মজলুম বন্দীর জন্য সুপারিশ | ইমরান রাইহান

imran
নিজেদের সীমান্ত অতিক্রম করে হিমস শহরে আক্রমন চালালো রোমানরা। হত্যা ও লুটপাট শেষে অনেক মুসলমানকে বন্দী করে নিয়ে গেল তারা। দামেশকে বসে এই সংবাদ পেলেন সুলাইমান বিন আবদুল মালিক। তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন তিনি। ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে উঠলেন, আমি হয় কনস্টান্টিনোপল জয় করবো নইলে মারা যাব। দ্রুত নিজের ভাই মাসলামা বিন আবদুল মালিককে নির্দেশ দিলেন সেনাবাহিনী গঠন করতে। বিভিন্ন শহর থেকে সংগ্রহ করা হলো সেনা। মিসরের গভর্নরকে নির্দেশ দেয়া হলো জাহাজ পাঠাতে। বিশাল বাহিনী নিয়ে মাসলামা বিন আবদুল মালিক রওনা হলেন কনস্টান্টিনোপলের পথে। কনস্টান্টিনোপল পৌঁছে এই শহর অবরোধ করেন তিনি। ইতিমধ্যে দামেশকে ইন্তেকাল করলেন সুলাইমান বিন আবদুল মালিক। মসনদে বসেন উমাইয়া আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক ওমর বিন আবদুল আযিয। সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করে মাসলামাকে ফিরে আসার নির্দেশ দেন তিনি। (১)
মাসলামা ফিরে এলেন বটে, কিন্তু তার অভিযানের মূল উদ্দেশ্য একেবারে ব্যহত হয়নি। তিনি অনেক বন্দীকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। একদিন তিনি একজন রোমানকে বন্দী করেছিলেন। পরে দুজন মুসলমান বন্দী কে মুক্ত করার বিনিময়ে তাকে তিনি মুক্তি দেন। (২)
ওমর বিন আবদুল আযিয ক্ষমতায় বসে বন্দী মুক্ত করার বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। পূর্ববর্তী খলিফাদের সময় যেসব মুসলমানরা রোমানদের হাতে বন্দী হয়েছিল যেকোনো মূল্যে তাদের মুক্ত করতে তিনি ছিলেন মরিয়া। আবদুর রহমান বিন আবি আমরাকে তিনি কনস্টান্টিনোপল পাঠালেন বন্দী মুক্তি বিষয় আলোচনা করতে। আবদুর রহমান বললেন, আমি বলবো আমাদের একজনের বিনিময়ে তাদের একজনকে মুক্তি দেয়া হবে। কিন্তু তারা যদি এতে রাজি না হয়? ওমর বিন আবদুল আযিয বললেন, তাহলে তাদের সংখ্যা বাড়াবে। তাদের দুজন আমাদের একজন। আবদুর রহমান বললেন, যদি তারা এতেও রাজি না হয়? যদি তারা বলে আমাদের একজনের বিনিময়ে তাদের ৪ জনকে মুক্তি দিতে হবে। খলিফা বললেন, তারা যা চায় মেনে নিবে। আল্লাহর কসম, আমাদের হাতে যত মুশরিক আছে, তাদের সবার চেয়ে একজন বন্দী মুসলিম আমার কাছে অনেক বেশি প্রিয়। আবদুর রহমান কনস্টান্টিনোপল গেলেন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শেষে উভয়পক্ষে একটি চুক্তি হলো। এই চুক্তি অনুসারে একজন মুসলমানের বিনিময়ে দুজন রোমানকে মুক্তি দিল উমাইয়া প্রশাসন। এভাবে রোমানদের হাতে বন্দী থাকা মুসলমানরা মুক্ত হলেন। (৩)
ওমর বিন আবদুল আযিয এই দূতের সাথে বন্দী দের উদ্দেশ্য করে একটি পত্রও পাঠিয়েছিলেন যেখানে তিনি তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন, তোমাদের সকল পুরুষ ও মহিলা, বয়স্ক ও শিশুকে মুক্ত করা হবে ইনশাআল্লাহ। (৪)
ওমর বিন আবদুল আযিয শুধু রোমানদের হাতে থাকা মুসলমানদের মুক্ত করেই ক্ষান্ত হননি। জর্ডানের উপকূলে কিছু মুসলমান বন্দী ছিল। তিনি তাদেরকেও মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। রবিআ বিন আতাকে অনেক অর্থ দিয়ে তিনি জর্ডান পাঠান এবং তাদের মুক্ত করেন। বন্দী মুক্ত করার ক্ষেত্রে খলিফা এতটাই আগ্রহী ছিলেন যে, একজন বন্দী মুসলমানের মুক্তির বিনিময়ে তিনি দশজন খ্রিস্টানকে মুক্তি দেন। (৫)
বন্দী দের মুক্ত করার জন্য খলিফা ওমর বিন আবদুল আযিয একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। যখনই খবর পেতেন কোথাও কোনো মুসলমান বন্দী হয়েছে তখনই তাকে মুক্ত করার চেষ্টা চালাতেন। একবার খলিফার দূত গেলেন কনস্টান্টিনোপলে। একদিন শহরের রাস্তায় হাঁটার সময় তিনি দেখলেন একজন অন্ধ ব্যক্তি রাস্তার পাশে গম চূর্ন করছে এবং কোরআন তিলাওয়াত করছে। দূত তাকে সালাম দিলেন। লোকটি কোনো জবাব দিল না। দুত এভাবে তিনবার সালাম দিলেন। শেষে লোকটি বললো, এই দেশে সালাম আসলো কোথেকে? দূত বললেন, আপনার বৃত্তান্ত কী ? আমাকে খুলে বলুন। লোকটি বললো, আমাকে রোমানরা বন্দী করে সম্রাটের সামনে নিয়ে আসে। সম্রাট আমাকে প্রস্তাব দেয় তাদের পক্ষে থেকে সাহায্য করতে। আমি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে আমাকে অন্ধ করা হয়। আমাকে প্রতিদিন গম দেয়া হয় তা চূর্ন করার জন্য। বিনিময়ে খাবারের রুটি দেয়া হয়। দূত দামেশকে ফিরে খলিফাকে বিস্তারিত জানালেন। খলিফা এই মর্মান্তিক ঘটনা শুনে কান্না করতে থাকেন। তিনি এতবেশি কান্না করেন যে তার পুরো চেহারা ভিজে যায়। তিনি তখনই রোমান সম্রাটের উদ্দেশ্যে পত্র লিখেন। পত্রের ভাষ্য ছিল, আমার কাছে সংবাদ এসেছে আপনি এমন একজন ব্যক্তিকে বন্দী করে রেখেছেন। দ্রুত তাকে মুক্তি দেন। নইলে আমি এমন বাহিনী পাঠাবো যার অগ্রভাগ থাকবে আপনার শহরে আর পেছনের অংশ থাকবে আমার শহরে। খলিফার এই পত্র পেয়ে রোমান সম্রাট ওই ব্যক্তিকে মুক্তি দিয়ে খলিফার কাছে পাঠিয়ে দেন। (৬)
খলিফা ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিক ও তার ভাই হিশাম বিন আবদুল মালিকের সময়ও যুদ্ধের মাধ্যমে অনেক বন্দী কে মুক্ত করা হয়। তারা রাজনৈতিক আলোচনার পরিবর্তে যুদ্ধের মাধ্যমে বন্দী উদ্ধারে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন।
উমাইয়াদের পর মসনদে এলো আব্বাসিরা। তাদের সময়ও রোমানদের সাথে যুদ্ধ লেগেই থাকতো। এসব যুদ্ধে দুপক্ষের অনেকে বন্দী হতো। উভয় পক্ষই চেষ্টা চালাতো নিজেদের বন্দীদের মুক্ত করতে। তবে মুসলমানরা এক্ষেত্রে ছিল অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। তারা চাইতো যে কোনো মূল্যে নিজেদের বন্দী মুক্ত করতে। এজন্য তারা সর্বোচ্চ ছাড় দিতেও দ্বিধা করতো না। শুরু থেকেই আব্বাসি খলিফারা বন্দী মুক্ত করার বিষয়ে ছিলেন আন্তরিক। খলিফা আবু জাফর মানসুর একবার খবর পেলেন উমাইয়া আমলে কিছু মুসলমান আর্মেনিয়ায় বন্দী হয়েছিলেন। আবু জাফর মানসুর দ্রুত তাদেরকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। ১৩৯ হিজরিতে তিনি আর্মেনিয়া থেকে সকল মুসলমানকে মুক্ত করেন। (৭)
১৮৯ হিজরিতে খলিফা হারুনুর রশিদও রোমানদের হাত থেকে অনেক বন্দীকে মুক্ত করেন। (৮) খলিফা মামুনও পিতার অনুসরণ করেছেন। ২০১ হিজরিতে তিনি অনেক বন্দীকে মুক্ত করেন। (৯)
মামুনের পর এলেন মুতাসিম। মুতাযিলা মতবাদ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে তিনি ছিলেন পরিচিত। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের মত জগদ্বিখ্যাত আলেম তার হাতে হন নির্যাতিত। কিন্তু তিনিও মুসলমান বন্দী মুক্তির ক্ষেত্রে ছিলেন খুবই সোচ্চার। এমনকি তিনি আম্মুরিয়াতে বড় একটি যুদ্ধই পরিচালনা করেছিলেন বন্দী দের উদ্ধারের জন্য। (১০)
এখানে অল্পকিছু উদাহরণ দেয়া হলো মাত্র। মুসলিম শাসকরা বন্দী মুক্ত করার ক্ষেত্রে ছিলেন খুবই সচেষ্ট। তারা নবিজির এ নির্দেশনাকে সামনে রেখেছিলেন, যেখানে নবিজি বলেছেন, তোমরা রোগি দেখতে যাও, ক্ষুধার্তকে খাবার দাও এবং বন্দীকে মুক্ত করো। (১১)
ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন, মুসলমানদের উপর আবশ্যক হলো তাদের বন্দীদের মুক্ত করা, যদি এজন্য তাদের সম্পদ ব্যয় করতে হয় তাহলে তাও করতে হবে। (১২)
বন্দী মুক্ত করার বিষয়ে শুধু শাসক নন, এগিয়ে এসেছিলেন আলেমরাও। ইমাম আউযায়ি এক দীর্ঘ পত্র লিখে খলিফা আবু জাফর মানসুরকে বন্দী মুক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। (১৩) ইয়াকুব বিন দাউদ নামে আরেকজন আলেম খলিফা মাহদিকে নসিহত করেছিলেন বন্দী মুক্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে। (১৪) আহমাদ বিন ইসহাক ছিলেন নিজের সময়ের বিখ্যাত আলেম। খলিফা মামুন নানা সময় তাকে অনেক কিছু হাদিয়া দিলেও তিনি কিছুই গ্রহণ করেননি বরং সব ফিরিয়ে দিয়েছেন। (১৫) আহমাদ বিন ইসহাক প্রায়ই টাকা জমিয়ে শত্রুদের এলাকায় সফর করতেন এবং সেখান থেকে মুসলিম বন্দীদের কিনে এনে মুক্ত করে দিতেন। একবার তিনি তার বন্ধু ইবরাহিম বিন শাশকে পত্র লিখলেন, চলো সফরে যাই। তারপর তারা সফরে গেলেন এবং বেশ কজন মুসলমান বন্দীকে মুক্ত করে নিয়ে এলেন। (১৬)
আবু হাফস আমর ছিলেন খোরাসানের বিখ্যাত সুফি আলেম। মুসলিম বন্দীকে ক্রয় করে মুক্ত করার কাজে তিনি ছিলেন খুবই প্রসিদ্ধ। একবার তিনি একদিনে ১২ জন বন্দীকে ক্রয় করে মুক্ত করে দেন। (১৭) আবুল আব্বাস আহমাদ বিন মুহাম্মদ তো এইকাজে আরো বেশি এগিয়ে যান। একদিন তিনি নিজের হাতে থাকা সকল অর্থ দান করে দেন দাইলামে বন্দী থাকা মুসলমানদের মুক্ত করার জন্য। সেদিন সন্ধ্যায় আহার করার মতো অর্থও তার কাছে ছিল না, ফলে তিনি ক্ষুধার্ত থাকেন। (১৮)
মুহাম্মদ বিন হাসান বিন আইয়ুব মৃত্যুকালে তার সকল সম্পদ ওয়াকফ করে যান। তিনি অসিয়ত করে বলেন, এই অর্থের একটা অংশ ব্যয় করতে হবে মুসলমান বন্দীদের মুক্ত করার কাজে। (১৯) মাসউদ বিন নাসের বিন আবু যায়দ ছিলেন নিশাপুরের শীর্ষ মুহাদ্দিসদের একজন। তিনি আকিল মসজিদের জন্য নিজের বইপত্র ওয়াকফ করে দেন। তিনি বলে দেন, যারা এসব বই থেকে ইলম অর্জন করবে তারা যেন অর্থের একটা অংশ বন্দি মুক্ত করার কাজে ব্যয় করে। (২০) মুহাম্মদ বিন আলি বিন আহমাদ অনেক এলাকা সফর করে মুসলিম বন্দিদের মুক্ত করেন। (২১)
বন্দিকে মুক্ত করার কাজে পুরুষের পাশাপাশি এগিয়ে এসেছিলেন মহিলারাও। এমনই এক নারী স্পেন বিজেতা মুসা বিন নুসাইরের আম্মা। তিনি ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তার সামনে একজন রোমান সেনা একজন মুসলমান মুজাহিদকে বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছিল। এই দৃশ্য দেখে তিনি রোমান সেনাকে আঘাত করে হত্যা করেন এবং সেই মুসলমানকে মুক্ত করেন। (২২) খলিফা মুকতাদির বিল্লাহর আম্মা অনেক হাসপাতাল ও খানকাহ নির্মান করেছিলেন। তিনি সামাজিক কাজে অনেক অর্থ ওয়াকফ করেছিএলন। তার বিশেষ নির্দেশ ছিল, এই অর্থের একটা অংশ ব্যয় করতে হবে সেসব বন্দিদের জন্য যারা নিজেরা নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না। (২৩) সফিয়্যা বিনতে মালিকুল আদিল ছিলেন হালাবের প্রভাবশালী আমিরের স্ত্রী। তিনি অনেক মাদরাসা নির্মাণ করেছিলেন। ৬৩৩ হিজরিতে নিজ উদ্যোগে তিনি অনেক মুসলমান বন্দিকে কাফেরদের হাত থেকে উদ্ধার করেন এবং মুক্ত করে দেন। (২৪)
ক্রুসেড চলাকালেও মুসলমানরা বন্দি মুক্ত করার দিকে দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ মনোযোগ। দামেশকের শাসক তুগতেকিন এক চুক্তির মাধ্যমে ক্রুসেডারদের হাত থেকে ৫০০ মুসলমানকে মুক্ত করেন। (২৫) সুলতান নুরুদ্দিন জেংগি ৫৫৯ হিজরিতে এন্টিয়কে বন্দী থাকা অনেক মুসলমানকে মুক্ত করেন। (২৬) সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবিও অনুসরণ করেছেন নুরুদ্দিন জেংগিকে। মিসর গমনের পর থেকে তিনি মুসলিম বন্দি মুক্তির বিষয়টিতে দিয়েছিলেন সতর্ক দৃষ্টি। ৫৭৫ হিজরিতে তিনি যখন বানিয়াস আক্রমন করেন তখন সেখান থেকে প্রায় ৭০০ মুসলমানকে মুক্ত করেন। (২৭)
শুধু শাসক, আমির কিংবা আলেম নয়, বরং সাধারণ মানুষও বন্দি মুক্ত করার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতেন সে সময়। দামেশকের বিখ্যাত ফকিহ যিয়াদ বিন আবি যিয়াদ যখন বন্দি হন, তখন শহরের সাধারণ মানুষ চাঁদার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তাকে মুক্ত করেছিল। (২৮) আন্দালুসের বিখ্যাত পর্যটক ইবনে যুবাইর যখন দামেশকে সফর করেছিলেন তখনও তিনি এমন দৃশ্য দেখেছিলেন। তিনি দেখেছেন শহরের ধনী ও ব্যবসায়িরা নিজেদের অর্থ ব্যয় করে কুফফারদের হাত থেকে মুসলমান বন্দিদের মুক্ত করায় সচেষ্ট। (২৯) নাসরুদ্দিন মানসুর ছিলেন সিরিয়ার বিখ্যাত ব্যবসায়ি। নিজের অর্থের বড় অংশ তিনি ব্যয় করতেন বন্দি মুক্ত করার কাজে। (৩০)
ইতিহাসের পাতায় এমন শত সহস্র বর্ননা বিদ্যমান যা থেকে স্পষ্ট হয় মুসলমানরা কতটা গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের বন্দি ভাইবোনদের উদ্ধার করতেন। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো বর্তমান সময়ে এসে এই বিষয়টি আমাদের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে। দেশের কারাগারগুলোতে হাজার হাজার নির্দোষ মানুষ কারাভোগ করছেন। মিথ্যা মামলা ও সাজানো নাটকের বলি হচ্ছে অনেকে। ভুগছে তাদের পরিবার আত্মীয়স্বজন। আইনি লড়াই চালিয়ে নেয়ার মত সামর্থ্য নেই অনেকের। দিনের পর দিন কাটছে কারাগারের বিষন্নতায়। একদিকে তারা ভুগছেন কারাগারের ভেতরে। অপরদিকে অনেকের পরিবারের নেই সামর্থ্য। মামলা চালানো পরের কথা, দুমুঠো অন্নের যোগান দেয়াটাই হয়ে উঠছে অসম্ভব। পরিবারের উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা বাবা-মা, স্বামীকে হারিয়ে পেরেশান স্ত্রী।
এমন দৃশ্য একটি দুটি নয় শত শত। সব আমাদের সামনে আসে না। এক দুটো আসে। দুয়েকদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা ব্যস্ত থাকি। দুয়েকদিন পর আবার আমরা ভুলে যাই। পরিবারগুলোর দুখের সফর আরো দীর্ঘ হতে থাকে।
মাজলুম বন্দি ও তাদের পরিবার নিয়ে আমাদের সুচিন্তিত পদক্ষেপ জরুরী। মাজলুমদের দীর্ঘশ্বাস আরো দীর্ঘ হওয়ার আগেই প্রয়োজন সুচিন্তিত পদক্ষেপ। কোনো দল-মত-ঘরানার চিন্তা না করে দ্বীনের জন্য যারাই কাজ করতে গিয়ে বন্দি হচ্ছেন হবেন, সবার পাশে দাঁড়ানো আমাদের একান্ত কর্তব্য। ইসলামিক দলগুলো টুকটাক কিছু কাজ করে থাকে, কিন্তু বেশিরভাগ সময় নিজের দল বা ঘরানার বাইরের ব্যক্তিকে সাহায্য করতে চায় না তারা। এমন অনেক আলেম কারাগারে আছেন, যাদেরকে হক কথা বলায় কারাগারে নেয়া হয়েছে, আইনি লড়াই চালানোর সামর্থ্য তাদের নেই, আবার নির্দিষ্ট কোনো দল করেন না বলে কেউ তাদের পাশেও নেই। এই অচলাবস্থার অবসান জরুরী।
অবশ্যই শক্ত কোনো ব্যবস্থা থাকা দরকার যা মাজলুমদের আইনি ও আর্থিক সহায়তা দিবে।
তাদেরকে মুক্ত করার পাশাপাশি তাদের পরিবারের নুন্যতম প্রয়োজন মেটানোর ফিকির করবে।
তবে এক্ষেত্রে নিজেরা হুটহাট কোনো সিদ্ধান্ত বা কাজ করা উচিত হবে না। উত্তেজিত ভুল সিদ্ধান্ত অনেক সময় পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলতে হবে। সুযোগ সন্ধানীরা অর্থ লোটার সুযোগ কাজে লাগাতে দাঁড়িয়ে আছে এক পায়ে। ইতিমধ্যে তাদের অনেকে সক্রিয় হয়ে উঠেছেও। তাই যাকে তাকে টাকা না দেই, যেখানে সেখানে যোকোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে না বসি। বড় কোনো দলের প্রধান, বড় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, কোনো ঘরানার মুখপাত্র, কেন্দ্রিয় মসজিদের খতিব, এই ধরণের ব্যক্তিত্বদের সাথে আমরা আলাপ শুরু করি। এই বিষয়ে তাদের মতামত চাই। নিজেরা সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তাদেরকে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করি। এমন যেন না হয় নিজেরা অনেক হৈ চৈ করলাম, কিন্তু যখন তারা কোনো সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন আর কাউকে পাওয়া গেল না। সিনিয়রদের সাথে বারবার আলোচনা করি, প্রত্যাশার চাপ তাদেরকে অনুভব করতে দেই।
যে যেখানে আছি আলাপ শুরু করি। মুরব্বিদের সাথে যোগাযোগ বাড়াই। তাদের হাত ধরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসলে অনেক সহজ হয়ে যাবে। আমরা বিক্ষিপ্তভাবে সিদ্ধান্ত নিলে দেখা যাবে, এক মামলার পেছনে ৫ গ্রুপ পরিশ্রম দিচ্ছে এবং বিষয়টি আরো জটিল করে তুলছে।
আপাতত, নিজেরা অপরিচিত কাউকে কোনো প্রকার আর্থিক তহবিল না দেই। যদি বিশ্বস্ত কেউ সত্যায়ন করে তাহলে দিতে পারি। ইসলামি আন্দোলন, হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, জামায়াতে ইসলামিসহ অন্য ইসলামি ঘরানার সর্বোচ্চ পদে যারা আছেন তাদের কাছে আমরা এই আহ্বান ছড়িয়ে দেই। তারা পদক্ষেপ নিলে অনেক কিছু সহজ হবে ইনশাআল্লাহ। বিভিন্ন সময় চরমোনাই ঘরানার যারা ইসলামি আন্দোলন করতে গিয়ে বন্দি হয়েছেন তাদের কেউই এখন আর কারাগারে নেই। কিছুদিন আগে বাইতুল মোকাররম থেকে গ্রেফতার ছাত্রদেরকেও অল্প সময়ে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে সক্রিয়তার কারণে। হ্যা, সব মামলায় হয়তো এত সহজে সমাধা করা যাবে না, বা মুক্ত করা যাবে না। কিন্তু আমাদের চেষ্টা তাদের জীবনের বেদনাকে কমাতে পারবে অবশ্যই। তাদের পরিবারগুলো অন্তত একা হয়ে পড়বে না। তারা অন্তত এটুকু অনুভব করবে, আল্লাহর কিছু বান্দা কাজ করে যাচ্ছেন।
আল্লাহ মাজলুমদের সহায় হোন। আমাদেরকেও তাদের সাহায্য করার তাওফিক দিন।
টীকা
১। ফাওয়াতুল ওফায়াত, ২/৭০।
২। আল মুন্তাজাম, ৬/২৭১।
৩। আল আওসাত ফিস সুনানি ওয়াল ইজমা ওয়াল ইখতিলাফ, ৬/১৫০।
৪। বাদাইউস সিলক ফি তবায়িইল মুলক, ৬/১৫৯।
৫। আত তবাকাতুল কুবরা, ৫/৩৫৩।
৬। সিরাতু উমার বিন আবদুল আযিয, ১৪৪।
৭। আল কামিল ফিত তারিখ, ৫/১১৯।
৮। প্রাগুক্ত, ৫/৩৩৯।
৯। আল মাওয়ায়েজ ওয়াল ইতিবার, ২/৩৯৭।
১০। তারিখুত তাবারি, ৫/২৩২।
১১। সহিহ বুখারি, ৫১৭৪।
১২। আল মুদাওয়ানাতুল কুবরা, ৩/২২।
১৩। হিলয়াতুল আউলিয়া, ৬/১৩৫।
১৪। আল কামিল ফিত তারিখ, ৫/২৩০।
১৫। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৩/৪০
১৬। প্রাগুক্ত, ১৩/৩৮।
১৭। তারিখুল ইসলাম, ৫/৭৯।
১৮। প্রাগুক্ত।
১৯। আল ইরশাদ ফি মারিফাতি উলামাইল হাদিস, ২/৭১৫।
২০। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৮/৫৩৫।
২১। আদ দুরারুল কামিনাহ, ৫/৩০৭।
২২। আল ইসাবাহ, ৮/৩১৪।
২৩। আল ওয়াফি বিল ওফায়াত, ৫/২০৮।
২৪। ওফায়াতুল আইয়ান, ৪/১০।
২৫। আন নুজুমুয যাহিরা, ৫/১৯২।
২৬। আত তারিখুল বাহির, ১২৫।
২৭। আর রওযাতাইন, ৩/২৮।
২৮। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/৪৫৮।
২৯। রিহলাতু ইবনি যুবাইর, ১২৮।
৩০। শাজারাতুয যাহাব, ৪/২৭০।

Facebook Comments