বিয়ে: কিছু ভুল শুধরে যাক | শাব্বীর আহমাদ

বিয়ে
বিয়ে আমাদের জীবনের একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । কিন্তু বিয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে বিভিন্ন প্রকার প্রথা ও রীতি প্রচলিত আছে যা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম এবং বিদ’আত। বিয়ের সময় গায়ে হলুদ, যৌতুক বা গান বাজনা করা ইত্যাদি হারাম তা আমরা সবাই জানি। এগুলো ছাড়াও আরো কিছু ভুলকাজ সমাজে প্রচলিত আছে। যেগুলো নিয়ে আমরা বেশ উদাসিন।  নিম্নে ক্ষেত্রবিশেষ এ রকম কিছু নিয়ে আলোচনা করা হল:
১. বিয়ের বয়স নির্ণয়ের ক্ষেত্রে
পুঁজিবাদী সমাজের বেঁধে দেয়া বিয়ের বয়সের কারণে “Late Marriage” (বিলম্বে বিবাহ) এর  প্রচলন দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।এর প্রধান কারণ হল পুঁজিবাদী সমাজ অর্থনীতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।যেকোন বিষয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবার সময় তারা মূলত সে বিষয়ের “অর্থনৈতিক  ” দিকের কথা চিন্তা করেই সিদ্ধান্ত দেয়। “শারীরিক ও মানসিক” দিক তারা বেশি গুরুত্ব দেয় না। বিয়ের ক্ষেত্রেও তারা “অর্থনৈতিক” দিককে বেশি গুরুত্ব দেয় যেখানে বেশি গুরুত্ব দেবার ছিল “শারীরিক ও মানসিক” দিকের ।

ফলে যাই হবার তাই হচ্ছে,মানুষ দেরি করে বিয়ে করে যৌন রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাচ্ছে। স্বামী/স্ত্রীর অক্ষমতার কারণে ডিভোর্স এর ঘটনা বেশি হচ্ছে। বিলম্বে বিয়ের কারণে নারী-পুরুষ উভয়ই তাদের বিবাহিত জীবনে নানা ধরনের ঝামেলার মুখোমুখি হয়।

পুরুষরা সাধারণত যেসব সমস্যায় পরে

বর্তমানে পুরুষরা নারীদের থেকে অনেক বেশি বিলম্বে বিয়ে করছে। কারণ একটাই সেটা হল “ক্যারিয়ার”। বেশিরভাগ পুরুষই এখন ৩০-৩৭+  বয়সে  বিয়ে করছে ,ফলে অনেকেই বিবাহিত জীবনে নানান ধরনের ঝামেলার মুখে পড়ছে। কখনো শারীরিক অক্ষমতায় লজ্জিত হতে হয়। কখনো বয়সের সাথে সাথে আবেগ অনুভূতি বিলুপ্ত হওয়ায় রসকষহীন একটা সংসার নিয়ে কোন রকমে দিনপার করে। এতে স্ত্রী সন্তান সবার কাছে বিরক্তির কারন হয়ে যান।

নারীরা সাধারণত যেসব সমস্যায় পরে

নারীরা দেরিতে বিয়ে করার ফলে যে সমস্যা সবচেয়ে বেশি ভুগেন তা হল ” Miscarriage বা (অসময়ে গর্ভপাত)”। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে,যাদের বয়স ২০-২৫ তাদের Miscarriage এর ঝুঁকি হল ১০  পার্সেন্ট।    আর যাদের বয়স ২৬-৩০ তাদের ২০ পার্সেন্ট। এখন অনেক মেয়েকে দেখা যায় পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় প্রভাবিত হয়ে ২৬-২৭ বছরে বিয়ে করে এবং কনসিভ (গর্ভধারণ) করতে করতে বয়স গিয়ে দাঁড়ায় ত্রিশের কোঠায়। এই কারণেই মানব সমাজের একটা বিরাট অংশ আজকে জেনেটিকালি দুর্বল হচ্ছে। মানে ফিজিক্যাল,বায়োলজিক্যাল দিক থেকে দুর্বল হচ্ছে। নারীদের মনে রাখা উচিত যে সুস্থ ও সবল মানব শিশু জন্মদানে তাদের ভূমিকাই বেশি।

আসলে দেরিতে বিয়ে করার শারীরিক অপকারিতার থেকে আত্মিক অপকারিতা বেশি। এই লেখা দিয়ে এটা বুঝানো উদ্দেশ্য হল, এই পুঁজিবাদী সমাজ একটা জাহেল সমাজ, এই সমাজ না বিজ্ঞান মানছে, না ইসলাম মানছে। যদিও বিজ্ঞান ইসলামের প্রতিটি বিধানের সাথে একমত। মুসলিমরা জীবনের কোন সিদ্ধান্ত নেবার সময় বিজ্ঞানকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেয় না। সিদ্ধান্ত নেয় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি সামনে রেখে। আর এই জন্যই বর্তমানে অনেক মুসলিম নিজেকে পবিত্র রাখার জন্য দ্রুত বিয়ে করতে চাইছে কিন্তু এই পুঁজিবাদী সমাজ তাতে বাধা দিচ্ছে। তাই আমাদের সবারই উচিৎ সঠিক সময়ে  বিয়ে করার আত্মিক ও শারীরিক উপকারিতা এই সমাজের কাছে তুলে ধরা। সমাজের কাছে তুলে ধরতে না পারলেও অন্তত পরিবারের কাছে তো খুলে বলা যায়ই।

সঠিক সময়ে বিয়ে করার উপকারিতা 

বিয়ে জীবনের একটা অংশ। ক্যারিয়ারও জীবনের একটা অংশ। বিয়ের ক্ষেত্রে শুধু ক্যারিয়ারের জন্য দেরি করা উচিত না। এমনকি উচ্চতর পড়াশোনার জন্যও দেরি করা উচিত না। আবার এটাও বলা হচ্ছে না , দশম শ্রেণিতেই বিয়ে করে ফেলেন। তবে প্রাপ্ত বয়স্ক হলে এবং যোগ্যতা থাকলে অবশ্যই বিয়ে করতে পারেন।

চিন্তা করে দেখেন বিয়ে করলে স্ত্রী আপনাকে পড়াশোনায় সাহায্য করবে। নোট তৈরিতে সাহায্য করবে। আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করবে। আগে শুধু মা দেখা-শোনা করতেন। এখন মা’র সঙ্গে স্ত্রীও করবে।

দ্রুত বিয়ে করে সন্তানও তাড়াতাড়ি নিবেন। অনেকে বলতে চান ‘আমি আরাম করতে চাই। একটু রিল্যাক্সে থাকতে চাই। তাই দেরিতে সন্তান নিবো।’ তাদের উদ্দেশে বলবো, আরে! আরাম করতে চাইলেই তো অতিদ্রুত সন্তান নিবেন। ২০/২৫ বয়সের মধ্যে বিয়ে করে দ্রুত সন্তানের বাবা হবেন। আর চল্লিশ বছর বয়সে আপনার ছেলের বয়স হবে আঠারো বা উনিশ। তখন আপনার ব্যবসা থাকলে তাকে বুঝিয়ে দিতে পারেন। ব্যবসা না থাকলেও উপার্জন করার মতো বয়স ছেলের তখন হয়ে যাবে। তারপর আপনি বাকী জীবন আরাম করেন। অতএব আমি বলবো, জীবন উপভোগ করতে চাইলে দ্রুত বিয়ে করুন।

অন্যদিকে দ্রুত বিয়ে করলে সমাজের ক্ষতিকর বিষয় থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। কারণ, তরুণ বয়সে নারী সংক্রান্ত বিপদে পড়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি।

রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলীম উম্মাহকে তাদের ছেলেমেয়েদের তারুণ্যেই  বিবাহ দেয়ার বা করার বিষয়ে উৎসাহিত করেছেন।

জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা.) এর সাথে একটি যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ (সা.) জাবেরকে জিজ্ঞেস করলেন যে তুমি কি বিবাহ করেছ? জাবের (রাঃ) বলেন যে আমি বললাম হ্যা। রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন তোমার স্ত্রী কি কুমারী না পূর্ব বিবাহিতা? জাবের(রাঃ) উত্তর দিলেন পূর্ব বিবাহিতা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন তুমি কেন একজন কুমারী তরুণী মেয়েকে বিয়ে করলে না। যার সাথে তুমি আনন্দ উপভোগ করতে এবং সেও তোমার সাথে আনন্দ উপভোগ করত। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২০৪৪)।

