আত্মশুদ্ধি

আলোকিত রমাদান | শায়খ আহমাদ মুসা জিবরিল

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

(শায়খ আহমাদ মুসা জিবরিলের লেকচার সিরিজের অনুবাদ ‘ধূলিমলিন উপহার রমাদান’ অবলম্বনে)

১. রমাদানে বান্দার জন্য তিনটি সুযোগ আসে। সিয়াম, কিয়াম, কদর। বান্দা যদি এই তিনটি সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, এই তিন বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে রবের দিকে এগুতে পারে, তবে তার জন্য রয়েছে ক্ষমা পাওয়ার অকল্পনীয় সুযোগ।

২. আল্লাহর দিকে আমাকে এগিয়ে যেতে হবে। আমি এগুলেই রব আমার কাছে আসবেন। যে পথ এখন মনে হচ্ছে অনেক দূরের, শীঘ্রই তিনি সেই পথ নিকটে করে দিবেন। যে পথকে ভাবছি বন্ধুর ও দুর্গম, রব সে পথে এগুনো আমার জন্য সহজ করে দিবেন ইনশাআল্লাহ। আমাকে তাই হিম্মত করতে হবে। সাহসে ভর করে এগিয়ে যেতে হবে।

. গোপন আমলের শ্রেষ্ঠ সময় রমাদান। ইলম অর্জন করি গোপনে, আমল করি গোপনে, কিয়াম করি গোপনে। শুধু রব জানুক, আর কেউ না।

৪. আমাদের রব আল্লাহ বলেছেন, সিয়াম তাঁর জন্য এবং তিনিই এর প্রতিদান দিবেন। এই ঘোষণার পর আর কী লাগে আমাদের জন্য। এই এক ঘোষনাই যথেষ্ট আমাদের আমলের গতি বাড়ানোর জন্য। সাওম আল্লাহর নিকট প্রিয় ইবাদত। এটি একই সাথে তাকওয়া, আল্লাহর প্রতি প্রেম এবং আল্লাহর প্রতি ভয় সৃষ্টি করে। সাওমের মাধ্যমে তিন ধরণের ধৈর্য অর্থাৎ, আল্লাহর আনুগত্যের ধৈর্য, হালাল-হারাম মেনে চলার ধৈর্য, এবং আল্লাহর বিধান ও নির্ধারিত তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার ধৈর্যের পরীক্ষা হয়। ফলে সাওমের প্রতিদান অনেক বেশী তা সহজেই অনুমেয়। সাওম এমন এক ইবাদত যার মাঝে শিরকের সম্ভাবনা নেই।

৫. রমাদানে বোনেরা দুঃখকষ্টে ভোগেন তাদের কিছু শরয়ী ওজরের কারণে। তারা ভাবতে থাকেন, তাদের কাছে নেক আমল করার সুযোগ নেই। ফলে তারা টিভির সামনে বসে থাকেন এবং বিরাট নিয়ামত হতে নিজেকে বঞ্চিত করেন। বস্তুত রামাদানে সিয়াম না করার মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ পালন করে বোনেরা সারাদিন সওয়াবের সুযোগ পান। সুস্থ অবস্থায় সিয়াম আদায় করা যেমন রবের আদেশ, বিশেষ অবস্থায় সিয়াম আদায় না করাও রবের আদেশ। ফলে তাদের হতাশার কিছু নেই।

. রমাদান এমন এক মৃদুমন্দ বাতাস, যা শরীর ও মনন শীতল করে দেয়। তাই এই বাতাসের পরশে, মিষ্টি ঘ্রাণ নিয়ে জীবন গোছানো আমাদের জন্য অপরিহার্য। সময়ের সদ্ব্যবহার করে, নিজের চেয়ে উত্তম আমল, আখলাকওয়ালা বান্দার সোহবতে এসে, গোপনে তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করে এই রামাদানের সুবাস নেওয়া যায়। তাছাড়া নেক আমল করার আগে প্রস্তুতি নেওয়া, (যেমন রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদ পড়ার আগে দুই রাকাত নফল সালাত পড়তেন প্রস্তুতি হিসেবে), নেক আমল ছুটে গেলে হৃদয় বিগলিত হওয়া, কাফফারা হিসেবে আরও কিছু নেক আমল করা আমাদের রমাদানের সুবাস পেতে সাহায্য করবে ইনশাআল্লাহ।

