দরবেশ মুজাহিদ | আহমাদ উসমান

দরবেশ-মুজাহিদ

এককালে তিন মহাদেশে রাজত্ব করা ইসলামবুলের খিলাফতে উসমানীয়্যাহর পতন ঘটলো। ফলস্বরূপ কাফেরদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে প্রতিরোধ গড়ে তুলার মতো সর্বশেষ রাষ্ট্রটিরও সমাপ্তি হলো। তা সত্ত্বেও মুসলিম জাতির জিহাদি চেতনায় কোন ভাটা পড়লো না, ঐতিহ্যের সন্ধানীরা আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বেরিয়ে পড়লো। তার মধ্যে অন্যতম হলেন সোমালিয়ায় সাইয়েদ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ হাসান রাহিমাহুল্লাহ- এর দরবেশ আন্দোলন।

তখন পৃথিবীজুড়ে ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর ঔপনিবেশিকতার রোগ মাথা চড়া দিয়ে উঠে। মিশর, লিবিয়া, সুদান ও আলজেরিয়া থেকে সমগ্র আফ্রিকা সাম্রাজ্যবাদীদের উপনিবেশের শিকার হয়। আফ্রিকার অন্যান্য দেশগুলোর মতো সোমালিয়াও এ সময় শিকার হয় ইটালি ও ব্রিটিশদের উপনিবেশে।

সোমালিয়াতে আবিসিনিয়ান সাম্রাজ্য বিস্তারের দ্বারা এবং পাশাপাশি পূর্ব আফ্রিকাতে ক্রুসেডার দখলদারিত্ব ছিল একটি মিশনারী তৎপরতা। যা সাইয়েদ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে সোমালিয়ার জনসাধারণের একটি জনপ্রিয় গণজাগরণের অগ্রবাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিল। সাইয়েদ মুহাম্মাদ বহন করেছিলেন জিহাদের পতাকা এবং সামরিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তিনি খ্রিস্টান সাম্রাজ্যবাদীদের নিরস্ত্র করেছিলেন।

সাইয়েদ মুহাম্মাদ প্রথম তার সংগ্রাম শুরু করেন বারবারা বন্দর নগরীতে। যেখানে তিনি দেখেছিলেন যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিম শিশুদের বাইবেল শিক্ষা দিচ্ছিল। যা দেখলেন, তাতে গভীরভাবে উদ্বীগ্ন হলেন; একটি পাথর উঠিয়ে তিনি তা এক ব্রিটিশ সৈনিকের দিকে নিক্ষেপ করলেন। সেই কাফিরের দিকে পাথর ছুড়ে মারার পর সাইয়েদ মুহাম্মাদ নিজেকে বললেন, ‘হে আল্লাহ, আজকে আমি এতটুকুই করার সামর্থ্য রাখি।’ আর সেই পাথরই ছিল সাইয়েদের জিহাদের সূচনা।

সাইয়েদ প্রথমে বেশ কদিন বারবারাতে নিরবচ্ছিন্ন দ্বীনি মেহনত চালালেন। তিনি গ্রামের সর্বত্র নিজ মুরিদ এবং দরবেশদের ছড়িয়ে দিলেন। তারা গ্রামের বাচ্চাদের দ্বীন শিখানো শুরু করে, গ্রামের মানুষদেরকে দখলদার ব্রিটিশ এবং তাদের ছত্রছায়ায় গেড়ে বসা মিশনারীদের ব্যপারে সচেতন করে তুলেন। তার দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে বিশাল একদল লোক দরবেশ আন্দোলনের সাথে জুড়ে যায়। ইতিমধ্যে ব্রিটিশদের দৃষ্টিগোচর হয় অঞ্চলে সাধিত হওয়া এই নিরব বিপ্লব। তারা প্রথমে গ্রামের কিছু পরিবারের উপর হামলা করে এবং সম্পদ লুন্ঠন করে নিয়ে যায়। সাইয়েদ হাসানের সামনে এ-র কারণ স্পষ্ট হয়ে যায়।

তিনি একদল ধর্মপ্রাণ ও দরবেশ মানুষদের সাথে নিয়ে বারবারা শহর ত্যাগ করেন। পথে দাইমুল নামের এক গ্রাম অতিক্রম করছিলেন। সেই গ্রামে ব্রিটিশদের পরিচালিত একটি মিশনারী স্কুল ছিল, যেখানে ছোট ছোট সোমালী বাচ্চাদের পড়ানো হত। সাইয়েদ এক বাচ্চাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি? বাচ্চাটি উত্তর দিলো, জন ফাদার। সাইয়েদ তখন তাকে আসল নাম জিজ্ঞেস করলেন। সে উত্তর দিল, মুহাম্মাদ।

মর্মাহত হতভম্ব অবস্থায় সাইয়েদ তার সাথীদের দিকে লক্ষ্য করে বললেন, মানুষ কিভাবে খ্রিস্টান হয়ে যাচ্ছে, তা কি তোমরা দেখছ না? সাইয়েদ বেশিক্ষণ অপেক্ষা করেননি, এখানে তিনি মুসলিমদের উদ্দীপ্ত করতে লাগলেন। তিনি তাদের জেগে উঠার ও আগ্রাসী কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আহবান জানালেন। প্রকৃতপক্ষে এই আন্দোলন এমন এক বৃহত্তম আন্দোলন, যা মুসলিম ভূখণ্ডসমূহকে বিভক্ত করার এবং মুসলিমদের খ্রিস্টান বানানোর নীলনকশা ও তাদের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করার একটি নিষ্পত্তিমূলক ফ্যাক্টর হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল।

এমনকি বিশেষভাবে এটি ১৮৮৪ সালের বার্লিন কনফারেন্সের ফলাফলকে ব্যাহত করে দেয়। সাইয়েদ মুহাম্মাদ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের মোকাবেলায় দৃঢ়পদ ছিলেন। তিনি সোমালিয়া ও বৃহত্তর পূর্ব আফ্রিকাতে সাম্রাজ্যবাদীদের লক্ষ্য অর্জনে বাঁধা দিয়েছিলেন এমন এক সময়ে যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তার শক্তির সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করছিল।

দরবেশরা যুদ্ধের জন্য সোমালিয়াজুড়ে অনেক দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন যেমন, তালিহ, এয়িল ও বেলেদ উয়েইন দুর্গ। সাইয়্যেদ মোহাম্মদ অল্পকিছু সাথী নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী কাফিরদের বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন, তার মধ্যে ছিল জিদবালে যুদ্ধ, আফ বাকাইলে, দারাতোলে ও বেলেদ ওয়েনে যুদ্ধ, ১৯১৩ সালের এযুদ্ধে নিহত হয়েছিল ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন রিচার্ড করফিল্ড। ১৯১৭ সালের দিকে দরবেশরা বেশকিছু শহর, গ্রাম দখল করে ইসলামি ইমারাত প্রতিষ্ঠা করে।

এসব অঞ্চল থেকে ব্রিটিশদের লাঞ্চনার সাথে বিতাড়িত করা হয়েছিল। উপনিবেশ বিরোধী এই বিপ্লবের আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পুরো উত্তর আফ্রিকায়। সোমালিয়া থেকে ব্রিটিশ ও ইটালীয়রা পিছু হটতে বাধ্য হয়। ইমারতের আমীর নির্ধারিত হন সাইয়েদ হাসান। পাশাপাশি স্বীকৃতি পায় তুর্কি খিলাফত থেকে। সাইয়েদ পুরো ইমরাতের ভূমিতে পূর্ণাঙ্গ শরীয়াহ শাসন প্রতিষ্ঠিত করেন। মৃত্যু পর্যন্ত দক্ষতার সাথে আপন দায়িত্ব পালন করে যান। জীবনের শেষ দিকে মহামারী রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। কিছুদিন পরই আমীর সাইয়েদ হাসান ১৯২০ সালে ডিসেম্বর মাসে মৃত্যুবরণ করেন। ইতি ঘটে এক সংগ্রামমুখর জীবন অধ্যায়ের। রহিমাহুল্লাহ।

এটা স্পষ্ট যে, সাইয়েদ আব্দুল্লাহ হাসানের দরবেশ আন্দোলন সোমালিয়ায় চূড়ান্তভাবে উপনিবেশ শাসনকে নির্মূল করতে সমর্থ হয়নি কিন্তু এর নীরব অথচ সুদূরপ্রসারী বৃহৎ এক অর্জন ছিল সোমালিয়ার মুসলমানদের দ্বীন ও ইমানকে ইরতিদাদ থেকে রক্ষায় সফল হওয়া। যার ফলে সোমালিয়ায় সাম্রাজ্যবাদীদের ইসলামকে মুছে দেয়ার প্রকল্প ধ্বংস হয়ে যায়। ভেস্তে যায় তাদের দীর্ঘদিন ধরে দ্বীনের আলোকে মুখের ফুৎকারে নিভিয়ে দেয়ার লালিত স্বপ্ন।

যুগে যুগে এভাবেই আল্লাহ তার কিছু মুখলিস বান্দাদের মাধ্যমে বিভিন্ন ভূমিতে দ্বীনকে রক্ষা করেছেন। অব্যাহত রেখেছেন তাওহীদের আযান।যাদের মাধ্যমে রচিত হয়েছে ইজ্জত ও সম্মানের ইতিহাস। আজও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্তরে যারা পৃথিবীর অশুভ শক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বীরদর্পে লড়াই করে যাচ্ছে তারাই হলো সাইয়েদ মুহাম্মাদের মতো অসংখ্য সাহসী বীরের উত্তরসূরী।

Facebook Comments