“কুমারী তরুণীদের সাথে যুবকদের বিয়ে হোক নবী করিম (সা.) সেটাই পছন্দ করতেন।”

আরেকটি হাদিসে দেখা যায় রাসূলুলল্লাহ (সা.) তার উম্মতের যুবকদেরকে পূর্বে বিবাহ হয়নি এমন সুন্দরী ধর্মপরায়ণা তরুণী স্ত্রী গ্রহণে উৎসাহ দিতেন। (যাদুল মাআদ,৩য় খণ্ড)।

তরুনদের বিবাহ করার প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করতে গিয়ে নবী করীম (সা.) বলেন যে, হে যুবকদল তোমাদের মধ্যে যে বিবাহ করার সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। আর যে বিবাহ করার সামর্থ্য রাখে না সে যেন রোজা রাখে । কেননা রোজা জৈবিক চাহিদা  দমন করে। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫২৯২। সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪০০, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৪৬৯২।)

আরেক হাদিসে ধমকের সাথে বলা হয়েছে,     যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগভাব পোষণ করবে (সঠিক সময়ে বিয়ে করবে না) সে আমার উম্মাত (দলভুক্ত) নয়। (সহীহ বুখারী হাদিস নং ৫০৬৩, সহীহ মুসলিম হাদিস নং ১৪০১।)

এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) যথাসময়ে বিবাহ করাকে অবশ্য পালনীয় সুন্নাত হিসাবে ঘোষণা করেছেন এবং সামর্থ্য থাকা স্বত্ত্বেও সুন্নাতটি পালন না করলে উম্মতে মুহাম্মদী হিসাবে গণ্য হবে না মর্মেও ঘোষণা করেছেন।”

বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে জটিলতা 

ইসলামী শরীয়তে যেহেতু বাল্যবিবাহ পরিহার করার ক্ষেত্রে কোন গোনাহ নেই। সে কারণে বাল্যবিবাহ পরিহার করাই বেশী যুক্তিযুক্ত। পৃথিবীর সবদেশের ছেলেমেয়েরা ছোট বেলায় একইভাবে বেড়ে উঠে না। পৃথিবীর অনেক দেশের ছেলেমেয়েরা নয়, দশ, এগার বা বার বছর বয়সের মধ্যে বিশাল এক শক্তিশালী দেহের অধিকারী হয়। যেমন পাকিস্তানের খাইবার পাখতুন প্রদেশ, আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশ সমূহের ছেলেমেয়েরা। কিন্তু বাংলাদেশ, ভারতের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। আমাদের বাংলাদেশের মেয়েরা ষোল থেকে আঠারো বছরের আগে এবং ছেলেরা আঠারো থেকে তেইশ বছরের আগে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বিবাহের জন্য শক্তিশালী দেহের অধিকারী হয় না। তাছাড়াও বিবাহের পর দাম্পত্য জীবন যাপন,সন্তান গ্রহণ এবং সন্তান প্রতিপালনের ন্যায় দায়িত্বপালনের জন্য মানসিক ক্ষমতার অধিকারী হয় না। স্বল্পসংখ্যক ছেলে মেয়ে বার, তের, চৌদ্দ বৎসরের মধ্যেই সুস্থ সবল দেহের অধিকারি হতে দেখা যায়। কিন্তু সে সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।

বাল্যবিবাহ ফরজ বা সুন্নাত এই মর্মে কোন ঘোষণা কুরআন মজীদ কিংবা হাদীসে রাসূলে বর্ণিত হয়নি । কোন সমাজ বা রাষ্ট্রের মুসলমানরা যদি কোন কারনবশত সম্পূর্ণরূপে বাল্যবিবাহ ( সর্বদিক বিবেচনায় বিয়ের অনুপযুক্তর বিবাহ) সম্পাদন থেকে বিরত থাকে তাতে গোনাহ হবে বা ইসলামী শরীয়া লংঘন হবে এমন কোন কথাও কোরআন হাদীসে বর্ণিত হয় নাই।
সুতরাং আবেগের অতিরঞ্জন থেকেও সতর্ক থাকতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪:১৭৩-১৭৫, ৪:১৯০-৯১, ৪:১৯৮, ৫:১০৭ এর আলোকে)

২.মতগ্রহণের ক্ষেত্রে

বিবাহের ক্ষেত্রে যেসব মধ্যপন্থার লংঘন ব্যাপক হয় মতগ্রহণের বিষয়টিও তার অন্যতম।  বাড়াবাড়ি দুদিক থেকেই হয়। খোদ অভিভাবকের দিক থেকেও এবং ছেলেমেয়ের দিক থেকেও। আমাদের সমাজে বিবাহের ক্ষেত্রে ছেলেরা স্বাধীনতা পেলেও মেয়েদের উপর জুলুম করা হয়।

অভিভাবকেরা যা করে

দাপুটে অভিভাবকেরা মেয়েদের মতামতকে গুরুত্বই দেয় না। তাদের কাছে নিজেদের ইচ্ছাই শেষ কথা।

ছেলেমেয়ের ইচ্ছা-অভিরুচিকে অবজ্ঞা-অগ্রাহ্য করে নিজেদের খেয়াল-খুশিমত বিবাহ মেনে নিতে তাদেরকে বাধ্য করে।

অথচ বিবাহটা তাদের ছেলের বা মেয়ের। একত্রে ঘর-সংসার তারাই করবে। বিবাহের ভালোমন্দ ফল তারাই ভোগ করবে।

কাজেই স্ত্রী বা স্বামী নির্বাচনের আসল হক তাদেরই। সে হক থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা নির্ঘাত জুলুম। অভিভাবকত্বের গুমরে সে জুলুম করার কোন অধিকার তাদের নেই। আর অনধিকার হস্তক্ষেপ তথা জুলুমের পরিণাম কখনওই শুভ হয় না। জুলুম হল জুলুমাত বা বহুমাত্রিক অন্ধকারের উৎস।

সেই অন্ধকার থেকে নানা অমঙ্গল জন্ম নেয়। প্রথমেই ছেলে মনে করে স্ত্রী হল তার উপর অভিভাবকদের পক্ষ থেকে এক চাপিয়ে দেওয়া বিপত্তি। কিংবা মেয়ে মনে করে তার অভিভাবক তাকে ধরে বেঁধে অজানা অন্ধকারে নিক্ষেপ করল।

এহেন ভাবনার সাথে স্বচ্ছন্দ দাম্পত্যের আশা দুরাশামাত্র। শুরু থেকেই তারা একে অন্যকে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। ফলে সব কিছুতে কেবল খুঁতই চোখে পড়ে। ভালোটাও যেন ঠিক ভালো মনে হয় না। এভাবে অন্তরে ঘৃণা ও বিদ্বেষ দানা বাঁধতে থাকে। অভিভাবকদের শত চেষ্টাতেও তা দূর করা সম্ভব হয় না।

অগত্যা দু’জনেই সারা জীবন অশান্তির আগুনে জ্বলতে থাকে, নয়ত মিছে শান্তির সন্ধানে মরীচিকার পেছনে ছোটে আর দ্বীন ও ঈমান সব বরবাদ করে। তা না হলে ছাড়াছাড়ির পথ ধরে নতুন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়। এই যে, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি তাদের জীবনে দেখা দিল দৃশ্যত এটা তাদের ইচ্ছা-অভিরুচিকে অগ্রাহ্য করারই কুফল।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-  “সাবালিকা মেয়ের নিজ বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অভিভাবক অপেক্ষা তার নিজেরই বেশি”। (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৪২১; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২০৯৮; জামে তিরমিযী, হাদীস : ২০৯৮)

অন্যত্র উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. থেকে বর্ণিত , একবার এক তরুণী তাঁর কাছে এসে বলল, আমার বাবা আমাকে তার ভাতিজার সাথে বিবাহ দিয়েছে-উদ্দেশ্য আমার দ্বারা তার হীনাবস্থা ঘুচানো-কিন্তু আমার তাতে সম্মতি ছিল না।

উম্মুল মুমিনীন বললেন, তুমি বসো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসুন। অতপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলে তিনি তাঁকে সে ঘটনা অবগত করলেন। তা শুনে তিনি মেয়েটির বাবাকে ডেকে পাঠালেন।

তারপর মেয়েটিকে নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার দিলেন। মেয়েটি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার বাবা যা করেছেন আমি তা অনুমোদন করলাম। আমার উদ্দেশ্য কেবল নারীদেরকে জানানো যে, এ বিষয়ের ক্ষমতা বাবাদের হাতে নয়। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস : ৫৩৯০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ১৮৭৪; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২৫০৮৭)

অপর এক হাদিসে খানসা বিনতে খিযাম আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণীত, তিনি বলেন, তিনি যখন প্রাপ্তবয়স্কা হন তখন তার পিতা তার অনুমতি ছাড়াই তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়, কিন্তু ঐ পাত্র তার পছন্দ ছিল না। এরপর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এরকাছে গেলে তিনি এই বিয়ে বাতিল করে দেন। (সহিহ বুখারী, বিবাহ অধ্যায়, হা.নং- ৪৭৬২) সুতরাং বোঝাগেল  বিবাহের বৈধতার জন্য সন্তানের স্বেচ্ছায় সম্মতি নেয়াটা আবশ্যক।

সন্তানেরা যা করে

অন্যদিকে বহু ছেলেমেয়েও তাদের বিয়েতে অভিভাবককে মূল্যায়ন করে না। তারা নিজেরাই নিজেদের বিবাহ সেরে ফেলে। সাম্প্রতিককালে এরকম বিবাহের হিড়িক পড়ে গেছে এটা সহশিক্ষা, পর্দাহীনতা ও অবাধ মেলামেশার কুফল।

নিজ পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারটা যেমন আছে, তেমনি অভিভাবকেরও মর্যাদা আছে। আছে সন্তানকে নিয়ে তার স্বপ্ন। তারপ্রতি শুভেচ্ছা ও  সর্বাপেক্ষা বেশি কল্যাণকামিতা।।

একথা অনস্বীকার্য যে, সন্তানের জন্য স্বামী বা স্ত্রী নির্বাচনে সন্তানের নিজের অপেক্ষা অভিভাবকের বাছাই বেশি সঠিক হয়ে থাকে। কেননা বিয়েটা সন্তানের একান্ত নিজের হলেও সাধারণত তার দৃষ্টি যেহেতু থাকে নেশাচ্ছন্ন এবং কেবল নিজ জীবনের পরিমন্ডলে আর তাও দিক-বিশেষের মধ্যে সীমিত। তাই উপযুক্ত বাছাই তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। তা সম্ভব হয় অভিভাবকের পক্ষেই।

সন্তানের প্রতি অসিমিত কল্যাণকামিতার সাথে তার যেহেতু থাকে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বয়সজনিত বিচক্ষণতা, জানা থাকে সন্তানের স্বভাব-চরিত্র ও রুচি-অভিরুচি, সেই সাথে দৃষ্টিতে থাকে প্রসারতা-সন্তানের, নিজের ও পরিবার-খান্দানের পরিমন্ডল ছাড়িয়েও আঞ্চলিক ও কালিক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে তা ব্যাপ্ত থাকে তাই তার নির্বাচনও তুলনামূলক বেশি নিখুঁত ও সুষ্ঠু হয়ে থাকে। সুতরাং সন্তানেরই কল্যাণার্থে তার বিবাহের দায়িত্বও ইসলাম অভিভাবকের উপর ন্যস্ত করেছে।

অভিভাবকের প্রতি অর্পিত দায়িত্বকে যদি সন্তান নিজের হাতে নিয়ে নেয় এবং নিজেই নিজের বিবাহ সম্পন্ন করে ফেলে, তবে সে গুরুত্বকে খাটো করা হয় এবং তাতে অভিভাবকের শরীয়ত-প্রদত্ত মর্যাদা খর্ব করা হয়।  তাই তো অভিভাবকবিহীন বিবাহ যেন সত্যিকারের শরীয়তী বিবাহই নয়।

এ ব্যপারে হাদীস সতর্ক করছে, অভিভাবক ছাড়া কোন বিবাহ নেই। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২০৮৫; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১১০১)

একই সতর্কবাণী আরেক হাদীসে উচ্চারিত হয়েছে, যে কোনো নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করে, তার বিবাহ বাতিল বাতিল বাতিল। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২০৮৩; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১১০২)

অর্থাৎ ইসলাম যে বিবাহের ব্যবস্থা দিয়েছে তাতে অভিভাবকেরও একটা ভূমিকা আছে। সে ভূমিকাকে অগ্রাহ্য করে যে বিবাহ হবে তা বৈধতার বিচারে উত্তীর্ণ হলেও একটা অনুষঙ্গ বাদ পড়ায় ত্রুটিযুক্ত বিবাহ হবে এবং অভিভাবকের জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতের সংশ্লিষ্টতা না থাকার ফলে তা বহুবিধ কল্যাণ ও বরকত থেকে বঞ্চিত থাকবে। যে কোনও কাজে বড়দের সংশ্লিষ্টতা বরকতপূর্ণ হয়ে থাকে।

 হাদীসে আছে, বরকত তোমাদের বড়দেরই সাথে। (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস : ২১০; মুজামে আওসাত, তবারানী, হাদীস : ৮৯৯১; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস : ১১০০৪)

৩. মোহর নির্ণয় ও আদায়ের ক্ষেত্রে

দেনমোহরের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে রয়েছে চরম অজ্ঞতা কিংবা সজ্ঞান উদাসীনতা। নিয়মিত নামাজ-রোজা আদায় করেন এমন অনেক মানুষও দেনমোহরের বিষয়ে সচেতন নন। এ বিষয়ে উদাসীনতা এতো প্রকট যে, তারা নফল নামাজ পড়াকে যতোটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, স্ত্রীর মোহর আদায়কে তার সিকিভাগও গুরুত্ব দেন না।

তাই বরের এক লাখ টাকা দেনমোহর পরিশোধের ক্ষমতা আছে জানা সত্ত্বেও কাবিননামায় কনে পক্ষের সামাজিক মর্যাদা রক্ষার অজুহাতে জোরপূর্বক লেখানো হয় আরও বেশি।

কনেপক্ষ ভাবে, মোহরানার অর্থ বেশি হলে বর কখনও কনেকে তালাক দিতে পারবে না। আর ছেলের পক্ষ ভাবে, যতো খুশি মোহরানা লিখুক। ওটা তো আর পরিশোধ করতে হবে না। এমন মনোভাব কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বিয়ের মোহরানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সামাজিক সম্মান বিবেচনা করে অসম্ভব বা অসাধ্য পরিমাণ মোহরানায় রাজি হওয়া বা বরপক্ষকে চাপ দিয়ে রাজি করানো শরীয়ত সম্মত কাজ নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সাধ্যমত নগদ মোহরানা দিয়ে বিয়ে করেছেন এবং সাহাবীদেরও সাধ্যমতো মোহরানা দিয়ে বিয়ে পড়িয়েছেন।

শুধু লোক দেখানোর জন্য কোটি টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করা, এরপর প্রথম রাতেই বৌয়ের পা ধরে ৯৯ লক্ষ ৯৯ হাজার টাকা মাফ করিয়ে নেয়া, এগুলো মানবতা বিবর্জিত ঘৃণিত কাজ। অতএব শুধু অঙ্কের দিকে না তাকিয়ে সামর্থ্যের দিকেই তাকানো উচিৎ।

কেননা মহর একটি ঋণ । অন্যান্য ঋণের ন্যায় মহরও পরিশােধ করা অবশ্য কর্তব্য । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ ঋণ থেকে মুক্ত হওয়া প্রত্যেক বিবেকবান পুরুষের কর্তব্য । মহর নির্ধারণ করার সময় তা আদায় করার কথা চিন্তা করা হয় না । অথচ মহর আদায় না করা অপরাধ ।

এ ব্যপারে মহান আল্লাহ তাআ’লা বলেন;

“তোমরা স্ত্রীদের মহর আদায় করো, যা তোমাদের অবশ্য কর্তব্য।'(সূরা নিসা: আ.২৪)

এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মহর নির্ধারণ করে , অথচ তা আদায় করার ইচ্ছা পােষণ করে না, সে ব্যভিচারী। আরেক হাদিসে আরও আছে, কেয়ামতের দিন সে ব্যক্তি ব্যভিচারী হিসাবে আল্লাহর দরবারে উঠবে। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হা.নং ৭৫০৫-৭৫০৬)

অনেক স্বামী আবার মনে করেন, স্ত্রীর ভরণ-পোষণসহ যাবতীয় ব্যয়ভার তো তিনিই বহন করছেন। অতএব এর মধ্যে আবার আলাদা করে তাকে মোহর পরিশোধ করতে হবে কেন? আসলে এমন না। মোহরের সঙ্গে ভরণপোষণের কোনো সম্পর্ক নেই। দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা অধিকার, দু’টোই স্বামীকে বহন করতে হবে।(আলমগীরী: ১:৩২২)

৪.  সুষ্ঠু রেজিষ্ট্রেশনের ক্ষেত্রে

বিয়ে সংক্রান্ত গুরত্বপূর্ণ তথ্যাদি সরকারী রেজিষ্ট্রারে লিপিবদ্ধ করাই হচ্ছে বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন বা কাবিননামা। মুসলিম বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। মুসলিম বিয়ে ও তালাক (রেজিষ্ট্রেশন) আইন ১৯৭৪ মতে বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন ব্যপারে বেশ কিছু বিষয় খেয়াল রাখা হয়না, যথা-

১. কাবিন নামায় বয়সের সঠিক তথ্য দেয়ার প্রতি সতর্ক না হওয়া।

২. কাবিননামার আসলত্ব যাচাই না করা।

৩. আসল মোহরের পরিমান গোপন করে কাবিনে মোহরের পরিমান বাড়িয়ে উল্লেখ করা। অথবা কনে পক্ষের অগোচরে উসুলে পূর্ণ পরিশোধ লিখিয়ে নেয়া। ইত্যাদি।

 সুষ্ঠু  রেজিষ্টেশন গুরত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ

১. কখনো কেউ এর সত্যতা অস্বীকার করতে পারে না,

২. এ দলিলের মাধ্যমে স্ত্রী বা স্বামী একে অন্যের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারে।

৩. ভরণ-পোষণ আদায়ের জন্য এটি একটি প্রমাণপত্র।

৪. আদালতে দেনমোহর আদায়ের জন্য রেজিষ্টিকৃত পরিমানই ধর্তব্য হয়।

৫. সঠিক তথ্য লিপিবদ্ধ থাকায় স্বামী -স্ত্রী দু’জনের মধ্যে একজন মারা গেলে মৃতের সম্পতিতে নিজের অংশের ভাগ পেতে পারে।

অন্যদিকে, বিবাহ রেজিস্ট্রেশন সুষ্ঠু  না হলে স্বামী বা স্ত্রীর আইনগত বৈধতা প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য, অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণই করা যায় না। রেজিস্ট্রেশন সুষ্ঠু না হওয়ার ফলে স্বামী অথবা স্ত্রী উভয়ই আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত বা প্রতারিত হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। আবার, রেজিস্ট্রেশন সুষ্ঠু না করা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধও বটে। মোদ্দাকথা কথা, বিবাহ রেজিস্ট্রেশন একদিকে যেমন বাধ্যতামূলক অন্যদিকে এটি একটি সামাজিক এবং পারিবারিক উপকারী প্রামাণ্য দলিল।

এছাড়াও আরও কিছু বিষয় এমন আছে যেগুলো বিয়ের পরে প্রকটভাবে দেখা যায়।

যেমন:

১-বৌ-শাশুড়ীর বনিবনা না হওয়া। 

২- স্ত্রীকে অধিক মহব্বত করার কারনে উগ্র সমাজ কর্তৃক স্বামীকে কটাক্ষ করে নানান কথা বলে স্ত্রীর প্রতি উস্কে দেয়া। 

৩- নারী স্বাধীনতার নামে স্ত্রীকে স্বামীর অবাধ্য বানানোর চেষ্টা করা। 

৪-কখনো অতিলোভি বাবা মা তার সন্তানকে শশুরবাড়ির সম্পদ শোষণে বাধ্যকরা,ইত্যাদি।   

মনে রাখতে হবে। বিবাহ একটি সামাজিক নিরাপত্তা ও আল্লাহ প্রদত্ত জান্নাতি শান্তির খণ্ডাংশ। মানুষরূপী শয়তানের কারনে যেন কোন ভাবেই এর  প্রকৃত উদ্দেশ্য নষ্ট না হয়।  আল্লাহ তৌফিক দিন। (আমিন)

Facebook Comments