নীড়ে ফেরার গল্প-৯ | আমাতুল্লাহ সালিহা (ছদ্মনাম)

নীড়ে-ফেরার-গল্প

“তোমাকে ঠিক কত দামী স্কার্ফ কিনে দিলে তুমি মাথা ঢেকে রাখবা? বলো,আমি কিনে দিবো,তবু মাথাটা ঢাকো!”

একরাশ অসন্তুষ্টি নিয়ে কথা গুলো বলেছিলেন আমার মামা।সেদিন ও আমি মামার সাথে বসে ছিলাম, আজো বসে আছি।

আজ মামা আমায় অনুরোধ করছেন,পর্দা ভেঙে এক্সাম দিতে!ইউনিভার্সিটিতে ফিরে যেতে!অনুরোধে কাজ না হওয়ায় মামা হার্ডলাইনে গেলেন!

আমি মুচকি হাসলাম।মামা আমায় শেষ কবে বকেছিলেন আমার মনে নেই।আমার ভেতরটা ভেঙে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।এসব আমার এখন সয়ে গেছে তবু কেন জানি চোখের জল বাধ মানে না!

Tijarah Shop

আমি সালিহা! আমাতুল্লাহ সালিহা! বাংলাদেশের স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা আমার।দামী সাব্জেক্ট!আর পাচ জন আধুনিকা এই দুনিয়াবী জীবনে যা চায় তার সব আমার ছিল।খ্যাতি,যশ,সুনাম,বাকপটুতা, অসংখ্য ফলোয়ার সহ ফেবু প্রোফাইল,ভালো রেজাল্ট, এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস,ভার্সিটির পরিচিতি,বন্ধু বান্ধব,আড্ডা,গান….. কি ছিল না আমার!

ঝিলের জলে শালুক ফুটলো,সোনালু গাছের সোনা ঝড়া সোনালু ফুরিয়ে এলো, জীবন জীবনের গতিতেই চলছে।

স্রষ্টার অস্তিত্ব কখনো অস্বীকার না করলেও আমি তখন নাস্তিকদের দলের নিয়মিত সদস্য।আমার মত আরো অনেকেই আছেন দলে।শরৎ বিভূতি গিলে খাই,সমান অধিকার চেয়ে গলা মেলাই!

উচ্ছ্বলতা,চঞ্চলতা কিছুতেই কমতি নেই!হুট করেই ছন্দ পতন!একেবারেই হুট করে।কিচ্ছু ভালো লাগছে না আমার।কিচ্ছু না!কিচ্ছু না!কিচ্ছু না!

কেন?

জানিনা আমি।সব ঠিক চলছে।এক্সামে ভালো মার্ক্স,বন্ধুদের আড্ডা,ঘুরতে যাওয়া,গান,অর্গানাইজেশনের কাজ করা সব ঠিকঠাক! এরমধ্যেই ভাল পদ পেলাম অর্গানাইজেশনে।কিন্তু আমার ভালো লাগছে না।মোটেও না।যেখানে যাই ঝিম মেরে বসে থাকি।কেন এমন করি জানিনা আমি।এভাবে তো চলতে পারে না।এটা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ!

তখন কে জানতো এই নাম না জানা ঝড় আমার রবের তরফ থেকে এসছে!কে জানতো এই ঝড় আমায় ভেঙে গড়তে এসেছে!কে জানতো এ ঝড় আমায় ফেরাতে এসেছে!যদি জানতাম তবে প্রতিটা নিঃশ্বাস গুনে রাখতাম!

যাহোক!অনেকদিন যাবত আমি বেশ হতাশায় দিন কাটাচ্ছিলাম।কোনো কারন খুজে পাচ্ছিলাম না,অথচ আমার কিচ্ছু ভাল্লাগছে না,ভীষণ মন খারাপ,সব কিছুতে বিরক্তি!

কেন এমন হচ্ছে তা অনেক ভাবলাম, ভাবতে ভাবতে বিরক্তি ধরে গেল!সব কিছুতে একঘেয়েমি তে ছেয়ে গেছে!

কোনো কারন ধরতে না পেরে আমি এর নাম দিলাম “চ্যালেঞ্জ বিহীন জীবনের বিতৃষ্ণা”..!

আমি ভাবতে লাগ্লাম হয়তো আমার জীবনে নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ নেই তাই এরকম লাগছে!

কারন বিহীন মন খারাপ আমার আগেও হয়েছে, তবে তা বেশিক্ষন স্থায়ী হতে পারেনি!কিন্তু এবারের মন খারাপ যেনে জেকে বসেছে! এর নাম আসলেই মন খারাপ কিনা আমি এ নিয়ে দোটানায় পড়ে গেলাম!সবসময় অস্থির লাগতে শুরু করলো,কেমন বিরক্তি সব কিছুতে!এর থেকে নিস্তার পেতে কিছু কাছের বন্ধুদের জানালাম ব্যাপারটা! তারা বলল কান্নাকাটি কর, মন হাল্কা হবে!কিন্তু আমার কান্নাও পেল না!আমি এরপরই আবিষ্কার করলাম আমার আবেগ হারিয়েছে!আমার কিছুতেই কোনো কিছুই অনুভূত হয়না!

কাছের কিছু বড় ভাইকে জানালাম,তারা অনেকেই বেশ সদোপদেশ দিলো,কিন্তু আমার মন কিংবা মস্তিষ্ক  তাদের কথা গুলোকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে নিলো না!গ্রহণযোগ্য হিসেবে নিল না একারনে বলছি কারন, তাদের কথা শুনেও আমার মন ভারমুক্ত হলো না!

ক্লাস,আড্ডা,রুম,ঘোরাঘুরি সবকিছুতেই আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়লাম,এর সাথে আরেকটা ঝামেলায় পড়ে গেলাম,সেটা হলো…সবাই আমাকে ডাক দিতে শুরু করলো,কেন আমি এভাবে নিরস মুখে বসে আছি!!!

তাদের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার বড্ড বিরক্ত লাগতো!বিরক্তি থেকে বাচতে আমি মিথ্যে বলতাম…!তাছাড়া আমার আর কি ই বা করার ছিলো…! যেখানে আমি নিজেই জানিনা আমার কেন মন খারাপ সেখানে আমি কি বলব তাদেরকে!আর নিজের খারাপ লাগার কথা বলে অন্যকে চিন্তায় রাখার ব্যাপারটা আমার কখনোই ভাল লাগে না!

এদিকে তাদের প্রশ্ন এড়াতে আমি সিধান্ত নিলাম এদের এড়িয়ে চলব…! বন্ধুদের এড়াতে গিয়ে আমি পড়লাম আরেক ঝামেলায়!আমাকে তখন সব আড্ডায় আসতেই হত এবং ক্লাসে হাসিমুখেই থাকতে হতো…!আমি অভিনয় করতে লাগ্লাম সবার সাথে! “আমি ধোকা দিচ্ছি সবাইকে “…এটা ভেবে নিজেকে আরো ছোট করে ফেললাম নিজের চোখে…!ফেবুতে কলেজের কিছু প্রিয় বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করলাম কেন এমন হচ্ছে,এখন আমার করনীয় কি সেটা জানতে…!তাদের কথায় অল্প সল্প যুক্তি পেলাম বটে,কিন্তু আমার মন ভরলো না!তারা অনেকেই যা বলল তার সারমর্ম এরূপ যে…” এ জগতে অভিনয় করেই চলতে হবে…! এটাই বাস্তব..! ” এ কথার সত্যমিথ্যা যাচাই করার অবস্থায় আমি ছিলাম না! তবে কথাটি আমার মানসিক অস্থিতিশীলতা ন্যানো-সেকেন্ডের জন্যে কমিয়ে দিয়েছিল…!!তবে এর সাথে সাথে আমার এটা মনে হয়েছিলো যে, অভিনয় করতে করতে আমি যদি আমার অস্তিত্ব কে ই হারিয়ে ফেলি…!

অস্তিত্ব সংকট কে আমি বরাবর ই ভয় পাই!যারা আমার কাছের লোক তারা অনেকে জানে আমার ভাবনার জগত খানিকটা প্রসারিত!ভুলভাল ভাবতে ভাবতে একসময় বের করে ফেললাম আমার সমস্যা…! তখন আমার আরো হতাশ হবার পালা!আমি আবিস্কার করলাম,আমি আমার নিজস্ব সত্তা থেকে অনেক দূরে সরে এসছি…! এই আমি, আমি নই…!আমার অস্তিত্ব সংকটাপন্ন…!আমি পরে গেলাম আরো ভয়াবহ অবস্থায়, এমন এক অবস্থা যে কাউকে বলতেও পারছিলাম না,আবার নিজে কি করব ঠিক করতেও পারছিলাম না!তবে আমার মাথায় কেবল একটা কথা ঘুরছিলো, “আমাকে ফিরতে হবে…!”

আমি ফিরব কিভাবে,পথ কোনটা,কে ফেরাবে..! জানিনা কিছুই!

অন্ধকারে হাতড়ানোর শক্তিও ছিল না আমার!ঠিক তখন ফেবুতে একটা পোস্ট পড়লাম এক সিনিয়রের। উনি ইসলামিক লেখালেখি করেন।একটা আয়াত কোড করেছেন লেখায়।মুল ভাব টা এরকম যে,আল্লাহ কিছু বান্দাদের অন্তর মোহর মেরে দেন,কেয়ামত অব্দি আর তাদের হেদায়েতের পথে ডাকেন না!এই একটা আয়াতই যথেষ্ট ছিল আমার অস্থিরতা আরো বাড়াতে!কিন্তু রবের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন!আমি জানিনা কেন আমি এটা করেছিলাম!সেদিন রাতে আমি অর্থ সহ সুরা ইয়াসীন শুনতে শুরু করলাম ইউটিউবে।

সূরা ইয়াসীনের ৭ম আয়াত পর্যন্ত শোনার পর আমার গলা শুকিয়ে এলো!সুবাহানাল্লাহ!! একি বলা হচ্ছে!আল্লাহ সত্যিই অন্তর সীলমোহর করে দেন!ইয়া মাবুদ!আমি তাদের মত নই তো!তারা দেখেও দেখে না,শুনেও শুনে না,কারন আল্লাহ তাদের মোহর করে দিয়েছেন!ও মাবুদ!আমি সেরকম নই তো!চোখের সামনে নানুকে মারা যেতে দেখেও কাদলাম না।মানুষের কষ্টেও আমার কান্না আসে না।এতো শক্ত অন্তর কি তবে সীলমোহর করে দেবার জন্যে!

আমি কাকে জিজ্ঞেস করব আমি এদের দলের কিনা যাদের আল্লাহ মোহর করে দিয়েছেন?

তখনো বুঝিনি আমাকে ফেরানোর আহবান ই ছিলো এটা…!আমি খুজে পেলাম আমার সমস্যা,এবার পালা সমাধানের…! আমি জানলাম সমাধানের পথ বেশ কণ্টকাকীর্ণ..!  তবু আমার উলটোরথে পা বাড়ানোর সুযোগ নেই,আমাকে যে ফিরতেই হবে…!আমি নেমে পড়লাম আমার আমাকে খুজতে! যে আমি এতকাল পথ হারিয়ে উদ্দেশ্যহীন হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে…!

নানান উপায় দেখিয়ে যার ফেরানোর, সে আমাকে ফেরালেন…!

ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরের একটা কোনে আমি সূক্ষ্ম একটা আলোক রশ্মি দেখলাম…!চারপাশের সবকিছু যেন আমাকে পথ দেখাতেই ব্যস্ত! চারপাশের সব দেখে আমার মনে হতে লাগলো যেন আমার জন্যেই নির্দেশনা নিয়ে বসে আছে তারা…!

অবশেষে আমিপথ খুজে পেলাম,যে পথে গেলে আমি আমাকে পাবো…!

আগস্টের উদ্ভট গরমের এক দিনে বন্ধুকে চেপে ধরলাম কালিমা পড়ব বলে…

“আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসুলুহু!”

পরের ক্লাস তিন টায়।যদ্দুর মনে পড়ে তখন বাজে ১২টা।আমি রুমে ফিরলাম।এক দুই তিন করে অবশেষে এলো সেই অবর্ণণীয় অউপমেয় মুহুর্ত! আমার রবের সাম্নে লুটিয়ে পড়ার সেই ক্ষণটি!আমার মুসলিম জীবনের প্রথম সালাত!

আমার মুসলিম জীবনের প্রথম সালাত।অনুভূতি গুলো কাউকে বুঝিয়ে বলা অসম্ভব! একে একে সবগুলো স্টেপ পালন করলাম—দুই হাত তুলে একত্রে বাঁধা, সূরা মিলিয়ে পড়া, শরীর ঝুঁকিয়ে রুকু করা এবং নির্দিষ্ট তাসবীহ পাঠ করা—সবই তো করলাম! এখন সিজদাহ করার সময়

আমার এতদিনের অহংকার, ঔদ্ধত্য আর মূর্খতা নিয়ে যেই মাথা উঁচু করে আমার রবকে অমান্য করে এসেছি, এবার সেই মাথাটাই নত করে আমার প্রভুর সামনে আত্মসমর্পণ করার পালা!

আমার মুসলিম জীবনের প্রথম সিজদাহ!

আলহামদুলিল্লাহ! আদায় করলাম যোহরের সালাত!প্রথম সালাত!এই আবেগ ভাষায় প্রকাশ করা যায়না।সালাত শেষে এবার দু হাত তুল্লাম রবের তরে!

“আল্লাহ গো!আমাকে তো জানেন আপনি!আমাকে মাফ করে দেয়া যায়না আল্লাহ?আমাকে কি তালা মেরে দিবেন আল্লাহ?আল্লাহ প্লিজ আমাকে সীল মোহর করে দিয়েন না প্লিজ!আমার অবাধ্যতা চরম পর্যায়ে,তবু আপ্নি আমাকে মাফ করে দিবেন না আল্লাহ?আমি আপ্নি ছাড়া আর কার কাছে যাব গো মাবুদ!ও আল্লাহ!….

বলতে বলতে চোখের পানিতে আমার নামাজের হিজাব ভিজে গেলো।গলা ব্যাথা হয়ে গেলো।এভাবে কতক্ষণ কেদেছি জানিনা।মোনাজাত শেষ করলাম!

সুবাহানাল্লাহ!! এক অপার্থিব প্রশান্তি আমি টের পেলাম!সুবাহানাল্লাহ!! সুবাহানাল্লাহ!

আমার তনুমন ছেয়ে গেলো এই খুশিতে যে আমাকে আল্লাহ সীলমোহর করে দেন নি!যদি দিতেন ই তবে কাদতে তো পারতাম না।এবার সময় একটু একটু করে পুরোটা ফেরার।রবের তরে পুরোপুরি সমর্পিত হওয়ার!

কথাটা বিশ্বাসযোগ্য কিনা আমি জানিনা।কিন্তু সত্য এটাই যে, ফরজ সুন্নাত নফল কিংবা দ্বীনের কোনো ব্যাপারেই ভালো জ্ঞান ছিল না।কাগজে কলমেই আমি মুসলিম ছিলাম।

রব্বুল আলামীন আমাকে কিভাবে কাছে টেনেছেন,কত নিখুত আর অভাবনীয় সেই ভালোবাসা তা আমি কিভাবে বোঝাবো!কোন কালিতে লিখবো সেই অসীম অনুগ্রহের উপাখ্যান!আমার যখনি যে বিষয়ে জানার দরকার হতো কিভাবে কিভাবে যেন সেসব আমি হাতের কাছেই পেয়ে যেতাম!আনমনে ফেবুতে ঢুকলাম হুট করে সেই রিলেটেড পোস্ট যেটা আমি খুজছিলাম!যেহেতু আমি ইসলামে নতুন সেহেতু কোনটা প্রয়োজন সেটা বুঝতাম না।আল্লাহ আমি জান্তাম না এমন অনেক বিষয় আসমানী সাহায্য দ্বারা আমাকে শিখিয়েছেন!একদিন পানি খেতে নিলাম।পানি মুখে নিতেই মনে হলো আচ্ছা!ইসলাম পানি খাওয়া নিয়ে কি বলে!সুবাহানাল্লাহী ওয়াবিহামদিহি!এমন সময় মেসেঞ্জারে একলোকের স্টোরিতে দেখলাম পানি খাওয়ার সুন্নাহ গুলো!অথচ আমি উচ্চারণ ও করিনি আমি কেবল মনে মনে ভেবেছিলাম!সুবাহানাল্লাহ!এই রবকে, এই রবের আদেশকে এতোকাল আমি উপেক্ষা করে এসছি!হায় রব্বা!আল্লাহুম্মাগফিরলি!!

এমনই আমার প্রত্যেকটা বিষয়!পর্দার ব্যাপারটা ও অনেকটা এরকম!

আমি জানতাম না পর্দার বিধান কি বা কেন!হঠাৎ ই একদিন হিজাব পড়তে শুরু করলাম।কেন?জানিনা।আমাকে দিয়ে যেন কেউ সুন্দর আর সাবলীল ভাবে কাজ গুলো করাচ্ছে!তখন আমাকে একজন একটা বই উপহার দিলেন!সুবাহানাল্লাহ আমি বই থেকে জেনে নিলাম কেন পর্দা করা জরুরি!

আলহামদুলিল্লাহ আমি হিজাব পড়লাম।নিকাব পড়তাম না তখনো।রব্বুল আলামীন তার দয়া আর অনুগ্রহ যে আমার উপর কতখানি মেলে দিয়েছিলেন তার অগনিত ঘটনার মধ্যে একটি হলো আমার পর্দা শুরু করা।একবারেই আমি পরিপূর্ণ পর্দা শুরু করিনি।আমায় যিনি এক ফোটা জল থেকে বানালেন তিনি তো লাতিফুল খবির ও!আমার স্বভাব তো তিনি জানেন।তাই ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে হয়তো রহমতের চাদরে আচ্ছাদিত করেছিলেন!আমি নিজেও নিজের চঞ্চল স্বভাবের ভয় করছিলাম।বারবার দুয়া করেছি পর্দা যাতে পরিপূর্ণ ভাবে করতে পারি আর এর উপর অবিচল থাকি!অজস্র দুয়ার মত এটাও রব কবুল করলেন আলহামদুলিল্লাহ।এরপর এলো সেই অউপমেয় ক্ষণটি!কালো জিলবাবে নিজেকে আড়াল করে নেয়ার সেই অপূর্ব সময় টি!অন্তর ঝুকে গেলো সিজদাহয়!ইয়া রব্ব!এই তো আমি তোমার বান্দি!আমাতুল্লাহ!এইতো আমি,এইতো আমার পরিচয়!

দ্বীনে ফেরার এই জার্নিটাতে আমি একটা জিনিস শিখেছি,সেটা হল “ভাল আর মন্দ কখনো একসাথে সহাবস্থান করতে পারে না,যতটুক মন্দ থাকবে ততটুক ভাল বেরিয়ে যাবে,ভাইসভার্সা।”

তাই ক্যাম্পাসে যেদিন প্রথম হিজাব পড়ে গেলাম সেদিন কিছু লোকেরা মুখ কালো করে আমার থেকে সরে গেলো।অথচ গতদিন ও সকাল সন্ধ্যা আমি তাদের সাথেই উঠাবসা করতাম।আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ আমায় সরিয়ে দিলেন তাদের থেকে!

আরেকদিন হিজাব পরে দাড়িয়ে কথা বলছি এমন সময় এক সিনিয়র আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছেন যেন আমাকে চিনতে পারছেন না!আমার মত মেয়ে হিজাব পড়তে পারে এটা যেন স্বপ্নাতীত!উনার চাহনি পড়তে পেরেছিলাম আমি।এতটূক রাগ হয়নি বরং নিজে নিজে আফসোসে পুড়ে মরেছি এটা ভেবে যে কতটা জঘন্য আমি যে কেউ আমার সামান্য হিজাব পড়াটাই মানতে পারছেনা।এই পর্দার কারনে ধীরে ধীরে কাছের সব বন্ধু বান্ধব সরে যেতে লাগলো।কাউকে আমি ছেড়ে এলাম।কেউ আমায় ছেড়ে গেলো।কাউকে রব সরিয়ে দিলেন!অন্তর জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছিলো।তবে একটা অপার্থিব প্রশান্তি আমার ছিল আলহামদুলিল্লাহ!

জীবন একপিঠে নয়,দুটো পিঠের গল্প গুলো ভিন্ন!ঈমানী পরীক্ষাগুলো এই গল্পের অন্য পিঠ!কিভাবে আসমানী সাহায্য আসে আর তা আমার মত নগন্য বান্দীর জন্যে!যে কিনা এটাই জানতো না যে হেদায়েত বলে কোনো ব্যাপার আছে!যে কিনা কোনোদিন রবের কাছে হেদায়েত চায় ও নি!সুবাহানাল্লাহ! এমন কোন শব্দমালা আছে যা দ্বারা আমি আমার রবের প্রশংসা করলে আমার অন্তর তৃপ্ত হবে! আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন!

কলেজে পড়ার সময়ে উত্তরায় একটা রোডের পাশ দিয়ে যেতাম, ওখানে ময়লার স্তুপ জমা করা হতো।এতো বিশ্রি গন্ধ ছিল যে পেট উল্টে আসতে চাইতো!বাসে যাবার সময় আমরা ওই জায়গাটা নাক চেপে পার হতাম!দ্বীনে ফেরার পরে আমার তখন মনে হতো,আমি ওই জায়গাটায় বসে আছি গায়ে নোংরা ময়লা মেখে!ময়লা মাখছি তো মাখছিই!হঠাৎই যেন কেউ এসে আমায় হাত বাড়িয়ে দিলো!বলল,”এসো,উঠে এসো!”

সমস্ত ময়লা পরিষ্কার করে সে যেন আমায় বুকে টেনে নিলো!ব্যাথায় কুকড়ে উঠলে মা যেমন সন্তানকে বুকে চেপে ধরে ঠিক সেভাবে!সুবাহানাল্লাহ! আমি কোত্থেকে শব্দ আনবো কোন ভাষায় বোঝাবো সেই অনুভূতি! ইয়া রব্ব! আমি অজ্ঞ!আমায় ক্ষমা করুন! কি অপূর্ব সেই ভালোবাসা,কি অপূর্ব সেই কাছে টানা!না আমি কোনো ইবাদতগুজার কেউ,না আমি কোনো সচ্চরিত্র কেউ!আমার পাপ জানলে লোকে আমার গায়ে থুতুও ফেলবে না।আর তুমি আমায় এভাবে আপন করলে মালিক!আমি কোন শব্দে তোমার প্রশংসা করব ইয়া রব্ব!

লোকে বলে আমি বাকপটু! দারুন প্রশংসা করতে পারি!অথচ দেখো তোমার প্রশংসা করতে গিয়ে ভাষা খুজে পাইনা।

সেসময় গুলো আমি কাটাতাম চুপ করে।গড়গড় করে জল গড়াতো চোখে!কিচ্ছু বলতে পারতাম না কান্নার তোপে!কাদতে কাদতে উপুড় হয়ে পড়ে ছিলাম কত!ইয়া রব্ব! ইয়া রব্ব!

একে একে মালিক আমার সব ঠিক করে দিলেন।এক এক করে ঈমানী পরীক্ষা গুলোও কঠিন হচ্ছিলো। কিন্তু রব আমাকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন।যেন অদৃশ্য একটা বলয় আমার চারপাশে।আমি অনুভব করতাম সেটা কিন্তু বাকিরা বুঝতো না।সবার সাথে থেকেও আমি আলাদা যেন।সবাইকে ধরে ধরে বলতে ইচ্ছে করতো,”যানো আমি মুসলিম!”মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করতো,”শোনো সবাই!আমি মুসলিম!আমি মুসলিম হয়েছি!”

আমাকে পর্দা নিয়ে সাপোর্ট করেছে,আল্লাহর জমীনে এমন একজন মানুষ ও ছিল না তখন।এমন কেউ নেই যে আমায় বাধা দেয়নি।ক্লাসে গেলাম। ম্যাম সিআর কে ডেকে বলে দিলেন এভাবে নিকাব করে ক্লাস করা যাবে না।আমি চুপ রইলাম।ফাইনাল এক্সামের দিন ঘনিয়ে আসছে।এদিকে অন্য কোর্সের প্রেজেন্টেশন! টিচার প্রত্যেকের টপিক দিয়ে দিচ্ছেন।আমিও নিলাম।কিন্তু মন সায় দিচ্ছেনা কোনোভাবেই।এতো গুলো ছেলের সামনে দাড়িয়ে এভাবে স্পিচ দিতে হবে!অথচ কিছুদিন আগেও ডিবেট মঞ্চ মাতিয়ে রাখতাম!সে যাক গে।আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলাম!কি করব ভাবছিলাম।প্রেজেন্টেশন দিব না ঠিক করলাম।অথচ প্রেজেন্টেশন নিয়ে কত প্ল্যান ছিল আমার!

আরেক কোর্সের মিড সামনে।এক্সামে গেলাম।নিকাব করে এক্সাম দিতে দিবে না!স্টুডেন্ট বেশি হওয়াতে দু রুমে এক্সাম হচ্ছে।কোর্স টিচার যে রুমে গার্ড দিবেন আমি সে রুমে গেলাম পারমিশন নিতে।আমার রুমের স্যার বলেছেন ম্যাম পারমিশন দিলে এক্সাম দিতে দিবে।ম্যাম হল ভর্তি স্টুডেন্টদের সামনে আমাকে যাচ্ছেতাই অপমান করে বলে দিলেন নিকাব খুলে এক্সাম দিতে হবে।আমার চোখে তখন পানি।একটু হলেই গড়িয়ে পড়বে।হাত পা কাপছে সমানে।এভাবে আমায় কেউ কোনোদিন ভরা মজলিসে অপমান করেনি!আমায় কেন এভাবে বল্লো?আমি আল্লাহর হুকুম মেনে নিকাব করলাম বলে!চোখের পানি টলমল করছে,ওদিকে এক্সামের টাইম পেরিয়ে যাচ্ছে,এদিকে আমি কাপতে কাপতে আমার এক্সাম হলের দিকে যাচ্ছি।এলোমেলো ভাবে পা ফেলছি!বুকের মধ্যে তখন দারুন ঝড়!মাথায় এলো কেবল একটা আয়াত!

“হাসবিয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়া আলাইহি তাওয়াক্কালতু ওয়া হুওয়া রব্বুল আরশীল আজীম!”

সুরা তাওবাহর শেষ আয়াত!অস্ফুট স্বরে মাজলুমের ঠোট কেপে বের হলো কেবল,”আল্লাহ!”

এক্সাম হলে গেলাম।স্থির করেছি বাড়াবাড়ি করব না।এক্সাম দিতে না দিলে চলে আসব।দিব না এক্সাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে স্যার আমায় নিকাব না খুলেই এক্সাম দিতে দিলেন!সুবাহানাল্লাহি ওয়াহামদিহি!

আমি তো আমার রব্ব কে ডেকে কখনো নিরাশ হইনি!তিনিই আমার রব তিনিই আমার সব!আল্লাহ যাকে সম্মান দেন, কার সাধ্য তাকে অসম্মান করার!আর আল্লাহ যাকে অসম্মান করেন কে পারবে তাকে সম্মান দিতে!

আমার রব আমায় সেদিন সম্মানীত করেছিলেন।এক্সাম শেষে বেরিয়ে শুনি বাকি যেসব মেয়েরা জাস্ট এম্নি হিজাব করতো,মুখ খোলা রাখতো,স্টাইল করে পড়তো তাদের সবার হিজাব খোলা লেগেছিলো।আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমার সম্মান সেদিন রক্ষা করেছিলেন এতো এতো বান্দার মধ্যে!আমি এক নগন্য বান্দি কেবল!

সেদিনের পর আমি সিদ্ধান্ত নিই ইউনিভার্সিটি ছাড়ার।পর্দার কোনো পরিবেশ ই নেই সেখানে।এভাবে চলতে থাকলে আমি ঈমান নিয়ে ঝুকিতে পড়ব!এভাবে নিকাব করে ফাইনাল এক্সামে বসতে দিবে না জানিয়ে দেয়া হলো।

সকাল থেকেই বৃষ্টি।ভেজা পথে হেটে আমি ফেলে এলাম আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়!আমার আবেগ।পেছনে ফেলে এলাম বন্ধু,আড্ডা,প্রিয় মানুষ সব সব সব!ক্যারিয়ারের সফলতার চুড়ান্তে আমি তখন!এমন ক্যারিয়ার অনেকেরই আরাধ্য!পেছন ফিরে একবার তাকালাম!

রবের তরে ফরিয়াদ ছিল যেন এই দুনিয়ার চমকপ্রদ ক্যারিয়ারটার বদলে আখিরাতের ক্যারিয়ারটা চমকপ্রদ করে দেন!

এই পাবলিক ইউনিভার্সিটি যেখানে অজস্র ছেলেমেয়েদের আরাধ্য ব্যাপার সেখানে আমার ইউনিভার্সিটি ছাড়ার ব্যাপারটা বেদ্বীন দুনিয়ামুখী লোকেদের কাছে কেমন লেগেছিলো সেটা একটু ছোট্ট কথায় বলি।

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ওয়েটিং রুমে বসে আছি।পেছন থেকে কে যেন হাতে খুচাচ্ছে।পিছন ফিরে দেখি হ্যা হ্যা করে হাসছে এক্টা ব্রেন আউট হওয়া পাগল ছেলে!একে একে আরো পাগল চোখে পড়লো!

বুঝতে পেরেছেন?ইউনিভার্সিটি ছেড়ে চলে আসায় আমার পরিবারের লোকেরা ভেবেছিলো আমি পাগল হয়ে গেছি!আমাকে পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলো!এই ঘটনায় আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম!ইয়া রব্ব! আমি করেছিটা কি!কিচ্ছু বলতে পারিনি তখন! ঝরঝর করে কেদে বুক ভাসিয়েছি আমার রবের কাছে।

কেউ ভেবেছে জ্বীনে ধরেছে,কেউ ভেবেছে প্রেমে পড়ে একাজ করেছে,বফ বলেছে তাই এরম করছি,কেউ ভেবেছে আমি নষ্টা তাই মুখ ঢাকতে এভাবে চলে এসছি।

লাস্ট লাইন টা আবার পড়ুন!হ্যা আমি মুসলিম পরিবারের ই সন্তান! এইযে এসব অপবাদ?এগুলো বাইরের কেউ না আমার আত্মীয় স্বজনরা দিয়েছে।লাস্ট লাইনটা আমি শুনে কেমন করেছি আমার কেমন লেগেছিলো সেকথা লেখার শক্তি আমার নাই।শুধু এটুক বলি,আমার আজো সেকথা মনে পড়ে বুকের দগদগে ঘা টা শুকায় না!

বাড়ি আসার পর মা আমার সাথে কথা বলেন না।আমার সাথে খান না।আমি চুপ করে বসে ভাবতাম,আমি আসলে কি করেছি!রবের হুকুম পালন ছাড়া!যেদিন ওরা আমার চরিত্র নিয়ে বাজে কথা বললো,মা সেদিন আমার কষ্ট টের পেয়েছিলেন।অন্ধকারে এসে হাতড়ে চোখের জল টা মুছে দিয়ে বললেন,”কেদো না মা!”

দাতে দাত চেপে আমি সব সয়েছি আর বলেছি,”ইয়া রব্ব! যদি তুমি আমার উপর রাগ না করো,তবে আমার কিছুতেই কিছু যায় আসেনা!”

লুকিয়ে লুকিয়ে তখন তাহাজ্জুদ পড়তাম।ট্যাপ ছাড়ার শব্দ পেয়ে যাবে কেউ,সকালে জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হবে ভেবে খুব সাবধানে ওজু করতাম।তবু টের পেয়ে যেত মাঝে মাঝে আর দিন হলে তিরস্কার জুটতো!

ওই যে বল্লাম,ভালো আর মন্দ একসাথে সহাবস্থান করতে পারেনা?ঠিক তেমনি আমি কুরআন পড়তে ভুলে গেছিলাম।খুব কষ্ট করে কুরআন পড়তাম!আমার কুরআন শিখতে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল!কারন আমি নাকি জঙ্গি!আবার পড়ুন!আমার কুরআন শিখতে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল! হ্যা আমি মুসলিম পরিবারের ই সন্তান! আজো আমার ইসলামী কোনো বই কিনতে গেলে বহুত হাঙ্গামা করতে হয়!এমনকি সীরাহ কিনতে গেলেও!

পরিবারের লোকেরা লুকিয়ে আমার ডায়েরি পড়ে ফেলতো।ভাবতো কোনো সন্ত্রাস দলের সাথে আমার গোপন আতাত আছে।যদি ডায়েরি থেকে কোনো সূত্র পাওয়া যায়!আমার ফোন নিয়ে গেলো।আমি ফোনের এপ্স থেকে মাসনুন দুয়া গুলো পড়তাম,সালাতের টাইম দেখতাম।ফোন নিয়ে যাওয়াতে ব্যাপক খারাপ লেগেছিলো।তখন কেবল ভেবেছি আল্লাহর সাহায্য আসতে ফোন লাগে না।আল্লাহ আমাকে ঠিকই পথ দেখাবেন!

যারা নওমুসলিম তারা ইসলামে ফিরলে তাদের লড়তে হয় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে। আর আমাদের লড়তে হয় নিজেদের লোকেদের সাথে,মুসলিম নামধারীদের সাথে। কতটা কঠিন এই পরীক্ষা যারা দিয়েছে এই পরীক্ষা তারা ছাড়া কেউ জানেনা!আল্লাহ কাউকে এর মুখোমুখি না করুন!

পরীক্ষা দিয়েছি অনেক, সহ্য করেছি অনেক কিছু,ছেড়ে এসেছি অনেক প্রিয় ব্যাক্তি,বস্তু!রবের নিকটবর্তী হতেই এই ত্যাগ!আর কিচ্ছুনা।তিনি কবুল করনেওয়ালা!আমার যা কিছু ভালো তা কেবলই আমার রবের।এটা কেবল বলার জন্যে বলা নয় সত্যি এটাই।যে আমি জান্তাম ই না হেদায়েত বলে একটা ব্যাপার আছে তাকে এভাবে আপন করে নিয়েছেন যিনি তিনি আমার রব!

বলতে গেলে ইসলামের কিছুই আমি জানতাম না।রব নিজের হাতে ধরে শিখিয়েছেন যেন আমায় সব!সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার টা হলো আমার আশেপাশে কোনো প্র‍্যাক্টিসিং মুসলিম ছিলনা।কারো থেকে সাহায্য আমি পাইনি।ইউনিভার্সিটিতে এক আপু ছিল,উনি হেল্প করতেন অল্প স্বল্প, কিছুদিন গড়াতেই মানা করে দিলেন। আপাত দৃষ্টিতে এটা নেগেটিভ মনে হলেও এটা আমার আসলে আমার রবের তরফ থেকে অমূল্য একটা নিয়ামত! তিনি আমায় নিজে শিখিয়েছেন!বুঝার সুবিধার্থে একটা ঘটনা উল্লেখ করছি…

ওজু সেরে বের হলাম।যোহরের সালাতের জন্যে।তখনো আজান হয়নি।আমি জানিনা কেন আমার সমস্ত পাপের কথা ভেবে আকাশ পাতাল তোলপাড় করা কান্না পেলো!কতখানি অনুতাপ আমায় বিদীর্ণ করে দিচ্ছিলো তা আমি কিভাবে বোঝাবো!যেন কেউ আমার ভেতর থেকে বলছিলো,”যাও দু রাকাত সালাত পড়!”

সুবাহানাল্লাহ!! আমি দু রাকাত সালাত পড়লাম!সুবাহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি!পুরোটা সালাত জুড়ে আমি কেদেই গিয়েছি!কেদে কেদে সালাত পড়েছি।কাপুনি হচ্ছিলো,গা কাটা দিচ্ছিলো!কত পাপ আমার!লোকে দুয়া করে বলে,”ইয়া রব্ব,অমুকের এতো পাপ,তবু তুমি তাকে মাফ করলে আমাকেও মাফ করে দাও!”

আমি ভেবে পাইনা কোন পাপীর উদাহরণ টানবো!আমার চেয়ে বেশি পাপ যে কারোই নেই!

সুবাহানাল্লাহ! এর অনেক পরে জেনেছি যে সালাতুত তাওবার ব্যাপারে!

এরকম আরো অসংখ্য অপূর্ব উপায়ে আমার রব আমাকে শেখালেন অনেক অনেক ব্যাপার যা আমি আগে জান্তাম না।কি অপূর্ব সেই প্রতিপালন!কি অপূর্ব সেই ভালোবাসা! সুবাহানাল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ!

আমার রব আমাকে কখনো নিরাশ করেন নি!আমার কোনো দুয়া রব কখখনো ফেরান নি আলহামদুলিল্লাহ!

ভার্সিটি থেকে ফিরে এসে আমি সমস্যার সমুদ্রে পড়েছিলাম।দ্বীনী পরিবেশ নাই কোথাও,দ্বীন মেনে চলতে অজস্র বাধা আসছে।কেউ রড দিয়ে পেটাবে বলছে তো কেউ গালি দিচ্ছে!কেউ কেউ আমায় কষ্ট দিতে টিভিতে হাই ভলিউম এ গান চালাতো!কান চেপে রাখতাম বালিশে।

তবে আমার একটা ধারনা ছিল যে আর যাই হোক না কেন আম্মা আমাকে সর্বদা সাপোর্ট করবে।কিন্তু আমার সেই ধারনাও ভুল হলো।আম্মা আমার সাথে কথা বলছেন না!এ আমি কিভাবে মেনে নিব!বুকে পাথর চাপা দিয়ে কাটছিলো দিন আমার।প্রতিটা ক্ষণে ক্ষণে কষ্ট এসে আমায় তোলপাড় করে দিতো!আমার আম্মা, আমার প্রিয় আম্মা!আমার কষ্ট দেখে আমার পিচ্চি কাজিন বলতো,”বুবু!পড়াশোনা ছাড়লে এতো কষ্ট পেতে হয়!আল্লাহ গো!”ও আমাকে অনেক খোজ দিতো!আমাকে কেউ কিছু বললে ও এসে আমাকে বলে দিতো।বাচ্চা মানুষ,আমায় বড্ড ভালোবাসতো কিনা!এতো সব কিছুতে আমি সর্বদা দুয়া করে গেছি যেন আল্লাহ আমার দ্বারা যেন কারো মনে কষ্ট না পায়।সবার কথা শুনেছি চুপ থেকেছি।আল্লাহ আমাকে চুপ রেখেছিলেন।চুপচাপ শুনে গেছি সব প্রতিবাদ করিনি।মায়ের বুক ফাটা কান্না দেখে একলা জায়নামাজে নিজে কেদে বুক ভাসিয়েছি তবু আল্লাহর অবাধ্য হইনি আলহামদুলিল্লাহ!কি করে হবো!আমি যে সবার উপরে আল্লাহকে প্রাধান্য দিয়ে ফেলেছি!আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ আমায় হেফাজত করেছিলেন।শুরুতে মেজাজ খারাপ হতো খুব।দাত কটমট করে চুপ থাক্তাম।এরপর কেউ কিছু বললে ভাবতাম,দুনিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক কি।থাক যে যা বলে বলুক।সবাইকে মাফ করে দিতাম যেন কেউ আমার জন্যে পুলসিরাত এ না আটকে যায়।কিছু লোককে আমি শুরুতেই মাফ করতে পারিনাই।আল্লাহ তাওফিক দিয়েছেন ধীরে ধীরে আমায় ক্ষমা করার তাওফীক দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ!

আমি প্রচন্ড বদরাগী,বদমেজাজি মেয়ে ছিলাম।আল্লাহ আমায় এক্ষেত্রেও রহমত আর অনুগ্রহের পরশে এক নিমিষে কেমন করে যেন একটা শান্তশিষ্ট আর ধৈর্যশীল মেয়ে বানিয়ে দিলেন!সুবাহানাল্লাহ!! এটা সম্পূর্ণই আমার রবের অনুগ্রহ এতে আমার কোনো ক্রেডিট নাই!একদম ই নাই!লোকে যা ইচ্ছে যা পারছে আমাকে বলে যাচ্ছে আর আমি চুপ করে বসে চোখের জল ফেলছি!সুবাহানাল্লাহ! এটা আমি কিভাবে পেরেছি জানিনা!আল্লাহর রহমত ছাড়া এটা অসম্ভব,কারন আমার কাছে লোকেরা জানতো আমি কতটা বদমেজাজি! আমার এই চুপ থাকাতে একটা বিপত্তি বেধেছিল বৈকি।লোকে ভাবলো আমাকে জ্বীনে পেয়েছি তা না হলে স্বভাব বিরুদ্ধ আচরন করছি কেন!হাসবো না কাদবো ভেবে পাইনি।সব মুখ বুঝে সয়েছি এমন না।মাঝে মাঝে মেজাজ খারাপ হয়ে যেতো।চিৎকার করতাম।আবার আল্লাহর কাছে মাফ চাইতাম।আম্মা আল্লাহর কাছে দুয়া করে বলতো,”আল্লাহ আমি বলেছি তুমি ওকে হেদায়েত করো কিন্তু এমন হেদায়েত তো চাইনি!”

প্রায়ই দারুন অসম্ভব সুন্দর স্বপ্ন দেখতাম।সুবাহানাল্লাহ একদিন দেখলাম নবী এসেছেন আমার ঘরে সুবাহানাল্লাহ!!!আমি কিভাবে বুঝাবো,কোন শব্দে লিখবো এই নিবিড় অনুগ্রহের উপাখ্যান!কিছু স্বপ্ন আমাকে সাবধান হতে সাহায্য করেছে।আমি মোটামুটি অনেক কিছুই আগাম টের পেতাম স্বপ্ন দেখে।সেভাবে সচেতন হতাম।সরাসরি কি হতে যাচ্ছে তা দেখতাম না,পজেটিভ নেগেটিভ বুঝতে পারতাম।আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আমায় অনেক যত্ন নিয়ে দ্বীনে ফিরিয়েছেন।ওয়াল্লাহী!পুরো ব্যাপারটায় আমার কোনো ক্রেডিট নাই।

আমার রব্ব ধীরে ধীরে চারপাশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে দিলেন আলহামদুলিল্লাহ!আম্মা একদিন এসে বল্লেন আমাকে হিফজখানায় ভর্তি করে দিবেন!সুবাহানাল্লাহ! আমি বলে বোঝাতে পারব না আমি সেদিন কতটা খুশি হয়েছিলাম।এ অনুভূতি বলে বোঝানোর মত না।আল্লাহ প্রথমে আম্মাকেই আমার প্রতি নমনীয় করে দিলেন।ধীরে ধীরে বাকিরা।আলহামদুলিল্লাহ আম্মাও দ্বীনের পথে পা রাখছেন আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ সহজ করুন।আগে যারা পর্দার বিরোধিতা করতো এখন তারা বাসায় গায়রে মাহরাম কেউ এলে আমাকে আড়ালে থাকার ব্যবস্থা করে দেন আলহামদুলিল্লাহ!আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ সব টা সহজ করে দিয়েছেন।আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ। লাখো কোটি সিজদাহ আমার রবের দুয়ারে!আমার রব আমাকে নিরাশ করেন নি।ব্যর্থ মনোরথ ও করেননি।আড়ালে ঝরে যাওয়া কান্নার নোনাজলের মূল্য আমার রব দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ!আসলে রব সব দুয়াই কবুল করেন।আমাদের কেবল চেয়ে যেতে হয়।আর কখনো সবর আর কখনো শোকর করে জীবনকে সুন্দর বানিয়ে নিতে হয়।জীবন জান্নাত না যে যা চাইবো তাই পাবো।দুনিয়ার জীবন কেবল একটা বিকেলের সময়।এটুক সময় সবর করে কাটিয়ে দেয়ার তাওফিক আল্লাহ আমাদের সবাইকে দিন!আমীন,ইয়া রব্বাল আলা’মীন!!

হেদায়েত চিরস্থায়ী বিষয় না। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম না।ঈমানের পারদ উঠানামা করে বারবার! বারবার পা পিছলাই রব আবার টেনে তুলেন!আবার পিছলাই আবার তোলেন।যিনি আমাকে পরীক্ষায় ফেলেন তিনিই আমায় সাহায্য করেন।আমার যা কিছু ভালো তা কেবল ই রবের অনুগ্রহ।রব আমায় কিভাবে কত ভালোবেসে ফেরালেন তার সামান্য একটু দৃশ্যপট তুলে ধরার চেষ্টা করেছি কেবল।রবের অনুগ্রহের লক্ষকোটি গল্প বাকি!কোনোদিন আল্লাহ তাওফিক দিলে সে গল্প হবে,দুনিয়ায় না হলে জান্নাতে কোনো একটা সুন্দর শান্ত ঝর্ণার পাশে বসে বাকি গল্প শেষ করার ইচ্ছে রাখি ইনশাআল্লাহ! আল্লাহ কবুল করুন!

রহমতের এই বারিধারায় রব আমায় সিক্ত রাখুন চিরকাল,সাথে কবুল করে নিন সকল মুমিন মুসলিম ভাইবোনকে।দুনিয়ার মোহে যারা রবকে ফেলে ভিন্ন পথে ছুটছে সে পথ গিয়ে শেষ হয়েছে জাহান্নামে।জাহান্নামের শাস্তি অনেক বেশি কিন্তু অনন্তকাল মালিককে না দেখে কাটিয়ে দেয়ার যন্ত্রণার চাইতে বেশিনা!জান্নাতে আমি আমার রবকে দেখতে পাব, জান্নাতে আমি আমার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখতে পাব এই আশায় দিনগুনি!আল্লাহকে বলব,”ইয়া মালিক! আমায় ভাষা শিখিয়ে দিন যে ভাষায় আমি আপনার প্রান ভরে প্রশংসা করতে পারব!যে ভাষায় আপনার প্রশংসা করে আমি শান্তি পাব,আমার অন্তত তৃপ্ত হবে!ইয়া রব্ব!”

যারা লেখাটা পড়বেন তারা দয়া করে আমার হেদায়েত এর অবিচলতার জন্যে করবেন,আল্লাহ যেন আমায় বদনজর থেকে হেফাজত করেন এবং হেদায়েতের উপর মৃত্যুবরণ করার তাওফীক দেন।লেখা থেকে সামান্য উপকৃত হলেও আমার জন্যে দুয়া করবেন প্লিজ!আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে কবুল করে নেন।

আমীন,ইয়া রব্বাল আলা’মীন

আল্লাহ আমাদের কবুল করুন,রব্বানা তাক্বব্বাল মিন্না, ইন্নাকা আন্তাস সামীউল আলীম।

পুনশ্চঃএই লেখায় যা কিছু ভালো তা কেবলই মহান রবের অনুগ্রহ আর যা কিছু খারাপ বা ভুল তার সবকিছুই আমার এবং শয়তানের পক্ষ থেকে। লেখা থেকে এক ফোটাও উপকৃত হলে আমার জন্যে দুয়া করবেন যেন রব আমায় আরশের নিচে ঠাই দেন,হিসাব টা সহজ করেন।

বিজলীর মত পুলসিরাত পাড় করিয়ে দেন!আমীন!ইয়া রব্বাল আলা’মীন!

Facebook Comments