সংকলন
দ্বীনি-মজলিস
আত্মশুদ্ধি

দ্বীনি মজলিস‌ এবং আমাদের করণীয় | মনিরুজ্জামান

মজলিস কি?

‘মজলিস’ বলতে অল্প বা বেশি সময়ের জন্য একাধিক ব্যক্তির একত্রে বসাকে বুঝানো হয়। মজলিস দুই প্রকার হতে পারে। প্রথমত, দুনিয়াবি প্রয়োজনে বন্ধু কিংবা সহপাঠী কিংবা সহকর্মীদের‌ সাথে একত্রে কিছু সময় অবস্থান করা। দ্বিতীয়ত, দ্বীনি আলোচনা কিংবা ওয়াজ-নসিহতের উদ্দেশ্যে কিছু সময় অবস্থান করা এবং আল্লাহর যিকর‌ তথা স্মরণ করা।

মজলিসে করণীয়

দ্বীনি মজলিস‌ সহ দুনিয়াবি‌ কোনো আলোচনার মজলিসে‌ও আল্লাহর যিকর‌ করা কর্তব্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ হাদিসে ইরশাদ করেন,”কিছু মানুষ যদি একটি বৈঠকে বসে এবং এরপর তারা বৈঠক ভেঙ্গে চলে যায়, কিন্তু উক্ত সময়ের মধ্যে তারা আল্লাহর যিকর না করে তাহলে কিয়ামতের দিন ঐ বৈঠক তাদের জন্য আফসোসের কারণ হবে।”(আত‌ তারগীভ:২/৩৮৫)। অন্য হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ বলেন,”যদি কিছু মানুষ এমন কোনো বৈঠক শেষ করে উঠে, যে বৈঠকে তারা আল্লাহর যিকর করেনি, তবে তারা যেন একটি গাধার মৃতদেহ (ভক্ষণ করে বা ঘাটাঘাটি করে) রেখে উঠে গেল। আর এই বৈঠক তাদের জন্য আফসোসের কারণ হবে।”(সুনানে‌ আবু দাউদ:৪৮৫৫)। সুতরাং, কয়েকজন বন্ধু একত্রিত হলেও‌ সেখানে নিজে নিজে কিছু আল্লাহর যিকর‌ করা কর্তব্য।

দ্বীনি মজলিশের ফজীলত

হাদিসে দ্বীনি মজলিস খুব গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে। এটা হতে পারে আপনার বন্ধুদের সাথে আলোচনা কিংবা কোনো নামাজের পর মসজিদে কিছু সময় দ্বীনি আলোচনা কিংবা প্রচলিত ওয়াজ মাহফিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ বলেন,”যখনই কিছু মানুষ বসে মহা মহিমান্বিত আল্লাহর স্মরণ করে, তখনই ফিরিশতাগণ তাদেরকে বেষ্টন করে নেন, রহমত তাদেরকে আবৃত করে, তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল হয় এবং আল্লাহ তাদের স্মরণ করেন তাঁর নিকট যারা আছেন তাদের মধ্যে।”(সহিহ মুসলিম:২৭০০)। অন্য হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ বলেন,”যখনই (কিছু মানুষ) একত্রিত হয়ে আল্লাহর স্মরণে রত হয়, এদ্বারা তাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া কিছুই চায় না, তখনই আসমান থেকে একজন আহ্বানকারী তাঁদেরকে ডেকে বলেন, তোমরা পরিপূর্ণ ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে উঠে যাও, তোমাদের পাপগুলিকে পুণ্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে।”(মুসনাদে আহমাদ:৩/১৪২)।
অন্য হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ ইরশাদ করেন,”মহান আল্লাহর কিছু পরিভ্রমণকারী ফিরিশতা আছেন যাঁরা যিকরের মাজলিস অনুসন্ধান করেন। তাঁরা আল্লাহর স্মরণের মজলিস সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে বলেন: হে প্রভু, আমরা আপনার এমন কিছু বান্দার নিকট থেকে এসেছি যারা আপনার নিয়ামতসমূহের মহত্ত্ব বর্ণনা করেছে, আপনার গ্রন্থ কুরআন তিলাওয়াত করেছে, আপনার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এর এর উপর সালাত পাঠ করেছে এবং তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য আপনার কাছে প্রার্থনা করেছে। আল্লাহ বলেন, তাঁদেরকে আমার রহমত দিয়ে আবৃত করে দাও।”(মাজমাউজ জাওয়ায়েদ‌:১০/৭৭)। অন্য হাদিসে এসেছে,”যিকরের মাজলিসসমূহের গনীমত বা লাভ হলো জান্নাত।”(মুসনাদে আহমাদ:২/১৭৭)।
দ্বীনি আলোচনা তথা আল্লাহর স্মরণের মজলিস সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ আরো বলেন,”যখন তোমরা জান্নাতের বাগানে গমন করবে তখন বিচরণ ও ভক্ষণ করবে। সাহাবীগণ প্রশ্ন করেন, জান্নাতের বাগান কি? তিনি বলেন, যিকরের মজলিস সমূহ।”(সুনানে‌ তিরমিযী:৩৫১০)।
দ্বীনি মজলিসে করণীয়
এই মজলিসে উপস্থিত মুমিনগণ সাতটি কর্ম করবেন, ১) সুবহানাল্লাহ বলা, ২) আল্লাহু আকবার বলা, ৩) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা, ৪) আলহামদুলিল্লাহ বলা, ৫) জান্নাত প্রার্থনা করা, ৬) জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা, ৭) ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা।(সহিহ মুসলিম:২৬৮৯)। এছাড়া, মসজিদেও যিকরের‌ মজলিস হতে পারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ বলেন,”যখন তোমরা জান্নাতের বাগানে গমন করবে তখন সেখানে মনভরে বিচরণ ও ভক্ষণ করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, জান্নাতের বাগান কী? তিনি বলেন, মসজিদগুলি। আমি বললাম, বিচরণ ও ভক্ষণ করা কী ? তিনি বলেন: সুবহানাল্লাহ, আল-হামদুলিল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার বলা।”(সুনানে তিরমিযী:৩৫০৯)।
দুইটি গুরুত্বপূর্ণ আমল
ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,”গণনা করে দেখা যেত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বৈঠক থেকে উঠে যাবার পূর্বে একশতবার নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়তেন।”
رَبِّ اغْفِرْ لِي، وَتُبْ عَلَيَّ، إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الغَفُورُ
(রব্বিগফির লী ওয়াতুব ‘আলাইয়্যা, ইন্নাকা আনতাত্ তাউওয়া-বুল গাফূর)।
“হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার ত‌ওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি ত‌ওবা কবুলকারী‌ এবং ক্ষমাশীল।”(সুনানে‌ তিরমিযী:৩৪৩৪)। এছাড়া, কোনো বৈঠকে‌ কিংবা মজলিস থেকে উঠে যাওয়ার সময় নিম্নোক্ত দোয়াটি‌ পড়লে সে মজলিসের‌ কাফফারা‌ আদায় হয়ে যায়:
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
(সুব্‌হা-নাকাল্লা-হুম্মা ওয়া বিহামদিকা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা আস্তাগফিরুকা ওয়া আতূবু ইলাইকা)।
“হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসা সহকারে আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করি। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আপনি ছাড়া হক্ব কোনো ইলাহ নেই। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার নিকট তওবা করি।”(সুনানে‌ তিরমিযী:৩৪৩৩, সুনানে‌ নাসাঈ‌:১৩৪৪)। সুতরাং, আমরা কোনো বন্ধুদের‌ সাথে যেকোনো স্থানে আলোচনার পর অথবা দুনিয়াবি‌ কোনো বৈঠকের‌ পর কিংবা দ্বীনি আলোচনার পর মজলিস‌ থেকে উঠে যাওয়ার সময় উপরোক্ত দোয়াটি‌ অবশ্যই পাঠ করবো।
দ্বীনি মজলিসের নমুনা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এবং সাহাবীদের‌ জীবনিতে এইরকম অসংখ্য দ্বীনি মজলিসের‌ নমুনা পাওয়া যায়। তাঁরা দ্বীনি মজলিসে‌ আল্লাহর যিকর‌ ছাড়াও বিভিন্ন ওয়াজ‌ নসীহত করতেন। ইরবায ইবনে সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,”একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এমন এক মর্মস্পর্শী ভাষণ শুনালেন, যার দ্বারা আমাদের অন্তরসমূহ ভয়ে কেঁপে উঠল এবং চক্ষুসমূহ অশ্রু বিগলিত করতে লাগল।”(সুনানে‌ তিরমিযী:২৬৭৬)।
হযরত উমর‌ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু একবার এশার‌ নামাজের পর কিছু লোককে দেখলেন, যারা একত্রে মসজিদে বসে দ্বীনি মজলিস কায়েম করেছে, যাদের মধ্যে উবাই‌ ইবনে‌ ক্বাব‌ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন। হযরত উমর‌ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু‌ তাদের সাথে বসে পড়লেন এবং আলোচনা, যিকর‌ শেষে দোয়া করলেন। তখন সমবেত মানুষদের মধ্যে তাঁর চেয়ে বেশি আর কেউ কাঁদল না। তিনি সবার চেয়ে বেশি ক্রন্দন করলেন এবং বেশি অশ্রুপাত করলেন। এরপর তিনি সবাইকে বললেন : মজলিসের শেষ। তখন সবাই যার যার পথে চলে গেলেন।(আত-তাবাকাতুল কুবরা:৩/২৯৪)।
আনাস ইবনু মালিক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু কোনো সাহাবীর সাথে সাক্ষাৎ হলে বলতেন,” আসুন কিছুক্ষণের জন্য আমরা আমাদের প্রভুর উপর ঈমান আনি (অর্থাৎ, তাঁর প্রতি ঈমান বৃদ্ধি করি)।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এই ঘটনা জানতে পারলে তিনি বললেন,”আল্লাহ আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহাকে রহমত করুন। সে তো ঐসব মজলিস পছন্দ করে যে মজলিস নিয়ে ফিরিশতাগণ গর্ব করেন।”(মুসনাদে আহমাদ:১/২৩০)।
শেষ কথা
সুতরাং, আমাদের‌ মজলিস গুলো আল্লাহর যিকির কেন্দ্রীক হ‌‌ওয়া উচিত। এছাড়া, বন্ধুদের সাথে কথা বলার সময় দ্বীনি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা উচিত। আর আল্লাহ তায়ালার নিম্নোক্ত বাণীটি‌ মনে রাখা উচিত:
تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَ التَّقۡوٰی ۪ وَ لَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثۡمِ وَ الۡعُدۡوَانِ
“তোমরা নেক‌ ও তাক‌ওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।”(সূরা মায়িদাহ‌:০২)।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে উপরোক্ত কথাগুলোর উপর আমল করার তৌফিক দান করুন আমিন।

Facebook Comments

Related posts

৯৯ কুফর ও এক ঈমান: ওলামায়ে দেওবন্দ কী বলে? | আব্দুল্লাহ বিন বশির

সংকলন টিম

কোরআনে বর্নিত দোয়াসমূহ | সংগৃহীত

সংকলন টিম

নির্মল জীবন-৭ | ইমরান রাইহান

সংকলন টিম

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!