৭. সালাফদের মত আমল না করে আমরা কীভাবে আশা করতে পারি যে, সালাফদের মত আমরা একই জান্নাতে প্রবেশ করব? সালাফদের মত একই জান্নাত পেতে চাইলে আমাদের সালাফদের সাথে প্রতিযোগীতা করতে হবে। নেক আমলের গতি বাড়াতে হবে।

৮. আল্লাহ মুনিব ব্যক্তিকে পছন্দ করেন। যে ব্যক্তি তাওবাহর পর নিজেকে বদলে ফেলে, আল্লাহর দিকে একধাপ এগিয়ে যায়, বিরতিহীন তাওবাহ করে আল্লাহর দিকে ছুটে যায়, গুনাহের ছাপে মরচে পড়া অন্তরটাকে কোমল করার কসরত করে, অনুনয় বিনয় করে কাঁদে, নিজেকে ইসলামের ছাঁছে পরিশুদ্ধ করে, তার চেয়ে উত্তম আর কে আছে? রামাদান হোক ইনাবার শুরু। চলতে থাকুক আজীবন।

. দোয়ায় লেগে থাকা জরুরি। আমাদের রব চান আমরা যেন দোয়া করি। আমরা যদি দোয়া করতে থাকি, তবে এই দোয়া কবুল হয়ে আমাদের জরুরত পুরা হওয়ার পাশাপাশি দোয়া করার জন্যও আমরা সাওয়াব পাব।

১০. গোপন আমল করা। যতটুকু পারা যায়। যত গভীরভাবে আমল গোপন করা যায়। আল্লাহ বান্দার গোপন আমলের উসিলায় বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। তার দোয়া কবুল করেন। শেষরাতের কিয়াম এমন এক তীর যা কখনও লক্ষভ্রষ্ট হয় না। আজ বিশ্বব্যাপী মজলুম উম্মাহর উপর হওয়া জুলুমের ব্যাপারে আমি আপনিও সমান দায়ী। আমাদের দোয়া থেকে যেন তাদের কথা বাদ না পড়ে। অন্তত আল্লাহকে বলতে তো পারব, ইয়া আল্লাহ! আমি দোয়া করেছিলাম।

১১. হারিয়ে যাওয়া আমলগুলো নিয়ে সময় কাটানো হতে পারে রমাদানে উত্তম করণীয়।

  • ফজরের আগে ইস্তেগফার করা। আশেপাশে সবাই যখন ব্যস্ত, সাহরীতে কিংবা অন্য কাজে। রহমানের বান্দারা তখনই চট করে
  • এককোণে বসে পাঁচ, সাত মিনিট ইস্তেগফার করে নেয়।
  • আগে যেসব আমল করতাম না, সেসব আমল শুরু করা।
  • তাফাক্কুর করা। এ বিষয়টা যেন আমাদের জীবন থেকে হারিয়েই যাচ্ছে। আমরা আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করি না। আমরা আখিরাত নিয়ে কল্পনা করি না। জান্নাত, জাহান্নাম নিয়ে চিন্তা করি না। অথচ গুনাহের ফলে আমাদের মননে যে মরচে পড়েছে তা ধুয়ে মুছে সাফ করতে তাফাক্কুরের জুড়ি নেই।
  • তাবাত্তুল করা, তথা সম্পূর্ণভাবে নিজেকে আল্লাহর জন্য সমর্পণ করা। সাধারণত আমরা তিন ধরণের তাবাত্তুল দেখতে পাই।
    ** গৃহসংসার থেকে বিরাগ হয়ে যেভাবে খ্রিষ্টান ধর্মযাজকেরা গীর্জায় নিজেকে আবদ্ধ করে রাখে। ইসলাম আমাদের এই তাবাত্তুলের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করে।
    ** দিনের নির্দিষ্ট অংশে নিজেকে দুনিয়া থেকে পৃথক করে নেওয়া। পাঁচ-দশ মিনিট একমনে দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত, আযকারে রত হওয়া এর অংশ। এই তাবাত্তুলের উত্তম সময় হলো রাতের শেষ একতৃতীয়াংশে সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রবের নিকট পড়ে থাকা।
    ** তৃতীয় প্রকার তাবাত্তুল তাবাত্তুলের সর্বোচ্চ ধাপ। এটা হলো মনকে পুরোপুরি আল্লাহর নিকট সমর্পণ করে দেওয়া। এ নিয়ামত উম্মাহর খুব কম মানুষ পায়। তারা আমাদের সাথেই থাকে। শারীরিকভাবে আমাদের মাঝেই থাকে। কিন্তু তাদের মন ঘোরাফেরা করে আসমানী বিষয়াদির ভাবনায়। প্রতিটা কাজ করার সময় তারা চিন্তা করে সে কাজে রব খুশি হবেন কিনা।

১২. রমাদান কুরআন নাজিলের মাস। সালাফরা রমাদানে হাদিস, ফিকহের দারস পর্যন্ত স্থগিত করে দিতেন যেন রাতদিন কুরআনকে সময় দিতে পারেন। হতাশ হই, দুঃখে জর্জরিত হই, অশান্তিতে থাকি, সুখে ভাসি, আনন্দিত হই, আমরা যেন কুরআন পড়ি। সব কাজের ফাঁকে, কুরআন আমাদের ঠোঁটে লেগে থাকুক। একমাত্র কুরআনকে বন্ধু বানালেই আমরা সফল হবো। কুরআন ছাড়া আমাদের উৎকৃষ্ট কোনও বন্ধু নেই। হতে পারে না। এটা তো সেই কুরআন যা অমুসলিম মুশরিকদের হৃদয়েও প্রভাব ফেলে। এটা সেই বন্ধু যা আমাদের হাত ধরে জান্নাতে পৌঁছে দেয়। আমাদের জন্য সুপারিশ করে।

১৩. প্রথম ধাপেই টার্গেট বড় না করি। আমাদের সালাফরা এক রাতে দুইবারও কুরআন খতম দিয়েছেন। এখন সেটা দেখে শুরুতেই যদি আমরা নির্ধারণ করি, অবশ্যই একরাতে দুই খতম দিবো, এতে বিপত্তি বাঁধতে পারে। শয়তান আমাদের ওয়াসওয়াসা দিয়ে এক ইবাদতে অনেকক্ষণ আটকে রেখে সব শক্তি নিঃসৃত করে ফেলে। পরবর্তীতে এমন হয়ে যায় যে, খতম তো পরের কথা, আমরা প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াতই ছেড়ে দিই। আল্লাহর শপথ, আল্লাহ সেসব আমল পছন্দ করেন যা নিয়মিত করা হয়। কাজেই আমাদের দরকার অল্প আমল হলেও এমন পরিমাণে নির্ধারণ করা যা আমরা নিয়মিত করতে পারব।

১৪. সদাকাহ। রমাদানের উৎকৃষ্ট আমল। সালাফরা লুকিয়ে, গোপনে, ছোট, বড় সদাকায় মেতে থাকতেন। সদাকাহর মাধ্যমে আমরাও আমাদের রমাদানে সুশোভিত করতে পারি। এ রমাদানে যাকাত দেওয়ার অথবা সদাকাহ করার সবচেয়ে ভালো খাত হচ্ছে এমন একটি পরিবারকে খুঁজে বের করা, যেখানে কারো স্বামী জেলখানায় আছে। যে মহিলার স্বামী জেলখানায় আছে, তাকে বিধবার মতই বলা চলে।

১৫. আমরা অনেকেই রমাদান শেষ হওয়ার আগে রমাদানের স্বাদ হারিয়ে ফেলি। আমরা গতানুগতিকভাবে সিয়ামরত হই, তাই আমাদের মধ্য থেকে রমাদানের মিষ্টতা চলে যায়। যদি আমরা মনের মাঝে গেঁথে ফেলতে পারি এই সিয়াম কেবল আল্লাহর জন্য, তবে রমাদান আমাদের নিকট সুপেয় মিষ্টি পানির মত মনে হবে। ইবাদাতের মাঝে আনন্দ সবাই পায় না। তারাই পায়, যাদের প্রতি আল্লাহ ইহসান করেছেন। আমরা যদি আল্লাহকে প্রচণ্ড ভালবেসে, আল্লাহকে খুশি করতে সিয়ামরত হই, ঠিকই আমরা সাওমে আনন্দ, প্রশান্তি খুঁজে পাব। আমাদের হৃদয় যদি এসবের উপর গভীর মনোনিবেশ ও তাফাক্কুর করার পরও পুলকিত না হয়, আমরা যদি সাওমের মিষ্টতা অনুভব না করি, আফসোস! আমাদের দূর্ভাগ্য।

১৬. মানুষ যখন কাউকে ভালবাসে, তখন সে চায় তার সাথে একাকী সময় কাটাতে। রহমানের বান্দারাও তেমন। তারা আল্লাহর সাথে একাকী সময় কাটাতে ভালবাসে। আর একাকী সময় কাটানোর জন্য, কেবল আল্লাহর দিকেই মনোনিবেশ করার জন্য ইতেকাফের চেয়ে শ্রেষ্ঠ সুযোগ আর হতে পারে না। নবিজি সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত কক্ষনো ইতেকাফ ছাড়েন নি। আফসোস আজ মুসলিম হয়ে আমরা ইতেকাফ ছেড়ে দিই, ইতেকাফকে মাজলুম, হারিয়ে যাওয়া সুন্নাহয় পরিণত করেছি।

রামাদানের শেষ দশদিনকে নবিজি এতই গুরুত্ব দিয়েছেন যে তিনি তার স্ত্রীদের সময় দেওয়ারও সুযোগ পেতেন না। কেবল আল্লাহর সাথে, আল্লাহর মাঝে মশগুল থাকতেন। আমাদেরও তেমনই হওয়া চাই। সালাত, যিকির, তিলাওয়াত, প্রশংসা, সাদাকাসহ যত ধরণের ইবাদতের কথা আমাদের মনে পড়ে, আমাদের উচিত তত ধরণের ইবাদত নিয়েই আল্লাহর কাছে চলে আসা, নিজের সবটুকু উজাড় করে ঝাঁপিয়ে পড়া। আল্লাহকে ভালবেসে, আল্লাহর মাঝে, আল্লাহর সাথে সময় কাটানো। নিজেকে পাপমুক্ত করে আল্লাহর প্রিয় বান্দার তালিকাভুক্ত করার এখনই সময়।

১৭. লাইলাতুল কদর। আমাদের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান রাত। এই রাতের ইবাদত হাজার রাতের চেয়েও উত্তম। আমাদের জীবনের সবচেয়ে খুশির রাত হওয়া উচিত লাইলাতুল কদর। কেননা, এ রাতে আমাদের কাঁধ থেকে আমাদের গুনাহ সরিয়ে নেওয়া হয়। এ রাতে অল্প কয়েকঘন্টার আমল করে আমরা হাজার রাতের সমান সওয়াব পেয়ে যাই। একবার আলহামদুলিল্লাহ বললে আমরা হাজার রাতের সমান আলহামদুলিল্লাহ বলার সওয়াব পাই। একবার তাওবা করলে হাজার রাত একনাগাড়ে তাওবাহর সওয়াব পাই। ওয়াল্লাহি আমার জানা নেই আর কোন রাত এ রাত অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। এ রাত যে গাফলতে কাটিয়ে দেয়, আল্লাহর কসম, সে নিজের প্রতি নিজে জুলুম করে, নিজেকে নিজে ধোঁকায় রাখে।

১৮. রমাদানে আমাদের মাঝে ইযযাহ বৃদ্ধি করে। রমাদানে আমরা কামনা, বাসনা, নিচ, জঘন্য কাজ, পাপাচার থেকে মুক্ত থাকার মাধ্যমে সম্মান অর্জন করি। আমরা যখন সাদাকাহ করি, আল্লাহ আমাদের সম্মান বাড়িয়ে দেন। কেননা, নিচের হাত অপেক্ষা উপরের হাত উত্তম। নবিজি আমাদের মানুষের কাছে না চেয়ে আল্লাহর কাছে চাইতে বলেছেন। এই রামাদান ইযযাহের মাস।

আমরা মুসলিমরা বড় একটা সমস্যায় ভুগি। ইযযাহের অভাবে ভুগি আমরা। দেখা যায় আমরা কোনো মজলিশে থাকলে যদি সেখানে গীবত, পরচর্চার আড্ডা চলে তবে তা ভেঙে দেওয়ার সাহস করি না, সালাতের সময় হলে দাঁড়িয়ে যাই না। সামনের জন কী ভাববে তা নিয়ে চিন্তা করি। ইসলামের সব বিধান নিয়ে গর্ববোধ করি না, সম্মানিত বোধ করি না। পশ্চিমা নোংরা যুক্তির কবলে পড়ে দ্বীনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলি। একজন মুসলিমের চরিত্র কীভাবে এমন হতে পারে? আমরা কীভাবে আমাদের দ্বীন নিয়ে, ধর্মীয় বিধান নিয়ে সম্মানিত বোধ করি না? আমরা কীভাবে আমাদের শারীয়াহ নিয়ে গর্ববোধ না করে থাকতে পারি!

১৯. আমাদের জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ছোট্ট মাংসপিণ্ডের জিহ্বাই যথেষ্ট। গীবত, পরনিন্দা, কুৎসা রটানো, গালিগালাজ, মিথ্যাচার, ফন্দি আঁটাসহ যাবতীয় গুনাহ আমরা জিহ্বার মাধ্যমেই করি।

  • সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের কল্যাণে অনেকে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখির ব্যাপারে সতর্ক হই না। আমরা মনে করি যেহেতু জবানের মাধ্যমে আমরা কিছু বলছি না, তাই এটা হিফাযতের দরকারের নেই। বস্তুত এটা ভুল। গীবত গীবতই, মিথ্যাচার মিথ্যাচারই। যেখানেই হোক, যেভাবেই হোক।
  • নবিজি এই ব্যাপারে আমাদের মূলনীতি শিখিয়ে গেছেন। হয় আমরা চুপ থাকবো, নয় ভাল কথা বলবো।
  • মুখের কথাকে নিছক হারাম হালালের সাথে তুলনা করা যাবে না। অকল্যাণকর কথা থেকে বিরত তো থাকতেই হবে, বরং যেসব কথার মাঝে কল্যান নেই, অকল্যানও না, সেসব থেকেও দূরে থাকতে হবে। খায়েশ মেটাতে কিংবা বাচালতার দরুণ জিহ্বা চালিয়ে যেতে হবে না। যদিও চালাতে হয়, তবে যেন তা কল্যাণ বয়ে আনে।
  • যদিও সিয়ামরত অবস্থায় জবানের হেফাযত না করলে আমাদের সিয়াম ভেঙে যায় না, তবে অনবরত সওয়াব আসা থেমে যায়, পুরষ্কারপ্রাপ্তি থেমে যায়।
  • একমাত্র জিহ্বার সংযম না করার কারণে আমরা আমাদের ভাল আমলগুলো অন্যকে দিয়ে দিই। আমরা হয়তো হজ করি, উমরা করি, কিয়ামুল লাইল করি, কিন্তু অল্প একটু গীবত, মিথ্যাচার, সমালোচনা, গালি দেওয়ার কারণে আমরা আমাদের সব আমল অন্যকে বিলিয়ে দিই।
  • গীবত শ্রবণকারীও গুনাহের ভাগিদার। তাই কোথাও গীবতের পসরা বসলেই আমাদের অনতিবিলম্বে সেই মজলিশ ভেঙে দিতে হবে। যদি আমাদের সামনে কেউ পরনিন্দা করে, তবে যাকে নিয়ে করা হচ্ছে, তার সম্মান রক্ষার্থে আমরা প্রতিবাদ করে উঠি আল্লাহ আমাদের জাহান্নাম হতে হেফাযত করবেন ইনশাআল্লাহ।
  • দি আমরা কারো ব্যাপারে জবানের খিয়ানত করে ফেলি, তবে আমাদের কর্তব্য হলো প্রথমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, জবানের খেয়ানত সম্পর্কে সর্বোচ্চ সচেতন থাকা এবং যার ব্যাপারে খেয়ানত করা হয়েছে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া। যদি ক্ষমা চাইলে পরিস্থিতি বিগড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে আমাদের কর্তব্য হলো সে ব্যক্তির জন্য দোয়া করা, সাদাকা করা, তার ব্যাপারে ভাল কথা বলা।

২০. রমাদান আত্মশুদ্ধির মাস, তাকওয়া অর্জনের মাস। এই রামাদানে আমরা গুনাহ থেকে বিরত হওয়ার পর, আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিষ্পাপ হওয়ার পর যেন আমরা আবার গুনাহে না জড়াই।

  • রামাদানজুড়ে শয়তান থাকে শেকলে বাঁধা, বন্দী। তাই বন্দীত্ব থেকে ছোটার পরপরই সে আমাদের সামনে গুনাহের পসরা সাজাবে। রঙবেরঙের গুনাহ। আমরা যেন সেই পাতা ফাঁদে পা না দিই। আমরা যেন রামাদানে সিজনাল মুসলিম না হই।
  • রামাদান আমাদের ঈমানদার মুসলিম তৈরি হওয়ার সময়। আমরা যেন এই সময়কে চূড়ান্তভাবে কাজে লাগাই এবং রামাদান শেষে গুনাহে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিফাকে না পতিত হই।
  • শয়তান একমাত্র মুমিন ছাড়া বাকি সবার উপর প্রভাব বিস্তার করে। আমরা যেন শয়তানকে পরাজিত করি। মুমিন হয়ে যাই। মুমিনদের দলে ভিড়ি। অন্তত মুমিন হওয়ার পেছনে কসরত করতে থাকি, আঠার মত লেগে থাকি।
  • রামাদানের পর আমরা যেন প্রতিদিন অল্প কিছু আয়াত কুরআন পড়া, শেষরাতটুকু আল্লাহকে দেওয়া, সাদাকা করা, মাসের অন্তত দুই তিনটা দিন সিয়াম পালন করায় ব্যস্ত থাকি। অল্প থেকে শুরু করি। যাতে আল্লাহর পছন্দের বান্দা হতে পারি। আল্লাহ বান্দার নিয়মিত আমল পছন্দ করেন। আমরা যেন আমাদের আমলে নিয়মিত হই।
  • ইবাদত করলেই তা কবুল হবে এই ব্যাপারে গ্যারান্টি কার্ড আমাদের কাছে নেই। তাই আমাদের উচিত প্রতিদিন, অন্তত রামাদানের শেষ দশদিন আল্লাহর কাছে দোয়া করা, তিনি যেন আমাদের ইবাদত, আমাদের রামাদান কবুল করে নেন। আমাদের ইস্তিকামাতের ওপর রাখেন।
  • যাদের সাথে আমরা সম্পর্ক ছিন্ন করেছি, অবিলম্বে তাদের সাথে আপোস করা উচিৎ। রামাদান শেষ হওয়ার আগেই। দোষ যারই হোক, আপোসের ক্ষেত্রে নিজে এগিয়ে গিয়ে আল্লাহর পছন্দের বান্দা আমাদেরই হতে হবে। নুন্যতম সালামের বিনিময় করি।
    -অন্তর থেকে রাগ, ক্ষোভ, ঘেন্না ঝেড়ে ফেলি। সকলকে ক্ষমা করে দিই। সব ক্ষোভ মুছে ফেলি। আমাদের রবের সন্তুষ্টিই আমাদের জন্য উত্তম বিনিময় হবে।

রামাদান চলে যাবে। আমরা জানিনা আমরা আগামী রামাদান পাব কিনা। আমরা জানিনা আমরা এই রামাদান পুরা করতে পারব কিনা। আমরা যেন আল্লাহর নেককার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাই। আল্লাহ আমাদের উপর রাজিখুশি থাকুন। এবং আমাদের জান্নাতুল ফিরদাউসে মিলিত করুন। আমীন

নির্মল জীবন সব পর্ব একত্রে 

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: