে বইতে এইচএসসির রেজাল্ট ছিল আরেকটি ধাক্কা।

কখনও বুঝিনি খারাপ রেজাল্ট করলে কেমন লাগে! হ্যাঁ স্কুল-কলেজে একাডেমিক রেজাল্ট মাঝে মাঝে খারাপ হত তবে বোর্ড পরীক্ষাগুলো আলহামদুলিল্লাহ ভালো ছিল। আত্মীয়-স্বজনরা সবাই ফোন দিচ্ছে… ‘রেজাল্ট কি হলো? জানা কথা, ও তো ভালোই করবে।’

আম্মু বলছিল, নাহ! এবার রেজাল্টটা খারাপ হয়ে গেছে…ইত্যাদি ইত্যাদি।

খুব কষ্ট লাগছিল ভেতরে ভেতরে। সব নিজের হাতে নষ্ট করেছি। এ তো আমার নিজেরই কর্মফল! পড়া-লেখা, নামায-কালাম…সব দিক দিয়ে এমন অধঃপতন। আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। বের হতে চাচ্ছিলাম এ অন্ধকার পথের ধুম্রজাল থেকে।

মহান রব্বুল আলামীন আমাকে সাহায্য করলেন আলহামদুলিল্লাহ।

বেশ কিছুদিন পর। একদিন দুপুরের ঘটনা। যুহরের সালাতের পর সেই স্বপ্নটা দেখলাম। এখনও স্বপ্নটা মনে পড়লে গায়ে কাটা দিয়ে উঠে আমার। অন্তরটা মহান রব্বুল আলামীনের কৃতজ্ঞতায় ভরে যায়। স্বপ্নটা যে ছিল আমার পরিবর্তনের অন্তিম একটা ধাক্কা।

সন্তান না বুঝে ভুলপথে চললে পিতা-মাতা যেমন যেকোনো ভাবে, প্রয়োজনে ভয় দেখিয়ে বিপদাপদ থেকে সুরক্ষিত করে। ঠিক সেভাবেই মহান আল্লাহ সুবহানু তা’আলা যেন আমার অন্তরে সেই স্বপ্নের মাধ্যমে এক ভীতি সঞ্চার করে ফিরিয়ে আনলেন সত্য আর সুন্দর পথে। যার ফলশ্রুতিতে মরচেধরা অন্তরটা যেন সতেজ হয়ে উঠল মহান রবের সতেজতায়। শুরু হলো আমার নীড়ে ফেরার অন্যতম অধ্যায়। হেদায়েতের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল গহীন অন্ধকার অন্তরটা। তৃষিত হৃদয় যেন রহমতের বারিধারায় পুলকিত হয়ে উঠল। আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ!

এরপর শুরু হলো অন্য এক সংগ্রাম। প্রত্যেক দ্বীনে ফেরা ব্যক্তির জন্য যে সংগ্রাম চিরন্তন। এ যেন মহান রব্বুল আলামীনের সেই বাণীর বাস্তবায়ন,

“মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?”

[ সূরা আল আনকাবুত; ২৯ : ২ ]

যে পরিবার চাইত নামায-কালাম পড়ি, ভুল পথে না চলি; সেই পরিবারই প্রথম বাধ সাধল। মেয়েদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা আসে বোধ হয় পর্দা নিয়ে। দ্বীনে ফেরার পর, এক বুক অনুশোচনার আঘাতে অন্তর যখন রক্তাক্ত । তখনই শুরু হয় সেই রক্তাক্ত অন্তরে আরেক ধাপ ক্ষত তৈরির প্রক্রিয়া।

হঠাৎ কী ঢং শুরু হইছে! এতদিন কী করছে না করছে, আর এখন হুজুর হইছে।

এগুলো আবার কেমন পর্দা! ইসলাম এত কঠিন নাকি? কাজিনদের সামনে যাওয়া যাবে না! বাবা-চাচার বয়সী তাদের সামনেও পর্দা!

এভাবে খালাম্মা সেজে, মুখ ঢেকে থাকলে, কেউ চেহারা না দেখলে কে বিয়ে করবে! ইত্যাদি ইত্যাদি।

জাহিলিয়াত সময়ের ছবিগুলো ডিলেট করতে বললে বন্ধু-বান্ধবরাও তামাশায় ফেটে পরে। তবে সবাই এক না। এমনও বন্ধু আছে, যারা প্রকৃতই বন্ধু। যাদের সহায়তায় এপথ চলাটা সহজ হয়ে যায়। একটা ভরসা পাওয়া যায়।

এছাড়াও আশেপাশের পরিচিতজন, আত্মীয়স্বজন সবাই তো আছেই। তাদের কটুকথা কিংবা ব্যাঙ্গাত্মক আচরণগুলোও আচড় কাটে হৃদয়ে। এসব কিছু মিলিয়েই দ্বীনের পথে অটল থাকার সংগ্রাম করে যেতে হয়।

সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় বিয়ে নিয়ে। দ্বীনে ফেরার পর প্রত্যেকেরই আশা থাকে, শরিয়তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান–বিয়ে নিয়ে। বিয়েটা যেন শরিয়ত সমর্থিতভাবে হয়। তার ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীও যেন তার মতই মহান আল্লাহর প্রতি অনুগত থাকতে সচেষ্ট থাকে। দ্বীনের পথে চলতে যেন একে অপরকে সহায়তা করে। হালাল-হারাম সহ মহান রব্বুল আলামীনের যাবতীয় আদেশ যেন মেনে চলে, হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত একজন দ্বীনদার সঙ্গী, পরিবার যেন পায়।

কিন্তু গতানুগতিক মুসলিম পরিবার থেকে এক্ষেত্রে অনেক বেশিই বাধা আসে। অনেক সময় বাবা-মা মেনে নিলেও, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী প্রত্যেকের নানান মন্তব্যে তারাও বাধা হয়ে বসেন। মেয়েদের ক্ষেত্রে এ বাধাটা যেন আরও কঠিন, ইস্পাতদৃঢ়। একজন মেয়ে হিসেবে আমি যেগুলো প্রত্যক্ষ করেছি বা করছি তার ভিত্তিতেই বলা কথাগুলো। পরিবার মেনে নিতে চায় না দ্বীনদার, আল্লাহ ভীরু, বর্তমান ফিতনাময় যুগে সৎপথে সামান্য হালাল রুজি উপার্জনকারী সাধাসিধে কোনো পাত্রের হাতে তাদের আদরের মেয়েকে তুলে দিতে। এছাড়াও আরও অনেক দিক তো রয়েছেই। আল্লাহ সকল অভিভাবককে সঠিক বুঝ দান করুন।  হেদায়েত দান করুন আমীন।

এভাবে কাছের মানুষগুলোর দেয়া আঘাতে তাদের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। যেগুলো মেনে নিতে কষ্ট হয়। তবে এই আসমান-জমীনের সৃষ্টিকর্তা, একমাত্র বাদশা মহান রব্বুল আলামীন যখন পাশে, তখন আর কীই বা লাগে না এই দুনিয়ায়! আলহামদুলিল্লাহ এভাবেই মহান আল্লাহর সহায়তায় বাধাগুলো পার হয়েছি এবং হচ্ছি প্রতিনিয়ত।

স্বপ্নটা দেখার বেশ কিছুদিন পর আমাদের বাসায় আমার নানী বেড়াতে আসেন। যিনি ছিলেন আমার ভালোবাসার একটা পৃথিবী। যদিও তিনি অনেক অসুস্থ ছিলেন, তবুও তার ভালোবাসার কমতি ছিল না। তবে এবার কেমন যেন অন্যরকম। একেবারেই নিস্তেজ হয়ে গেছেন।

হঠাৎ একদিন এক দুর্ঘটনা ঘটে। ফ্লোরে পড়ে গিয়ে নানীর ডান পা ভেঙ্গে যায়। অপারেশন করা হয়। এর প্রায় দুই মাসের ব্যবধানে আমার নানী আমাদের ছেড়ে পারি জমান পরকালের যাত্রায়। আমাদের বাসাতেই ছিলেন তিনি। খুব কাছ থেকে একটা মৃত্যু দেখলাম এই প্রথম! তাও খুব ভালোবাসার আর কাছের একজন মানুষ। লিখতে গিয়ে এখনও অশ্রুসিক্ত হয়ে যাচ্ছে আঁখি। আল্লাহ ওনাকে ভালো রাখুন, জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন (আমীন)।

ধীরে ধীরে শোক কাটানোর চেষ্টায় পুরো পরিবার। মৃত্যু এমনই এক অনিবার্য সত্য। প্রতিনিয়ত আমাদের চোখদুটো এর সত্যতা প্রত্যক্ষ করছে, তবুও যেন হুশ নেই। নানীর মৃত্যুর অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে আমার অন্তরেও একটা বোধ জাগ্রত হচ্ছিলো।  পরিপূর্ণ পর্দা শুরু করে দিয়েছি আরও আগেই আলহামদুলিল্লাহ। আর অন্যান্য ফরয, সুন্নাত এবং নফল আমলেও মনোযোগী হয়ে উঠলাম আল্লাহর অশেষ রহমতে। এভাবেই একের পর এক ঘটনায় আমার ঈমান যেন দৃঢ় হচ্ছে। এ পথে অটল রাখতে এগুলো তো আমার মহান রবেরই পরিকল্পনা। আলহামদুলিল্লাহ।

একটু একটু করে নিজেকে পরিবর্তন করার প্রচেষ্টায় আলহামদুলিল্লাহ। ইসলামিক বই তেমন একটা পড়া হত না। কিন্তু মহান আল্লাহ তা’আলাই যেন ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। হঠাৎ একদিন বড় আপু কিছু ইসলামিক বই আনে বাসায়। ওর ফ্রেন্ডের ছিল বইগুলো। আমিও পড়া শুরু করলাম আর ঈমান যেন আরও মজবুত হচ্ছিল। সেই থেকে ইসলামিক বইয়ের প্রেমে পড়ে গেলাম। যেটা আমাকে হেদায়েতের পথে অটল থাকতে দীপ্ত অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।

এসময়টায় ধীরে ধীরে দ্বীনের যত গভীরে প্রবেশ করছিলাম, এই অস্থায়ী দুনিয়া ততই অর্থহীন হয়ে যাচ্ছিল আমার কাছে। এত এত পরিশ্রম, এত বছর পড়া-লেখা—এর শেষ পরিণতি কি? এইসব সার্টিফিকেট কী কখনও আমার রবের সান্নিধ্য এনে দিতে পারে!? মৃত্যু এসে গেলেই এতসব পরিশ্রম যেন মূল্যহীন। জেনারেল লাইনে পড়ার আগ্রহটাই নষ্ট হয়ে যায়।

খারাপ রেজাল্ট টা একদিকে আমার জন্য কল্যাণকর হলেও চরম হতাশার মধ্যে পড়ে যাই। কি করব কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একসময় সিদ্ধান্ত নেই আবার ইমপ্রুভমেন্ট এক্সাম দেব। প্রথমে পরিবারে মেনে নিলেও পরে আর দিতে দেয়নি। যার কারণে প্রথম বছর ভার্সিটি এক্সামগুলোও দেইনি। কিছুদিন পরই বিশ্ব জুড়ে করোনা মহামারিতে অচল হয়ে যায় জনজীবন।  যার কারণে পড়া-লেখাও প্রায় বন্ধই বলা চলে।

একসময় বাসায় জানিয়ে দেই, আমি মাদ্রাসায় পড়তে চাই। তারাও মেনে নেন। আবার বাস্তবতা বুঝে উপলব্ধি হয়, একজন মুমিনের জন্য এই দুনিয়া ও পরকাল উভয়ই সমান গুরুত্ববহ। কেননা পরকালীন মুক্তির পাথেয় সংগ্রহের স্থান এই দুনিয়া। তাই একটা ছেড়ে আরেকটা পাওয়া সম্ভব না। একজন মুমিনের সবদিক থেকেই আদর্শবান হতে হবে। আর বর্তমানে দ্বীনের খেদমত করতে হলে সবদিক থেকেই যোগ্যতা অর্জন করা বাঞ্ছনীয়। দ্বীনি ইলম আর দুনিয়াবি জ্ঞান দুটোকেই গুরুত্ব দিতে হবে আমাদের দ্বীনের স্বার্থেই। এগুলো ভেবেই বর্তমানে মাদ্রাসার পাশাপাশি অনার্সে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছি।

আর ফিতনাময় পরিবেশে নিজের ঈমান-আমল টিকিয়ে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করছি, আল্লাহ যেন কবুল করেন। শুধু এটাই প্রার্থনা, মহান রব্বুল আলামীন যেন আমাকে কবুল করেন। তাঁর ক্ষমার চাদরে আচ্ছাদিত করে তিঁনি যেন আমায় বরণ করেন। সন্তুষ্টচিত্তে পরিসমাপ্তি ঘটে যেন এই দুনিয়ার জীবনের। আমীন ইয়া রব্বুল আলামীন।

“হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি ফিরে এসো তোমার রবের প্রতি সন্তুষ্টিচিত্তে, সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও। আর প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।” [ সূরা ফাজর: ২৭-৩০]

এ মোহনীয় বাণী শ্রবণের অপেক্ষায় ইনশাআল্লাহ।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: