প্রতিযোগিতা-২

নীড়ে ফেরার গল্প-১ | মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ 

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

একটা গল্প লিখতে চেয়েছিলাম।

নীড়ে ফেরার গল্প, রবের দিকে প্রত্যাবর্তনের গল্প, নিজেকে বদলানোর গল্প। কিন্তু প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই যখন মনে হয়, নিজেকে বদলানোটা আজও শেষ হলো না, আরো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি, তখন উপলব্ধি হয়, এ গল্প লেখার যােগ্যতা আমার নেই , টাইপিং করতে করতে আবার কেটে দিই। রিয়া (লোক দেখানো আমল) হয়ে যাওয়ার ভয়ে গল্পটা আর লেখা হয়ে উঠে না। কিন্তু একটা মূহুর্তে মনে হয় এই অধমের নীড়ে ফেরার গল্প সকলের জানা উচিৎ, তাদেরও বেলা ফুরাবার আগে মহান রবের দিকে প্রত্যাবর্তন করা উচিৎ। তাই সাতপাঁচ না ভেবে অপরিপক্ক হাতে আবার টাইপিং শুরু করি।

তিজারাহ শপ

তবে শুরু থেকেই গল্পটা শুরু করা যাক…

সময়টা সম্ভবত ২০১৯ সালের শেষের দিকে। প্রতিদিনের মতো ফেইসবুকে লগইন করে নিউজফিড স্ক্রল করছিলাম। স্ক্রল করতে করতে চোখের সামনে একটা ভিডিও এসে উপস্থিত। ভিডিওটা কোন গান কিংবা নাটক সিনেমার ক্লিপ নয়, এটা ছিলো একটা ইসলামিক লেকচারের ভিডিও। আগে-ভাগে বলে রাখা ভালো আমার কিন্তু এইসব ইসলামিক লেকচারের প্রতি তেমন আগ্রহ ছিলো না। আমি ছিলাম একজন মডারেট মুসলিম। ধর্মের যেই দিকটা আমার সুবিধার মনে হতো সেটা মেনে চলতাম আর যেটা দেখতাম  আমার জন্য সুবিধার না সেটা এড়িয়ে চলতাম। সালাতে নিয়মিত ছিলাম না। সপ্তাহে একবার জুম’আর সালাত আর মাঝে মধ্যে ঝোঁক উঠলে কিংবা পরিবারিক  চাপে  মসজিদে যেতাম। তাও মসজিদে বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারতাম না। একটা অস্থিরতা কাজ করতো। মসজিদে যেতাম সবার শেষে আর বেরিয়ে আসতাম সবার আগে। মাঝে মধ্যে আপন ধর্মের ব্যাপারে নিজের মধ্যে দু-টানা কাজ করতো। আসলেই কি আমি সঠিক ধর্মে আছি?

আসল সত্য ধর্ম কোনটি?

সব ধর্মই তো বলে তাদের প্রত্যেকের ধর্মই সত্য ধর্ম।

তাহলে আমি কিভাবে বুঝবো কোন ধর্ম সঠিক?একসাথে তো সব ধর্ম সত্য হতে পারে না।

তবে কি একটা জীবন ঠিক এভাবেই কেটে যাবে? অন্ধকারের করাল গ্রাসে, একটা জীবন কুরে কুরে হবে নিঃশেষ? জীবনের যে মহান উদ্দেশ্য, অনন্ত অবসরের জন্য যে মহা প্রস্তুতি নিতে আমাদের আগমন, জীবন কি সেই অধ্যায় থেকে বিচ্যুত হবে? এভাবে দু-টানার মধ্যে জীবনের মহা মূল্যবান সময়টা পার করতে লাগলাম। জীবনের কোন লক্ষ্যই স্থির করতে পারলাম না। করবই বা কিভাবে?

লোহাকে খোলা আকাশের নিচে অযত্নে- অবহেলায় ফেলে রাখলে তাতে তো মরিচা ধরবেই। মরিচা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত পরিচর্যা। তেমনি আমার মনের মধ্যেও ধর্মীয় পরিচর্যার অভাবে মরিচা ধরেছিল।

বলছিলাম একটা ইসলামিক লেকচারের কথা। ভিডিওটি ক্লিক দেওয়ার পরক্ষণেই লেকচারটি চালু হয়ে গেলো। কি এক সুমিষ্টভাষী মানুষ!

ফরসা চেহারা, মুখ ভর্তি দাড়ি, বাচনভঙ্গি কতই না চমৎকার!

মাঝে মধ্যে কুরআন থেকে কয়েকটা আয়াত তিলাওয়াত করে রেফারেন্স টানছেন, আবার সেগুলোর বাংলানুবাদ করে দিচ্ছেন, এতোটুকুতেই থেমে নেই, মাঝে মধ্যে কয়েকটা ইংরেজি বাক্যও জুড়ে দিচ্ছেন। এখনো মানুষটার নাম অজানা। মানুষটা সম্পর্কে জানার কৌতুহল রীতিমতো বেড়েই চলেছে। দেখলাম সাজেস্ট লিস্টে একই ব্যক্তির আরো অনেক ভিডিও শো করছে। ধারাবাহিকভাবে কয়েকটা ভিডিও দেখার পর জানতে পারলাম সেই মানুষটার নাম “মিজানুর রহমান আজাহারী”।

শুরু করে দিলাম মানুষটাকে নিয়ে গবেষণা। এভাবে ওনার কোন ভিডিও দেখলে সাথে সাথে শেয়ার করে টাইম লাইনে রেখে দিতাম। একদিন দেখলাম ওনি ওনার লেকচারে বলছেন প্রত্যেকটি যুবকের উচিৎ আরিফ আজাদের লিখিত “প্যারাডক্সিকাল সাজিদ” বইটি পড়া।

বই?

কি এমন আছে এই বই তে?

আমি তো প্রাতিষ্ঠানিক বই পড়তে হিমশিম খেয়ে যাই, এর বাইরে আবার অন্য বইও পড়তে হবে?

প্রশ্নই আসে না।

তবে ওনি যেহেতু বলেছেন বইটি পড়া উচিৎ, সেহেতু একবার হলেও অন্তত চোখ বুলিয়ে দেখা উচিৎ।

বইটি প্লে-স্টোরে উন্মুক্ত থাকায় প্লে-স্টোর থেকে নামিয়ে নিলাম। শুরু করে দিলাম পড়া।

আশ্চর্যের ব্যাপার লক্ষ্য করলাম বইটা যেন আমাকে কি এক অদৃশ্য মায়ায় টানছে, আমাকে ছাড়তেই চাইছে না। ইচ্ছা করছিলো পুরো বই এক বসাতেই পড়ে ফেলি।

কিন্তু আমি সময় নিলাম। কয়েকদিনের ব্যবধানে বইটি অধ্যয়ন শেষ করলাম। বইটি পড়ে আমার ভাবনার জগৎ উদয় হলো, এতদিনের যত দু-টানা,  যত সংশয় সব কেটে গেলো। আমি যেন নতুন একটা জগৎ সম্পর্কে জানতে পারলাম। আমি আমার আসল গন্তব্য খুঁজে পেলাম। আমার চোখে আঙ্গুল দিয়ে যেন সমস্ত সত্য দেখিয়ে দেওয়া হলো। আমার বিশ্বাসের ভিত্তি মজবুদ হয়ে গেলো। এতোদিন ধর্ম নিয়ে যে দু-টানায় ভোগছিলাম তা কেটে গেলো। তবে হে! তখনও প্র‍্যাক্টিসিং মুসলিম হয়ে উঠতে পারলাম না।

আবার ও সেই স্রোতের অনুকূলে গা ভাসিয়ে দিতে লাগলাম, দুনিয়ার চাকচিক্যের মায়ায় পড়ে আসল গন্তব্যের কথা ভুলে গেলাম। এভাবে ২০১৯ সালটা বিদায় নিলো।

২০২০ কে পুষ্পমাল্য দিয়ে বরণ করে নিলাম।

২০২০ এর শুরুর দিকে, তখন চলছে বই মেলার মৌসুম। একদিন একটা ফেসবুক গ্রুপে দেখলাম একটা বই নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। বইটির নাম “বেলা ফুরাবার আগে”। কারো মাঝেই দেখছি বইটির জন্য আগ্রহের কমতি নেই। একেকজন একেক রকম অভিমত প্রকাশ করছেন বইটি নিয়ে। আমার ও বইটির ব্যাপারে কৌতুহল জাগল।

আমি ও ভাবলাম বইটি সংগ্রহ করা দরকার।

দূর্ভাগ্যবশত বই মেলায় যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হলো না। তাই বাধ্য হয়ে অনলাইন অর্ডার করে বইটি নিয়ে আসলাম এর পাশাপাশি আরিফ আজাদের লিখিত এবং সম্পাদিত বাকি বইগুলো একসাথে অর্ডার করলাম, কারণ আরিফ আজাদের লিখিত প্রথম বই “প্যারাডক্সিকাল সাজিদ” পড়ে আমার ভাবনার দোয়ার খোলে গিয়েছিলো, আমাকে নীড়ে ফেরার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। অর্ডার করার পর অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগলাম। ২ দিনের মাথায় বই গুলো হাতে পেলাম।

এরপরের দিন থেকেই “বেলা ফুরাবার আগে” বইটি পড়া শুরু করে দিলাম। আস্তে আস্তে সময় নিয়ে বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগলাম। প্রতিটি অধ্যায় শেষ করার পর বুঝতে পারি কতটা ভুলের মধ্যে জীবনের এই মহামূল্যবান সময়টা পার করছি। নিজের মধ্যে অনুশোচনা কাজ করতে শুরু করল। বিশেষ করে যখন “আমরা তো স্রেফ বন্ধু কেবল” অধ্যায়টি পড়লাম, মাথার উপর যেন আকাশ ফেটে পড়লো।

বইটি শেষ করে নিজেকে পরিবর্তনের জন্য পাকাপোক্ত একটা সিগ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। জাস্ট ফ্রেন্ড, বেস্ট ফ্রেন্ড, হারাম রিলেশনশীপ, গেট টুগেদার, অহেতুক আড্ডা এইগুলা থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসলাম। আল্লাহর নাম নিয়ে ধীরে ধীরে মোবাইল থেকে অতীতের সবচেয়ে পছন্দের গানের এলবাম গুলো চোখ বন্ধ করে ডিলিট করতে লাগলাম, তার পরিবর্তে নাশিদ, কুরআনের বিভিন্ন সূরা, বিভিন্ন ইসলামিক লেকচার সংগ্রহ করতে লাগলাম। মোটামুটি প্র‍্যাক্টিসিং মুসলিম হয়ে উঠলাম।

নবীর সুন্নাত মতো জীবন পরিচালনা করার চেষ্টা শুরু করে দিলাম, শার্ট থেকে পাঞ্জাবিতে, টাকনুর উপর প্যান্ট, দাড়ি না কাটার সিগ্ধান্ত নিলাম।

হঠাৎ করে আমার এই ধরণের পরিবর্তন দেখে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ধরণের কথা বলতে শুরু করলো, বিশেষ করে আমার বন্ধুরা।

” কিরে! হুজুর হলি কবে?

দাড়ি কি রেখে দিবি?

এখন কি দাড়ি রাখার বয়স?

জঙ্গীর মতো লাগতেছে!

কেউ তুর ব্রেন ওয়াশ করে দিলো নাকি?

কোন গুপ্ত সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়েছিস নাকি?”

আরো কত কি!

আমি এসবের কিছুই তোয়াক্কা করতাম না।

হাসি মুখে সব এড়িয়ে যেতাম। বরংচ মনে মনে খুশি হতাম। মনে মনে ভাবতাম,

কবরে যাওয়ার পর আল্লাহকে বলবো, রাসুলের কয়েকটি সুন্নাহ সাথে করে নিয়ে এসেছি। এই উসিলায় আমাকে ক্ষমা করে দিন, ইয়া আল্লাহ।

মাঝে মাঝে নেটে বসে ক্লাসমেটদের ফ্যান্টাসিতে ভরা জীবনটা দেখি। বান্ধবীদের নিয়ে রসালাে স্ট্যাটাস, মুভি নিয়ে রিভিও। শুধু “চিল” করার জীবন। আল্লাহ চাইলেই আমাকেও সেখানে রাখতে পারতেন। এটা ভেবে নিজের হতাশ জীবনে এক চিলতে আলাে খুঁজতে চেষ্টা করি।

দিন যতই যাচ্ছে ততই দ্বীনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এভাবেই চলছে জীবন, আলহামদুলিল্লাহ্!

আল্লাহর শুকরিয়া, যিনি এই অধমকে নীড়ে ফেরার তৌফিক দিয়েছেন।

সবাই এই গুনাহ্গার বান্দার জন্য দোআ করবেন,

রবের কাছে একটাই চাওয়া, আখিরাতে তিনি যেন এই গুনাহ্গার বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। (আমিন)

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: