নির্মল জীবন-১১ | ইমরান রাইহান

মুশতাক মুহাম্মদ আরমান খান নামে এক ব্যক্তি নিজেকে মাহদি দাবী করেছেন। মাহদি সংক্রান্ত হাদিসগুলোকে উদ্ভট গানিতিক ব্যখ্যার মাধ্যমে তিনি নিজের দাবী প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তার দাবী অনুসারে ইতিমধ্যে তিনশোর বেশি লোক তার হাতে বাইয়াত দিয়েছে।
মাহদি দাবিদারদের এই সিলসিলা নতুন নয়। হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দী থেকেই একের পর এক মাহদি দাবিদারের আবির্ভাব ঘটেছে। ১১৬ হিজরীতে খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালিকের শাসনামলে আল হারিস বিন সুরাইজ নামে এক ব্যক্তি নিজেকে মাহদি দাবী করে এবং খোরাসানের আমিরের বিরুদ্ধে লড়াই করে।(১)
মাহদি সংক্রান্ত একটি হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তার নাম আমার নামের সাথে এবং তার পিতার নাম আমার পিতার নামের সাথে মিলে যাবে।(২)
এই হাদিসের প্রতি লক্ষ্য রেখে অনেকে নিজের সন্তানের নাম মাহদি রেখেছিলেন। এমনই একজন আব্বাসি খলিফা আবু জাফর মানসুর। তার মূল নাম ছিল আবদুল্লাহ। তিনি ভেবে দেখলেন তার নাম মাহদির পিতার নামের সাথে মিলে যাচ্ছে তাই তিনি নিজের সন্তানকে উপাধি দেন মাহদি। এ সম্পর্কে ইবনু কাসির লিখেছেন, তাকে আল-মাহদি উপাধি দেয়া হয়েছিল এ আশায় যে তিনিই হবেন হাদিসে উল্লেখিত মাহদি, কিন্তু বাস্তবে তা আর হয়নি।(৩)
সুদান ও মরক্কোতে অনেকেই নানা সময় নিজেকে মাহদি দাবী করেছিলেন। মরক্কোর বিখ্যাত আলেম ইবনু তুমার্তও নিজেকে মাহদি দাবী করেছিলেন। (৪) ভারতবর্ষেও এক সময় মাহদি আন্দোলনের নামে অনেক মাহদি দাবিদারদেও আবির্ভাব হয়েছে। কথিত এই ‘মাহদি আন্দোলনের’ সূচনা ঘটে মীর সাইয়েদ মুহাম্মদ জৌনপুরীর হাত ধরে। ৯০১ হিজরিতে হজ্বের সফরে তিনি নিজেকে মাহদি দাবী করেন। তার অনেক ভক্ত অনুসারী জুটে যায়। ৯১০ হিজরী তথা ১৫০৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান। (৫)
বাঙ্গালী মুসলমানদের মধ্যেও মাহদি দাবিদারের আবির্ভাব হয়েছিল। শেখ আলায়ি নামে একজন বাঙ্গালী মুসলমান নিজেকে মাহদি দাবী করেছিলেন। ১৫৫০ সালে ইসলাম শাহর আদেশে তাকে হত্যা করা হয়।(৬)
মাহদি দাবিদারদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা ছিলেন পন্ডিত ব্যক্তি ও সুবক্তা। ইবনু তুমার্ত সম্পর্কে ইবনু খালদুন উচ্ছ্বসিত স্বরে লিখেছেন, ইলমের টগবগে সমুদ্র ও প্রদীপ্ত তারকা হয়ে তিনি মাগরেবে ফিরে আসেন। (৭) সৈয়দ মুহাম্মদ কিংবা শেখ আলাই তারাও ছিলেন পন্ডিত ও সুবক্তা। ফলে তারা দ্রুতই প্রচুর অনুসারী জুটিয়ে ফেলতে পেরেছিলেন।
মুশতাক মুহাম্মদ আরমান খান এদিক থেকে অনেক পিছিয়ে। সংখ্যাতত্ত্বের কিছু জটিল ও চটকদার থিউরি ছাড়া তার জ্ঞানরাজ্য শূন্য আবার তিনি সুবক্তা নন। অসম্ভব পরিমান ধৈর্য্য শক্তির অধিকারী না হলে তার একটি আলোচনাও শুনে শেষ করা সম্ভব নয়। ফলে তার পক্ষে অনুসারী জোটানোও সহজ হচ্ছে না।
ব্যক্তিগতভাবে মুশতাক মুহাম্মদ আরমান খানকে চেনেন এবং দীর্ঘ সময় একসাথে চলাফেরা করেছেন এমন অনেকের বক্তব্য হলো, ব্যক্তিজীবনে মুশতাক অত্যন্ত ধার্মিক ও পরহেজগার মানুষ ছিলেন। ব্যক্তিগত ইবাদতে ছিলেন বেশ এগিয়ে। এমন একজন মানুষ কী করে নিজেকে এই উদ্ভট ও ভয়ংকর অবস্থানে নিয়ে এসেছেন তা নিয়ে বিস্ময় জেগেছে তার পরিচিত অনেকের মনে।
মুশতাক আরমান খানের বর্তমান অবস্থান আমাদেরকে একটি বার্তাই দেয়, আর তা হলো, হেদায়াত আল্লাহর হাতে। বান্দাদের অন্তরের চাবিকাঠিও আল্লাহর হাতেই। তিনি যাকে চান তাকে হেদায়াত দান করেন আবার যাকে চান তাকে হেদায়াতের পর বিভ্রান্ত করেন। আল্লাহ তাআলার স্পষ্ট ঘোষণা
لَقَدْ أَنزَلْنَا آيَاتٍ مُّبَيِّنَاتٍ وَاللَّهُ يَهْدِي مَن يَشَاء إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
আমি তো সুস্পষ্ট আয়াত সমূহ অবর্তীর্ণ করেছি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালনা করেন।(৮)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُواْ بِاللّهِ وَاعْتَصَمُواْ بِهِ فَسَيُدْخِلُهُمْ فِي رَحْمَةٍ مِّنْهُ وَفَضْلٍ وَيَهْدِيهِمْ إِلَيْهِ صِرَاطًا مُّسْتَقِيمًا
অতএব, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাতে দৃঢ়তা অবলম্বন করেছে তিনি তাদেরকে স্বীয় রহমত ও অনুগ্রহের আওতায় স্থান দেবেন এবং নিজের দিকে আসার মত সরল পথে তুলে দেবেন। (৯)
অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ كَذَّبُواْ بِآيَاتِنَا صُمٌّ وَبُكْمٌ فِي الظُّلُمَاتِ مَن يَشَإِ اللّهُ يُضْلِلْهُ وَمَن يَشَأْ يَجْعَلْهُ عَلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
যারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলে, তারা অন্ধকারের মধ্যে মূক ও বধির। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন। (১০)
এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট হয়, হেদায়াত একমাত্র আল্লাহর হাতে। তার সাহায্য ছাড়া দ্বীনের পথে অটল থাকা সম্ভব নয়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বীনের পথে অটল থাকার জন্য দোয়া শিখিয়েছেন,
يَا مُقَلِّبَ القُلُوبِ ثَبِّت قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী। আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর অবিচল রাখুন। (১১)
আল্লাহ দ্বীনের পথে চলার তাওফিক দিয়েছেন বলেই নিজেকে নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিত নয়। হেদায়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নেয়ামত। কোনো কারণে রুষ্ট হলে তিনি এই নেয়ামত আবার কেড়ে নিতে পারেন। ফলে সবসময় বিনীত থেকে আল্লাহর কাছে হেদায়াতের উপর অটল থাকার দোয়া করে যাওয়াই মুমিন বান্দার কাজ। দ্বীনের উপর চলার পথে ইস্তিকামাত বা অটল-অবিচল থাকা অনেক জরুরী বিষয়। আল্লাহ তাআলা কোরআনুল কারিমে এই বিষয়ে নবিজিকে আদেশ করে বলেন,
فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَن تَابَ مَعَكَ وَلَا تَطْغَوْا ۚ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
তুমি (দ্বীনের পথে) দৃঢ়পদ হয়ে সোজা চলতে থাক, যেভাবে তোমাকে আদেশ করা হয়েছে, এবং তোমার সাথে যারা তওবা করেছে (তারাও) এবং সীমালঙ্ঘন করো না। তোমরা যা কিছু করছ, নিশ্চয়ই তিনি তার প্রতি দৃষ্টি রাখেন। (১২)
হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন,
الِاسْتِقَامَةُ أَنْ تَسْتَقِيمَ عَلَى الْأَمْرِ وَالنَّهْيِ، وَلَا تَرُوغَ رَوَغَانَ الثَّعْلَبِ
ইস্তিকামাত হচ্ছে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের উপর দৃঢ় থাকা, শেয়ালের মত এদিক সেদিক বিচরণ না করা। (১৩)
যারা জীবনের শেষ পর্যন্ত দ্বীনের উপর অটল থাকতে পারবে তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে বিশেষ সুসংবাদ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۖ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ نُزُلًا مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ
নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন।ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্যে আছে তোমরা দাবী কর। এটা ক্ষমাশীল করুনাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন। (১৪)
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর সামনে যখন এই আয়াত তেলাওয়াত করা হত তখন তিনি বলতেন, হে আল্লাহ, আপনি আমাদের রব। আপনি আমাদেরকে ইস্তিকামাত দান করুন। (১৫)
সালাফে সালেহিনের জীবনি পাঠ করলে আমরা দেখি, জীবনের নানা ধাপে ও বিপর্যয়ে তারা দ্বীনের উপর অটল থেকেছেন। ধৈর্যের সাথে সকল বিপদ-আপদ মোকাবেলা করেছেন কিন্তু দ্বীন থেকে বিচ্যুত হননি। ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ তাই সালাফদের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন,
كُنْ صَاحِبَ الِاسْتِقَامَةِ، لَا طَالِبَ الْكَرَامَةِ. فَإِنَّ نَفْسَكَ مُتَحَرِّكَةٌ فِي طَلَبِ الْكَرَامَةِ. وَرَبَّكَ يُطَالِبُكَ بِالِاسْتِقَامَةِ
অবিচলতার সাথী হও, (মানুষের কাছে) সম্মান-মর্যাদার অন্বেষণকারী হয়ো না । তোমার অন্তর মর্যাদা পেতে চায়, কিন্তু তোমার রব বলেন অবিচলতার (ইস্তিকামাত) মাধ্যমে সম্মান ও মর্যাদা লাভ করতে’’। (১৬)
দ্বীনের পথে অটল অবিচল থাকার জন্য জরুরি হলো বিশুদ্ধ তাওহিদ। ইবনু রজব হাম্বলি বলেন, ইস্তিকামাতের মূল হলো তাওহিদের উপর অন্তরের ইস্তিকামাত প্রতিষ্ঠিত হওয়া। অন্তর যখন আলালহর পরিচয় লাভ করে, তাতে গেড়ে বসে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও ভয়, তার প্রতি ভরসা ও তিনি ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে বিমুখতা, তখন প্রতিটি অঙ্গই আল্লাহর আনুগত্যের উপর অবিচল থাকে। অন্তর হলো রাজার মতো, অন্য অঙ্গগুলো তার সেনাবাহিনী। যখন রাজা অবিচল হয়ে যান তখন সেনাবাহিনীও তাকে অনুসরণ করে। (১৭)
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তার মারিফাত দান করুক। আমাদের অন্তরসমূহকে দ্বীনের উপর অটল রাখুন। নানা আধুনিক মতবাদ ও ব্যখ্যার ভীড়ে আমাদের আকিদাকে বিশুদ্ধ রাখার তাওফিক দিক। আমিন।
সূত্র
১। তারিখুত তাবারি, ৯/৬৬
২। সুনানে আবু দাউদ, ৪২৮১। জামে তিরমিযি, ২২৩০।
৩। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/১৫১
৪। শাজারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, ৬/১১৭
৫। নুজহাতুল খাওয়াতির, ৭/৩২৪
৬। মুন্তাখাবুত তাওয়ারিখ, ১/৪০৮
৭। তারিখে ইবনে খালদুন, ৬/২২৬
৮। সুরা নুর, আয়াত-৪৬
৯। সুরা নিসা, আয়াত-১৭৫
১০। সুরা আনআম, ৩৯
১১। জামে তিরমিযি, ৩৫২২
১২। সুরা হুদ, আয়াত-১১২
১৩। তাফসিরে বাগাবি, ৪/২০৩
১৪। সুরা ফুসসিলাত, ৩০-৩২
১৫। তাফসিরুত তাবারি, ২১/৪৬৫
১৬। মাদারিজুস সালিকিন, ২/১০৬
১৭। জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ৩৮৬

Facebook Comments