আকিদা

হেযবুত তওহীদের মুজেযা বিভ্রান্তি | মাহদি হাসান কাসেমি

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

মুজেযা কি?

‘معجزة’ মুজেযা শব্দটি ‘عجز’ থেকে নির্গত। অর্থ অক্ষম ও অপারগ। আর ‘معجزة’  হলো অক্ষমকারী। যা قدرة বা সক্ষমতার বিপরীতে আসে।[1]

পরিভাষায় মুজেযা বলা হয়: الخارق للعادة المقرون باالتحدى  ‘অভ্যাস বহির্ভূত এমন অলৌকিক বিষয়, যা চ্যালেঞ্জের বিপরীতে আসে।[2]

ইবনে হামদান বলেন:

المعجزة هي ما خرق العادة من قول أو فعل إذا وافق دعوى الرسالة وقارنها وطابقها على جهة التحدي ابتداء بحيث لا يقدر أحد عليها ولا على مثلها، ولا على ما يقاربها

‘মুজেযা এমন অলৌকিক কথা ও কাজকে বলে, যা রিসালাতের দাবি সত্ত্বায়ন করতে চ্যালেঞ্জের মুকাবেলায় আসে। এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিবিম্ব আনয়ন করা অসম্ভব হয়।’[3]

ইমাম ফখরুদ্দীন রাযি রহ. বলেন:

المعجزة عرفا أمر خارق للعادة مقرون بالتحدي مع عدم المعارضة

মুজেযা স্বভাববহির্ভূত এমন অলৌকিক বিষয়, যা প্রতিদ্বন্দ্বিহীন চ্যালেঞ্জের বিপরীতে আসে।[4]

অর্থাৎ মুজেযা এমন হতে হবে, যার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না এবং কেউ তা প্রত্যাখ্যান করা কিংবা তার প্রতিবিম্ব উপাস্থাপনের সামর্থ রাখবে না। আর এ কারণেই এটাকে মুজেযা বলা হয়।[5]

মুজেযা কাদের জন্য?

মুজেযা একমাত্র নবী রাসূলদের সঙ্গেই খাস। যেটা রাব্বুল আলামিন তার প্রেরিত মনিষীদের সত্যায়নের জন্য কাফিরদের চ্যালেঞ্জের মুকাবালায় সংঘঠিত করাতেন।[6] মোল্লা আলি আল-কারি রহিমাহুল্লাহ কাযি ইয়ায রহিমাহুল্লাহকতৃক রচিত শিফা গ্রন্থের ব্যাখ্যায় এটাকে সংজ্ঞারই অন্তর্ভূক্ত করেছেন: الامور الخارقة للعادة الشاهدة بصدق دعوى الرسالة ‘অভ্যাসবহির্ভূত এমন অলৌকিক বিষয়, যা রিসালাতের দাবির সত্যায়নের জন্য দেখান হয়।[7]

মীর সাইয়্যেদ শরিফ জুরজানিও এটাকে সংজ্ঞার অন্তর্ভূক্ত করেছেন:

المعجزة أمر خارق للعادة داعية إلى الخير والسعادة مقرونة بدعوى النبوة، قصد به إظهارصدق من ادعى أنه رسول من الله

মুজেযা অভ্যাসবহির্ভূত এমন অলৌকিক বিষয়, যা নবুওয়াতের দাবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে কল্যাণ ও সৌভাগ্যের দিকে আহ্বান করে। এবং তার দ্বারা এমন ব্যক্তির সত্যবাদীতা প্রকাশ করা উদ্দেশ্য থাকে, যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত।[8]

মুজেযার আবশ্যকীয় শর্ত:

সংজ্ঞার মধ্যে মুজেযার চারটি শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে:

১. প্রতিদ্বন্দিহীন হওয়া।

২. চ্যালেঞ্জের মুকাবেলায় আসা।

৩. নবী রাসূলদের সত্যায়নের জন্য হওয়া।

৪. কল্যাণ ও সৌভাগ্যের দিকে আহ্বান করা।

এর সঙ্গে পঞ্চম আরেকটি শর্ত হলো: সংঘঠিত এ অলৌকিক বিষয়টি প্রকাশ্যে মানুষের সামনে  হওয়া।

لأن المعجزة يجب كونها بمشهد من الرسول والقوم حتى تقوم الدلالة عليهم.

‘মুজেযা প্রেরিত রাসূল ও তার অধীনস্ত কওমের সামনে সংঘঠিত হওয়া, যেন এটা দ্বারাই তাদের সামনে তাঁর নবুওয়াতের সুস্পষ্ট প্রমাণ হয়ে যায়।’[9]

সারকথা:

মুজেযা নবী রাসূলদের হবে। চ্যালেঞ্জের বিপরীতে আসবে। কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে। তাকে প্রত্যাখ্যান করা কিংবা তার দৃষ্টান্ত উপাস্থাপন করার সামর্থ থাকবে না। আবার তা প্রকাশ্যে বিরোধী পক্ষের সামনে সংঘঠিত হবে। যেমন হযরত হুদ আলাইহিস সালামকতৃক পাথর চিড়ে গর্ভবতী উট বের হওয়া। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামকতৃক চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া। যেগুলো সংঘঠিত হয়েছিলো কাফিরদের চ্যালেঞ্জের বিপরীতে। তাও বিরোধী পক্ষের উপস্থিতিতে। জনসম্মুখে। ঘরের মধ্যে বা নিজ দলীয় কারো সামনে না। তাই তার মধ্যে মিথ্যা, ছলচাতুরী ও অস্বীকারের মত কোনো প্রবণতা ছিল না।  আজ কেনো কিয়ামত অবধিও তা খণ্ডন করা কিংবা তার সাদৃশ্য কাজ উপাস্থাপন করা সম্ভব না। ফেরাউন এ মুজেযাকেই যাদুর সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছিল। যখন মুজেযার সাপ যাদুর সাপগুলোকে গিলে খেল, তখন যাদুকরগণ সত্য বুঝতে পারল, এবং ঈমান গ্রহণ করল। এ মুজেযাই যদি ঘরের মধ্যে কিংবা নিজ দলীয় কতক লোকের সামনে সংঘঠিত হত, তবে অস্বীকারকারীদের কাছে কষ্মিণকালে তা বিশ্বাসযোগ্যতার স্থান দখল করতে পারত না।

শরীয়তের আলোকে বায়াজীদ খান পন্নীর মুজেযা

বিংশ শতাব্দির শেষলগ্ন থেকে নিয়ে আজ অবধি চলমান বায়াজীদ খান পন্নীকতৃক গঠিত হেযবুত তওহীদ বাংলাদেশের অন্যতমও একটি কুফুরি ফিরকা। যিনি তার মূর্খ ভক্তদের মাঝে নিজেকে আল্লাহর মনোনীনিত ব্যক্তি ও হেযবুত তওহীদকে আল্লাহকতৃক গঠিত সংগঠন প্রমাণের জন্য প্রতারণা বশত: নাবী রাসূলদের সঙ্গে বিশেষিত মুজেযার মত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে টানা হিচড়া করেন। তার জাহিল অনুসারীরা তার এ কথাকে ওহির মত বিশ্বাসও করে। আর এটাকেই পুজি করে সহজসরল লোকদের ঈমান চুরির নেশায় মত্ত হয়ে উঠে।  আসুন দেখি কি ছিল সেদিনকার সেই মুজেযা:

মুজেযা সংঘঠিত হওয়ার পূর্বকথা

২/২/০৮ তারিখে যাত্রবাড়ী কথিত হেযবুত তওহীদের কোনো এক মোজাহেদের নাতনীর আকিকা ছিল। সেখানে সবাই উপস্থিত থাকলেও বায়াজীদ খান পন্নী উপস্থিত ছিল না। তাই তখনকার ঢাকার আমীর এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় আমীর মসীহ উর রহমান বিকেল ৩টার দিকে ফোন করে তাকে বক্তব্য রাখতে বললেন। কিন্তু তিনি মাগরীবের পরে বক্তব্য রাখবেন বলে জানালেন। বাদমাগরীব যথারীত ১০ মিনিট ৯ সেকেন্ড কথা বলেন। তখন কিছু বুঝতে না পারলেও পরবর্তীতে তারা বুঝতে পারলেন যে, এখানেই ৮টি মুজেযা সংঘঠিত হয়ে গেছে। আসুন  আমরা সেই মুজেযাগুলো দেখে আসি:

১. এমামুযযামানের ভাষণ আরম্ভ হওয়ার মুহূর্ত্ত থেকে চারিদিকে একটি অদ্ভুত পিনপতন নীরবতা, নিস্তব্ধতা নেমে এলো। মনে হোচ্ছিল পৃথিবীর সমস্ত শব্দ থেমে গেছে। কোথাও সামান্যতম শব্দ নেই, শুধু এমামুযযামানের বলিষ্ঠ, সুন্দর কন্ঠ শোনা যাচ্ছে এবং প্রতিটি শব্দ এত পরিস্কারভাবে শোনা যাচ্ছে যে, পরে অনেকে বলেছেন তাঁর সামনে বোসে তাঁর কথা কোনও দিন এত পরিস্কারভাবে শোনা যায় নি। কেউ কেউ বোলেছেন যে, মনে হোচ্ছিলো তাঁর সামনে বোসে কথা শুনছি। কেউ বোলেছেন যে, এমামের ভাষণ শুরু থেকে শেষ পর্য্যন্ত আমি কোথায় ছিলাম এই বোধ ছিলো না, আমি পৃথিবীতে, নাকি আসমানে ছিলাম এ বোধও ছিলো না।

২. এমামের ভাষণ আরম্ভের একটু আগে পর্যন্তও আমাদের সেই লাউড স্পিকার দু’টির শব্দ ছিল অস্পষ্ট, খুব খেয়াল কোরে বুঝতে হোচ্ছিল। কারণ সাউন্ড সিস্টেমটাই ছিল অনেক পুরানো। কিন্তু এমাম কথা বলার সামান্য আগেই হঠাৎ লাউড স্পিকারের শব্দ একদম পরিস্কার হোয়ে গেল।

৩. এমামের ভাষণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ৩টি দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ ৪৩টি শিশু একদম চুপ হোয়ে গেলো এবং এই চুপ হওয়া এমামুযযামানের ভাষণ শেষ হওয়া পর্য্যন্ত জারি রোইলো। কোন বাচ্চা ‘টু’ শব্দও কোরল না।

৪. অনুষ্ঠানের আগে থেকেই বাইরের যে ২ টি লাউড স্পিকারের (Loud Speaker) শব্দ ভেসে আসছিলো, এমামের ভাষণ শুরু থেকে শেষ পর্য্যন্ত কেউ সেগুলির শব্দ শুনতে পান নি।

৫. বিকাল থেকে ঠাণ্ডা বাতাস বইছিলো। মাঝে মাঝেই বাতাস বেশ জোরে বইছিলো। প্যান্ডেলের কাপড়গুলো বাতাসে পত পত শব্দ কোরছিলো। এমামুযযামানের ভাষণ শুরু হবার আগ পর্য্যন্ত এই অবস্থা চোলছিলো। ঠাণ্ডা বাতাসে অনেকেই বেশ কষ্ট পাচ্ছিলেন, বিশেষ কোরে যারা ফাঁকা অংশে ছিলেন। মাগরেবের পর এমামুযযামানের ভাষণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস একদম বন্ধ হোয়ে গেলো। অনুষ্ঠান হোচ্ছিলো চারতলার ছাদের ওপরে। কিন্তু এমামের ভাষণ শেষ হওয়া পর্য্যন্ত শৈত্য প্রবাহ বন্ধ হোয়ে গেল। ভাষণ শুরু হওয়ার আগে পর্য্যন্ত যে কনকনে ঠান্ডা ছিল তা পরিবর্ত্তিত হোয়ে আরামদায়ক উষ্ণতায় পর্য্যবসিত হোল।

৬. অনুষ্ঠানস্থলে ২৭৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক মোজাহেদ মোজাহেদার প্রায় সকলেরই কাছে মোবাইল ফোন ছিল। বেশীর ভাগই তাদের ফোন বন্ধ রাখলেও ৫২টি ফোন অন করা ছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সারাদেশের আমীরগণ, যাদের প্রত্যেকের ফোনে প্রচুর কল আসে। কিন্তু এমামের ভাষণের সময় একটিতেও কোন রিং বাজে নাই, কোন কল আসে নাই।

৭. সকলের মনকে আল্লাহ পৃথিবীর সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন কোরে ভাষণের প্রতি কেন্দ্রভূত কোরেছিলেন। কেউ এ সময় বাইরের কোন আওয়াজ শুনতে পান নি, শীতের অনুভূতি লোপ পেয়ে গিয়েছিল, বাচ্চারা নীরব হোয়ে গিয়েছিল অর্থাৎ তাদের মনোযোগে বিচ্যূতি হোতে পারে এমন কোন ঘটনাই তখন আল্লাহ ঘোটতে দেন নি। কেউ বোলেছেন, মনে হোল যেন গভীর পানির মধ্যে বোসে এমামের কথা শুনছি, কেউ বোলছেন, তখন মনে হোয়েছে পৃথিবীতে কেবল আমি আর এমাম আছি। অনেক বাবা-মা বোলেছেন তাদের বাচ্চা তাদের কাছে বোসে ছিল কিন্তু কখন যে তারা চোলে গেছে তারা বোলতেও পারবে না। মোট কথা এমামের ভাষণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবাই আত্মবিস্মৃত হোয়ে শুধু তার কথা শুনেছেন, আর কিছুই শোনেন নাই।

৮. ঘটনার চারমাস পরে আমরা উদঘাটন কোরি যে, এই ভাষণে এমামুযযামানের কথাগুলির মধ্যে আল্লাহ তিন (৩) সংখ্যার একটি অভূতপূর্ব সমন্বয় সাধন কোরেছেন। ভাষণের অন্তত ৩০টির অধিক বিষয় তিনবার কোরে বা তিন দ্বারা বিভাজ্য।[10]

….সমস্ত কোর’আনকে আল্লাহ যেভাবে উনিশ সংখ্যার জালে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধেছেন, ঠিক একইভাবে সেদিন এমামের সংক্ষিপ্ত ভাষণটিকে আল্লাহ বাঁধলেন তিন সংখ্যার জাল দিয়ে। উদ্দেশ্যও এক অর্থাৎ সত্যায়ন।[11]

 

পাঠক! আমি আগেই বলে এসেছি, মোজেযা এমন হতে হবে যা প্রত্যাখ্যান করা কিংবা তার সাদৃশ্যতা আনয়ন কস্মিণকালেও সম্ভব হবে না।  আমরা সে শর্তগুলো আবার লক্ষ করি:

মুজেজার পাঁচটি শর্ত: ১. নবী রাসূল হওয়া। ২. চ্যালেঞ্জ থাকা। ৩. প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা না থাকা। ৪. কল্যাণের দিকে আহ্বান থাকা এবং ৫. বিপক্ষ দলের সামনে সংঘঠিত হওয়া।

উক্ত পাঁচ শর্তের আলোকে এবার আমরা বায়াজীদ খান পন্নীর মুজেযাগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করি।

  • কোথাও যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কথা বলে, যার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা শ্রোতাদের অন্তরে বদ্ধমূল থাকে, তবে তার কথা বলার ক্ষেত্রে মজলিসে পিনপতন নীরবতা আসবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের দেশ সহ বিভিন্ন দেশের বড় বড় উলামায়ে কিরামদের মজলিস ও মাহফিলের লক্ষ লোকের মজমায়ও পিনপতন নীরবতা লক্ষ্য করা যায়; যদি ২৭৫ ব্যক্তির নীরবতা মুজেযা হিসেবে সাব্যস্ত হয়, তবে লাখো লোকের মজমা কি বলে বিবেচিত হবে? রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাহাবাদের মধ্যে কথা বলতেন, তখনতো তাদের ওপর পাখি পর্যন্ত বসত! কই এটা তো রাসূলের মুজেযার মধ্যে স্থান পেলো না। আজ পর্যন্ত কেউ এমন দাবিও করল না! বরং এটা সাহাবাদের মনযোগ ও রাসুল মান্যতার বড় একটি উদাহরণ হিসেবেই গণ্য হয়েছে। তাছড়া শ্রোতাদের মনযোগের মধ্যে বক্তার পূণ্যতা কোথায়! এটা কি কক্তার কথার যাদুময়ীতা ছাড়া আর কিছু বুঝাতে সক্ষম!
  • ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র পুরানো হোক বা নতুন, কখনো ভালো সার্ভিস দেয়, কখনো খারাপ। এটাও কি কখনো অলৌকিক ঘটনা বলে সাব্যস্ত হতে পারে? তাছাড়া দেখবেন, পুরানো স্পিকারে মাইক্রোফন দিয়ে কথা বলার সময় সমস্যা হয়। আওয়াজ ওঠানামা করে। কিন্তু ওটাই যখন কোনো মোবাইলে সংযোগ দেওয়া হয়, তখন অধিকাংশ মাইক্রোফনই সাবলীলভাবে চলতে থাকে। এমন অনেক দৃষ্টান্ত নিজ চোখে দেখা। তো তাদের ওটা যদি মুজেযা হয়, তবে এগুলো কী?
  • বাচ্চারা স্বভাবত অল্পতে বিস্মিত হয়। আর তখন তাদের বিস্ময়ের ঘোর কাটতে বহু সময় লেগে যায়। বিশেষত যখন অনেক লোক থাকে এবং সবাই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে মত্ত থাকে কিংবা নীরবতা অবলম্বন করে, তখন ওরাও মৌনতা পালন করে। কখনও ভয়ে কখনো বিস্ময়ে। এটা কী কখনো কোনো মুজেযা বা অলৌকিক বিষয় হতে পারে! তাছাড়া পন্নী সাহেব তো কথার শুরুতেই আওয়াজ আসে কেনো দুবার জিজ্ঞেস করেছেন, তারমানে তিনি পরিপূর্ণ চুপ থাকতে বলেছেন। তখন বাচ্চাদের অভিভাবকরাও পূর্ণ সতর্ক হয়ে গেছেন। এ মুহূর্তে বাচ্চাদের কিভাবে শান্ত রাখতে হয়, মায়ের সেটা খুব ভালোমতই জানা আছে। আর এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ  মজলিসে সতর্ক থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক।  এটা আবার মুজেযা হয় কী করে!

একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো। ২০১৬ সালের এপ্রিলের কথা। আমাদের খতমে বুখারি ছিল সেদিন। আমি ছিলাম সবার সামনে আর আমার কাছেই রেখেছিলাম আমার পাঁচ বছরের ভাগ্নেকে। ৩ঘন্টার অনুষ্ঠানে ও একটা কথাও বলেছিল না। অথচ এই বয়সের বাচ্চাদের দু মিনিট নীরব রাখা অকল্পনীয় বিষয়। যদি ১০:৯ সেকেন্ড বাচ্চাদের চুপ থাকা মুজেযা হয়, তবে তিন ঘন্টা কী?

  • যখন কেউ কারো কথা খুব মনযোগ দিয়ে শুনে, তখন আত্মবিস্মৃত না হওয়াটাই বিস্ময়ের কথা। আর আত্মবিস্ময়ের মুহূর্তে উদ্দেশিত আওয়াজ বা কাজ ছাড়া তার কাছে কোনো আওয়াজ পৌঁছাবে না, এটাই স্বাভাবিক। এর উদাহরণ অহরহ। তরুণ সমাজের দিকে লক্ষ্য করলেই কিছুটা বুঝা যায়। কখনো দেখা যায় তারা স্মার্টফোনে এতটাই মনযোগী যে, দুনিয়ার কোনো খবরই তাদের কানে পৌঁছে না। কখনো মোবাইলে পছন্দের কোনো বড় আলিমের বয়ান শুনলে কিংবা কেউ গভীরভাবে মুতাআলা করলে এমনভাবে আত্মবিস্মিৃত হয়। এটাও কী মুজেযা?
  • এমনকি এ আত্মবিস্ময়ের মুহূর্তে শরীরের অনুভূতিও লোপ পেয়ে থাকে। তখন সে শরীরের আগুন বা পানি কোনোটাই ঠাওর করতে সক্ষম হয় না। বলতে গেলে তার ইন্দ্রিয় শক্তিই অকার্যকর হোয়ে যায়। যেটা মানুষের মধ্যে সচরচার দেখা যায়। এটা যদি মুজেযার অন্তর্ভূক্ত হয়, তবে দৈনন্দিন তো আমরা হাজারো মুজেযা ঘটিয়ে থাকি। এগুলোকে অলৌকিক বিষয় গণ্য করা কি হাস্যকর বৈ কিছু হতে পারে?
  • ফোন আসা বা না আসা কি কখনো কোনো অলৌকিক ঘটনার অন্তর্ভূক্ত হতে পারে? হাজারো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মজমায় দেখা যায় ঘন্টা পেরিয়ে যায় অথচ কোনো ফোনকল তো দূরের কথা মিসকলও আসে না। পাঠক! এটা যদি অলৌকিক ঘটনা হয়, তবে দৈনিক কতস্থানে এমন অলৌকিক ঘটনা ঘটছে—অনুমান করেন তো!

 

৮ম মুজিযা নিয়ে কিছু কথা

  • আল্লাহ তাআলাকতৃক এমন কোনো মুজিযা আছে যা তাৎক্ষাণিক তার উম্মতগণ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে? তবে এটা আবার কেমন অলৌকিক বিষয় হবে যা তার উম্মত অনুধান করতে সক্ষম হলো না।
  • অনুষ্ঠানে বক্তব্যর জন্য ফোন দিয়েছিলো বিকেল তিনটায়। এরপর মাগরীব পর্যন্ত প্রায় তিন সাড়ে তিন ঘন্টা সময়। এতসময় একটা বক্তৃতা খুব সুন্দরভাবেই সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা যায়। প্রশ্ন হতে পারে, এমাম কি তাহলে মিথ্যা বলেছে? জি মুজেযা বায়াজীদ খান পন্নীর স্পষ্ট মিথ্যাচার। এবং সেও একজন মিথ্যাবাদী। যার প্রমাণ বায়াজীদ খান ও পন্নী ও তার ইলহাম অধ্যায়ে উল্লেখ করব ইন শা আল্লাহ।
  • এ মুজিযা বিষয়টা তার আগ থেকে পরিকল্পনায় ছিল যে, সে এমন কিছু করবে। তাইতো রাতে স্ত্রী থেকে সংবাদ নেওয়া আবার পরদিন মাসীহ উর রহমানের কাছে ফোনে জিজ্ঞেস করা—এসব কী হতে পারে! হোক সেটা স্বাভাবিক জিজ্ঞাসাই। কিন্তু সব তো স্বাভাবিকই হবে। একটা বিষয়কে বার বার জিজ্ঞেস করার অর্থ কী!

তাছাড়া গত হওয়া কোনো বিষয়কে যদি গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবন করে পুনরায় জানতে চাওয়া হয়, তবে বিপরীত কিছু হলেও অনুসন্ধানকারী যেমনটা ইচ্ছে করে, তেমনই বর্ণনা করা হয়।। এছাড়াও বাঙালীরা কিন্তু সাঈদী সাহেবকে চাঁদে দেখেছিল। যা ডাহা মিথ্যা  ও আত্মপ্রবঞ্চনা ছিল। কারণ কারো ভাবনা ও কল্পনা যখন কোনো একটা দিককে ঘিরে দেখান হয়, তখন সে আত্মপ্রবঞ্চনার স্বীকার হয়। এবং প্রতারক যা দেখাতে ইচ্ছে করে, সে সেটাই  দেখতে পায়। মুজিযার বিষয়টিও ঠিক এমন।

 

১৯ সংখ্যা তথ্য

বায়াজীদ খান পন্নীর দাবি, আল্লাহ যেমন কুরআনকে ১৯ সংখ্যার জ্বালে বেধে দিয়েছেন, তেমনই তার এ বক্তব্যকেও  তিন সংখ্যার জ্বালে বেধে দিয়েছেন।[12]

এটা তো পূর্বেও বলে এসেছি যে, বক্তব্য লেখিত ও সাজানো ছিল। তাছাড়া কুরআনে কারীম ১৯ সংখ্যার আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, এটাও এক বিভ্রন্তিকর তথ্য।  আসুন আগে আমরা ১৯ সংখ্যার বিভ্রান্তি জেনে আসি। তবে তাদের মুজেযার তিন সংখ্যার ‘আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা’ এমন জাহালাতপূর্ণ কথা ও মুজেযার স্বরূপ কিছুটা হলেও উন্মোচিত হবে। এখন সর্বপ্রথম জানতে হবে যে, ১৯ সংখ্যার জালে বাঁধা বিভ্রন্তিকর এ গবেষণার জনক কে ও তার গবেষণার কারণ কি?

গবেষক

আমরা যদি কুরআন বিষয়ক গবেষণাগ্রন্থগুলো পাঠ করি তবে আমাদের সামনে এটাই উন্মোচিত হয় যে, ১৯ সংখ্যার জনক হলো রাশাদ খলিফা নামক এক ব্যক্তি। আসুন আগে তার সামান্য জীবনবৃত্তান্ত জেনে নিই:

রাশাদ খলিফা ১৯৩৫ সালের ১৯ নভেম্বর মিশরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন সূফী। রাশাদ খলিফা কায়রোর এইন শামস্ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে ১৯৫৯ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকাতে আসেন এবং ১৯৬৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জৈব-রসায়নবিদ্যায় পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি আমরিকার এক মেয়েকে বিয়ে করে ওখানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে ক্যালিফোর্নিয়া ও এরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করান। ১৯৭৫-৭৬ সালে প্রায় বছরখানেকের জন্য লিবিয়া সরকারের বিজ্ঞান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে জাতিসংঘের অধীনে রসায়নবিদ হিসেবে ভিয়েনাতে শিল্প উন্নয়ন সংস্থায় যোগ দেন এবং ১৯৮০ সালের দিকে সেখান থেকে সিনিয়র রসায়নবিদ হিসেবে আমেরিকার এরিজোনা রাজ্যের সরকারি রসায়ন বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।[13] ১৯৬৮ সাল থেকে তিনি কুরআনের গানিতিক কোড নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এবং কুরআন ১৯ সংখ্যার জালে বাঁধা—এটা আবিস্কার করেন।  এ গবেষণার ওপর তিনি বেশকিছু বই লিখেন। আর এটা প্রচারের জন্য ১৯৮২ সালে Quran:Visual Presentation Of TheMiracle রচনা করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে যা  ইসলামিক ফাউন্ডেসন থেকে ‘আশ্চর্য এই কোরান’ নামে অনূদিত হয়।

আকিদা

রাশাদ খলিফা মূলত বাহায়ি ফিরকার অনুসারী ছিলেন।[14] ওলামায়ে কিরামের সর্বস্মিতিক্রমে যারা কাফির ও মুরতাদ। তাছাড়া  ১৯৮৫ সালের ১১ই মার্চ তিনি ‘সুন্নাত বলতে কিছুই নেই’ বলে সুন্নাত ও হাদীসের ওপরে আক্রমণ করেন। সে সঙ্গে সহিহাইনসহ অন্যান্য হাদিসগুলো অস্বীকার করেন এবং এগুলোকে শয়তানের রেওয়ায়েত বলে অবহিত করেন। তিনি কখনো শাহাদাতাইন তথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সঙ্গে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-এর স্বীকৃতি দিতেন না বরং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে শিরিক হিসেবে সাব্যস্ত করতেন। আযানের মধ্য থেকেও তিনি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ শব্দকে ফেলে দিয়ে শুধু ৪বার আল্লাহু আকবার ও লা ইলাহা ইল্লাহ রেখেছিলেন। অনুরূপভাবে তাশাহহুদ থেকেও রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম ও তার ওপরে সালাম ফেলে দিয়েছিলেন।[15] তার দাবি হলো মুসলমানগণ রাসূলের কবরকে যিয়ারতের নামে বড় মূর্তিরূপে গ্রহণ করেছে।[16] তিনি নিজেকে আমেরিকা ও বিশ্ববাসীর জন্য  আল্লাহর পক্ষ থেকে বিংশশতাব্দীর প্রেরিত রাসূল বলে দাবি করেন এবং নাজাতের জন্য তার মতবাদ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানান। তিনি বলতেন, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাতামুন্নাবিয়্যিান ছিলেন, খাতামুল মুরসালিন না। আর কিয়ামত ১৭১০ হিজরিতে সংঘঠিত হবে। যা কুরআনের ১৪টি হুরুফে মুকাত্তায়াত থেকে অনুধাবিত হয়।[17]

 

১৯ সংখ্যাকে গ্রহণের কারণ

১৯ সংখ্যা মূলত বাহায়িদের কাছে একটি পবিত্রতম সংখ্যা। আর এ সংখ্যা চয়নের একটি গোপন রহস্যও রয়েছে। তা হলো ইবলিসের খাস শাগিরদ বাহায়ী মতবাদের গুরু কথিত বাহাউল্লাহর ওপর প্রথম ১৮ জন ঈমান এনেছিল। আর সে সহ মোট ১৯ জন ছিল। তাই এটাকেই  শয়তান তাদের শরীয়াতের মূল ভিত্তি নির্ধারন করে দিয়েছিল। এ জন্যই তাদের বছর হয় ১৯ মাসে।  মাস হয় ১৯ দিনে। রমযান মাসও তাদেরই আবিস্কৃত বছরের ১৯তম তথা সর্বশেষ মাস ‘আলা’-য় হয়। তাদের ঈদ হয় মার্চের ২১ তারিখ। আর নামায দিনে ৯ রাকাত। তাতে ৩৬১*৯=৩২৪৯ হয়। যা (৩২৪৯/১৯=১৭১) ১৯ দ্বারা বিভাজ্য। এমনকি তাদের বিবাহের মহরও ১৯ হয় মিছকল স্বর্ণ।[18]

উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ১৯ সংখ্যা কুরআনের গণিতিক কোনো মুজেযা নয়, বরং এটা মুরতাদ বাহায়িদের শরীয়ত ও তাদের মনগড়া মতবাদ।

১৯ সংখ্যা গ্রহণের দলিল

এই ১৯ সংখ্যার বিভ্রান্তি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ভিত্তি হিসেবে রাশাদ খলিফা বিসমিল্লাহকে দলিল বানিয়েছে। তার দাবিমতে ‘بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ’ ১৯ সংখ্যাবিশিষ্ট। সে এটার দলিল গ্রহণ করেছে সুরা মুদ্দাচ্ছিরের ৩০ নং আয়াত ‘عَلَيْهَا تِسْعَةَ عَشَرَ’ থেকে। অথচ সমস্ত মুফাসসিরিনে কিরামগণ একমত যে, এ আয়াত দ্বারা জাহান্নামের ফিরাস্তাগণ উদ্দেশ্য অন্য কিছু নয়। তাছাড়া বিসমিল্লাহর সংখ্যাও যদি গণনা করা হয়, তবে রাশাদ খলিফার গণনা ভুল বৈ কিছুই বের হয় না। কারণ সাধারনত তিন  পদ্ধতীতে এর সংখ্যা গণনা  করা হয়:  ১. উচ্চারণগত দিক থেকে। তখন এটা ১৮ সংখ্যার হয়।  ২. খত্তে উসমানি। তথা হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময় লেখিত কুরআনের খত। এ হিসেবে এটা বিশ সংখ্যার হয় । ৩. আর খত্তে ইমলায়ি তথা হাদিসের খত। এ হিসেবে এটা ২১ সংখ্যার  হয় । অর্থ্যাৎ  বিসমিল্লাহ কোনভাবেই ১৯ সংখ্যার হয় না।

মূলত সে ১৯ এর মিরাকেল ঠিক রাখতে গিয়ে যেটা যেভাবে মিলাতে পেরেছেন, উল্লেখ করেছে আর যেটা পারে নি বাদ দিয়েছে। যেমন কুরআনের ১১৪ টি সুরার ১৯ দ্বারা বিভাজ্যের কথা লিখেছে ঠিক, তবে তার রুকু ও আয়াত সংখ্যার বিভাজ্যের কথা কিন্তু লিখেন নি। আবার এর মিরাকেল ঠিক রাখতে গিয়ে কমবেশি গণনা করেছেন কোথাও না মিলাতে পেরে বাদও দিয়েছেন। যেমন তার লেখিত কুরআনে সুরা তওবার ১২৮ ও ১২৯ নং আয়াত বাদ দিয়েছেন।

গবেষণার ত্রুটি

রাশাদ খলিফার ১৯ সংখ্যার মিরাকেল ঠিক রাখতে গিয়ে নির্দিষ্টি কোনো পদ্ধতীর অনুসরণ করে নি। না লেখ্যনীতি অবলম্বন করেছে না পাঠ্যনীতি। অথচ মুজেযা হয় দৃঢ় ও পরিপক্ক। যেখানে হেরফের করার কোনো সুযোগ থাকে না। যদি এ মুজেযার নির্দিষ্ট কোনো নিয়মই না থাকে, তবে অন্যপদ্ধতী দ্বারা তো তা রহিত হয়ে যাবে। তখন মুজেযার অর্থ ঠিক থাকবে কোথায়? আর নীয়মনীতির তোয়াক্কা না করা ও সংখ্যার কমবেশি গণনা করার জন্যই গবেষকরা তার এই গবেষণাকে মিথ্যা ও ছলান বলে আখ্যা দিয়ে অনেক গবেষণাগ্রন্থ রচনা করেছেন। এর ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সাল থেকেই। সে বছরই সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন গণিতবিদ-বিজ্ঞানী মার্টিন গার্ডনার ‘স্কেপটিকল এনকুইরার’ নামক পত্রিকায় রাশাদ খলিফার এ গবেষণাকে কুরআনের কৌশলী পাঠ আখ্যা দিয়ে সর্বপ্রথম সমালোচনার ধারা আরম্ভ করেন। বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘যুক্তি’র ২০১০ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় সৈকত চৌধুরী ও অনন্ত বিজয় দাশ ১৯ তত্ত্বের বিভিন্ন দুর্বলতা ও বিভ্রান্তি নিয়ে বিস্তর সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিপিবদ্ধ করেন। এবং এটাকে খলিফা সাহেবের ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার বলে অভিযুক্ত করেন।[19] এছাড়া ইন্টারনেটেও বিভিন্ন ভাষায় ১৯ সংখ্যার সমালোচনা ও মিথ্যাচার নিয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ রয়েছে। আমি সংক্ষেপে কয়েকটা ত্রুটি পেশ করছি:

রাশাদ খলিফা দাবি করেছে যে কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ সুরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াতের শব্দ সংখ্যা ১৯। আর সুরার আয়াত সংখ্যাও ১৯। অথচ ওই পাঁচ আয়াতের শব্দসংখ্যা ১৯ নয় বরং বিশ। কারণ من,  ما ও لم প্রত্যেকটি ভিন্ন ভিন্ন শব্দ।  আর হরফে যর ب ও হরফে আতফ و কে গণনা করলে মোট শব্দ হবে ২৪ টি।

আর আয়াত সংখ্যা ১৯ তো কুফা ও বসরাবাসীর কাছে। মক্কা ও মদীনার কারীদের কাছে ২০ আর শামের কারীদের কাছে ১৮। তো মুজেযা যে অপরিবর্তনশীল, তা ঠিক থাকল কই!

সুরা ক্বলামে ১৩১ টি নূন রয়েছে। যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়। অথচ রাশাদ খলিফা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য বানানোর লক্ষ্যে শুরুর ن কে نون লিখে ১৩৩ টি বানিয়েছে। এমনই তিনি ইচ্ছেকৃত অসংখ্য ভুল  করেছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেলে  ড. গানেম কাদ্দুরির ‘আবহাছ ফি উলুমিল কুরআন’, ড. সালাহ আবদুল ফাত্তাহ আল খালিদির ‘আল বয়ান ফি ইজাজিল কুরআন’  হুসাইন নাজি মুহাম্মদ মহিউদ্দীনের ‘তিছআ’তা আশারা মালাকান’ ও ‘ফিতনাতু কুরনিল ইশরিন’, ড. ফযল হুসাইন আব্বাসের ‘ইজাজুল কুরআনিল কারিম’ এবং ইদরিস আল কিলাকের ‘লাইসা ফিল ইসলামি তাকদিসুন লিল-আরকাম’ ও উইকিপিডিয়া বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য।

বায়াজীদ খান পন্নীর তিন সংখ্যা বিভ্রান্তি

পাঠক! রাশাদ খলিফার ১৯ সংখ্যার মিরাকেল, এ সংখ্যার মৌলিকত্ব ও  গবেষণা  দেখে এটাকে কি মুজেযা মনে হলো না ইবলিসকতৃক নির্ধারিত কুফুরির কোনো মন্ত্র? আর এটাকেই যদি কেউ মুজেযা গণ্য করে এমনই কোনো সংখ্যার মিরাকেল দিয়ে নিজ বক্তৃতাকে সাজায়, তাও কি মুজেযা হবে নাকি ইবলিসের ধোকায় পড়ে প্রতারিত হয়েছে বলে গণ্য হবে? যদি ১৯ সংখ্যার মিরাকেল মুজেযা না হয়, তবে এর ওপর ভিত্তি রেখে সাজানো বক্তব্যের ৩ সংখ্যার মিরাকেল কী হবে? তাছাড়া তার এ বক্তৃতাও কী আল্লাহর কথা বলে বিবেচিত হবে? অথচ তাদের দাবিই হলো ‘এর দ্বারা আল্লাহ এটাই প্রকাশ কোরছেন যে, ‘ঐ ভাষণে যে কথাগুলো বলা হোয়েছে এগুলো যে মানুষটি বোলেছেন তাঁর স্বরচিত মনগড়া কথা নয়, এগুলো আমারই (আল্লাহর) কথা এবং তিনি আমার মনোনীত ব্যক্তি।’[20]

পাঠক! এটা কি কুফুরি ছাড়া আর কিছু হতে পারে? তাছাড়া আপনি যদি তার মুজেযার বক্তব্যটা পড়েন, তবে অনেক ত্রুটিই আপনার চোখে পড়বে, সেটা ভাষাগত দিক থেকে হোক কিংবা উচ্চারণগত দিক থেকে। এসব ত্রুটিপূর্ণ কথা কি কখনো আল্লাহর কথা বলে বিবেচিত হতে পারে? মানলাম আল্লাহর কথা! তবে কি তার ওপর ওহি এসেছিল? আচ্ছা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি কখনো তার কথা আল্লাহর কথা বলে দাবি করেছিলেন, না ‘إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى’ বলে আল্লাহ তাআলাই তা ওহি বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন? তবুও রাসুল কি তার কোনো কথাকে মুজেযা বলে দাবি করেছিলেন? রাসূলের হাদীস পড়লে কি সেখানে ভাষাগত বা উচ্চারণগত কোনো ত্রুটি অনুধাবিত হয়? যদি নাই হয়ে থাকে, তবে পন্নীর এ ত্রুটিপূর্ণ কথা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় কী করে আর তা মুজেযা বলে গণ্য হয় কী করে? তার বক্তব্য আল্লাহর কুরআনের ন্যায় হয় কী করে[21] এ ব্যপারে সন্দেহকারী মুনাফিক  হয় কী করে![22]  আর এ আকিদা পোষণকারীর ঈমান থাকে কী করে?

আল্লাহ তায়ালা তার রাসুলের কথাকে তার স্বরোচিত কথা না বরং তিনি যা বলেন তা ওহি-ই—বলে স্বীকৃতি দেওয়ার পরও তিনি নিজের কথাকে মুজেযা হিসেবে গণ্য করলেন না, আর একজন ফাসিক ও পাপাচারী ব্যক্তি নিজের বক্তব্যকে আল্লাহর বক্তব্য বলে মুজেযা গণ্য করল, এটা কী হাস্যকর ছাড়া আর কিছু হতে পারে? তাছাড়া সে যে তার বক্তৃতাকে তিন সংখ্যার মিরাকেলে বাধা বলে যে দাবি করেছে, তাওতো অপরিপূর্ণ। কেননা সে বক্তৃতায় ডাইরেক্টলি বলেছে ২ বার, আল্লাহর শোকর বলেছে ২ বার, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বলেছে ২ বার, উম্মতে মুহাম্মদী বলেছে ৭ বার, হেযবুত তওহীদ বলেছে ৪ বার, আল্লাহ শব্দ বলেছে ১৭ বার আর আমি নবী রাসুল নই বলেছে ২ বার। যদি এভাবে হিসেব করা হয়, তবে তো আরো অমিল বের হবে। তো মিরাকেল ঠিক থাকল কই?

মূলকথা হলো সংখ্যা কখনো মুজেযা হতে পারে না। যদি এটাকে মুজেযা বলেই বিশ্বাস করি, তবে হয়ত কাদিয়ানিরাও মুরতাদ গোলাম গোলাম আহমাদের কোনো কথাকে আপনাদের সামনে এভাবে হাজির করবে। শুধু যে কাদিয়ানি তা নয়, বরং ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা অসংখ্য ভ্রান্ত ও কুফুরি ফিরকা নিজেদের বক্তব্য ও লিখনিকে এভাবে সাজিয়ে তা মুজেযারূপে প্রচার করে জনগনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। যেমন করেছে বায়াজীদ খান পন্নী। আল্লাহ তাআলা আমাদের সহিহ বুঝ দান করুন।

 

[1] মিরকাতুল মাফাতিহ শরহে মিশকাতুল মাসাবিহ—১১/৩

[2] দলিলুল ফালিহিন লিতুরুকি রিয়াযিস সালিহিন—৭/৩৩৩

[3] লাওয়ামিউ আনওয়ারিল বাহিয়্যাহ ওয়া সাওয়াতিয়িল আসরারিল আছরিয়্যাহ—২/২৯০

[4] লাওয়ামিউ আনওয়ারিল বাহিয়্যাহ ওয়া সাওয়াতিয়িল আসরারিল আছরিয়্যাহ—২/২৯০

[5] দলিলুল ফালিহিন লিতুরুকি রিয়াযিস সালিহিন—৭/৩৩৩

[6] মিরকাতুল মাফাতিহ—১১/৩ , দলিলুল ফালিহিন লিতুরুকি রিয়াযিস সালিহিন—৭/৩৩৩

[7] শরহুস শিফা—৫২৬

[8] আত-তা’রীফাত—২২৫

[9] দলিলুল ফালিহিন লিতুরুকি রিয়াযিস সালিহিন—৭/৩৩৬

[10] আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা: পৃ. ১১-১৪—মো’জেজার ৪র্থ বর্ষ উপলক্ষে ১৪৩৩ মোতাবেক ২০১১ সালে প্রকাশি বই থেকে।

[11] আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা: পৃ. ২৫—মো’জেজার ৪র্থ বর্ষ উপলক্ষে ১৪৩৩ মোতাবেক ২০১১ সালে প্রকাশি বই থেকে।

[12] আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা: পৃ. ৭৫-৭৬—মো’জেজার ৪র্থ বর্ষ উপলক্ষে ১৪৩৩ মোতাবেক ২০১১ সালে প্রকাশি বই থেকে।

[13] আবহাছ ফি উলুমিল কুরআন—২৬৯, আল বয়ান ফি ই’জাজিল কুরআন—৩৬৮-৬৯ ও উইকিপিডিয়া।

[14] আবহাছ ফি উলুমিল কুরআন—২৬৯, আল বয়ান ফি ই’জাজিল কুরআন—৩৬৯

[15] আল বয়ান ফি ই’জাজিল কুরআন—৩৬৯

[16] তিসআতা আশারা মালাকান—১৭৩

[17] আল বয়ান ফি ই’জাজিল কুরআন—৩৭০

[18] তিসআতা আশারা মালাকান—৩১-৩৮, ‘১৯ রকম শিয়ারুল বাহায়িয়্যাহ’ অধ্যায় দ্রষ্টব্য।

[19] https://bn.m.wikipedia.org/wiki/কুরআনের_সংখ্যাগত_বিশ্লেষণ

[20] আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা: পৃ. ২৪—মো’জেজার ৪র্থ বর্ষ উপলক্ষে ১৪৩৩ মোতাবেক ২০১১ সালে প্রকাশি বই থেকে।

[21] আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা: পৃ. ৩৩

[22] আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা: পৃ. ৬৩-৬৪

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: